এক গুচ্ছ কবিতা

জাহানারা পারভীন


অপরাধ

এক চিলতে বারান্দার দোতলা বাড়ি
বাড়িতে আসা যাওয়া দখিন হাওয়ার
আর আসত চড়ুই
ছানাপোনাসহ চড়ুই মা শিকার করতেন কখনও কখনও

বন্ধ দরোজা, জানালা, ঘুলঘুলি,
পাখিদের ছুটোছুটি, আর্তচৎিকার
এখনও মনে আছে মায়ের নিষ্ঠুরতা

শিশু সন্তানের পাতে মা তুলে দিতেন পাখি মায়ের ডানা, পা, কলিজা
যার সন্তানেরা তার জন্য অপেক্ষায়,

বাড়ির গ্রিলে বসা চড়ুইয়ের কাছে তাই ক্ষমা চাই
আমার মায়ের অপরাধের



পাখিজন্ম

দেয়ালে কয়লায় আকা ছবি
পাখিটা উড়তে শেখে একদিন
খড়কুটো জড়ো করে বাসা বাধে ঘুলঘুলিতে,
তা দেয় ডিমে, ডিম ফেটে বের হয় ফুটফুটে ছানা

মা পাখিটা ছবি হয়ে আবার ফিরে যায় দেয়ালে
ক্ষুধার্ত পাখিছানার চিৎকারে আমার ঘুম আসে না...



মসলার গান....
আমার মুঠোতে কোনও ঈশ্বর নেই
একটা পিপড়ে ছিল, সেও চলে গেছে
দাদীর সিন্দুক থেকে যে সবুজ মার্বেল
এনেছিলাম, সেও ছিল কিছুদিন..
সেও জানে, মুগ্ধতাও অনুতাপের মা

অথচ একটি এলাচ আমাকে বলেছিল-
মসলার বন তার ভালো লাগে না
সে চায় অভিশপ্ত হাতের মুঠোবন্দী জীবন...
কাচের বয়ামে ভরে রাখি মুঠোভর্তি এলাচের ইচ্ছে



প্রহসন...
পাল তোলা জাহাজে ধানের বীজ জড়ো করে
ভেবেছি চলে যাব কোথাও
কৃষকেরা নিশ্চিত নয় এগুলো বীজধান, নাকি চিটেধান....
অথচ ফসল ফসল করে সারা আশ্বিন দাড়িয়ে থেকেছি মাঠে
অপেক্ষা এমনই...
মেঘের মুখোমুখি দাড় করিয়ে রাখে বৈশাখের পর্বত
কখনও কখনও উচ্চতাও অপরাধ এক
গজ ফিতায় মেপে রাখে সব অসুখের দৈর্ঘ
চিটেধানসহ জাহাজ ডুবে গেলে নদীতে
আকাশ থেকে ঝড়ে পড়ে বীজধানের বৃষ্টি...
হুদহুদ পাখির পালক



শহরের অভিধান...

অবশেষে জেনে গেছি সেই শহরের নাম,
যেখানে জুতো পায়ে প্রথম হেটেছে মানুষ;
মেলেনি জুতো ও পায়ের মাপ...

মৌলভীর পকেটে পাওয়া ট্রেনের টিকেট
সেখানে নেই যাত্রীর নাম, আসন নাম্বার
চেনা ষ্টেশনে চায়ের লিকারের গাঢ় ঘুম
পানের পিকের মতো ছুড়ে দিলে দেয়ালে...

সারল্য ছাড়া তার কোনও অপরাধ নেই
শহরের ঠিকানা খুজতে খুজতে সেও জেনে যায়
সেদ্ধ ধানের পিঠে জন্মানো গাঢ় তিলের অপরাধ







পাটিগনিতের গ্রাম...


চরের বালিতে দাফন করেছি জুতোর একপাটি
অথচ পায়ের কোনও নিবন্ধন নেই
হাটা বলতে পায়ের ফোসকাকে অস্বীকার বুঝি
একপাটি জুতো নিয়ে মাইলের পর মাইল
পকেটে জুতো হারানোর শোক;
মনে ভাঙা কাচের আঘাত
হাটতে হাটতে দেখি
নদী ভাঙনের কাছাকাছি কবরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সব আঙুল
কবরে বহুকালের খুজে ফেরা অক্ষত পা..


কাকতাড়ুয়ার মুখ

উঠোনে উঠোনে শুধুই প্রস্থান;
ছাপ রেখে যাওয়া পায়ের প্রতিভা
চৌকাঠে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি
কথা ছিল কলাপাতায় আকব পিকাসোর মুখ;
তাহিতির মেয়েদের হলুদ হাতের নমুনা...

উঠোনে একে রাখি কাকতাড়ুয়ার মুখ
হলুদ ধানক্ষেতে দাড়িয়ে থাকে একা...