শারদীয়া

দেবদ্যুতি রায়

সমীররঞ্জন কান পেতে শোনেন মণ্ডপ থেকে ভেসে আসা মন্ত্রোচ্চারণ। দিব্যেন্দু ছেলেটার গলাটা বেশ, কেমন গমগমিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করে। শিবালয় ঠাকুর অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর তার ছোট ছেলে দিব্যেন্দু গত দু’তিন বছর ধরে পুজো করতে আসছে। নিচ তলার বারান্দায় বসে এই সকালবেলায় “যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেন সংস্থিতা/ নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমস্তসৈ নম: নম:....” শুনতে শুনতে সমীররঞ্জনের চোখে জল আসে। সমস্ত পৃথিবীর মাতৃরূপের দেবীর কাছে তিনি যেন নিজেকে সমর্পিত করে দেন।

বাবা।

যুক্তার ডাকে তিনি ধ্যানমগ্নতা ভেঙে তাকান। যুক্তা তার পুত্রবধূ, মেয়েটাকে এই পুজোর সকালে যেন আরেকটু বেশি স্নিগ্ধ দেখায়। সমীররঞ্জনের সব সময়ই মনে হয় এই মেয়েটার মধ্যে কাকতালীয়ভাবে তার মায়ের আদল আছে।

বাবা, চলুন, অঞ্জলি দিতে যাই।

সমীররঞ্জন হাসেন। যুক্তার আর কী দোষ? বেচারার বিয়ের পর এই প্রথম পুজো। তার ওপর আবার চাকুরি কলকাতায়, বিয়ের পর থেকেই রজতের সাথে সেখানে থাকে। সে কী করে জানবে আজ বহু বছর সমীররঞ্জন মন্দিরে অঞ্জলি দিতে যান না? কত বছর তা ভাবলে তার নিজেরই অবাক লাগে। অথচ এটা তাদেরই পাড়ার পুজো, বাড়ির উঠোন ছেড়ে দুই পা হাঁটলেই মণ্ডপ।

তিনি যুক্তাকে বলেন- তোমরা যাও বৌমা। আমি অঞ্জলি দিই না।

দোতলা থেকে রজত নেমে আসে।

আরে, তুমি বাবাকে বলছো নাকি মণ্ডপে যেতে?- হা হা করে হাসে সে- তোমাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, বাবা কোনোদিন মণ্ডপে যায় না। চলো চলো।

আচ্ছা, ঠিক আছে- যুক্তা খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেও সামলে নিয়ে বলে- মা, মা যাবে না?

মা আসবে পরে রণ্টি, মন্টির সাথে। চলো আমরা আগে যাই।
যুক্তা আর রজত বের হয়ে যায় বাড়ি থেকে। সমীররঞ্জন তেমনি বসে থাকেন তার হাতলওয়ালা চেয়ারটায়। বাইরে থেকে এখনও দিব্যেন্দুর মন্ত্রের আওয়াজের সাথে সম্মিলিত উলুধ্বনি ভেসে আসছে। অঞ্জলি শুরু হয়েছে, অন্তত আট দশটা ব্যাচ লাগবে শেষ হতে। দুই চঞ্চল নাতনি রণ্টি আর মন্টির সাথে রত্নাও ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। স্মৃতির এই যমজ মেয়ে দুটো পরশু এসেছে ওদের দিদার সাথে, রত্নবতী আনতে গিয়েছিলেন ওদের।

আচ্ছা শোনো, তুমি গ্যাসের অষুধটা খেয়ে নাও। আমরা মণ্ডপ থেকে আসি।

বিয়ের পর থেকে রত্নবতী কখনও তাকে অঞ্জলি দিতে দেখেননি। বিয়ের পর তার যেবার প্রথম পুজো ছিল এ বাড়িতে, সেবার ছাড়া আর কখনও এ নিয়ে কিছু জিজ্ঞেসও করেননি তিনি। ধীর পায়ে তিন জন বেরিয়ে গেলে তাদের গমনপথের দিকে খানিক তাকান সমীররঞ্জন।

বাড়ির দরজায় ঝোপড়া শিউলি গাছটায় ঝেপে ফুল হয়, রোজ সকালে টুপ টুপ করে পড়ে সাদা-কমলা রঙে ছেয়ে থাকে তার তলাটা। এখন অবশ্য গাছের তলাটা প্রায় পরিষ্কার। রত্নবতী সকালবেলাতেই গাছের পাতায় পড়া আর বোঁটা আলগা হয়ে আসা ফুলগুলো তুলে নেন পূজার জন্য, এরপর সন্তোষের মা তার তলাটা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে ফেলে। তবু আজ কয়েকটা কমলা বোঁটার সফেদ ফুল সেখানে পড়ে আছে। সমীররঞ্জনের নাকে হঠাৎ ঝাপটা মেরে যায় সতেজ শিউলির ঘ্রাণ!

এই গাছটার মতোই শিউলিগাছ ছিল সে বাড়িতেও। পুরনো লম্বাচওড়া দরদালানের সামনে যে সিংহদরজা ছিল এককালে, তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বুড়ো ঝোপড়া গাছটার তলা শরতের ভোরে নরম তুলতুলে গালিচা হয়ে উঠত। পুরো বাড়িজুড়ে সে কী সুগন্ধ ছিল তার! তখনও আলো ফুটতে পারত না, তার আগেই ছোট্ট দুটো পায়ের আবছা স্পর্শে জেগে উঠত সে গাছতলার শিশির ভেজা মাটি। বাঁশ চেঁছে বানানো একটা ছোট্ট ফুলের সাজি থাকত তার হাতে। মার পুজোর সাজির ছোট সংস্করণ সেই সাজি ভরে উঠত রাশি রাশি শিউলিতে। কখনও কখনও শিউলিতলায় বসে থাকতে থাকতে ভোর গড়াত সকালে। দস্যি ছেলেকে খুঁজে না পেয়ে সারদাময়ী ত্র্যস্ত গলায় ডাকতেন-

সমীর সমীর সমীর! বাবু কোনঠে তুই?

সে ডাকে সাজি হাতে ব্যস্তসমস্ত হয়ে দৌড়োত সমীর নামের ছেলেটা, ফুলের সাজি দেখে প্রতিবার হেসে ফেলতেন সারদাময়ী-

তুই বাবু, একবারে ভয় ধরে দিস!

সাজিটা রেখে সমীর তখন ঝাঁপিয়ে পড়ত মার কোলে। মার গায়ের আদর আদর গন্ধটা মেখে নিত সারা গায়ে, বুকের ভেতরে।
হই হই করে বাড়ি ফেরে রণ্টি আর মন্টি। সমীররঞ্জন বর্তমানে ফেরেন। রত্নাকেও দেখা যায় দরজায়, তার পেছনে যুক্তা। অঞ্জলি শেষে ওরা সবাই ফিরে আসছে। এবার এ বাড়িতে সকালের জলখাবারের পাত পড়বে।

ভেজানো চিঁড়ে, পাশেই খানিকটা ঝরঝরে সুন্দর মুড়কি, বাড়িতে পাতানো দই আর আখের গুড়, দুটো নারকেলের নাড়ু, একটা করে শবরী কলায় আজকের ডাইনিং টেবিলের প্লেটগুলো সাজে। সপ্তমী থেকে দশমী- এই চারদিন এ বাড়িতে এই হলো সকালের খাবার। রত্নবতী এই দেখে এসেছেন তার শাশুড়ির আমল থেকে, শাশুড়ি মারা যাবার পরও সে নিয়মের ব্যত্যয় হয়নি। এই ছোট ছোট পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে তার ভালো লাগে খুব।

ইছামতীর গ্রামেও পুজোর সকালে মা ঠিক এমন করেই বিভিন্ন সাইজের কাঁসার থালায় খাবার সাজিয়ে দিত! বড় দিঘীর চার পাশে সারি সারি কলাগাছ, সে গাছ থেকে পাকা কলা আসত আর দই হতো বাড়ির গাইয়ের দুধে। বাড়ির পুজো বলে ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত ছিল নিরামিষ; কত পদের যে ভাজা, ঘণ্ট, ছেঁচকি, রসা রান্না হতো! দশমীতে ঠাকুর বিসর্জন দিয়ে তারপর আমিষ ঢুকত বাড়িতে। ছোটদের তো বটেই, বড়দেরও নেমন্তন্ন থাকত এ বাড়ি সে বাড়ি। সমীরের বাবা নিখিলরঞ্জন খুব হাঁক ডাকের মানুষ ছিলেন, পুজোর ক’দিন অতিথি অভ্যাগততে ভরে থাকত রায়বাড়ি।

সমীররঞ্জন চোখ বন্ধ করে ইছামতীর ফেলে আসা সেসব দিনের ঘ্রাণ মাখতে চান যেন। বুড়ো হবার এই এক জ্বালা, স্মৃতিরা বড্ড জ্বালাতন করে। তবু সেই ঘ্রাণ খুঁজতে খুঁজতে তিনি মনে করার চেষ্টা করেন জলপাইগুঁড়ির এই শহরতলী থেকে দিনাজপুরের ইছামতী নামের গ্রামটার কাগুজে দূরত্ব কতখানি।

এ পাড়ার পুজোটাও বেশ পুরনো, পনের কুড়ি বছর তো হবেই। বিকেলে মণ্ডপের চারপাশ জুড়ে মেলা বসে। আজকাল সব মণ্ডপ ঘুরে ঘুরে প্রতিমা দেখার খুব চল হয়েছে। নতুনপাড়ার ছেলেছোকরাদের খুব ঝোঁক নামি কারিগরের কাছ থেকে দামি আর অন্যরকম প্রতিমা তৈরি করানোর। শোলাকাঠির গণেশ পাল দামও হাঁকে সেই রকম। এবার পুরো সাদা প্রতিমাটা গড়তে নাকি আশি হাজার টাকা গুণে নিয়েছে। মণ্ডপটাও বানিয়েছে চমৎকার। ঝিনুকের খোল দিয়ে কী সুন্দর করে যে সাজিয়েছে!

তাদের ছোটবেলায় প্রতিমা কিংবা মণ্ডপ নিয়ে এমন মাতামাতি ছিল না। অবশ্য সেই সময় পুজোই বা হতো ক’টা? আশেপাশের দশ গ্রাম মিলিয়ে পুজো হতো কেবল তাদের সেই ইছামতীতেই। রায়বাড়ির সেই পুজোর এত জাঁক ছিল না বটে কিন্তু ছিল প্রাণ। দশ গ্রামের মানুষ ভক্তিভরে সে পুজো দেখতে আসত সুযোগ পেলেই। সেই প্রাণ কি আর এই দেখনদারির মধ্যে মেলে?

সেদিন সপ্তমী বলে অবশ্য মেলায় অত ভিড় হয় না। তবু নরেনের জিলাপির দোকানের চুলার আগুন বন্ধ হয় না, একটু একটু করে বিক্রিবাট্টা চলে। ভোলার বাদামভাজা আর লাঠি লজেন্সের দোকানেও বাচ্চাদের ভিড় বড় কম নয়।

বাড়ির দরজায় চেয়ার পেতে বসে এই কম ভিড়বাট্টার মেলা দেখতে মন্দ লাগে না সমীররঞ্জনের। নবীন একটু আগে এসে ভালোমন্দ গল্প করে গেছে। বয়সে অনেক কম হলেও ছেলেটার সাথে কথা বলে আরাম লাগে। এবারের পুজো কমিটির সভাপতি সে, সাতচল্লিশের পরপরই পাততাড়ি গুটিয়ে ওর ঠাকুরদা রাধাকান্তবাবু কুড়িগ্রাম থেকে চলে এসেছিলেন জলপাইগুড়িতে। নতুনপাড়ার বেশিরভাগ ঘরই ওপার থেকে আসা। এই মানুষদের সাথে কথা বললে ইছামতী, নাগেশ্বরীর কথা আসবেই। এমন গল্পের সময় দুধকুমার, কাঁকড়া, করতোয়া নদী থেকে ভেজা মিঠে হাওয়া যেন মেঘে মেঘে উড়ে আসে নতুনপাড়ায়।

চারপাশে রাজ্যের গাছ আর লতাপাতায় ঘেরা এ বাড়িটা থেকে মণ্ডপ খুব বেশি হলে শখানেক গজ দূরে। মেলা এ বাড়ি ছাড়িয়ে আরও পশ্চিমে চলে গেছে। মেলা দেখতে দেখতে সমীররঞ্জনের মনে পড়ে- রণ্টি, মণ্টি গুড়ের জিলাপি খেতে চেয়েছিল। নরেন শুধু চিনির জিলাপি ভাজে, আজ একবার বলে দেখতে হবে নবমীর সন্ধ্যায় কেজিদুয়েক গুড়ের জিলাপি দিতে পারে কি না। সব ছেলেপুলেরা খাবে বিজয়ায়। আহ্, ইছামতীর নকুল কাকু কী ভালোই না গুড়ের জিলাপি ভাজত!

এই মেলায় একটাও মাটির পুতুল কী হাঁড়িকুড়ির দোকান চোখে পড়ে না তার। আজকালকার বাচ্চারা পুতুলই খেলে না বোধহয়। বিকেল হলেই মাটিতে দাগ টেনে একগাদা পিচ্চি হাঁড়ি পাতিল নিয়ে ঘর সংসার খেলতে বসে না। অথচ আগে, ইছামতীর পুজোর মেলা অথবা চড়কের মেলা- মাঠ ছেয়ে যেত মাটির জিনিসে। শিলাদি ওকে একবার চড়কের মেলা থেকে একটা শ্যাওলা রঙের মাছ কিনে দিয়েছিল। সেটা আসলে ছিল মাটির ব্যাংক, পিঠের উঁচু ‘ফয়রা’র সাথেই চিকন লম্বাটে একটা কাটা জায়গা ছিল পয়সা ঢোকানোর জন্য।

এত দিন পরও সমীররঞ্জনের সেই মাছটার জন্য মায়া লাগে। ছোট্ট সমীর ঐ শ্যাওলারঙা মাছটা বুকের ভেতর নিয়ে ঘুমাত রোজ রাতে। পাঁচ পয়সা দশ পয়সা আর আধুলিতে সেই মাছের পেট ভরে গেলেও বাচ্চা সমীর ব্যাংকটা ভাঙতে চায়নি অনেকদিন। আসলে ছোটখাট গোলপানা মুখের শিলাদিকে দেখলে ওর মনে হতো একটা পরী। মাটির তৈরি ঐ মাছটায় যেন লেগে থাকত শিলাদির পরী পরী স্পর্শ। আচ্ছা, শিলাদি কেমন আছে? বেঁচেই আছে কি এত দিন?

কাকু, এই পানটা খান।

আচমকাই এই ডাকটা তার ভাবনার সুতো কেটে দেয়। কুড়ি পঁচিশ বছরের মিজান পানের দোকান দিয়েছে মেলায়, তারই একটা খিলি এগিয়ে দেয় তার দিকে।

সমীররঞ্জন সাধারণত পান খান না, তবু মিজানের এগিয়ে দেয়া পানের খিলিটা তিনি হাতে নেন। মিজান ছেলেটা তার ভালোই পরিচিত। দেশ ভাগ হওয়ার পর অন্য আত্মীয়স্বজনরা ভিটেমাটিটুকু বেচে দিয়ে ওপাড়ে পঞ্চগড় এলাকায় চলে গেলেও ওর দাদা সোনা মিয়া যাননি। আত্মীয় পরিজনহীন হয়ে তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে তার পরিবার এখানেই থেকে গেল। এই তো এখান থেকে কিলোকয়েক গেলেই পঞ্চগড়, মিজানের কাছের মানুষেরা সেখানেই বসত গেড়েছে। প্রকৃতি সদয় হলে কী হয়- মানুষের গড়ে তোলা দুর্ভেদ্য সীমারেখা তাদের মধ্যে দূরত্ব রচেছে বিস্তর।

তোর বেচা কেনা কেমন চলে রে মিজান?
হাতের পানটা মুখে চালান করে দিয়ে তিনি ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করেন।

এই তো কাকু। আগের মতো আর হয় না বিক্রি।

এইটুকু ছেলে, সেও কিনা বলে আগের মতো হয় না! সমীররঞ্জন চমকান, আগের মতো যে আর কোনোকিছুই হয় না সে তার মতো করে আর কে জানে?

ঐ যে ইছামতীর রায়বাড়ির পুজো, এই নতুন পাড়ার ঝলমলে দুর্গাপ্রতিমা আর আয়োজনের জৌলুশ কি তার ঘ্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারবে? যোগেন জ্যাঠা নিজের তৈরি ছাঁচে ফেলে প্রতিমার মুখ গড়ত, আজকের মতো এত দেখনদারি ছিল না বটে তার কিন্তু দেখলেই বুকের মধ্যিখান থেকে মা ডাক উঠে আসত।

যোগেন জ্যাঠা প্রতিমা গড়তে শুরু করত পুজোর মাসখানেক আগে থেকে। তিন ক্রোশ দূরের কঞ্চনা গ্রাম থেকে গরুর গাড়িতে করে আসত ‘কুমার মাটি’। নিখিলরঞ্জন, তার ভাই অতীশরঞ্জন আর অখিলরঞ্জন, দুর্গাচরণরা সব তদারকি করতেন। প্রতিমা বানানোর পুরো সময়টায় স্কুলের সময়টুকু বাদে অন্য সময় তারা পড়ে থাকতেন মন্দিরের আশেপাশেই। একমাত্র ছেলেকে পুজোর আগের ক’টা দিন নাওয়াতে খাওয়াতে বড্ড বেগ পেতে হতো সারদাময়ীর।

দুর্গাপুজো এলেই প্রতিবছর সমীররঞ্জনের চোখের সামনে দুলতে দুলতে যেন ছেলেবেলাটা ফিরে আসে। ছোটখাট দুর্গা প্রতিমার সামনে মাটির সরায় প্রসাদ, বড় বড় ডালাজুড়ে ফুল বেলপাতা, ধূপ-ধুনোর গন্ধ, নবমীর খিচুড়িভোগ, বিকেলে নিত্যানন্দ, শিবময়, বন্দনাদিদের সাথে মেলায় পাঁপড়, আচার, গজা-বাতাসা খাওয়া, সন্ধ্যা পেরোলে হ্যাজাকের আলোয় আরতি। নিপু ঠাকুরের আরতির পরপরই বিষাদুদা কেমন ঘোরগ্রস্তের মতো আরতি শুরু করত। কবিরাজবাড়ির ফাই ফরমাশ খাটা বিষাদুদা ধুনুচি হাতে তখন এক অন্য মানুষ। ওর ভালো নাম যে মনোহর, তা ওরা জেনেছিল অনেক পরে।

ইছামতীতে শৈশব ছাড়া আর কোনো স্মৃতি নেই তার। একটু বড় হতেই চারদিকের বাতাসে ভেসে বেড়ানো ফিসফিসানি কানে আসত। সব না বুঝলেও ‘চলে যেতে হবে’ ব্যাপারটা বুঝে গিয়েছিল ঠিকঠাক। তারপর বাবা-মার হাত ধরে সেই উনিশশো ঊনষাটে যখন সদ্য শৈশব পেরনো ছেলেটা ইছামতী ছেড়েছিল তখন তার বয়স কেবল তের। অথচ এই বয়সেও ঐ সময়ের স্মৃতিই সবচেয়ে উজ্জ্বল। ইছামতীর তের বছরই এই জীবনের সুন্দরতম সময়।

অষ্টমীর বিকেলে স্মৃতিলেখা আর অবনীশ এল। চার দিন পর রণ্টি-মন্টি মাকে পেয়ে মহা খুশি। সে রাতে খাওয়া দাওয়ার পর বাড়ির উঠানে সবাই জড়ো হয়। কত বছর পর এমন আড্ডা বসল এ বাড়িতে। বিয়ের পর সেই প্রথমবার ছাড়া স্মৃতি পূজায় আসতে পারেনি আর একবারও। মেয়ের মুখে উপচে পড়া আনন্দ দেখে সমীররঞ্জনের বুক ভরে ওঠে।
যুক্তা কাল বাবার বাড়ি যাবে। রায়বাড়ির মতো ওদেরও পারিবারিক পুজো। বাড়ি যাওয়ার আনন্দেই হয়ত আজকের আড্ডায় মেয়েটাকে রঙিন প্রজাপতির মতো উচ্ছ্বল লাগে। মন্টি ওর কাঁধ ধরে ঝুলছে। স্মৃতির কোলে শুয়ে শুয়ে রণ্টি আহ্লাদ করে- আমরা কেন প্রতি বছর পূজোয় আসি না মা? এবার থেকে কিন্তু আসব।

স্মৃতি মেয়ের নাক টিপে আদর করে দেয়। যুক্তা হঠাৎ প্রশ্ন করে বসে-

আচ্ছা বাবা, আপনি অঞ্জলি দেন না কেন? কখনও দেননি?

রজতের চোখেমুখে কৌতুক ভাসে, অবনীশ আর স্মৃতি গল্পের আভাস পেয়ে নড়েচড়ে বসে। যাক। এই ফাঁকে যদি গল্পটা শোনা যায়! রণ্টি-মন্টি আহ্লাদে ব্যস্ত। কেবল রত্নবতীর চোখ ছলছল করে। সমীররঞ্জনের অঞ্জলি না দেয়ার কারণ তিনি জানেন। বিয়ের পর প্রথম পূজোয় তিনিও স্বামীর কাছে একই প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়েছিলেন। সেদিন তাকে যা বলেছিলেন আজ যুক্তাকেও সেই একই উত্তর দেন সমীররঞ্জন-

ইছামতী ছেড়ে আসার পর বাবা, মা, আমি কেউ আর পূজার অঞ্জলি দিইনি বৌমা। ঐ ভিটেমাটির সাথে, যোগেন জ্যাঠার প্রতিমার সাথে দুর্গা মাকেও আমরা ইছামতীতেই ফেলে এসেছি।

একটি গাঢ় দীর্ঘশ্বাসের সাথে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে একটু আগের আনন্দময় আড্ডায়। সে আড্ডায় মেঘমুক্ত অষ্টমীর আকাশ থেকে তারারা কেবল মৃদু আলো বিলিয়ে যায়।