রাজু

আসমা চৌধুরী

রাজুর সাথে আমার ছিলো খুব ভাব।বয়সে সে ছোটই হবে।সবসময় তার অদ্ভুত দাবী তার নানি বলেছে তার বয়স চৌদ্দ।একটু 'জিরকুট্টা'বলে নাকি ছোট দেখায়।বাচ্চা বয়সে বয়স বেশি হওয়াটাই ছিলো গর্বের কারণ তাই আমিও দমবার পাত্রী ছিলাম না।রাজুর যুক্তি উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করতাম।রাজুর লিকলিকে কালো পা,উঠতি শরীর আর একজোড়া নরম চোখ নিয়ে ছাইগাদায় বসে থাকার ভঙ্গিটি আমার আজও মনে পড়ে।কুটিলতা বর্জিত এমন করুণ চোখ আমি আর কোনদিন কোথাও দেখিনি।
রাজুর নানি আমাদের ঘরে রান্নার কাজ করতো।আমরা তাকে বলতাম ছলির মা বুয়া।রাজুর মাকে বলতাম আনুবুয়া আর রাজু আমাকে বলতো ছোড বুয়া।কী অদ্ভুত নিয়ম কেমন করে তিন প্রজন্ম বুয়া হয়ে যায় নিরন্তন অভাবের সূত্রে।সেই ছেলেবেলায় বলতে লজ্জা হতো কিন্তু আজ অন্তর থেকেই বলছি রাজুই ছিলো আমার জীবনবেলার প্রথম সখি বা সই।আমি কথা বেশি বলতাম না,রাজু অনর্গল বলে যেত নিমগ্ন হয়ে শুনতাম।শুনতে পছন্দ করতাম।বিচিত্র কথার অপূর্ব কারুকাজ।কৈশোরের কৌতুহল আর চিরসবুজ অধ্যায়।একদিন বসে আছি জামতলায় সামনে সবুজ ধানক্ষেত আর দূরের আকাশ।রাজু আমার নিস্তব্ধতাকে ভেঙে ফিসফিস করে বলে,'জানেন ছোড বুয়া রফিক্যায় একটা হারামি। আমারে টাহা হাদে।কয় পাঁচ টাহা দিব।'
আমি খুব অবাক হলাম।একজনে টাকা দিতে চাচ্ছে,তাও আবার পাঁচটাকা;তাতে রাগের কী আছে?আর রফিক সেজন্য হারামিইবা হবে কেন?রেগে গিয়ে রাজুকে বকে দিলাম।রাজু বিজ্ঞের মতো বলে,'আরে বুয়া টাহা কি এমনে এমনে দিতে চায়?কু মতলব আছে।ঐডাতো ভীষণ খচ্চর।'
রফিকের চেহারাটা আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে।হাবা-গোবা,মুখদিয়ে লালা গড়ায় এমন একটি ছেলে।তার কু মতলবটা কী হতে পারে ভেবে ঠিক করতে না পেরে রাজুকেই ধমকে দিলাম।এর কিছুদিন পরে রফিকের ভয়ে রাজুকে ছুটতে ছুটতে আসতে দেখি আমার কাছে।রাজু গিয়েছিলো ওর নানির জন্য গাছের নিচে পড়ে থাকা পাকা সুপারি টোকাতে।রফিক ওকে সুপারি বাগানে একা পেয়ে ঝাপটে ধরেছে।ওর কিশোরী স্তনে খামচে দেয় শয়তানটা।ভয়ে রাজু সাদা হয়ে গেছে।
একদিন রাজুর মা তার পাঁচ নম্বর স্বামীর ঘর থেকে ফিরে আসে।তালাক দিয়ে বিদায় করেছে।রাজুর মা আমার আম্মার পায়ের কাছে মাটিতে বসে খানিকটা কাঁদে।কেবলই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে একটি লাইনই বলছে,'ভাবীসাবগো আমনে কন আমার কী অইব'।
আম্মা সেলাইমেশিনে সেলাই নিয়ে ব্যস্ত ছিলো।তাকে এবং চাচিদেরকে বিচলিত মনে হলো না।এক পর্যায়ে মা ধমক দিয়ে বলে,'আনু তোর দেলু মাঝির কলের চাবিটা একটু থামা দেহি।এইডা তো নতুন কিছু না।'
'দেলু মাঝির কলের চাবি'একটি গ্রাম্য প্রবাদ।যার অর্থ বিরতিহীন অর্থাৎ চলবেই।আজ ভাবি বিশ্বের সকল নির্যাতিত নারীর চেহারা একই।আর তাই চীনের বিখ্যাত লেখক লু্্যসুনের 'নববর্ষে আত্মদান'গল্পের গৃহকর্মীর সাথে আনুবুয়ার কী অদ্ভুত মিল।এরা এতটাই দুঃখি এতটাই নির্যাতিত যে এদের দুঃখকথাও কেউ শুনতে চায় না।ট্রাজেডি কমেডিতে পরিণত হয়।
ঘরে মা ফিরে আসায় লজ্জামিশ্রিত খুশির আলোয় বিভোর হয় রাজু।ওকে বরাবরই দেখেছি নানির সাথে বাস করে।ঘরে ঘরে কাজ করে নানি যা পায় দুজনায় ভাগাভাগি করে খায়।রাজুর নানা নিঃস্ব ছিলো না।বেশ বড় একটি টিনের ঘরে মামা,মামির সংসার।রাতে নানার ঘরে সকলের আশ্রয় জুটলেও মামা,মামি ওদের ভরণ পোষণ করে না।রাজুর নানা গ্রামের কিছু মানুষের পরামর্শে আুবুয়া,তার মা ও বোনকে ঠকিয়ে জমিজমা লিখে দিয়ে যায় একমাত্র ছেলে রশিদকে।রশিদ তার মা বোনের খবর নিতো না।তাই দিন কয়েক পরেই দেখা যায় রাজুর মায়ের ষষ্ঠবারের মতো গায়ে হলুদ।আমরা কৌতুহল নিয়ে দেখতে গেলাম সেই দৃশ্য।
একটা হাতলভাঙা চেয়ারে আনুবুয়া বসে আছে জলচৌকির ওপরে পা রেখে। হাত জোড়া মেহেদি জড়িয়ে প্রণামের ভঙ্গিতে।মাথায় ঘোমটা দিয়ে আনুবুয়া কাঁদছে আর সকলে হাসছে।সুর করে গান গাইছে দলবদ্ধভাবে,'মেন্দি তুলিতে তুলিতে ভাইসাবেরে ঘামাইছে/আবের পাঙ্খা টাইন্যা ধর/ভাইসাবেরে পাঙ্খা কর।'
আবার-'ঘরের দুয়ারে ডালিম গাছ/চিনি,চিনি পাতালো ননন্দী জলতি মোরে সাজাইয়া দে'।গান গাইতে গাইতে প্রতিবেশীরা একে অন্যের গায়ে ঢলে পড়েছে।নাকি সুরে বৌ ঝিয়েরা যখন গান ধরে তখন রাজুও তাদের সাথে সুর মেলায়।সে গভীর মনোযোগের সাথে অন্যদের মতো হাতে মেহেদি লাগায়।দেখে আমার মতো অন্যরাও হাসে।
রাজু হচ্ছে ওর মা-বাবার প্রথম বিয়ের সন্তান।আনুবুয়ার সন্তান বাঁচেনা।জন্মাবার আগে অথবা পরপরই মারা যায়।রাজু ছাড়া তার আর কোন ভাই-বোন বেঁচে থাকেনি।আনবুুয়াকে তাই তালাক দিয়োছে রাজুর বাবা।ফিরে আসে ভাইয়ের সংসারে।ক্রমাগত চলে আশ্রয় পরিবর্তন। ভাই যাকে তাকে ধরে বিয়ে দিয়ে বিদায় করে।নতুন সংসারে যখন অভাব দেখা দেয়,তখনই আবার তালাক দিয়ে বিদায় করা হয়।খেটে খাওয়া অভাবী অনেক সন্তানের জনকেরা আনুবুয়াকে তামাশায় পরিণত করে।বিয়ের ছয় মাস এক বৎসর ষেতে না যেতেই তালাক হয়ে যায়।কাবিন নেই,রেজিস্ট্রি নেই শুধু কলমার অপব্যবহার।
একদিন আনুবুয়াকে দেখতে এলো ফকির নামের বৃদ্ধ।তার চুল দাড়ি সব পাকা তবুও সে কন্যা দেখতে আসা পাত্র। তাই যথেষ্ট গাম্ভীর্য নিয়ে বলে,'বিবির হাতটা দেখি,বিবির পা টা দেখি,বিবির চুলটা দেখি।আনুবুয়া প্রচলিত ধারায় প্রাণপণ দেখিয়ে যাচ্ছে।আমরা আড়াল থেকে হাসছিলাম আনুবুয়ার না খাওয়া শরীরের কাঠির মতো হাত পা আর আঁশের মতো একমুঠি চুল দেখাবার আগ্রহ দেখে।
তখন আনুবুয়ার বড়ই দুঃখের দিন।পরনের কাপড় নেই,দুবেলা ভাত নেই।সারাদিন এ দরজায় ও দরজায় একটু কাজ খোঁজে।ভাইয়ের দরজাটা বন্ধ তাই কান্নাটা লেগেই আছে।পঞ্চম বিয়ের পাত্র ফকিরকে আপ্যায়নের জন্য আনুবুয়া ধান ঝারার পয়সা দিয়ে সেমাই শরবতের ব্যবস্থা করেছে।অথচ পাত্র পক্ষের পছন্দ হয়নি।ষষ্ঠ বিয়ের হলুদের দিন রাজুকে আমোদ আহলাদে মত্ত দেখে আমিও হেসেছি কিন্তু অবাক হলাম দিন দুয়েক পরে।পরীক্ষা শেষে খেলার জন্য রাজুকে আমার দরকার কিন্তু সে আসে না।খোঁজ নিয়ে জানলাম বাড়িতেই আছে।মনে মনে ভাবলাম মায়ের বিয়ে হয়েছে তাতে ওর কী হয়েছে?
বিকেল বেলায় ডেকে এনে জিজ্ঞেস করলাম,কী রে কী হয়েছে?ধপ করে রাজু বসে পড়ে মাটিতে গাঁথা ইটের টুকরোর ওপর।জল ছলছল চোখ।ভাবলাম আমার ওপরে রাগ করেছে।জিজ্ঞেস করলাম খিদে পেয়েছে?উত্তরে বললো,না।
দীর্ঘক্ষণ কোনও কথা নেই।অবারিত সবুজ দেখতে দেখতে একসময় কেমন যেন লাগে।রাজুকে কেমন যেন রহস্যময় লাগছে।খোঁচা মেরে বললাম,ত
তুই থাক আমি যাই।
ও করুণ মুখ তুলে তাকায়।আস্তে বলে,'ছোড বুয়া মায়কয় হেরে(ওর মায়ের নতুন স্বামী)বাবা ডাকতে।কেমনে ডাহি কন?