মেট্রোর নোটবুক

দ্বৈপায়ন মজুমদার

মফস্বল থেকে মহানগরে এসেছিলাম পড়তে । বছর কুড়ি আগের কথা । হস্টেলে বেডের সমস্যা, ছাত্র রাজনীতি, নতুন পরিবেশ এই রকম অনেক কিছু মিলিয়ে বাবা একটা বাড়ি ভাড়া নিল বেহালা চৌরাস্তার কাছে । তারপর টালিগঞ্জ থেকে মেট্রোর দু'নম্বর বগি আমার, মানে আমাদের । এটা সেই সময় যখন টালিগঞ্জমেট্রো 'মহানায়ক উত্তমকুমার' হয়নি, যখন টালিগঞ্জ মেট্রোর ফুটপাথ দখল করে সব্জি থেকে ঘুগনি, মোমো থেকে ফ্রুট জুসের স্টল বসেনি । এটা সেই সময় যখন মেট্রো চত্ত্বরে দুটো কোকের গ্লাস তিন জন ভাগ করে অলস আড্ডা দেওয়া যেত । ছিল হলদে কাগজের টিকিট, পিছনে ম্যাগনেট স্ট্রিপ । মাল্টি রাইড টিকিটের ম্যাগনেট স্ট্রিপ নষ্ট হলে অপরাধী মুখে স্টেশনমাস্টারবাবুর অফিসে ঢুকে টিকিটের বাকি টাকা ফেরত নিতাম, সাথে অবশ্যই জুটত মৃদু ধমক ।

দু'নম্বর বগিতে ওঠার বিশেষ কারণ অবশ্য ছিল । আমাদের কলেজের আরও দুই বন্ধু উঠত ওই কামড়াতে । তখন মোবাইল বাসা বাঁধেনি আমাদের কারুর পকেটে । একই বগি হলে সুবিধা হয় খুঁজে পেতে । প্রায় আধ ঘণ্টা গিয়ে তবে তো শ্যামবাজার । আর বিভিন্ন স্টেশন থেকে ওঠা কিছু বন্ধুও জানত এই বগি । তারা যেখান থেকেই উঠত চলে আসত দু'নম্বরে । মেডিকেল কলেজের বন্ধুরাও উঠত অন্য স্টেশন থেকে । তাদের সাথেও ওই সামান্য সময়ে কলেজের, অফিসের ভিড়ের মধ্যেও জমিয়ে আড্ডা । ওরা নেমে যেত সেন্ট্রাল, আমরা এগিয়ে যেতাম শ্যামবাজার । মোটামুটি একই সময়ের মেট্রো ধরতাম আমরা । এমনি করেই প্রেসিডেন্সি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের গ্রুপ থাকত, থাকত তাদের কলরব । একবার কী একটা কারণে আটকে গেল মেট্রো, ক্লাসে দেরি । সম্ভবত এনাটমি বা বায়োকেমিস্ট্রির ক্লাস । একসাথে জনা দশেক ছেলে একই কথা বলার পর স্যার ঢুকতে দিলেন । একটু পরেই জনা পাঁচেক মেয়ে আসতেই স্যার বললেন ওহ মেট্রো বয়েস এলো, এরপর মেট্রো গার্লস । কত প্রেম সেই সময় দানা বাঁধত মাটির নিচে । কত প্রেম বিদায় নিয়েছে ওই পাতাল পথে । কিন্তু বন্ধুত্বে কখনও ভাঁটা পড়েনি । বাড়ি ফেরার সময় ভিড়গুলো চিনতাম আমরা । সেন্ট্রাল এলে উঠবে প্রেসি, মেডিকেল কলেজের গ্রুপ । এসপ্লানেড, পার্কস্ট্রিট থেকে ভিড় জমাবে অফিস ফেরতরা । মাটির নিচে গুটখা, পানমশলা, থুতু ছুড়ে দেওয়ার লোক ছিল বেশ কম । কেউ চট করে বহেন**, মাদার** গালি সাজিয়ে দিত না । এমনকি কেউ থুতু ফেললেও তার জন্য অপেক্ষা করত অন্য যাত্রীর ধমক ।

ওই টালিগঞ্জ মেট্রো চত্বরের ইঁট, সিমেন্ট সাক্ষী কত বন্ধুত্বের । টালিগঞ্জ স্টুডিও পাড়ার বেশ কিছু মুখ ভিড় জমাত সন্ধ্যেতে, বসত তাদের অবিরাম গল্পের আসর । সময়ের তখন ঘড়ি কাকে বলে জানত না । পুজোর দিনগুলোতে এই চেনা মেট্রো আবার অচেনা । আড্ডা গল্পের আসরের জায়গা নিত অনেক অপরিচিত মুখ । লাজুক হাসি অষ্টাদশীর হাতে আলতো স্পর্শ করা সদ্য দাড়ি ওঠা ছেলেটার চোখ টালিগঞ্জ মেট্রো থেকে বেরিয়ে খুঁজে বেড়ায় বেহালা অথবা গড়িয়া যাবার অটো, ঠাকুর দেখবে সারা রাত । তবে স্টেশনগুলোর অবস্থা হতো বেশ খারাপ । অত্যধিক ভিড় । গেটগুলো খোলা থাকত বেশ কিছু স্টেশনে । বেরোনোর সময় ভিড় সামলাতে এ ছাড়া আর উপায় নেই । কাতারে কাতারে লোক মেট্রোর ভিতরে । ধাক্কা, বিরক্তি ইত্যাদির মিশ্রণ । দাদা, পরেরটায় নামব বলে আলগা করে এগিয়ে আসা নেই । পুজোর সময় মেট্রো দেখে একটা অদ্ভুত কষ্ট হতো । কোন কোন সময় মনে হত বন্ধুকে অনেকগুলো লোক অত্যাচার করছে । তখন ওলা উবের আসেনি, ট্যাক্সি চাইত অনেক টাকা । মধ্যবিত্তের সারা রাত ঘুরে পুজো দেখার একমাত্র বিশ্বস্ত যানও ছিল ওই পাতাল রথ ।

পুজো পেরিয়ে ক্রমশ চেনা ছন্দে ফিরত মেট্রো । পুজোর পেরিয়ে বন্ধুদের সাথে পুজোর গন্ধ মাখা নতুন জামায় আবার দেখার যোগসূত্র ওই মেট্রো । তখন মেট্রোতে এসি ছিল না, কিন্তু গরম তেমন লাগত না । পুজো পেরোলে নিয়ম করে মহানগরে নামত কুয়াশা, আসত শীত । শীত মানেই বইমেলা । তখন বইমেলা বসত ময়দানে । ময়দান আর পার্কস্ট্রিট এই দু'টো স্টেশনে জন জোয়ার । বইমেলার জন্য শহর আর শহরতলির ভিড় মিশত পাতাল পথে ।

এক সময় বইমেলা ছাড়ল ময়দান । আর মেট্রোর জীবনেও এলো পরিবর্তন । প্রায় এক দশক আগে দু'টো জিনিস হলো, মেট্রো গড়িয়ে গেল টালিগঞ্জ থেকে গড়িয়া । সম্প্রসারণ হলো আর সঙ্গে যোগ হলো এয়ার কন্ডিশন রেক । ভিড় অসম্ভব বেড়ে গেল । গড়িয়া থেকে আসা মেট্রোয় টালিগঞ্জ থেকে ওঠাই যায় না । আর সবাই টার্গেট করে এসি রেকগুলো, সবারই চাই ঠান্ডা । শুরু হলো আজ এই ট্রেন খারাপ তো কাল ওই ট্রেন বাতিল । সাথে বাড়তে থাকল আত্মহত্যাও । পাতালের নিচে অন্ধকারে বিষন্ন মানুষ খুঁজে নিল আত্মহননের পথ । ক্রমশ বৃদ্ধি পেল এই হতাশ মানুষের সংখ্যা । সাথে বাড়তে থাকল উগ্রতা, অসহিষ্ণুতা । নীতি পুলিশ এবং গণধোলাইয়ের ঘটনাও বাদ গেল না । মেট্রো ক্রমশ অচেনা হয়ে গেল । সবাই খুব ঝগড়া করে, সবাই উত্তেজিত । বয়স্ক মানুষ দেখেও মুখ ঘুরিয়ে সিটে বসে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়ে চলল ।

কুড়ি বছর আগে আমি মেট্রো যাত্রা শুরু করি টালিগঞ্জ থেকে সাত টাকা শ্যামবাজার । কিছুদিন পরেই আট টাকা । কিন্তু ওই আটেই আটকে । চলতেই থাকল এক ভাড়া । বহু বহু বছর পর সেটা পনেরো হলো । বাসের, ট্যাক্সির ভাড়া প্রতি বছর বাড়ে, কিন্তু মেট্রো একই থাকে । সস্তাই নাকি পুষ্টিকর । চোখের সামনে দেখলাম আমার বন্ধুকে খুব দ্রুত শেষ হতে । স্টেশনের নাম বদলে দেওয়া হলো, কত রঙ চাপল । কিন্তু পরিবহনের মান, সংস্কৃতি, ভদ্রতা সব গেল ।

একটা সময় ছিল বলা হত 'মেট্রো কালচার' । এক রাজনৈতিক নেতা বলেছিলেন মাটির নিচে সভ্য মানুষ উপরে উঠলেই কী করে অসভ্য হয়ে যায় ?এতটাই ভদ্র ছিল মেট্রো । দূরদর্শনে 'মিলে সুর মেরা তুমহারা' স্মৃতি আজও টাটকা । সেই গানেও ছিল কলকাতার মেট্রো, ছিল রুচি আর ভদ্রতার ব্র্যান্ড । পশ্চিমবঙ্গের অংশ দেখাতে গিয়ে মেট্রো থেকে বেরিয়ে আসছেন সাহিত্যিক, খেলোয়াড়রা । এটাই ছিল মেট্রো সংস্কৃতি । সময় এগোল, কিন্তু সেই ভদ্রতা পেলবতা নিরুদ্দেশের পথে ।

পাতাল রথ ক্রমশ হারাতে থাকল তার পরিচয় । এখন হয়ত পরিষেবা নিয়ে কথা হচ্ছে, সমালোচনা হচ্ছে, হওয়াই উচিত । কিন্তু কোন আওয়াজ উঠছে না সেই হারিয়ে যাওয়া পরিবেশ নিয়ে । বড্ড দেরি করে ফেলছি হয়ত । মানুষের পাতাল প্রবেশের স্বর্ণরথ ক্লান্ত, বড় ক্লান্ত । অনেক চাপ, প্রত্যাশা নিয়ে চলতে চলতে অনেক আগেই মেট্রোকে আমরা আহত করেছি এবং প্রতিদিন করে চলেছি । তাই উন্নত রেকও হয়ত আসবে, তৈরি হবে নতুন স্টেশন । কিন্তু সংস্কৃতি, ভদ্রতা একদিনে তৈরি হয় না ।

একটা পরিবেশ, একটা সংস্কৃতি হারিয়ে গেছে । সেটা ফিরিয়ে আনার কথা কেউ বলছেও না ।