গন্তব্য ফিফথ এ্যাভিনিউ

মাহরীন ফেরদৌস

প্রথম যে তাকে রবার্ট লি ফ্রস্ট এবং উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসের কবিতা চিনিয়েছিল তার সাথে আর যোগাযোগ নেই। এক সহপাঠি শিখিয়েছিল এক্সেল শিটে কীভাবে হিসাব রাখতে হয়, তার নামটিও গেছে ভুলে। যে বন্ধুটি বলেছিল, সে যখন জীবনে প্রথম সমুদ্র দেখবে তখন সেই বন্ধুটি পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক, টের পাবে আর আনন্দিত হয়ে হাসবে। যদিও বন্ধুটি পরের বছরই সড়ক দূর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল; তবুও সে যখন সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়েছে ঠিকই তাকে মনে করেছে। বন্ধুটি কি অন্যজগত থেকে তা টের পেয়েছে? হেসেছে আনন্দিত হয়ে? এই মানুষগুলো আর জীবনে নেই, অথচ সে এখনও কবিতা পড়ে। একের পর হিসাব করে কিংবা লম্বা ছুটি পেলেই ছুটে যায় সমুদ্রের কাছে। মানুষ তারমানে চলে গিয়েও আসলে চলে যায় না! সে সব সময় কিছু না কিছু রেখে যায়, হয় স্মৃতি, নয়তো এমন কিছু যার সাথে তার উপস্থিতি জড়িত!

লুবনা আগে এসব নিয়ে প্রায় ভাবত তবে এখন আর উত্তর খোঁজে না। সে শুধু মাঝে মাঝে বর্তমানকে ধরতে চায়। এই যেমন সন্ধ্যা হবে হবে ভাব দেখে জ্বলে উঠছে ডাউনটাউনের সবগুলো বাতি, রেস্তোরাঁগুলো নানা আলোর চমকে কাঁপছে থেকে থেকে। বহুতল ভবনে শান শওকতের সাথে লুকিয়ে থাকা অফিসগুলোর বেশির ভাগই ছুটি হয়ে গিয়েছে আরও ঘন্টাখানেক আগে। এই আঁধার নেমে আসা সময়ে আজকের দিনের শেষ বাসটার জন্য অপেক্ষা করছে সে। এদিকে দূরে কোথাও র‍্যাপ মিউজিকের বিট বেজে যাচ্ছে। ফল সিজনের হালকা শীতল বাতাসের ঝাপটায় উড়ে যাচ্ছে তার পাতলা চুল। শীত শীত লাগছে একটু। সে গায়ের হুডিটা আরেকটু টেনে নেয়। কাঁধ ঝাঁকিয়ে ব্যাগপ্যাকটা ঠিক করে। ব্যাংক অফ আমেরিকার মস্ত বড় ভবনের পেছনে সূর্যের শেষ আলোটুকু জ্বলে আছে রক্ত জবার মতো। ম্যাপল, পাইন আর চেরি গাছগুলো হালকা বাতাসে কাঁপছে মৃদু। সাঁই সাঁই করে করে চলে যাচ্ছে কিছু গাড়ি। আর নাটুকে শব্দ তুলে এঁকেবেঁকে যাচ্ছে কিছু হালফ্যাশনের সাইকেল। শীতের হাওয়া, রক্তজবার মতো মোহময় সন্ধ্যা, অত্যাধুনিক সব ভবন ও রেস্তোরাঁয় ভরপুর যন্তর-মন্তর সময় পলকে পালটে যায়। 



লুবনা দেখে সে ফার্মগেটের ফুট ওভার ব্রিজ পার হচ্ছে খুব দ্রুত। হনহন করে হাঁটছে। ডান কাঁধে ভারি ব্যাগ, কানে ইয়ারফোন, সেখানে সঞ্জীব চৌধুরী ভরাট কণ্ঠে গেয়ে যাচ্ছে গান। সে ঘামছে খুব, বুকের ওড়নাটুকু দুই প্যাঁচ দিয়ে ঠিক করে নিচ্ছে মাঝে-মধ্যে। সিনেমার ফাস্ট ফরোয়ার্ড দৃশ্যের মতো দু’পাশে অজস্র মানুষের ট্রেন চলে যাচ্ছে। ওজন আর উচ্চতা মাপার মেশিন নিয়ে বসে আছে এক কিশোর। তার ঠিক পাশেই গান ধরেছে এক অন্ধ ফকির, সঞ্জীবের কণ্ঠে ঢাকা পড়ে যায় সেই গান। লুবনা আকাশ দেখে। ডিজিটাল শহরের আলো ফুরাচ্ছে। শতশত গাড়ির পেছনে ইমার্জেন্সি বাতির মত জ্বলে উঠেছে লাল টেল লাইট। যেন জরুরি আলো দেখিয়ে এরা সবাই পৃথিবীর জন্য মস্ত বড় কোনো উপকার করতে যাচ্ছে। কাছে ধারে কোথাও তেমন সবুজের সমারোহ নেই। ধূলায়, ধোঁয়ায় অদৃশ্য কোনো দানব যেন পাক খেয়ে যাচ্ছে বাতাসে। লুবনার গা ঘেঁষে চলে যাচ্ছে কিছু মানুষ। এত ভিড়। সামনের পথটুকুর দেড় হাতও দেখা যায় না। সব অফিস ফেরা মানুষ, ছাত্র-ছাত্রী, কেরানি, দোকানদার, ব্যবসায়ী, ফকির।

হঠাৎ বাতাসে বেলি ফুলের গন্ধ পেয়ে চমকে ওঠে।

‘এই অবেলায়, অসময়ে বেলিফুলের ঘ্রাণ আসবে কীভাবে?’

ভুল ভাঙ্গে নিমিষেই, সাদা আলখাল্লা পরা এক মুরুব্বি যাচ্ছেন পাশ দিয়ে, ফুলের তীব্র ঘ্রাণ তার কাছ থেকেই আসছে। আতরের গন্ধ। এত জীবন্ত! এত প্রবল। মাথা ঝিম ঝিম করে ওঠে। ফুটওভার ব্রিজের সিঁড়ি ভেঙে নামতে থাকে লুবনা। আর তখনই দীর্ঘদিন পর দেখা হয়ে যায় অর্ণবের সাথে। কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ, সন্ধ্যার এই সময়েও চোখে রে-ব্যানের সানগ্লাস। মুখে আগের মতোই ফ্রেঞ্চকাট দাঁড়ি। শুধু কাঁধটুকু আরেকটু প্রশস্ত হয়েছে। ঝট করে দৃষ্টি নামিয়ে নেয় সে। নিশ্চয়ই অফিসের কোনো ডিল বা মিটিংয়ের জন্য কারওয়ানবাজার এসেছিল ও। এখন ড্রাইভারের জন্য অপেক্ষা করছে। নাহ, দেখা হোক এমন চায় না সে। ডান-বামে দ্রুত নজর বুলিয়ে এমন একটা পথ খুঁজতে চায় যেখান দিয়ে না দেখার ভান করে এড়িয়ে যাওয়া যাবে। তবে দেখে ফেলে অর্ণব। 



প্রচলিত কোনো কুশল বিনিময়ে না যেয়েই গমগমে স্বরে বলে ওঠে,

- ‘লুবনা, কোথায় যাচ্ছ? রাইড লাগবে?’

কণ্ঠ শুনে লুবনার ভেতরে যেন এক ঈগল পাখি ক্রুর ভঙ্গিতে ডানা ঝাপটায়। ভাবে, এই শহরটা এত ছোট কেন? পৃথিবীটাই বা কেন গোল? ঘুরেফিরে বার বার সবার সাথে দেখা হয়ে যায়। কেন শিকড় উপড়ে ফেলা যায় না? কিংবা কেন নানা অনলাইন মাধ্যমের মতো মানুষের ব্যক্তিগত জীবনেও ইগনোর, রিমুভ, ব্লক এইসব অপশনগুলো নেই? নিজেকে সামলে নিতে নিতে দ্রুত বলে,

- 'রাইড লাগবে না। আমার একটা মিটিং আছে এখানে। সে জন্য এসেছি। তুমি ভালো?’ 'তুমি ভালো'র সাথে ‘আছ’ শব্দটুকুও যুক্ত করতে ইচ্ছে করে না, বিরক্তি আর আলস্যের কারণে। অর্ণব হাত দিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে কপালের চুলগুলো পেছনে ঠেলে দেয়। একটু ভ্রু কুঁচকায়, তারপর হালকা স্বরে বলে,

- 'রাস্তায় যা জ্যাম। এখান থেকে উত্তরা যাওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো ওয়ে কী হবে? হাতিরঝিল দিয়ে বনানীর অফিস হয়ে যাব নাকি সরাসরি উত্তরা চলে যাব?’ 



লুবনা একটু দ্বিধায় পড়ে যায়। অর্ণব এই প্রশ্ন তাকে কেন করছে? হালকা কাঁধ নেড়ে সে বলে,

- ‘আসলে… আমার মনে হয়…।’ কিন্তু তাকে কথা শেষ করতে দেয় না অর্ণব। পেলব অথচ কৃত্রিম হাসি দিয়ে বলে,

- 'ওহ হো, তুমি তো সাজেশন দিতে পারবে না। তোমার তো আবার পথঘাট মনে থাকে না। এরচেয়ে গুগল কিংবা আমার ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলে ভালো। কী বলো?’ 



ঈষৎ লাল হয়ে আসে লুবনার মুখ। আবার? একই আচরণ। সময় বদলে যায়, সম্পর্কও, কিন্তু মানুষ সম্ভবত নিজের কুটিল দিকগুলো হাতিয়ার মনে করে যত্ন করে লুকিয়ে রাখে। আর দিন দিন ধারালো করতে চায়। এই অবজ্ঞা, অন্য কারও সাথে নিচু করে তুলনা করা এসব অনেক পুরানো ট্রিক অর্ণবের। যা কোনদিন ঠিক হবে না। তবুও কেন সব জেনেশুনে সে ক্রোধকে দমিয়ে রাখতে পারে না? নির্লিপ্ত হওয়া কি এতই কঠিন? ভেতরের আগুনটুকু প্রশমিত করতে করতে একটা প্রসারিত হাসি দেয় সে অর্ণবের দিকে। তারপর বলে,

- ‘দেরি হয়ে যাচ্ছে। যাই। ইউ টেক কেয়ার।’ শুনে একটা অদ্ভুত হাসি দেয় অর্ণব আর তাকে পেছনে ফেলে হাঁটার গতি বাড়িয়ে প্রায় ছুটতে থাকে লুবনা। ঢাকার ভিড়, আত্মীয়বর্গের কলহ-কোলাহল আর মিথ্যা সংসার ছেড়ে দূরের নির্জনতায় মুক্তি ও আনন্দের স্বাদ নিতে সে বহু আগেই যাত্রা শুরু করেছে। সেদিকে আর ফিরে তাকানো যাবে না। ডাঙ্গায় তোলা মাছ আবার জলে পড়েছে, এখন আর তাকে খুঁজে পাওয়ার সাধ্য নেই কারও। 


‘ইউর নেক্সট বাস উইল বি এরাইভিং এ্যাট এইট পিএম’ যান্ত্রিক কণ্ঠে কানে গুঁজে রাখা ইয়ারফোনে জানিয়ে দেয় সিরি। লুবনা বুঝতে পারে সিরির রিমাইন্ডার আবার একটিভ হয়েছে। আর মাত্র কিছু সময়। স্টেট বিল্ডিংয়ের পাশ ঘেঁষে চলে যাওয়া প্রসারিত পথের অন্যপাশে দেয়ালে কিছু মিউল আর গ্রাফিতি আঁকা। এর পাশেই গর্বিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে লাল-সাদা ইটের ওল্ড শিকাগো রেস্তোরাঁ। বাইরে ফেলে রাখা প্যাটিও ও বেঞ্চিগুলোতে অল্প-স্বল্প মানুষ বসে আছে। কারও হাতে কোল্ড ড্রিংকস, কারও হাতে বিয়ার। কেমন যেন ছবির মতো লাগে দেখতে সব। মনে মনে ওল্ড শিকাগোর বাইরের দৃশ্যপটকে একটা লাইক দিয়ে বসে লুবনা। তারপর লম্বা নিঃশ্বাস টেনে ফুসফুসের ভেতর বাতাস নেয়। তার পেছনে গল্প করতে করতে হেঁটে যায় কিছু পথচারী, তাদের বলা কথার টুকরো টুকরো শব্দ ভেসে আসে কানে, ডিনার, মাই প্লেস, পাই এইসব। এই ক্ষুদ্রযাত্রার মহাসমারোহ শেষ করে আজ শুক্রবার রাতে এই ভিনদেশে সবাই হয়ে উঠবে পার্টিপ্রেমি। হ্যাপি হাওয়ারে ভরে যাবে সময়। হাওয়ায় ভাসবে মিউজিক, ড্যান্স, বিয়ার- রেড ওয়াইন, পিৎজা আর তুমুল মিলনের শব্দ। আজ এই রাতে এত গল্প ছড়াবে শহর; যে বড় বড় বিজ্ঞাপনদাতারা পর্যন্ত লজ্জা পেয়ে যাবে। এমন রাতগুলোতে মার্কিন মুলুকের প্রতিটি শহরই যেন লাস ভেগাস কিংবা ইস্তানবুলের মতো গ্ল্যামারাস হয়ে উঠে। আর শনিবার সকাল থেকেই ঘটে অনেকের মোহভঙ্গ। ছোঁয়াচে রোগ থেকে বাঁচার মতো করেই সবাই আবার নিজ রুটিনে একটু একটু করে ফিরে আসে। ভাবে যতটা পারা যায় আরাম করে নেওয়া যাক, কারণ এরপরেই আসবে সানডে আর ব্লু মানডে। আবার সাইকেল শুরু হবে আগের জীবনের। অধৈর্য্য হয়ে আকাশের দিকে তাকায় লুবনা। কখন আসবে বাস? আর কতক্ষণ? বাসে চড়ে ডাউনটাউন পেরিয়ে প্রায় মিনিট বিশেকের যাত্রা তারপর ফিফথ এ্যাভিনিউয়ের টুয়েন্টি টু নাম্বার রাস্তায় তাকে নামতে হবে। হাঁটতে হবে মিনিট পাঁচেক। এরপর পৌঁছে যাবে হোম, সুইট হোম।

কেউ পাশে এসে দাঁড়ায়। লুবনা চমকে তাকিয়ে দেখে আফ্রিকান আমেরিকান হিপ্পিদের মতো একটা লোক এসেছে তার পাশে। দাঁড়িয়েছে বাসের জন্য। অন্যদিকে কাঁধে ভারী ব্যাগ নিয়ে স্ট্রলারে বাচ্চাকে ঠেলে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে এক হিস্পানিক মহিলা। বাচ্চাটার হাতে একটা খেলনা, সে বার বার সেটা ছুঁড়ে ফেলছে আর মহিলাটি কুড়িয়ে এনে আবার স্ট্রলারে রাখছে। কারও জন্য যা খেলা, অন্যজনের জন্য তাই হয়তো যন্ত্রণা। 



হঠাৎ ধীর গতিতে একটা কালো টয়োটা এসে থামে তার সামনে। তারপর টার্ন নিয়ে পার্কিংয়ের দিকে আগাতে থাকে। লুবনা গাড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখে নেমে এসেছে জানালার কাচ। ড্রাইভিং সিট থেকে কেউ হাত নাড়ছে তার দিকে। ভ্রু কুঁচকে আরেকটু মন দিয়ে দেখে। কে ওটা? তখনই চিনতে পারে, তার প্রতিবেশী ডঃ কুমার। ভারতীয় এই চিকিৎসক গত কিছুমাস হলো বদলি হয়ে এসেছে শহরে। অল্পস্বল্প কথা হয়েছে। ভদ্র মানুষ। মিশুক কিন্তু উচ্ছ্বল নন। একইসাথে ফ্রেন্ডলি আবার বেশ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। ডঃ কুমারের কাছ থেকে রাইড নেবে কি নেবে না ভাবে এক পলক। তারপর রাস্তার আরেকপাশে এসে দাঁড়িয়ে যায়, চেপে ধরে ওয়াক বাটন। একটু পর সিগন্যাল পেলেই এগিয়ে যায় কালো টয়োটার মুখোমুখি।


- ‘হ্যালো মিস লুবনা, আমি বাড়ির দিকে যাচ্ছি। তুমিও বাড়ি গেলে উঠে পড়ো কিংবা অন্য কোথাও যাওয়ার থাকলে বলো। আমি নামিয়ে দিচ্ছি।’ 



- ‘শিওর। বাড়ি ফিরব।’ বলে ব্যাগপ্যাকটা পেছনের প্যাসেঞ্জার সিটে রেখে সামনে এসে বসে সে। সীট বেল্ট বেঁধে নেয় দ্রুত। গাড়ির ভেতর লিটল-ট্রি এর চাপা ঘ্রাণ ছড়িয়ে আছে। ড্রাইভের তালে তালে দুলছে রিয়ারভিউ মিররে ঝুলে থাকা লিটল-ট্রি। কিছুদিন আগেই সে কোথায় যেন পড়েছিল আমেরিকার সবচেয়ে বেশি বিক্রিত হওয়া কার ফ্রেশনার এটা। সেই ১৯৫২ সালে নিউয়র্কের ওয়াটারটাউন শহরে থাকা এক কেমিস্ট এটা আবিষ্কার করে বড়লোক হয়ে গিয়েছিল; এখনও এটার চল রয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, এটার আগের নাম ছিল ম্যাজিক ট্রি। ওয়ালমার্টে যেয়ে দেখেছে আজও শত ফ্রেশনারের ভিড়ে লিটল ট্রি সবার আগে সোল্ড আউট হয়ে যায়। 



- ‘মিস লুবনা। তুমি কি খুব ক্লান্ত আজকে? হেকটিক দিন ছিল?’ ডঃ কুমারের ভদ্রতাসুলভ কণ্ঠ শুনে এলোমেলো ভাবনা মুছে ফেলে লুবনা। 


- ‘কিছুটা।’ ছোট করে উত্তর দেয়। এদিকে প্রায় মুছে যেতে থাকা আলোতে একে একে পেছনে যেতে থাকে রককোল্ড ক্যাসল, ডগলাস স্ট্রিট, পাবলিক লাইব্রেরি, হাফ ডজন চার্চ আর অনেক অনেক গাছপালা। 



- 'ওয়েল, আজ আমার মন খুব ভালো। কারণ, আমি আগামীকাল আমার মেয়ের সাথে দেখা করতে যাব।’ হঠাৎ স্বগোতোক্তির মতো বলে বসে ডঃ কুমার।

লুবনা মনে মনে কিছুটা সতর্ক হয়। প্রশ্ন না করতেই এত কথা বলছে কেন ডক্টর? ড্রিংক করে হাই নাকি? ফ্রাইডে নাইট শুরু হবার আগেই? এই অবস্থায় তো ড্রাইভ করার অনুমতি নেই এই দেশে। ধরা পড়লে যা শাস্তি হবে না। সন্তর্পণে সে বলে, 



- ‘দ্যাটস রিয়েলি নাইস ডঃ কুমার।’ 



- ‘আমাকে রাজেশ বলেই ডাকতে পার তুমি। মানুষ নিজের পরিচয়ের সাথে আত্মবিশ্বাস আর অহংকার যুক্ত করতে ডক্টর, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর এসব যুক্ত করে। এরপর যখন তারা আরও সফল হয়ে যায়, তখন আরও বেশি ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। কেউ তখন তাদেরকে আর ডাকনাম ধরে ডাকে না। তাদের ডাকতে হয় পুরো নামে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, যেন প্রতিবার কোনো অফিশিয়াল ফর্ম ফিল আপ করা হচ্ছে। ফার্স্ট নেম অমুক আর লাস্ট নেম তমুক। তাই না?’



লুবনা মাথা নাড়ে। এভাবে সে আসলে আগে কোনদিন ভেবে দেখেনি। এই ভারতীয় চিকিৎসককে এখন আর হাই বা মাতাল মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে বরং সে কিছুটা ভাবুক ধরণের মানুষ। ভদ্রলোক সম্ভবত একাই থাকে তার মাঝারি সাইজের ফ্ল্যাটে। স্ত্রী কি বেঁচে নেই নাকি অন্য কোথাও থাকে? মেয়ের সাথে দেখা হবে বলেই কি সে আজ এমন ভাবুক? ইজ হি আ ফ্যামিলি পার্সন? তাহলে এখানে কেন একা? ভাবতে ভাবতে নিজের ওপর বিরক্ত হয় লুবনা। এত চিন্তা করছে কেন? কাউকে নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবতে তার আজকাল আর ভালো লাগে না। মাথা ধরে যায় খুব। একা তো সেও থাকে। পাশের রুমের টার্কিশ মেয়েটা যেন ফ্ল্যাটে থেকেও নেই। তার যা বয়স একই প্রশ্ন তাকে নিয়ে ডঃ কুমারেরও থাকতে পারে। কোথায় তার স্বামী বা বয়ফ্রেন্ড? সে কেন একা? এইসব ব্যক্তিগত প্রশ্ন শুধু মনেই আসে। এখানে কেউ খুব বেশি মাথা ঘামায় না। এটাই বিদেশের শান্তি। 



- 'মিস লুবনা, কিউটিতে থেমে গাড়ির গ্যাস নেব আর কফি। তুমি কি কফি খাবে?’ 



- ‘কফি ছাড়া আমার কোনো পানীয় নিয়ে কোনোই নেশা নেই।’ ভদ্রতাসুলভ হাসি দিয়ে বলে লুবনা। ভাবে, কফি পেলে মন্দ হয় না। মাথা ধরে গেছে। বাসায় কফি মিক্স শেষ। গত বেশ কয়েকদিন ধরে কিনবে ভেবে কেনা হয়নি। 



- ‘কুল।’ ছোট্ট করে এই উত্তর দিয়েই গাড়ি এইটথ এভিনিউ থেকে লেফট টার্ন নিয়ে কিউটির দিকে আগাতে থাকে ডঃ কুমার। মিনিটের মাঝেই পৌঁছে যায়। পাম্পের সামনে গাড়ি রেখে স্টার্ট বন্ধ করে দেয় তারপর সপ্রভিত একটা হাসি দিয়ে বলে, 



- ‘ওকে, আমি দুটা কফি নিয়ে আসছি। তুমি কোন ফ্লেভার পছন্দ করো?’ 



- ‘ডঃ কুমার, মানে মিঃ রাজেশ আমি সাথে আসছি। আমার কফি আমিই বানাব।’ গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলে সে। তারপর হালকা পায়ে এগিয়ে যায় লাল রঙের বিশাল আলোকিত দোকানের দিকে। মনে মনে পরিকল্পনা করে, যেহেতু সে রাইড নিয়েছে বিনিময়ে ধন্যবাদ হিসেবে চিকিৎসকের কফির বিল দিয়ে দিবে। কারও সাহায্য নিয়ে বেঁচে থাকা তার জন্য যন্ত্রণার। তা যত ছোট সাহায্যই হোক না কেন। সুযোগ পেলে কিছু না কিছু ফিরিয়ে দেওয়া উচিৎ। এমনিতেও সবাই বলে আমেরিকায় কিছুই ফ্রি না। এমনকি ফ্রি শব্দটাও ফ্রি না। সবকিছুর কোনো না কোনো পে-ব্যাক আছেই। 


কফি কর্নারে গিয়ে সে ফ্রেঞ্চ ভ্যানিলা বানিয়ে নিলো নিজের জন্য। ইচ্ছে করে বেশি চিনি দিলো ক্রীমারের সাথে। মিষ্টি তার খুব প্রিয়। যে কোনো ধরণের মিষ্টি ভালো লাগে। এমনকি খালি খালি চিনি খেতেও যেন ভীষণ ফুরফুরে আনন্দ। এই সুইট টুথ, ক্রেভিং সেই শিশুকাল থেকে। অর্ণব আগে বলত, 'এত মিষ্টি খেতে পারো, অথচ মুখের কথা এত কর্কশ কেন?’ না, এসব ভাবা যাবে না। লুবনা আপনমনে মাথা ঝাঁকায়; যেন ঝেড়ে ফেলতে চায় এসব কথা। যত পারে ভুলে যাবার চেষ্টা করে।

সাদা টপস আর চেক চেক মিনি স্কার্ট পরা, টকটকে লাল লিপস্টিক দেওয়া একটা মেয়ে ও তার প্রেমিক জড়াজড়ি করতে করতে বের হয়ে যায় কিউটি থেকে। হাসছে ওরা খলবল করে। হাসির দমকে হাতের পপকর্ন শিউলি ফুলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে রাস্তায়। ডঃ কুমারের হাতে ব্ল্যাক কফি। তাতে নামমাত্র চিনি দিয়ে আর একটা টুইংকিসের প্যাকেট হাতে নিয়ে লুবনার মুখোমুখি পড়ে যায় সে। এরপর কিছুটা কৈফিয়তের ভঙ্গিতে বলে,

- 'তোমার কাছে ফানি লাগতে পারে, কিন্তু কফির সাথে মিষ্টি কিছু খাওয়ার স্বাদ আলাদা। আমি টুইংকিস খুব পছন্দ করি। আমি আর আমার মেয়ে আগে একসাথে অনেক খেতাম।’ 


লুবনা সরলভাবে হাসে। তারপর দ্রুত কাউন্টারে গিয়ে চিকিৎসকে কিছু বলতে না দিয়ে বিল দিয়ে দেয়। ডঃ কুমার আপত্তি তোলে, সে পাত্তা দেয় না। বরং তার মনে হয় সেও কি খাবে টুইংকিস? তারও যে মিষ্টি খুব প্রিয়, কিন্তু ভেতর থেকে সাড়া আসে না। এই আচরণগুলো সে মানুষের সামনে করা বাদ দিয়েছে বহু আগেই। যা মন চায়, তা করার জন্য এই পৃথিবী না।

কফিকাপ আর মানিব্যাগ হাতে বের হয়ে দেখে, প্রায় সমস্ত আকাশ নিবিড় করে বেশ জোর বৃষ্টি নেমেছে। কিউটির স্বচ্ছ শার্সিতে বিন্দু বিন্দু জলকণা আছড়ে পড়ছে; ক্যানভাসে যেভাবে তুলি আঁচড় কাটে তেমন করে। এমন আচমকা বৃষ্টির আবির্ভাবকে ঠিক স্বাগত জানাতে পারে না মন। ভাবে বৃষ্টির মাঝে গাড়িতে উঠবে নাকি? কফি কাপ হাতে ডঃ কুমার কেমন যেন সিরিয়াস ভঙ্গিতে আকাশের দিকে তাকায়। যেন আকাশটা তার সাথে কোনো জরুরি এপয়েনমেন্ট ক্যান্সেল করে বৃষ্টি নামিয়ে দিয়েছে। এ দেশে তুষার পড়া দেখলে লুবনার কিছু মনে হয় না। প্রথম প্রথম উত্তেজিত হতো। ভাবত, এতবার সিনেমায় দেখা দৃশ্য চোখের সামনে দেখার আনন্দই আলাদা। তবে অল্প ক'দিনেই একঘেয়ে হয়ে গিয়েছে। এখন তুষারের অপর নাম একঘেয়েমি। তবে বৃষ্টিও আর আগের মত প্রিয় নেই। বরং মেঘদূতের জলভরা মেঘ আর বৃষ্টির ছাঁট শূন্যতার কথা মনে করায়, স্মৃতিকাতর করে। পিছু ডাকে। 



- ‘বৃষ্টি কি তোমাকে বিরক্ত করল মিঃ রাজেশ? আমরা কি গাড়িতে উঠব নাকি আরেকটু অপেক্ষা করব?’


- ‘একটু অপেক্ষা করতে পারি। আমার কোল্ড এলার্জি আছে। আর সাইনোসাইটিস। আমি সচরাচর বৃষ্টি আর তুষার এড়িয়ে চলি।’ 



- ‘আচ্ছা। বেশ। তোমার মেয়ের সাথে কতদিন পর দেখা হবে এবার?’ লুবনা চুপচাপ না থেকে অস্বস্তিকর পরিবেশ দূর করতে কিছুটা আইস ব্রেকিংয়ের চেষ্টা করে।

- ‘প্রায় ছয় মাস। আগামীকাল ওর মায়ের মানে আমার প্রাক্তন স্ত্রীর বিয়ে। সেখানেই দেখা হবে ওর সাথে।’ ম্লান হেসে বলে চিকিৎসক। আর তারপরেই হঠাৎ কেমন যেন একটা চাপা নিস্তব্ধতা নেমে আসে চারপাশে।

ম্লান হাসিটুকুর রেশ চোখ থেকে মুছতে পারে না লুবনা। মনে হয় নিজের আরেক অবয়বের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অর্ণবের বিয়ের খবর যখন পেয়েছিল, ওর কি এমনই লেগেছিল? একদিকে নির্ভার হবার আনন্দ আর অন্যদিকে বুকের মাঝে শতবছরের দীর্ঘশ্বাসের মতো গুমোট ভাব। কী বলবে খুঁজে পায় না। পরিবেশ সহজ করতে কফিকাপে চুমুক দেয় বার দুয়েক। হঠাৎ অথযাই মনে পড়ে, এখন আর সে ঠোঁটে লিপস্টিক দেয় না। দিলে এতক্ষণে হয়ত সিপ দেওয়ার জায়গাটুকু হালকা লাল বা গোলাপি আবরণে ছেয়ে থাকত। আরও কিছুক্ষণ পর নৈঃশব্দ্য ঝেড়ে ফেলে গলা খাঁকড়ে বলে,

- 'যদিও আমি পুরো ঘটনা জানি না। তবে তোমার হয়তো খুশি হওয়া উচিৎ যে তোমার স্ত্রী নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছে। কাল তার জন্য আনন্দের দিন।’ 



একটা বন্ধুসুলভ প্রশ্রয়ের হাসি দেয় যেন চিকিৎসক। তারপর বলে,

- ‘আমি আনন্দিত। অবশ্যই আনন্দিত। কারণ যে আমার স্ত্রী ছিল সে কাল নতুন জীবন শুরু করছে না। সে বর্তমানে আর নেই। আগেই মিলিয়ে গিয়েছে। কাল যার জীবন শুরু সে আরেকজন। অন্য সত্ত্বা। আমি সেই সত্ত্বার জন্য শুভেচ্ছা জানাতে কার্পণ্য করব না। তবে আমি হয়তো অতীতে থাকা মানুষ। সেখানেই থাকব। দেখো, অতীত শুনলে আমাদের সবার আগে মনে হয় অতীত মানেই বুঝি স্মৃতি। কিন্তু মানুষের অতীত শুধু স্মৃতি দিয়ে নয় বরং সেখানে ইতিহাস বা তথ্যও থাকতে পারে। আর এমন না যে বেশিরভাগ স্মৃতি আবেগকে ধারণ করে। যেমন, আমি অতীতে কোনো এক সময়ে মেডিকেলের লাইব্রেরিতে বই ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। এটা শুধুই স্মৃতি। এখানে কোনো প্রবল বা মৃদু ইমোশন নেই, কিন্তু আমাদের ছেলেবেলার স্মৃতিগুলো ভাবলে আমাদের মধ্যে যদি কোনো অনুভূতির প্রাবল্য কাজ করে সেটা স্মৃতিকাতরতা। তবে স্মৃতি অতীতের হলেও এই কাতরতা হতে পারে শুধুই বর্তমানে। এটা অতীতের সাথে জড়িত কিন্তু কখনো অতীত নয়।’ 


- ‘তোমার নিজের কোনো অতীতকে বা ভুলকে মনে করলে ভয় লাগে না, আফসোস হয় না?’

- ‘না। হয় না। কারণ অতীত মানুষকে পরিণত করে। অনেককিছু শেখায়। যার ভুলেভরা কিংবা বৈচিত্র্যময় অতীত নেই সে মানুষ হিসেবে এখনও পরিণত হতে পারেনি’

লুবনা কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। বহুদিন তারসাথে জীবন বা বোধ নিয়ে এমন করে কেউ কথা বলেনি। এই ভদ্রলোক চিকিৎসক নাকি কবি? নাকি দার্শনিক? এই চেনা শহরে, স্কাইলাইন আর রবার্টসন ভ্যালির সবুজ সমারোহে ডুবে থাকা লাল দোকানের বাইরে তারা দু'জন মানুষ যে বোধ নিয়ে কথা বলছে, কেন বলছে? কী অর্থ এর? একদিন এই পৃথিবীতে কেউ থাকবে না কিংবা এই রাইড নেওয়া শেষ হবার পর তারা দু’জন হাই, হ্যালো বাদে আর কোনদিন কথা বলবে নাকি তার নিশ্চয়তা নেই। তবুও কেন মানুষ ক্ষণিকের ভাবে, যোগাযোগে তৎপর হয়ে যায়? এটা কি মানুষের বোকামি নাকি সাহসিকতা?

কেন যেন কিছুটা কৌতূহলী হয়ে ওঠে চিকিৎসককে নিয়ে। ইচ্ছে করেই এবার নিজেকে একটু প্রকাশ করে। বলে, 



- ‘আমার মনে হয় আমি নিজে সব সময় একটু পিছিয়ে পড়া মানুষ। আমাকে বর্তমান শুধু ধাওয়া করছে, কিন্তু পাশে থাকছে না। ভবিষ্যৎ বলে হয়তো আমার কিছু আছে কিন্তু বর্তমান নেই। পৃথিবীতে সবার ঘড়িতে যখন সকাল নয়টা বাজে। আমার ঘড়িতে বাজে তখন আটটা পঞ্চান্ন। আমি যখন বাসস্টপেজে পৌঁছাই দেখি, মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য মিস করেছি কাঙ্ক্ষিত বাস। আমার কেবলই দেরি হয়ে যায়।’ 



- 'ইন্টেরেস্টিং! তুমি কি বুলগেরিয়ান একটা স্টোরি শুনেছ? অনেক অনেক বছর আগে একটা ছোট্ট গ্রামে ভায়সা নামের এক মেয়ে জন্ম নিয়েছিল। সে সাধারণ কোনো মেয়ে ছিল না। তার বৈশিষ্ট্য ছিল, সে এক চোখে দেখতে পেত আর অতীত এবং অন্যচোখে দেখত ভবিষ্যৎ। বর্তমান বলতে তার কিছু ছিল না। 



- 'না, শুনিনি। তারপর?’ 


- ‘একটু বড় হবার পর ভায়সা যখন বাড়ি থেকে বাইরে বের হতো সে দেখত একপাশে কোকুন পড়ে আছে আর অন্যপাশে পানির ওপর উড়ছে প্রজাপতি যাকে একটু পরেই একটা সবুজ ব্যাঙ খেয়ে ফেলছে। নিজের বাবা-মাকে বাঁ-চোখে সে দেখত বালক-বালিকার বেশে আর ডানপাশে তাকালে খুঁজে পেতো না। কারণ ততদিনে তারা মারা গিয়েছে। ও যখন ঘুমাত তখন শুধুই দুঃস্বপ্ন দেখত। কারও সাথে মিশতে বা যোগাযোগ করতে পারত না, কারণ ও বুঝতেই পারত না কোনটা আসল? অনেকেই মনে করছিল কেউ ওকে কালোজাদু করেছে। তাই তারা দিনের পর দিন চিকিৎসার নামে জরিবুটিসহ নানা কিছু ওর দু চোখে দিতে থাকল। কিন্তু তাতে কোনই লাভ হলো না। সবাই তখন বলল ভায়সা অভিশপ্ত। এখন মেয়েটি কী করবে বলো তো? এক চোখ বন্ধ করে অতীতে থাকবে? যার কোন অস্তিত্বই বর্তমানে নেই। নাকি অন্যচোখ বন্ধ করে ভবিষ্যৎ দেখবে যা এখনও ঘটেনি, এবং যেখানে ভালো বলতে হয়তো কিছু নেই। ’ 



- 'আসলেই তো! বুঝতে পারছি না কী সমাধান দেব ভায়সাকে। গল্পে কী হয়েছিল তারপর? শেষ পর্যন্ত ভায়সা কী ঠিক করল?’ 



- ‘গল্পটা এখানেই শেষ। আর কিছু আমার জানা নেই।’ সোজাসাপটা উত্তর দিয়ে কাপের শেষ কফিটুকু একটানে শেষ করে বলল ডঃ কুমার। তারপর প্রায় নিপুণভাবে পাশের ট্র্যাশবাক্সে কাপটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। 



- 'আসলেই এর শেষ নেই? বইতে কিছুই ছিল না?’ কিছুটা আশাহত স্বরে প্রশ্ন করে লুবনা। 



- ‘না নেই। এটা একটা হোপলেস স্টোরি। কারণ এই পৃথিবীতে অতীত আর ভবিষ্যতকে রিইউনাইটেড করে আমরা কোনদিন বর্তমানকে ক্রিয়েট করতে পারব না। এটা একটা হোক্স, মানুষের জীবনের প্র্যাকটিকাল জোকস। মিস লুবনা চলো, গাড়িতে উঠে পড়া যাক। আকাশটা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।’ 



নিঃশব্দে চিকিৎসকের পিছু নেয় লুবনা। আর তার দৈনন্দিন ও পৃথিবীর সব বড় বড় বিষয় বাদ দিয়ে ভায়সা নামের এক অদ্ভুত বালিকার কথা ভাবতে থাকে। গাড়িতে আবার সেই লিটল ট্রিয়ের চাপা ঘ্রাণ। ডঃ কুমার গ্যাস নিয়ে গাড়িতে এসে সিটবেল্ট বেঁধে নেয়। বাতি জ্বালিয়ে, ইঞ্জিন স্টার্ট করে। পার্কিং থেকে ড্রাইভ মোডে গিয়ে গাড়িটাকে অল্প অল্প করে ঘোরাতে থাকে। আর এই প্রথম… এই প্রথম, গ্যাস স্টেশনের মাঝারি আলোতে লুবনা বেশ মনোযোগ দিয়ে তার এই স্বল্পযাত্রার সঙ্গীর দিকে তাকায়। ভদ্রলোক সাদা রঙের শার্ট পরেছে, সাধারণ উচ্চতার মানুষ, গায়ের রঙ তামাটে, কিছুটা ভারী গড়ন, মাথার মাঝামাঝি টাক পড়েছে সম্ভবত, চোখেমুখে ক্লান্তি আর সৌম্যভাব। তবে বেশ বোঝা যায় সে চিকিৎসাবিদ্যা বাদেও বেশ অনেক কিছু জানে। তবে আলগাভাবে তা জাহির করতে যায় না। লুবনা এক পলকের জন্য কিছু একটা ভাবে তারপর গাড়ির রেডিওটা ‘এক্সকিউজ মি’ বলে অন করে দেয়। 



সপ্তাহের সবচেয়ে রঙিন রাতের রহস্যময় আঁধারে একটা কালো টয়োটা স্ট্রিট লাইটের আলো ছুঁয়ে সাউথ সাইড, রক রোড, অলিভার নামের একের পর এক পথ পেরিয়ে ফিফথ এ্যাভিনিউয়ের টুয়েন্টি টু নাম্বার রাস্তার দিকে ছুটে যায়। এসির বাতাসে সন্ধ্যার সেই শীত শীত ভাবটুকু লুবনার মাঝে আবার ফিরে আসে। সে গায়ের হুডিটাকে ভালো করে টেনে নেয়। এই বাতাসে তার কপালের পাতলা চুলগুলোও যেন কিছুটা বিব্রত হয়ে নড়াচাড়া করে ওঠে। সে মনে মনে ভাবে বাড়ি ফিরেই মোবাইল আর হাত ঘড়িটাকে পাঁচ মিনিট এগিয়ে নেবে। যেন আর দেরি না হয়। এমন সময়’ রেডিওতে বেজে ওঠে অচেনা একটা কান্ট্রি সং। অথচ লুবনার মনে হয় খুব ভরাট স্বরে কেউ হয়তো কবিতা আবৃত্তি করছে। বলছে-

“তারপরও কথা থাকে;
বৃষ্টি হয়ে গেলে পর ভিজে ঠাণ্ডা বাতাসের মাটি-মাখা গন্ধের মতন
আবছায়া মেঘ মেঘ কথা;
কে জানে তা কথা কিংবা কেঁপে ওঠা রঙিন স্তব্ধতা।”