রঙ্গীন ঘুড্ডি

স্মৃতি ভদ্র

কাঠটগর গাছের মাথায় চাপ চাপ অন্ধকার রেখেই সেদিন ঘর ছেড়েছিলো হাশেম মন্ডল। সাথে আব্বা, আম্মা আর দাদাজান। আব্বার দ্বিধাহীন উত্তেজনা থেকে হাশেম মন্ডল ততদিনে বুঝে গিয়েছে এই ঘর ছাড়লেই তাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে ভাল কিছু একটা। সেই কিছু একটা সেমুই ইদে দাদীজানের পাকানো গুড়ের ফিরনীর মতো মজাদার হবে, তা নিয়ে বেশ আশ্বস্ত ছিল হাশেম মন্ডল। বছরদূয়েক হয়ে গেলো সেই ফিরনীর স্বাদ পায় না সে। আম্মা যতই তরিবত করে ইদের মিষ্টি বানাক না কেন সেই ফিরনীর স্বাদ খুঁজে পাওয়া যায় কই?

ফিরনীর স্বাদের আশায় হাশেম মন্ডল যখন ঘর ছেড়ে সবার আগে গিয়ে গরুর গাড়িতে বসেছিলো তখন দাদাজান ঘাড় নুইয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন দাদীজানের কবরের পাশে। আব্বার 'তাড়াতাড়ি করো,তাড়াতাড়ি চলো, হাঁড়িটা গাড়িতে তোলো' এই শব্দগুলোর কাছে দাদাজানের বুক থেকে বেরিয়ে আসা দীর্ঘশ্বাস টুকু দিকভ্রান্ত হয়ে হারিয়ে গিয়েছিলো।

তবে ঘর ছাড়ার পর হারানোর তালিকা ক্রমেই বর্ধমান হবে তা তখনো অজানা হাশেম মন্ডলের। সে তালিকায় পড়ে আসা যাবে। এখন বরং হাশেম মন্ডলের গুড়ের ফিরনীর স্বাদ খোঁজা যাক।

দাদাজান ঠিক কখন সেই কবরের উপর থেকে এক মুঠো ঘাস নিয়ে হাশেমের পাশে এসে বসেছিলো, তা বেখেয়ালেই থেকে গেছে। হাশেম মন্ডল তখন বিভোর দাদীজানের পাকানো ফিরনীর স্বাদের স্বপ্নে।

বিভোর শুধু হাশেম মন্ডল নয় ওদিকে আব্বাও বিভোর। গণি মন্ডল তাঁর নাম। আবু মন্ডলের একমাত্র ছেলে, গোঁসাইপুর গ্রামের এক তেজী যুবক আর হাশেম মন্ডলের বাবা। গণি মন্ডলের তেজ সবাই টের পেয়েছিলো সেই লীগের সভাগুলোর সময়ে। এর আগ অবধি গ্রামের নম্র মানুষ হিসেবেই তাঁর পরিচিতি ছিল।

আবু মন্ডলের জমিজিরাত বেশ ভালই ছিল। আর ছিল শ্রম দেবার অকল্পনীয় শক্তি। তাই ঘরে কখনো অভাবের ছবিটা খুব স্পষ্ট হয়ে বসতে পারেনি। তবে একমাত্র সন্তান হিসেবে গণি মন্ডল উত্তরাধিকার সুত্রে সব পেলেও পায়নি শুধু সেই শ্রম দেবার ইচ্ছাটুকু। তাই বলে তাকে অলস বলা চলে না। সত্যি কথা বলতে আবু মন্ডলের সারাজীবনের অর্জিত বেশকিছু জমি,বাড়ি ঘেঁষা পুকুর আর ফল ফলাদির বাগান গণি মন্ডলকে শ্রম দিয়ে সুখ কিনতে সর্বদাই অনুৎসাহী করতো। বরং জীবনের এই অপরিমিত সময়কে সে কাজে লাগাতে চাইলো ভাল কিছুর জন্য।

'ভাল কিছু' করার বোধ অবশ্য গণি মন্ডলের ভেতর নিজে থেকেই উদয় হয়নি। বা একদিনেও উদয় হয়নি। এর প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছে দিনে দিনে।

তখন বর্ষার কাল। বড় বড় ফোঁটার ঘন বৃষ্টিতে জমিগুলোর সীমানা মিশে যায় নদী বা পুকুরের সাথে। জলা সে জমিতে পলো ফেলে তড়বড়া কৈ মাছ ধরা হোক বা ডুব দিয়ে শাপলার ফল তুলে আনা হোক সবকিছুতেই উৎসাহ হয়ে গণি মন্ডলের পাশে থাকে রথীন। রথীন্দ্রনাথ ভৌমিক। বাবু বাড়ির ছেলে। গোঁসাইপুর গ্রামে যে বাড়ির পরিচয় বড় বাড়ি হিসেবে। সে বড় বাড়ির সবকিছুই বড় বড়। বড় বড় ঘর, বড় উঠোন, বড় পুকুর আর একটি বড় পালকি। সে বাড়ির মেয়েরা এ গ্রাম থেকে অন্যগ্রামে যাবার সময় পালকিতে যায়। সেই বড় বাড়ির বড় তরফের ছেলে রথীন্দ্রনাথের ডাংগুলি খেলার সাথী গণি মন্ডল, ডুবসাঁতারে বেলা পার করা সময়ের সাথী গণি মন্ডল, সন্ধ্যায় জোনাই পোকার আলোয় হিজল গাছের নীচে বসে অচেনা শব্দ গুণে পাখি চেনার সাথী গণি মন্ডল। বলতে গেলে মানিকজোড়। কিন্তু সে জোড় খুলে যেতো বড় বাড়ির বাইর উঠোনে গেলেই।

গণি মন্ডলের জন্য নিষিদ্ধ ছিল বড় বাড়ির অন্দরমহল। তবে নিষেধ শুধু গণি মন্ডলের নয়, রথীনেরও ছিল। অজাতের সাথে সারাদিন টইটই করে ঘুরে বেড়ানোর জন্য বাইরের কাপড়ে বাড়ির ভেতর ঢোকা নিষেধ ছিল তার। পুকুর থেকে কিছুসময় ঝাপিয়ে তবেই বাড়িতে ঢোকার অনুমতি পেতো রথীন।

একদম ছেলেবেলায় এগুলোকে জগতের নিয়ম বলেই মনে করতো গণি মন্ডল। কিন্তু সেসব নিয়ম যে শুধুই তাকে অস্পৃশ্য প্রমাণ করতে, তা অবশ্য একদিন ঠিক বুঝে গেলো সে।

আর এই বুঝটুকু গণি মন্ডলকে এক ঝটকায় বড় বাড়ির রথীন্দ্রনাথ থেকে দূরে সরিয়ে দিলো। রথীন্দ্রনাথ থেকে দূরে এলেও গণি মন্ডল একা হয়ে যায় না। তার পাশে জায়গা করে নেয় শামছু তালুকদার। পাশের গ্রামের একহারা গড়নের জ্ঞানী এই মানুষটি খুব অল্প সময়েই গণি মন্ডলের বড় ভাই হয়ে ওঠেন। শামছু তালুকদারের সাথে পরিচয় না হলে গণি মন্ডলের জানাই হতো না বড়বাড়ির মতো অসংখ্য বাড়ি রয়েছে দেশজুড়ে। যেসব বাড়িগুলোর বাইর উঠোনেই সীমানা নির্ধারণ হয়ে যায় গণি মন্ডল আর রথীন্দ্রনাথদের সম্পর্কের।

অনেক হয়েছে বড়বাড়িগুলোর দোর্দণ্ডশাসন। এবার সীমানা নির্ধারণ করবে শামছু ভাইয়েরা। গণিমন্ডলদের জন্য তৈরী হবে এক অভয়ারণ্য। যেখানে রথীন্দ্রনাথেরা থাকবে না বড়বাড়ির সেই বাইর উঠোনের নিষেধ নিয়ে। যেখানে জোনাই পোকার আলোর তেজে সন্ধ্যাগুলোতেও আঁধার আসে না। শাদা জ্যোৎস্নায় আকাশ ভাসিয়ে টুকরো টূকরো আলো সেখানকার মাটিতে সুজনী পাতে। গণি মন্ডলদের স্বপ্নের চেয়েও সুন্দর হবে সেই নির্ধারিত সীমানা।

স্বপ্ন তো আর বর্ষাকালের জলা জমির কৈ মাছ নয়। যাকে পলো দিয়ে আটকে টুপ করে হাতে ভরা যায়। নতুন সীমানার স্বপ্নকে হাতের মুঠোয় আনতে করতে হবে অনেক কাজ। শামছু ভাইয়ের কথায় তাই গণি মন্ডল তার অপরিমিত সময়কে উৎসর্গ করলো এই স্বপ্নের নামে।

শামছু ভাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে সব সভায় যাওয়া, লীগের কথা সকলের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া, দেয়ালে বা গাছে ইস্তেহার ঝোলানো-----চোখের সামনে সেই স্বপ্নের নাচন বাড়িয়ে দিতো বহুগুণ।

' শামছু ভাই, সেখানে কী আমাদের সকলের একটা করে বড়বাড়ি থাকবে?'

' হ্যাঁ, হ্যাঁ, সবার একটা করে বড়বাড়ি হবে।'

' আর অন্দরের মানুষের জন্য বড় পালকি?'

' হুম, হুম সব হবে।'

গণি মন্ডলের স্বপ্নে রঙের পরত পড়ে কয়েক পোচ।

সেই স্বপ্ন কখন যেন গণি মন্ডলদের পণ হয়ে উঠলো। জোনাই পোকার আলোয় সে বাড়ির আলোকসজ্জা হবে মনে মনে তাও ভেবে নিলো গণি মন্ডলেরা।

কথায় বলে, মন থেকে সৎ ভাবে কিছু চাইলে প্রকৃতি তা অবশ্যই মিলিয়ে দেয়। গণি মন্ডলদের চাওয়াও পূরণ হলো। তাদের জন্য সীমানা নির্ধারণ করলো শামছু ভাইয়েরা। সকলের জন্য একটি করে বড়বাড়ি তখন দু'দন্ডের বিষয়।

তবে, হ্যাঁ একটি করে বড়বাড়ি আর গণিমন্ডলদের মধ্যে তখন একটি ছোটখাটো 'তবে' এসে উপস্থিত হলো। বড়বাড়ি হবে, জোনাই পোকায় আলোকসজ্জা হবে, শাদা বকের মতো ধবধবে জ্যোৎস্নার টুকরো টূকরো আলো থাকবে ঘরে ঘরে----- তবে সে বাড়ি, সে ঘর হবে অন্যকোথাও। জন্মাবধি চেনা এই মাটিতে নয়, এই পুকুরের পাড়ে নয়, এই গাছের ছায়ায় নয়।

তা হবে অন্য এক দেশে।

সবশুনে প্রথমে মনের ভেতরে অন্ধকার হয়ে যায় গণি মন্ডলের। বাড়ি, জমি, পুকুর, গাছ সব কী বললেই পর হয়ে যায়? এসব বাদে নিজের দেশ কীভাবে হয়। শুধু এক বড়বাড়ি দিয়ে কী দেশ হয়?

এই দোটানা সময়ে আবার পাশে এসে দাঁড়ায় শামছু ভাই।

' সেদেশে তো রথীন্দ্রনাথেরা থাকবে না। অচ্ছুৎ বলে কেউ দিনরাত গঙ্গাজল ছিটাবে না। বাইর উঠানে কেউ সীমা নির্ধারণ করে দেবে না। তোমার দেশ, তোমাদের দেশ। সব জায়গাতে তোমরাই বড়বাবু।'

শামছু ভাইকে এজন্যই এত জ্ঞানী মনে হয় গণি মন্ডলের। মানুষটা সবকিছু এত সুন্দর করে বুঝিয়ে দেয় যে মনের সব দোটানা দূরে চলে যায়।

গণি মন্ডল এবার প্রস্তত তাদের জন্য বানানো স্বর্গের মতো সুন্দর দেশে যাবার জন্য। গাছের ছায়ায় শ্যাওলা পড়া উঠানের এই মাটি, পুকুরের ভাঙা ঘাটের প্যাচপেচে কাঁদা, টিনের দোচালা ঘরের ভেতরের গুমোট অন্ধকার তার কাছে হঠাৎ করেই বিরক্তি হয়ে উঠলো। নতুন দেশের সোনারঙা মাটি, রূপালি জলের নদী আর পান্নার মতো সবুজ গাছের হাতছানীতে দিশেহারা হয়ে উঠলো গণিমন্ডল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পরিবার নিয়ে সে দেশে চলে যেতে হবে।

পরিবার বলতে ওই তো বিবি, পুত্র আর আব্বাজান। সবকিছু তার পরিকল্পনামাফিকই হচ্ছিলো। শুধু শেষ সময়ে এসে ঝামেলা করে বসলেন আব্বাজান। জয়নব বিবির কবর ফেলে তিনি কোথাও যাবেন না। কোনো বেহেশত্-এর লোভই তাঁকে জয়নব বিবির কবর থেকে দূরে নিতে পারবে না।

জয়নব বিবি এ বাড়িতে বউ হয়ে নয়, আবু মন্ডলের খেলার সাথী হয়ে এসেছিলেন। সেই কত ছোট বয়স থেকে দু'জন একসাথে। বছর দুয়েক আগে এক দুপুরে জয়নব বিবি কাঠটগর গাছের গোড়ায় বুকের ব্যাথায় নীল হতে হতে গড়িয়ে পড়েছিলেন। হাতের মুঠোয় তখনো কয়েকটি শাদা পাপড়ি ধরা। কাঠটগর বড় পছন্দের ফুল ছিল জয়নব বিবির। এজন্য এই কাঠটগরের নীচেই আবু মন্ডল কবর দিয়েছেন তাঁর জয়নব বিবিকে। আর পাশেও কয়েকহাত জায়গা রেখে দিয়েছেন নিজের জন্য। একসাথে থাকার অভ্যাস তাদের সেই ছোটবেলা থেকে।

কিন্তু এখন ছেলের কথায় জয়নব বিবিকে একলা ফেলে চলে যেতে হবে। এই বাড়িতে বসত হবে কোন এক অজানা পরিবারের। তারা কি জয়নব বিবির কবর ঠিকমতো দেখভাল করবে? নাকি আগত সময়ে এই কবরের নিশানাই মুছে যাবে?

ভেবেই অস্থির হয়ে ওঠেন আবু মন্ডল। দু'হাত আর মাথা ঝাঁকিয়ে অনবরত বলতে থাকেন," জয়নব বিবিকে এইখানে একলা রেখে আমি কোথাও যাবো না। গণি আমি নিষেধ করে দিলাম, এরপর কোনদিন আমাকে এ কথা আর বলবি না।"

নিষেধ---আবার সেই নিষেধ। বড়বাড়ির নিষেধের সেই দিনগুলো থেকেই শব্দটির প্রতি ঘৃণা গণি মন্ডলের। যে ঘৃণা থেকেই তো নতুন দেশ পেলো। এখন আর এই নিষেধকে প্রশ্রয় দেবার সময় নেই তার।

আব্বাজানকে অগ্রাহ্য করে বিবিকে হুকুম দিলেন," দুইদিনের মধ্যে সব গুছিয়ে নাও। সেখানে যেতে হবে তাড়াতাড়ি। "

গণি মন্ডলের উৎসাহ বিবিকে কতটুকু ছুঁয়ে গিয়েছে তা বোঝা না গেলেও ছেলে হাশেম মন্ডলকে আকর্ষিত করে ফেলেছে, এ বুঝি বলার অপেক্ষা রাখে না। আব্বার কাছ থেকে ঘর ছাড়ার সিদ্ধান্ত বেশ কয়েকবার শুনে শুনে হাশেম মন্ডল বুঝে গিয়েছে এ ঘর ছাড়লেই খুব ভাল কিছু অপেক্ষায় আছে তাদের। আর তা যে দাদীজানের পাকানো গুড়ের ফিরনীর মতো মজাদার হবে সেটাও বুঝে ফেলেছে। আর না বোঝারই বা কী আছে? হাশেম মন্ডলের কাছে এই পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল জিনিষ হলো সেই ফিরনী। যার স্বাদ সে হারিয়ে ফেলেছে দাদীজানের সাথে সাথে। সেই স্বাদ ফিরে পাবার সুযোগ এলে হাশেম মন্ডল তো উৎসাহী হবেই।

দাদাজানের আপত্তি দেখে হাশেম মন্ডল একটু অবাকই হয়েছিলো। দাদাজানও তো সেমুই ইদে নামাজ পড়ে এসেই তাকে নিয়ে বাটি ভরে সে ফিরনী খেতো আর বলতো, ' হাশেম, এই মিষ্টান্ন ছাড়া সেমুই ইদ হয় না।' তাহলে কেন আপত্তি করছে? তবে দাদাজানের সকল আপত্তি আব্বার উৎসাহ আর জেদের কাছে হেরে যায়।

সেদিন ফজরের পরেই একটি গরুর গাড়িতে কয়েকটি কাপড়ের পোটলা, একটিন মুড়ি, এক হাড়ি ঝোলা গুড় আর কয়েকটি হাঁস নিয়ে ওরা ছেড়ে আসে অন্ধকার সে ঘর, থমথমে সে বাড়ি আর নিস্তব্ধ সে পুকুর।

ওরা বেরিয়ে পড়ে ওদের নির্ধারিত গন্তব্যে। যেখানে গণি মন্ডলের জন্য অপেক্ষায় আছে একটা বড়বাড়ি, হাশেম মন্ডলের জন্য অপেক্ষায় আছে গুড়ের ফিরনী আর দাদাজানের জন্য? না, দাদাজানের জন্য কিছু অপেক্ষা করে নেই। কারণ আবু মন্ডল শুধু বাকী জীবনটুকু শ্বাস নিয়ে গেছে, বাঁচেননি তৃপ্তি করে। তাঁর আত্মায় জয়নব বিবির কবরের ভেতরের অন্ধকারটুকু বসত গেড়েছিলো বাকী জীবন।

তবে আবু মন্ডলের জীবনের সে অন্ধকার গন্তব্যে পৌঁছালেই মিলিয়ে যাবে, তা নিয়ে পুরোপুরি আশ্বস্ত ছিল গণি মন্ডল। মেলাতেই হবে সব হতাশা, অন্ধকার আর ঘৃণা থেকে দূরে আসতেই তো নিজেদের জন্য একটা নতুন দেশ বানালো তাঁরা।

নতুন দেশ, নিজের দেশ, সকলের জন্য একটি করে বড়বাড়ি----- গণি মন্ডলের আর তর সয় না। গন্তব্যপথের কষ্টগুলো বিরক্তি জাগালেও তাকে হতোদ্যাম করতে পারেনি। আর বিরক্তি জাগবেই বা না কেন? খুব কাছের পথ তো নয়। মাটির পথ, জলের পথ কোনকিছুই বাদ পড়েনি তাতে। আর সবচেয়ে বিরক্তি ছিল হাজারো মানুষের চিৎকার-চেঁচামিচি। সবাই যেন একদিনেই ঘর ছেড়েছে। হাজারো মানুষ সেদিন পথে। গরুর গাড়ি ছাড়তে হলো নদীর জন্য। তবে শুধু গরুর গাড়ি নয় তারসাথে গুড়ের হাড়ি আর মুড়ির টিনও ছেড়ে দিতে হলো। নৌকাতে মানুষই ধরছে এগুলো কীভাবে ধরবে? তবুও অনেক কষ্টেসৃষ্টে হাঁসগুলো আর কাপড়ের পুঁটলিগুলো নিয়ে ওরা বসলো নৌকায়। বড় নদী পাড় হতেই মাটির পথ। এবারে আরোও বেশী কষ্ট। হাঁটা ছাড়া উপায় নেই। যে দু'একটি গরুর গাড়ি আছে তাতে পারলে মানুষ ঝুলে যায়।

লম্বা পথ। আর ভাদ্র মাসের ভ্যাপসা গরম। ঘেমেনেয়ে ক্লান্ত শরীরে কাপড়ের পুঁটলিগুলোই বোঝা মনে হতে লাগলো। খুব দরকারি কিছু জিনিষ বাদে বাকী পুঁটুলিগুলো পথে রেখেই ওরা এগিয়ে গেলো। আর হ্যাঁ, এতসব ঝক্কিঝামেলায় হাঁসগুলো কখন ওদেরকে ফেলে চলে গেছে তা অবশ্য কেউ বলতে পারে না। হাশেম মন্ডলের মনটা খুব খারাপ করেছিলো হাঁসগুলোর জন্য। তবে গুড়ের ফিরনীর স্বাদ নেবার আশ্বাস তাকে বেশীসময় মন খারাপ করে থাকতে দেয়নি।

অবশেষে ওরা গন্তব্যে পৌঁছালো। যেন মহাকাল পাড় হয়ে এলো ওরা।

হোক ঝক্কিঝামেলা, হোক অবর্ণনীয় কষ্ট, তবু তো নিজের দেশ।

নিজের দেশ তো পাওয়া গেলো, এবার নিজের একটা বড়বাড়ি। আরেকটু খুঁজলে তাও পাওয়া যাবে।

তখনো গণি মন্ডল জানে না মৃত্যূ অবধি এই খোঁজ চলবে তার।

বাড়ি মিলে গেলো অল্পসময় পরেই কিন্তু সে বড়বাড়ি কই? জোনাই পোকার সেই আলোর তেজ কই, যা দিয়ে সে আলোকসজ্জা করতে চেয়েছিলো? আর শাদা বকের মতো ধবধবে জ্যোৎস্নাই বা কই, যা দিয়ে ঘরগুলোর অন্ধকার দূর হয়। কিছুই তো পায় না গণি মন্ডল। শুধু খুঁজতেই থাকে।

শামছু ভাই বলেছিলো, নতুন দেশে কোনো নিষেধ থাকবে না, অন্য কেউ সীমা নির্ধারণ করে দেবে না-----সেসব তো কিছুই মিললো না। এদেশেও নিষেধ এলো। ভয়ংকর নিষেধ।

' বাংলাভাষায় কথা বলা যাবে না' গণি মন্ডল আতকে উঠলো। এও কি সম্ভব? কথা বলাতেই নিষেধ চলে এলো। ছটফট করে উঠলো সে। বুকের ভেতরের ফেলে আসা নিস্তব্ধ পুকুর হাহাকার করে উঠলো।

এমন নিজের দেশ তো চায়নি গণি মন্ডল। নাকি নিজের দেশ খোঁজা এখনো শেষ হয়নি। ওরা কী ভুল দেশে চলে এসেছে?

ভুল দেশ তো অবশ্যই। নয়তো ফেলে আসা ঘর, সবুজ গাছ, কালচে জলের পুকুর তা থেকে ভাল তো দূরে থাক সেরকমও কিছু নেই এখানে। গণি মন্ডলের অস্থিরতা বেড়ে যায়। হতাশা বেড়ে যায়। আর সে হতাশা আর অস্থিরতায় যোগ হয় আরেক পোজ অন্ধকারের। জয়নব বিবির একাকী কবরের যে শোক অন্ধকার হয়ে বুকে বসত গড়েছিলো তা ফেলে একদিন হুট করে চলে যায় সে। বাড়ির পাশে আব্বাজানের কবরের পাশে যতবার গিয়ে দাঁড়ায় ততবার আম্মাজানের সেই একলা কবরের জন্য মন কাঁদে গণি মন্ডলের।

সময় ততদিনে বেশ পেরিয়ে গেছে। হাশেম মন্ডল ততদিনে বুঝে গিয়েছে গুড়ের ফিরনীর সে স্বাদ একবার হারিয়ে গেলে আর ফিরে পাওয়া যায় না। তাই সে স্বাদের কথা ভুলে নিজেদের জন্য ঠিক দেশটি খোঁজার দায়িত্ব নিয়েছে এবার সে।

আর গণি মন্ডল মধ্যবয়সের চৌকাঠ পেরিয়েছে। শরীর প্রায়ই খারাপ থাকে। তাই তাঁর শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী যাওয়া হবে ফেলে আসা ঘরে, সে বাড়িতে। দিন ঠিক হলো। প্রায় ভেঙে পড়া শরীর নিয়ে গণি মন্ডলও প্রস্তুত অন্যের হয়ে যাওয়া ফেলে আসা সে দেশের জন্য। তবে এগুলোর ছাড়াও মনের ভেতরে আরোও একটি সুক্ষ্ম ইচ্ছাও আছে তার। সেদেশে গেলে একবার যাবে বড়বাড়ির বাইর উঠোনে। বাইর উঠোনে রথীনকে বুকে জড়িয়ে ধরতে কোনো নিষেধ নেই।

আম্মাজানের কবর আর রথীনকে এক পলক দেখার লোভে অসুস্থ গণি মন্ডল চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। হাশেমের বউ করবীকে বলেছে হালুয়া বানিয়ে দিতে বেশী করে ঘি দিয়ে। রথীনকে লুকিয়ে দেবে খেতে।

হালুয়া সত্যিই বানানো হলো অনেকখানি ঘি দিয়ে। কিন্তু রথীনকে দেবার ভাগ্য হলো না গণি মন্ডলের।

পঁয়ষট্টির যুদ্ধের পর তখন বন্ধ গেলো হিন্দুস্তান আর পাকিস্তানের বর্ডার। আর এদিন থেকেই হারিয়ে গেলো গণি মন্ডলের ফেলে আসা দেশে যাবার স্বপ্ন। এরপর আর কোনদিন ফেরা হয়নি তাঁর সেই কাঠটগরের সে বাড়িতে।

হাশেম ক্রমেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লো নিজেদের জন্য একটি সঠিক দেশের স্বপ্নে। সংসারে তখন আব্বা, ছেলে রতন আর করবী।

করবী, হাশেম মন্ডলের স্ত্রী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় পড়া রুচিশীল একটি মেয়ে। হাশেমের সাথে তার পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয়েই। রতন আর আব্বার দায়িত্ব সে নিঁখুত ভাবে পালন করতে পারে বলেই হাশেম ব্যস্ত নিজের দেশের স্বপ্নে। সন্তানের জন্য একটি সঠিক দেশ এনে দেবার দায়িত্ব তো পিতাতেই বর্তায়।

যদিও হাশেমের একমাত্র সন্তান রতন তখনো বোঝে না দেশ কী। এর সঠিক দেশই বা কেমন।

' বাবা, তুমি যে দেশের কথা বলো সেখানে কী রঙিন ঘুড্ডি পাওয়া যায় অনেক? আমার ঘুড্ডিটা কাল কাটা পড়েছে।'

ছেলের সরল প্রশ্নে হেসে উঠে হাশেম বলে,

' হ্যাঁ, বাবা, অনেক রঙিন ঘুড্ডি পাওয়া যায়। তুমি একেকদিন একেক রঙের ঘুড্ডি ওড়াবে।'

হাশেম আরোও বলে, ' সে দেশে তুমি বাংলায় কথা বলবে, রবীন্দ্রনাথ পড়তে পারবে, কোনো অন্যায় থাকবে না সে দেশে '

অতকিছু বোঝে না রতন। শুধু বাবার আশ্বাসে আশ্বস্ত হয়। রঙীন ঘুড্ডির আশ্বাস। একটি বেগুনী রঙের লেজওয়ালা ঘুড্ডির খুব শখ। সে দেশে রতন পাবে লেজওয়ালা ঘুড্ডি।

রতন যখন বিভোর লেজওয়ালা রঙিন ঘুড্ডির স্বপ্নে তখন বাবা ব্যস্ত নিজেদের জন্য বিদ্বেষহীন এক দেশ ছিনিয়ে আনতে। রতনকে সে স্বপ্নে বিভোর রেখেই বাবা একদিন চলে গেলো রঙিন ঘুড্ডির সে দেশ আনতে।

' রতন, আমি কয়দিন থাকবো না। মা আর দাদুর কথা শুনবে। দুষ্টুমি করবে না।'

' তুমি কি আমার জন্য লেজওয়ালা ঘুড্ডি নিয়ে আসবে বাবা?'

' হ্যাঁ, বাবা। আমি তোমার জন্য ঘুড্ডি আর একটা স্বাধীন আকাশ নিয়ে আসবো। যেখানে তোমার ঘুড্ডি উড়বে নির্বিঘ্নে।'

স্বাধীন আকাশ কী তা বোঝে না রতন। তবে 'স্বাধীন' শব্দটি খুব বেশীদিন আর অচেনা থাকেনা রতনের। রাত হলেই দাদু ওদের ব্যাটারিওয়ালা রেডিও টা নিয়ে বসে যায়। টিউন করে করে খুঁজে বের করে 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র'। খুব ঢিমে আওয়াজে সেখানে বেজে চলে, 'কেল্লা ফতে খান'এর নাটক। এরপর সংবাদ বুলেটিন শুরু হলেই মা এসে দাঁড়ায় দাদুর বিছানার পাশে।

' বৌমা, আজ নরসিংদীর যে কালভার্ট মুক্তির দল ভেঙে দিয়েছে সে দলে মনে হয় হাশেম ছিল। এমন সাহসী কাজ আমার হাশেমই করতে পারে।'

মা কিছু বলে না। শুধু রেডিও-র আরোও কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। আর কিছু না বুঝলেও রতন এটুকু বুঝে গিয়েছে, রঙিন ঘুড্ডির সে দেশ পাওয়া সহজ নয়। বাবা খুব কষ্ট করছেন রতনের জন্য সে দেশ আনতে।

রঙিন ঘুড্ডির দেশ পাওয়া সহজ না হলেও একটি দেশ রতন পেয়েছিলো। তখন পৌষের দিন। কুয়াশা কাটিয়ে সেদিন রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিলো অজস্র মানুষ। সকলে গলা ফাটিয়ে বলছিলো,

'জয় বাংলা'

আনন্দে মা একটি লালসবুজ পতাকা নিয়ে উঠে গিয়েছিলো ছাদে। আর তখনই বাবার একটা জামা, দু'টো লুঙ্গি আর মা'র কিনে দেওয়া ঘড়িটা নিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন কিছু বাবার মতো দেখতে মানুষ। দাদু হু হু করে কেঁদে উঠেছিলো। আর মা জিনিষগুলো বুকে চেপে বসেছিলো সারাদিন।

রতন দেশ পেলো কিন্তু রঙিন ঘুড্ডি কই। রতন শুধু ঐ লালসবুজ পতাকাই দেখতে পেলো পতপত করে উড়তে। নির্বিঘ্নে ঘুড্ডি ওড়ানোর আকাশও খুঁজে পেলো না। এরপর মায়ের কাছ থেকে বায়না করে একবার দু'বার ঘুড্ডি পেলেও তা আর নির্বিঘ্নে ওড়ানো হয়নি। ঘুড্ডি আকাশে উঠিয়ে নাতাইয়ের সুতা ছেড়ে তা ভাসাতে গেলেই কেউ না কেউ এসে তার ঘুড্ডি কেটে দেয়। ভোকাট্টা হয়ে উড়তে উড়তে বাতাসে কয়েকবার ডিগবাজী খেয়ে হারিয়ে যায় তা। রতনের মন খারাপ হয় খুব।

বাবা কি তবে মিথ্যা বলেছিলো?

শুধু ঘুড্ডি নয়, ভোকাট্টা হয়ে যায় দাদুও। তিনি তখন আলঝাইমার্সে আক্রান্ত। রতনদেরকে চিনতে পারেন না। শুধু বারবার একটি কথায় বলতো, 'বড়বাড়ির বাইর উঠান টা কই?'

কোন বড়বাড়ি আর তার বাইর উঠানটাই বা কোনটা তা বুঝতে পারতো না রতন। একদিন ফজরের নামাজের সময় মা উঠে দেখে বাড়ির দরজা হাট করে খোলা। দাদু নেই। মা চোখে পানি নিয়ে অস্পষ্ট করে বললো,

' উনি বড়বাড়ির বাইর উঠোনের খোঁজে বেরিয়ে গেছেন।'

দাদু ফেরেননি। আর কোনদিন ফেরেননি। তবে দাদুর খোঁজে সেই বড়বাড়ি থেকে একজন বৃদ্ধ লোক এসেছিলেন। মায়ের মুখে সব শুনে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন,

' গণি ফিরলে বলো, রথীন বড়বাড়ির দুই উঠোন এক করে ফেলেছে। এখন আর কোন বাইর উঠান নেই।'

বড়বাড়ির উঠোন এক হয়ে গেলেও রতনদের উঠোন টুকরো টুকরো হয়ে গেলো। মায়ের পক্ষে ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠলো সে উঠোন এক রাখা। কিছু টুকরো হলো টাকার প্রয়োজনে। আর কিছু টুকরো হলো হুমকীর কারণে। শহরের মধ্যিখানে বাড়িটি হওয়ায় অনেকেরই চোখ ছিল তাতে।

অবশেষে ছোট হয়ে যাওয়া উঠোন নিয়ে প্রায় দমবন্ধ অবস্থাতেই কাটতে থাকে মা আর রতনের দিন।

ততদিনে রঙিন ঘুড্ডির মোহ কাটিয়ে রতন তখন শুদ্ধের মোহে বিভোর। বাবার এনে দেওয়া দেশটার দিনে দিনে অশুদ্ধ রূপ কিছুতেই মেনে নিতে পারে না রতন।

আবার একটা নতুন শুদ্ধ দেশের জন্য রাস্তায় নামে। যেভাবে রাস্তায় নেমেছিলো গণি মন্ডল, রাস্তায় নেমেছিলো হাশেম মন্ডল। আজ রতন মন্ডলও রাস্তায়। নিজের একটি সীমানাহীন বড়বাড়ি, দাদীজানের হাতের গুরের ফিরনীর স্বাদ, রঙিন ঘুড্ডির মতো স্বপ্নগুলোর মতো শুদ্ধ দেশের স্বপ্নও মুখ থুবরে পড়ে।

যেভাবে মুখ থুবরে পড়ে থাকতে দেখা যায় রতনকে বইমেলা থেকে বেরিয়ে আসার পথটাতে।