আখ্যানের শব্দ গন্ধঃ অভিমুখহীন স্মৃতি

প্রবুদ্ধ ঘোষ


মূর্তি গড়া আর ভাসানোর খেলা চলতে থাকে। সংকট গাঢ় হলে দেবীকে গড়ে তোলা হয়, সাজানো, অস্ত্রদান। মিথ্‌, গল্প তৈরি ক’রে নেওয়া হয়। বছরভরের অন্ন-আলো চেয়ে নেওয়া। জটিল জীবনকে সরলতর করার ভরসাস্তোত্র বুঝে নিয়ে বিসর্জনের আয়োজন পাকা। ছিনিয়ে নেওয়া হয় অস্ত্র। প্রসারিত শূন্যহাত- বরাভয় মুদ্রায় দেবী ডুবে যান। ভাসানকুলিরা ডুবে থাকেন। কাঠামো তুলে আনেন। আবারও ঘনিয়ে আসা নতুন সংকটে, কাঠামো জুড়ে মাটির প্রলেপ। কুমোরের শ্রম। নতুন অবয়ব, সাজ। মূর্তি গড়া আর ভাসানোর মধ্যে পুনরাবৃত্ত মিথ্‌ লোকমুখে, ছড়ায়। উৎসব আনাচকানাচ ভরিয়ে তোলে। উৎসব নিভে এলে হেমন্ত ঝরতে থাকে। শব্দ গন্ধ স্মৃতির বয়ামে শুকোতে দেওয়া হয় পুজোশেষের নরম রোদ্দুরে... আখ্যানেরা, জেগে থাকে।
#
পুজোর একটা গন্ধ আছে। দুর্গাপুজোর আগে থেকে সেই গন্ধটা নাকে লাগে, ছাতিমের গন্ধ, কোথা থেকে আসে জানিনা। কিন্তু, ওই গন্ধটা পেলে বুঝি, পুজো এসছে। ছোট থেকেই অমন একটা মনজাগানো গন্ধ আসে। গন্ধের উৎস খুঁজতুম আগে, পেতুম না। ছোটবেলার পাড়ায় একটাও ছাতিমগাছ নেই। যাও বা একটা কৃষ্ণচূড়া আকাশটাকে জালি-জালি ক’রে রাখত, বোসেদের ফ্ল্যাট তোলার সময় কেটে দিয়েছে। আর ওই বটগাছটাও আমি জানি, ছোড়দাদুদের বাড়ি ভেঙে চার তলা করার সময় অনেকটা কেটে দেওয়া হবে। কিন্তু, ছাতিমগাছ না থেকেও ওর’ম একটা শিরিশিরে অদ্ভুত গন্ধ একবার পঞ্চমীর প্রায়-শব্দহীন রাতে পেয়েছিলুম। মাসির বাড়ি থেকে মা-বাবার সঙ্গে ফিরছিলুম, পাড়ায় তখন যে একটাই মাত্র বারোয়ারি পুজো হত, সেই দুগ্‌গার হাতে তখন অস্ত্র দেওয়া হচ্ছে। সেই দৃশ্য থেকে কোনও এক গন্ধ- প্যান্ডেলের কাপড়, অক্টোবর-মাঝের প্রায়-শিশির ভিজেভিজে হাওয়া আর ওই মুহুর্তটার আনন্দের গন্ধ। এখনও ওই গন্ধটা মাথায় সেঁধিয়ে আছে। বড়ো হয়ে, যখন পঞ্চমীর রাতে একা-একা ফিরতে শিখেছি, যখন চতুর্থীতে ইউনিভার্সিটি বন্ধ হতে বন্ধুবান্ধবী মিলে আড্ডাঠাট্টা ছুঁড়তে ছুঁড়তে ফিরতে শিখেছি; তখনও, আঙ্গুলে লেগে থাকা সিগারেটের গন্ধ, জামায় হাল্কা মদের গন্ধ বা প্রিয়ঠোঁটের পিপারমিন্টের গন্ধ ছাপিয়ে ওই ছাতিম ফুলের গন্ধ মাথার ভিতরে জেগে উঠেছে। তখন আর পাড়ায় একটাই বারোয়ারি পুজো নেই, তখন আলো-শব্দ বেড়ে গেছে অনেক, তৃতীয়া থেকেই ঠাকুরের হাতে হাতে অস্ত্রদান হয়ে গেছে- তবু, ওই পঞ্চমীর রাতের অস্ত্রদানের দৃশ্য, মণ্ডপের দু’পাশে কাপড়ঢাকার ছবি আর মা-বাবার হাত ধরে নতুন জামার আগাম উৎসবসুখ সঙ্গে নিয়ে ফেরা বালকটি ওই মুহূর্তটির সযত্নরক্ষিত গন্ধ নিয়ে ভেসে ওঠে মাথার কোষে কোষে। আরও পরে, শহুরে এ চার দেওয়াল থেকে অন্য দেওয়ালের যাতায়াত, বই-ক্লাসরুম-কর্মস্থলে রোজনামচা, বাসে-ট্রামে ঘাম আর ভ্যাপসা, মনখুশি আর মনখারাপের বদলাবদলি এইসব গন্ধ যখন গাঢ় হয়েছে সেইসব সমান দিন-রাত পেরনো সন্ধ্যেয় চেনা রাস্তা অচেনা পাড়ার মোড়ে হঠাৎই ভেসে আসতে পারে ছাতিমের গন্ধ। কমলা বোঁটা আর উজ্জ্বল সাদাপাপড়ির ফুল ঢেকে আছে পথ এমন দৃশ্যও আচমকা জ্বলে উঠতে পারে। কারণ, এই পাড়ায় কোনও ছাতিমগাছ ছিলনা কখনও আর শুঁয়োপোকার ভয়ে শিউলি গাছের ডাল ছাঁটতে ছাঁটতে গোটা গাছটাই কেটে গেছে কখন। তবু, এলোমেলো বিপথগামী স্মৃতি থেকে দৃশ্যগুলো ফিরতে শুরু করে যখন আর, পুজোর আগে আগে হঠাৎ যেদিন ওই গন্ধগুলো পাওয়া যায়, সেইদিন থেকে কর গোণা শুরু হয়- আর ক’দিন বাকি পুজোর!?

#
পুজোর দিন সকালে ঘুম ভাঙত পুজোকমিটির ঘোষণায়- ‘এলাকাবাসীকে অনুরোধ করা হইতেছে যে, আপনারা সত্ত্বর পুজোর ডালি নিয়ে আমাদের মণ্ডপে উপস্থিত হোন। সপ্তমীর পূজা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হইবে...’- পুজোর আনন্দে সাধুচলিত মিশে যায়। একে গুরুচণ্ডালি দোষ বলে না বোধহয়! সপ্তমীর ভোরে অবশ্য উলুর শব্দ আসত, আর ম্যাটাডোরের ধোঁয়া ছাড়ার আওয়াজ। তারপরে বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ। একটু রোদ উঠতেই ওই ঘোষণা; সাহাবাড়ির মেয়ে বা পল্টুজ্যেঠুর নাতি, এখন আর মুখ দেখাদেখি নেই ওদের, মাঝেমাঝে মাইক নিয়ে মিহি গলায় চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ওই একই ঘোষণার জগাখিচুড়ি করত! পুজোর মন্ত্রপাঠ শেষ হলে, ওই বারোয়ারি পুজোর মাইকেই প্রথম শুনেছিলুম ‘রাত্রির আঙ্গিনায় এসে খোলা জানালায়/ একবার, একবার যদি সে দাঁড়ায়...’ কোনও এক পুজোর সময়েই ‘ত্রিবেণী’ নামে একটা ক্যাসেট এসে পড়েছিল আমাদের ওই ফিলিপসের পুরনো টেপরেকর্ডারের মধ্যে। রিল্‌ ঘুরতেই ‘ভীষণ অসম্ভবে তোমাকে চাইইই... না বলা কথায় আমি তোমাকে চাই’ বেজে উঠেছিল। পুজোর দুপুর জুড়ে পাড়াময় যে সুর ঘুরত, বাড়ির বেশিবয়সীরা দেখতুম সেই সুরে কেমন আনচান করছে। ‘আহা, ওই ছিল স্বর্ণযুগ...’ ওই গলা যে আর পাওয়া পাওয়া যাবে না অমন সব সিনেমা যে আর হবেনা বাংলায় সে আক্ষেপের মধ্যেই অষ্টমীর দুপুরে লুচি ভাজার ছ্যাঁকছ্যাঁক শব্দ আর গরম তেলে বেগুনের ফালি ছাড়ার ছ্যাস্‌স শব্দ উঠত। সাদা আলুর তরকারি আর বেগুনভাজা দিয়ে লুচি খাওয়ার একটা শব্দ ছিল। ফুলকো লুচির মধ্যিখানটা ফুটো ক’রে দিলে যেটুকু গরম হাওয়া বেরনোর নিভৃত শব্দ, সেটুকু শুনতে হৃদয় প্রয়োজন! অষ্টমীর সকাল থেকেই অবশ্য এখনও, “আমাদের পূজোমণ্ডপে অঞ্জলি শুরু হইবে। যারা যারা অঞ্জলি দেবেন, আমাদের প্যাণ্ডেলে চলে আসুন... সন্ধিপুজো শুরু ঠিক এগারো ঘটিকায়” এই ঘোষণাগুলো শোনা যায়। কিন্তু, বারোয়ারি পুজো বেড়ে যাওয়ায় শব্দ-ঘোষণা-ডেসিবেল এক প্যাণ্ডেলের সঙ্গে অন্য প্যাণ্ডেলে কাটাকুটি খেলে! বিকেলগুলোতে যে গান হত, তাতে আমাদের যৌথ পরিবারের দাদা-দিদিরা দেখতুম উন্মনা হচ্ছে, কয়েক কলি ক’রে গান গেয়ে নিচ্ছে নিজেরা, ইয়ারদোস্তের সঙ্গে বেরনোর আগে নতুন জামার পরিপাটি ভাঁজ খুলছে। ‘সর্দি খাঁসি না ম্যালেরিয়া হুয়া... ম্যায় গ্য্যয়া ইয়ারো, মুঝকো লাভেরিয়া হুয়া’-র সঙ্গে যোগ্য সঙ্গতে ‘সঙ্গীইইইই, আমরা অমর সোওওওঙ্গী...’ বিকেল থেকে সন্ধ্যে ঘনিয়ে দিত। ঢাক বেজে উঠত জোর শব্দে। ঢাকির ছেলে কাঁসর বাজাত... তারা ক্লান্ত হয়ে পড়লে মাইকে বাজত, ‘সাত সমুন্দর পার ম্যায় তেরে...’ আর ‘শিশে কি উম্র প্যার কি আখির বিশাত ক্যা...’ বড়োরা অবশ্য ছিঃ ছিঃ বলে মাঝে মাঝেই আপত্তি জানাত- একবার লোকাল কমিটির বয়স্কদের সঙ্গে পার্টিরই সদ্যমাস্‌ল যুবদলের সংস্কৃতির আগে ‘অপ’ বসবে কি না, তাই নিয়ে তুলকালাম হয়েছিল। ‘একটু জায়গা দাও মায়ের মন্দিরে বসি...’ কোনওরকমে সবাইকে শান্তিতে বসিয়ে রেখেছিল বিজয়া অবধি। ডিজে নাচের সঙ্গে ভাসান হালে কয়েকবছর, জানলা-দরজার কাঁচ ঝনঝনিয়ে দিচ্ছে বটে। বদল হয়েছে গানের লয়-সুর-শব্দেও। ‘চার বোতল ভডকা, কাম মেরা রোজকা’ আর ‘আগ লাগাইলে জিগর্‌সে পিয়া’ সকাল থেকে বাজে- ‘আপনাদের জানানো হইতেছে যে, বিকেল ৫ ঘটিকায় মা’কে বরণ করা হবে। যাহারা বরণ করিতে ইচ্ছুক...’ ঘোষণা থামে, চলে, বন্ধ হয়। নান্টুকাকুর ধমকধামকে বা সুভাষদাদুর বিরক্তপ্রকাশে নয়, হালফিলের হিন্দিগান চলতে চলতে মাইক জিরেন চাইলে, দু-একটা ভক্তিগীতি গুঁজে দেওয়া হয়। নান্টুকাকু, উত্তর কলকাতার ঐতিহ্য নিয়ে বুক ফোলাত, বাংলা ব্যান্ডের গানের সিডিগুলো পুজোকমিটিকে দিত, বছর দশেক হল বাড়ন্ত কলকাতার উত্তরপ্রান্তে ফ্ল্যাট কিনে চলে গেছে। ‘ম্যায় তো তন্দুরি মুর্গি হুঁ ইয়ার, গট্‌কা লে সাঁইয়া অ্যালকোহল সে’ গান শুনে প্যান্ডেলে চেয়ার পেতে আর দেশের উচ্ছন্নে যাওয়া নিয়ে মিটিং বসে না কারণ, মিটিং বসানোর লোকগুলো হয় বেঁচে নেই নয়তো কানে হেডফোন গুঁজে গেমের শব্দে মশগুল। অথচ, বেশ মনে আছে, খুব ছোটবেলায় পুজোর ছুটির আগে ইস্কুলের শেষদিন কাকাইয়ের সঙ্গে সাইকেলে ফিরতে ফিরতে শুনেছিলুম, ‘নন্দীবাড়ির একচালাতে কুমোর ঠাকুর গড়ে... মন বসে কি আর?’ সেই না-বসা মন নিয়ে প্রত্যেক পরের পুজোয় যত গানই শুনি না কেন, ‘কে জানে এতক্ষণে সিংহরাজের কেশর দিলো জুড়ে’ শুনলেই পড়ার বইপত্তর সরিয়ে রেখে দেওয়ার যে আনন্দ ছিল... শেষ কবে পাড়ার প্যান্ডেলে এই গান শুনেছি, মনে নেই। নবমীর সকাল থেকে বাড়িতে পাঁঠা রাধা ও খাওয়ার যে একটা আনন্দধ্বনি উঠত, যৌথ পরিবারে মাটিতে আসন পেতে একসঙ্গে খেতে বসা আর আহাউহু স্বাদে টাগরায় জিভ ছোঁয়ানোর যে শব্দ, তাও তো আর নেই। ভাগ হয়ে গেছে কবেই, একটাই বারোয়ারি পুজো ভাগ হয়ে যায় যেমন। পুজোকমিটির ঘোষণা এখনও হয়, মাইকে গান বাজে- কিন্তু শব্দগুলো পাল্টে গেছে; আগের বার পাড়ার সবচেয়ে ছোট বাজেটের পুজোয় ঢাক-কাঁসর বেজেছিল ইউটিউব থেকে... ওই টেপ-রেকর্ডার আর সারানো হয়নি, যৌথপরিবার পতনের শব্দও প্রথম শুনেছিলুম পুজোর পরে পরেই, কাকারা আলাদা হয়ে গেছিল। ‘ফিরবে না সে কী ফিরবে না...’ গানটাও প্রথম পুজোর মাইকেই শুনি, তখন ক্লাস সেভেন।

#
এ শহরের আখ্যান। এই যে রোজ লাখ লাখ মানুষ রাজপথ ভরেছিলেন। এই যে দড়ি-বাঁশের ঘেরাটোপে মফস্বল আর খাস কলকাতা, গাড়ি থেকে নামা আর পায়ে হেঁটে আসা, মার্কোপোলোয় যাওয়া আর ফুটপাথের দোকানে খাওয়া, ছাতা মাথায় আর ভিজে পোশাকে- নানারকম নিজস্ব গন্ধ নিয়ে এত মানুষ মিশে ছিলেন; কোন সরল আখ্যানে বাঁধা যায় একে? পুজোর পথে আলাপ, অপরিচিত কথোপকথন, জ্যামে আটকে সমস্বরে দোষারোপ, হঠাৎ ঝগড়া- পুজোর পরে এগুলো কি মিলিয়ে যাবে শিশিরের গন্ধে?
“-বাবা, ঠাকুরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
-ওরা জলে ফেলে দেবে ঠাকুর।
-জলে ফেললে ঠাকুরের ঠাণ্ডা লাগবে না?”...
এই কথোপকথনের মধ্যেই ভাসানকুলিরা ডুবে যান জলে, ভেসে ওঠেন নিঃশব্দে। ঝপ্‌ শব্দে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে আহিরীটোলা ঘাটে ছেলের দল, পয়সা কুড়নোর জন্যে। ঢাকের বোল ফিরে যাবে শহরের চকচকে উজ্জ্বলতা ছেড়ে, ঝলমলে আলোগুলো খুলে ফেলা হবে; শুধু একা পথবাতিগুলো হেমন্ত মেখে দাঁড়িয়ে থাকবে, ফেলে আসা উৎসবের স্মৃতিতে। ওই শিশুর সরল প্রশ্ন আর ভাসান-কুলিদের গভীরতার তুলনামূলক আখ্যান নেই কোনও? কাঠামো আবার উঠে আসবে। জল থেকে উঠবে কিছু পয়সা। পাঁচদিনের পুজো শেষে প্রত্যাখ্যাত দুর্গা-অসুর ফের উঠে আসবেন ভাসান-কুলির কাঁধে চেপে। তখন ভোর রাতের হাওয়ার হিম জড়িয়ে আসবে। অন্য মাটি, অন্য রঙ। অন্য শিল্পী নতুন পুরাণ-আখ্যান আঁকবেন সে কাঠামোয়। আর, আমাদের ছোট-মেজোবেলা পেছনদিকে দৌড়ুতে থাকবে দ্রুত, আমরা বড়ো হয়ে যাব আরও...