পাখি ও পাপ

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

১৯৮৯ সালে। আমার ৮ বছর বয়স। আমার লেখা প্রথম কবিতা ছাপা হয়। ঠিক ওটাকে কবিতা বলা যাবে না, পদ্য বলতে পারি। পদ্যও বলা যাবে না, পদ্যচেষ্টা বলা যেতে পারে। এর আগে কিছু লিখেছি কিনা মনে নেই। এটার কথা মনে থাকার কারণ এটা ছাপা হয়েছিল। পদ্যটা ছিল ৪৪ লাইনের, ছোটো ছোটো লাইন, অন্ত্যমিল দেয়া। মাকে নিয়ে লেখা। পদ্যের নাম ‘মা নেই যার’। প্রথম দুইটা লাইন একটুখানি মনে আছে, ‘মা নেই যার, নুন বিনা আহার /মা নেই যার, জানে না সাঁতার’ এই রকম। তখন মা গল্প করতে বসলেই আমাদের বায়েজিদ বোস্তামির গল্প বলতো। গল্পটা এমন—মা পানি খেতে চাইলো রাতে, ছেলে পানি আনতে গেলো। আনতে আনতে মা ঘুমিয়ে পড়লো। ছেলে মায়ের ঘুম ভাঙাবে না বলে পৈথানে সারারাত মশার কামড় খেয়ে খেয়ে পানির গেলাস হাতে দাঁড়িয়ে রইলো। এই গল্প শুনে শুনে আমাদের মাতৃভক্তি আরো গাঢ় হলো। ফলত এই জাতীয় পদ্য। আর প্রথম লাইনে ‘নুন’ শব্দ ব্যবহারের কারণ তখন ‘নুনের মতো ভালোবাসা’ নামক একটা রূপকথা পড়েছিলাম মনে হয় ‘ঠাকুর মার ঝুলি’তে।

পদ্যটা লিখে বাবার কাছে জমা দিলাম। পরের মাসে বাবা কী একটা স্থানীয়/আঞ্চলিক শিশুতোষ ম্যাগাজিন, নাকি মাসিক পত্রিকায় নাম মনে নেই পদ্যটা ছাপিয়ে নিয়ে এলেন। তো সেইটা ছিল আমার প্রথম প্রেরণা। লেখা ছাপা হলে তখন এক ধরনের প্রেরণা তৈরি হতো। এরপর মাকে নিয়ে আর লিখেছি কিনা মনে নাই। তবে ফুল পাখি লতা পাতা দেশ নদী মেয়ে বন্ধু বান্ধব পশু চাঁদ পাহাড় এইসব নিয়ে পদ্য/ছড়া ইত্যাদি লিখতাম নিয়মিত। হাই ইশকুলে ওঠে আলাদা বইয়ে রবিনাথ আর জীবনদাশের কবিতা-সহ অনেকের কবিতা পড়া হয়।

তখন আমি প্রতিদিন কবিতা লিখতাম। ওষুধ কোম্পানির খাতায়, নোটবুকে, ইনস্যুরেন্স কোম্পানি থেকে পাওয়া ডায়েরিতে, অংকখাতা-সহ নানা জায়গায়। দেখতে দেখতে খাতা ভরে যায়। আর বছর বছর খাতা থেকে কিছু পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলি। কারণ পরের বছর নিজের লেখা পড়ে হাসি পায়, আবার লজ্জাও হয়। একবার অদ্ভুত এক খেয়াল চাপে আমার মাথায়, ঠিক করলাম আমার একটা কবিতার খাতা ছিঁড়ে ধানের চারার সঙ্গে পুতে দিব।

১৯৯৩ সাল। বর্ষার সময়। আমাদের এক-কানি মতো জমি ছিল আমাদের বাড়ির সামনে রাস্তার ওইপারে। ওইখানে ধানচাষ হতো। আমরা কখনো-সখনো গিয়ে নিজেরাও ধান লাগাতাম। সেবার আমি ধান লাগানোর সময় প্রতিটা চারার সঙ্গে একটা করে আমার কবিতার পাতা পুতে দিয়েছিলাম কাদার মধ্যে। দেখা গেলো এক সারিতে দেড়শো চারা পুতেছি, চার সঙ্গে খাতার পাতা। সেই বছর ধানের ফলন তেমন ভালো হয়নি ইঁদুরের উপদ্রবের কারণে।

ক্লাস সেভেনে আমি প্রথম আমার একটা কবিতার পাণ্ডুলিপি তৈরি করি ১০৭ টা কবিতা নিয়ে। তার একটা প্রচ্ছদও ভাবি। আমি ক্লাস থ্রিতে যে মেয়েটার প্রেমে পড়েছিলাম, সে ক্লাস ফোরে অন্য ইশকুলে চলে যাওয়ার পর আমাদের ইশকুলের অফিস থেকে তার একটা পরীক্ষার খাতা আমি চুরি করেছিলাম, স্মৃতি হিশেবে রেখে দেবো বলে। সেই খাতার ওপরের অংশ দিয়ে যেখানে নাম রুল নং এইসব লেখা থাকে, ওই অংশ দিয়ে প্রচ্ছদ করবো ভেবেছিলাম। এই প্রচ্ছদের চিন্তা বেশ কয়েক বছর থাকে আমার মাথায়। তারপর আরেকটা প্রচ্ছদ তৈরি করি শাদা কালো কাগজ কেটে, কোলাজ টাইপ, ওপরের শাদা অংশে কাটা বাঁশের চিকন কঞ্চি লাল কালির দোয়াতে ডুবিয়ে মোটা করে লিখি ‘জন্মান্ধ রাতের আঁধার’। তারপর বছর বছর কাটা ছেঁড়া করি, কবিতা যোগবিয়োগ করি মানে পৃষ্ঠা ছিঁড়ে নতুন পৃষ্ঠা লাগাই।

আমার পাণ্ডুলিপির নাম ‘জন্মান্ধ রাতের আঁধার’ বেশিদিন রাখতে পারলাম না। কারণ কয়েক বছরের মধ্যে আমার হাতে চলে আসে আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’। ওইখানে জন্মান্ধ শব্দটা দেখে মনে হলো এই শব্দের মধ্যে মান্নান সৈয়দের গন্ধ আছে। তাই বাদ দিয়ে দিলাম। এর পর বছর বছর নাম দিই, প্রচ্ছদ বানাই। সেইসব নাম আর মনে নাই। ইশকুল হোস্টেল কলেজের সময়টাতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার আসা-যাওয়ার ফাঁকে কীভাবে পাণ্ডুলিপিটা হারিয়ে যায়। তখন মাঝখানে কয়েকবছর আর আলাদা পাণ্ডুলিপি বানাইনি। এমনিই আগের মতো খাতাপত্রে লিখেছি।

২০০২ সাল। দেখি ১৪ বছরের জমানো খাতাপত্রে প্রায় ৩ হাজার কবিতার মতো দেখতে লেখা। একদিন আয়োজন করে উল্টেপাল্টে পড়তে গিয়ে মহৎ একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। মহৎ হলেও সিদ্ধান্তটা খানিকটা নিষ্ঠুর। আমি ঠিক করলাম ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত লেখা সব খাতা আমি পুড়িয়ে ফেলবো। এবং পুড়িয়ে ফেললাম ২৫/৩০টা ছোটবড় খাতা। এবং ব্যাপক আনন্দ পেলাম। মনে হলো অ্যাটলাসের মতো পৃথিবী নামের বোঝাটা ঘাড়ে নিয়ে কুাঁজো হয়ে ঘুরছিলাম। পুড়িয়ে ফেলে সেই বোঝা নামিয়ে ফেললাম। বোঝা তো নামলো। কিন্তু সেই যে কুঁজো হয়েছি, এখনো আছি।

২০০৩ সাল। আমি আবার একটা পাণ্ডুলিপি তৈরি করলাম। কিন্তু স্থির কোনো নাম থাকে না। জলপত্র,’ ‘স্বপ্নান্ধ শব্দাবলি’ এই দুইটা নাম মনে আছে। এই দুইটা নামে অবশ্য আমি ছোটকাগজও করেছিলাম ৮ পৃষ্ঠার করে কয়েকটা সংখ্যা। সেই গল্প অন্যত্র করবো।

২০০৪ সাল। মা একটু একটু টাকা জমিয়ে আমার একটা কম্পিউটার কেনার জন্যে টাকা দেয়। আমি ২৪ হাজার টাকায় সেলেরন-এর একটা কম্পিউটার কিনে ফেলি। তখন খাতা থেকে কিছু কিছু কবিতা এমএস ওয়ার্ডে তুলতে শুরু করি। এবং আমার হাতে লেখা পাণ্ডুলিপিটাও ওয়ার্ডে কনভার্ট করি।

২০০৭ সাল। ততোদিনে পৃথিবীতে চলে এসেছে সামহোয়্যারইন ব্লগ। রাত জেগে ব্লগের পৃষ্ঠায় লিখি। দিনের বেলা ক্যাম্পাসের ঝুপড়িতে, ক্লাসরুমে বসে খাতায়ও লিখি।

২০০৮ সাল। আমার কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক ক্রাশ করে। সঙ্গে হারিয়ে ফেলি ওয়ার্ডে কম্পোজ করা ২০০ মতো কবিতা। কিছু খাতায় পাওয়া গেলেও যেগুলি সরাসরি ডক ফাইলে লিখেছি ওইগুলি পাওয়া যায় না।

২০১০ সাল। কবিতার বই বই প্রকাশের কথা ভাবি সিরিয়াসলি। নতুন করে পাণ্ডুলিপি গোছাতে গিয়ে ২০০০ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত লেখা কবিতা থেকে ৩টা কবিতা রেখে বাকিগুলি ফেলে দিই। ওই ৩টা-সহ ২০১০ পর্যন্ত ৭ বছরে লেখা প্রায় ২ হাজার কবিতা থেকে সেঁচে বের করি ১১৩ টা কবিতা। সেই কবিতাগুলি দিয়ে একটা চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি তৈরি করি। নাম দিই ‘পাখি ও পাপ’। পিকাসোর পাখি ও নারী মুখের একটা ড্রইং দিয়ে উজ্জ্বল একটা প্রচ্ছদ করি।

২০১১ সাল। জানুয়ারিতে ঋতবর্ণ প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী, কবি, লেখক ও সম্পাদক ইবরাহীম মুহম্মদকে জানাই আমার ইচ্ছার কথা। তিনি সানন্দে আমার বই প্রকাশ করতে সম্মতি দেন। নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হয় এই ভেবে যে আমার জন্মজায়গার একটা প্রকাশনী থেকে আমার প্রথম বই বের হচ্ছে। ফেব্রুয়ারির ২ তারিখে আমার পাণ্ডুলিপি তাকে প্রচ্ছদ-সহ ইমেইল করি। কিন্তু কয়েকদিন পর আমার মনে হয়, আমার প্রথম বইয়ের সবকিছু আমার হবে। পিকাসোর ড্রইং বাদ দিয়ে নিজের ড্রইং দিয়ে কালো একটা প্রচ্ছদ করে ফেলি। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে আমার ‘পাখি ও পাপ’ ছাপা হয়ে যায়।

এইভাবে একটা কবিতার বইয়ের জন্যে আমাকে প্রতীক্ষা করতে হয় ১৮ বছর। কিন্তু সেইসব কবিতা হলো কিনা এই সংশয় ক্রমশ অমর হয়ে যায়। কেউ কবি বলে ডাকলে ভয়ানক লজ্জা লাগে।