সোনারঘাট

রুখসানা কাজল


খুলনা থেকে একজন সাঁতারের প্রশিক্ষক এসেছিল আমাদের ছোট শহরে। সুমিত্রা পাল ম্যাম। সপ্তাহের তিনদিন উনি আমাদের খোলা ভ্যানে তুলে শহর ছাড়িয়ে যেখানে নদি বেশ চওড়া সেখানে সাঁতার শেখাতে নিয়ে যেতেন। আমরা সাঁতার ম্যামের ঘাড়ে পিঠে চড়ে হইহই করে সাঁতার শিখতে চলে যেতাম। কখনো নদির চরে কাদামাটি মেখে গড়াগড়ি খেয়ে, কখনো কচুরি ফুলের মালা গেঁথে কখনো আবার কৃষকের জমি থেকে কাঁচা ছোলা চুরি করে সাঁতার সাঁতার খেলা খেলতাম। সাঁতার ম্যাম কিছু বলত না। উল্টো আমাদের হয়ে কৃষকের সাথে হাসিমুখে ঝগড়া করে আরো দুমুঠো কাঁচা ছোলার গাছ আদায় করে আনত।
মাঝে মাঝে অনেক দূর সাঁতরে চলে যেত ম্যাম। প্রায় মাঝ নদি বরাবর। আমরা ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে দেখতাম ম্যাম অই নৌকার মাঝিদের সাথে অনেকক্ষণ কথা বলে ফের ফিরে আসত আমাদের কাছে। অই মাঝিরা খুব ভালো ছিল। সাঁতার ম্যামের কাছে আমাদের জন্যে চকোলেট, বিস্কিট, জিলিপি, দানাদার আরো কতকিছু যে দিয়ে দিত । আমরা খেতাম আর ম্যামের ভাগেরটা ম্যাম কোমরে গুঁজে নিয়ে যেত রাত্তিরে খাবে বলে।
সেই সাঁতার ম্যাম একটি ব্যায়াম শিখিয়ে দিয়েছিল আমাদের। যখন সাঁতরাতে সাঁতরাতে দুই ডানা ব্যথায় ভেঙে আসবে, পায়ের পেশিতে খিঁচ ধরে টান লাগবে, তখন শরীরটাকে শিথিল করে পানির ভেতর চিত হয়ে ভেসে থাকতে হবে। পানি ভাসিয়ে নিয়ে যাবে দোলাতে দোলাতে। চেনা নদি। ভয়ের তো কিছু নেই। ঘাট কোন না কোন একটা পাওয়া যাবেই । নইলে ভাসমান নৌকার মাঝি টেনে তুলে নেবে। জলের দেশের নিয়ম ত তাই। কাউকে, সে মানুষ কিম্বা পশু হোক না কেন, জ্যান্ত ভেসে যেতে দেখলেই তাকে বাঁচাতে হবে।
আমি প্রাণপণে তাই করছিলাম। ছোট ছোট পানির দোলা আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। প্রতিটি দোলার আঘাতে ক্লান্ত আমি উহু আহ করে ভেসে যাচ্ছিলাম স্রোতে । দূরে ঘাট দেখা যাচ্ছে। মুখরিত সোনার ঘাট। সে ঘাটের পৈঠায় বসে আমার বাপি, বরুণচাচা, ময়েন স্যার, কমলা দিদিমনি, অশোককাকু, তাতারিফুপি বকে যাচ্ছে। মিস জোন্স আর মা হাসি মুখে গল্প করছে হঠাত পালিয়ে আসা আমার নকশাল দাদার সাথে। বাপির হাতে লাল পতাকা। রেনুদি চক্কর দিচ্ছে পাহারাদারের মত। পুলিশ এলেই ইশারা করবে আর হাওয়ায় পালিয়ে যাবে দাদা। ওদিকে বরুণচাচা আর আমার সেজোমণি সেই আগের মতই মস্কো পিকিং মস্কো পিকিং করে লাগাতার তর্ক চালিয়ে যাচ্ছে।
অবাক হয়ে দেখি, আশ্চর্যেরও মহাআশ্চর্য ! আমার লস্ট হাসবেন্ড সাদা স্পীডবোটে চড়ে সেই সদা বিরক্ত, হতাশ আর অপুরুষিত মীন মুখে আমার ভেসে আসা দেখছে। অনেকটা যেনো পুলিশের মত তার চোখ। দৃষ্টিতে তীব্র মনোযোগের আড়ালে তীক্ষ্ণ গুপ্তচরের ক্ষিপ্রতা। ঘাটে পৌঁছানোর আগেই খপ করে ধরে ফেলে আমাকে। পুলিশের মত অনুনাসিক সুরে সে জেরা করে চলে, তোমাদের সাঁতার ম্যামের ভাগে চকোলেট, জিলিপি, দানাদার, বিস্কিট ছাড়া আর কি কি ছিল বলো ত খুকি ! অই যে চ্যাপ্টা মত, কালো। নল আছে। তোমার ভাইয়ার খেলনা পিস্তলের মত। মনে পড়েছে ? বাহ গুড। আচ্ছা বলত, তোমাদের ম্যাম কি সেটা কোমরে গুঁজে রেখেছিল নাকি বালুচরে বাদামের ক্ষেতের ভেতর পুঁতে রেখেছিল ? দেখাতে পারবে আমাদের ? পারবে না ? সে কি কিছুই মনে পড়ছে না এখনও ? এই দেখো খুকি, এই সবগুলো মিমি চকোলেট আর ভিউকার্ডগুলো তোমার জন্যে এনেছি। বলো খুকি । সত্যি করে বলো ত দেখি ।
আমি ঝুঁটি বাঁধা মাথা দুলিয়ে, মুখের ভেতর লোভের লালা টেনে নিয়ে বলে যাই, কিচ্ছু না। কিচ্ছু দেখিনি আমি। কিচ্ছু ছিলনা ত ম্যামের ! সত্যি বলছি কিচ্ছু ছিলনা।
লোকটার মীন মুখে আগুন জ্বলে ওঠে। আমি ভয়ে দ্রুত নেমে পড়ি পানিতে। এবার ভেসে যাচ্ছি। ভেসে যাচ্ছি সেই সোনার ঘাটের দিকে। হাত পা খিঁচিয়ে যাচ্ছে। ব্যাথায় ভরে যাচ্ছে শরীর। আমি শরীরটাকে শিথিল করে চীৎ হয়ে ভাসতে থাকি। মনে মনে ভয় পাই, লোকটা ঘাট ঘুরিয়ে আমাকে ডুবিয়ে মারবে না তো !
আমার জিভের নিচ থেকে থার্মোমিটার বের করে ডাক্তারআপু বলে ওঠেন, এই ত জ্বর নেমেছে। হান্ড্রেড টু পয়েন্ট ফাইভ। তবে এত সহজে জ্বর ছাড়বে না। ভোগাবে আরো কিছুদিন।
আমি কাঁইকুঁই করে উঠি, এত জ্বর আমার কক্ষনো হয় না। কি হলো আমার ! মরে যাচ্ছি যে ! আমি মরে যাচ্ছি !
খুব আদরে কদিনের জটাজুটো বাঁধা আমার চুলে চুমু খেয়ে অশেষ হেসে ডাক্তারকে জানায়, আন্টি প্রতি তিনচার বছর পর পর আম্মুর এই জ্বর হয়। ডাক্তার এন্টিবায়োটিক আর টেস্ট দেয়। আম্মু ওষুধ খেয়ে জ্বর সেরে গেলেই টেস্টের কথা ইচ্ছে করে ভুলে যায়। কোনো টেস্ট আর করায় না। ইনফ্যাক্ট টেস্টের কথা মনেই আনে না। তবে এবার দেখছি খুব বেশি কষ্ট পাচ্ছে।
আমি জ্বরতপ্ত শরীরটা অশেষের হাতের উপর ছেড়ে দিতে দিতে শব্দহীন বলে চলি, ভেসে যাচ্ছি। আমি কিন্তু ভেসে চলে যাচ্ছি। অই যে মাঝ নদিতে নৌকা এসে থেমেছে। অই যে সাঁতার ম্যাম চকোলেট, বিস্কিট, দানাদার, জিলিপির সাথে খেলনা পিস্তলের মত কি যেনো লুকিয়ে ফেললো কোমরে। মাঝিটা যেনো মাঝি নয় ! নকশাল দাদার মত লাগলো। দাদা ! নকশাল বলে যে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে গেছিল সেই আমার কোন ছোট্ট বেলায় !
গেলো সন্ধ্যায় জ্বর কমে এলে অশেষ আমাকে মোয়ানা ফিল্মটি দেখতে বসিয়ে দিয়েছিল। আমার যে নিজস্ব একটি নদি আছে ও জানে। আর জীবনভর ফাইট দিতে আমি যে খুব ভালোবাসি ছেলেটা তাও জানে। আমি আধো ঘুমে আধো জাগরণে মোয়ানাকে দেখছিলাম আর উদ্দীপ্ত হয়ে নিজেই বলছিলাম, আই এম রুখসানা কাজল, ডটার অফ দ্যা রিভার মধুমতি! সিস্টার অফ এ পলাতক নকশাল। এইসব জ্বরটরে আমার কিচ্ছু হয় না, হয় না ----
কে যেন ভারি গলায় অশেষকে বলে, এবার সবগুলো টেস্ট করিয়ে ফেলো বুঝলে। আমি এখন ঢাকায় আছি কিছুদিন। জোর করে না করলে তোমার মা কবেই বা কি করেছে স্বেচ্ছায় !
কে ? কে ? কে ভাই আপনি ? ছেলের কাছে আমার গুপ্তী খুলে মেলে দিচ্ছেন ! চোখ খোলার আপ্রাণ চেষ্টা করেও আমি পারি না। আমার চোখের আশেপাশে অসংখ্য নদি নালা। তাতে ধাপ বেঁধেছে কচুরিপানার দাম। কিছুতেই সে ভার সরিয়ে আমি তাকাতে পারছি না। কিন্তু কে এই মানুষটা ? অশেষকে সাহস দিয়ে আমার সেবা করে চলছে ! আমার পায়ের, মাথার জলপটি বার বার বদলে দিচ্ছে অসীম মমতায়!
বাঁহাতের উপর মাথা রেখে কঁকিয়ে উঠি ব্যাথায়, ও মাগো। বাবাগো। মরে যাচ্ছি গো। আমি মরে যাচ্ছি।
ঘরসুদ্ধ সবাই হেসে ওঠে। সেই ভারি গলা অশেষকে বলে, একেই বলে ঠেলায় পড়ে বাঘের ধান খাওয়া বুঝলে অশেষ। তোমার মা সেই ছোটবেলা থেকে এরকম। মারকুটে। দাঙ্গাবাজ। তা এখন কেমন লাগছে মাতঙ্গিনী রুখসানা?
আমি চোখ মেলে তাকাতে চাই। এই কন্ঠস্বর আমার শৈশব মনে পড়িয়ে দিচ্ছে। সেই যে রাত দুপুরে, ভর বিকেলে, ভোরের আজানের আগে যখন তখন পুলিশ আসত আমাদের বাসায়। দাদাকে খুঁজে পেতে সারা বাড়ি, বাগান, তছনছ করে ফেলত। স্টোর রুমে রাখা চালের বস্তা, আলুর ঝাঁপি খুলে ফেলে পেঁয়াজ রসুনের মাচান ভেঙ্গেচুরে একাকার করে চলে যেত। সব মনে পড়ে যাচ্ছে।
কিন্তু আমি চোখ মেলে তাকাতে পারি না। কচুরিপানার শিকড় আর নালে জড়াজড়ি হয়ে গেছে আমার চুল। দূর নদির ঘ্রাণ ভেসে আসছে। নদি ডাকছে গুমগুম করে । কঠিন ভৈরবী বাজছে সে সুরে। আমি ভেসে যাচ্ছি সেই ভৈঁরো সুরের মায়া ঝরা পথে। আরো একটি বাঁক। সেটা পেরুতে পারলেই হাতের কাছে সোনারঘাট। সেখানে লাল পতাকা হাতে বাপি বসে আছে। বাপির পাশে দাদা। দাদার দুপাশে মা আর সাঁতার ম্যামসহ আরো কত জন !
হঠাত রক্ষীবাহিনীর কমান্ডরের মুখের মত হয়ে যায় আমার লস্ট হাসব্যান্ডের মুখ। সাফল্যের শেষ মুহুর্তে বরাবরের মতই রুক্ষ কঠিন স্বরে সে হেঁকে ওঠে, ফায়ার !
মুহুর্ত মাত্র ! প্রতিটা কচুরিপানার ধাপ ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে নদিতে। এক সময় একটি ধাপ থেকে মরণ চিৎকার ভেসে আসে। সুমিত্রাদি। একবার ভেসে ওঠে আবার হারিয়ে যায় কচুরিপানার বনে। পানিতে ঘূর্ণি ওঠে লাল হয়ে যায়। তারপরেও দুজন সৈনিক না থেমে ঠা ঠা করে গুলি চালিয়ে যায়। আমরা, ম্যাম আমাদের সাঁতার ম্যাম বলে জলপুলিশের নৌকায় ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে কাঁদতে থাকি। কেউ কেউ সৈনিকদের পায়ের ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে চিৎকার করে উঠি, ম্যাম ম্যাম , এই যে আমরা । হাত ধরুন ম্যাম ! ম্যাম----
সৈনিকরা আলুর বস্তার মত আমাদের সবাইকে নৌকার মাঝখানে জড়ো করে রেখেছে। ভেজা গা । খালি পা। এ ওর গায়ের সাথে লেপ্টে চেপ্টে কাঁপছি আর কাঁদছি। বিধ্বস্ত নদি। বিধ্বস্ত কচুরিপানার দল। এলোমেলো হয়ে স্রোতে ভেসে যাচ্ছে বড় নদির বুকের গভীরে । আমরা কাঁদতে কাঁদতে ঢিকসি তুলে বলি, ম্যাম মরে যাচ্ছে। আমাদের সাঁতার ম্যাম বড় নদিতে ভেসে যাচ্ছে । ও রাইফেল কাকুরা আপনারা ম্যামকে বাঁচান। আমাদের ম্যামকে বাঁচান প্লিজ!
ধ্যাড়াঙ্গে এক সৈনিক রাইফেল নামিয়ে কমান্ডারকে জিগ্যেস করে, লাশ কি তুলে আনব স্যার ?
নো । কমান্ডার লাল গামছা মাথায় বেঁধে রাখাল রাজা সেজে উত্তর দেয়, রিপোর্টবুকে লিখে রেখো, সফল খতম বাট নো ট্রেস। আমরা পিকনিক করতে এসেছিলাম।
বাট এই বাচ্চারা স্যার ---
কমান্ডার রঙ ছোপানো সুন্দর বিকেলকে কাঁপিয়ে হেসে ওঠে। কমান্ডারের মুখটা কেমন ফ্যাঁকাসে । অপুরুষ ফর্সা রঙের। আমি জানি এরকম মুখে হাজারবার চুমু খেলেও এই মরা রঙের কোনো খোলতাই হয় না। পানসে। জলশীতল মীন স্পর্শ। অথচ বেদম স্মার্ট। আর্টিফিসিয়াল সুন্দর দেখতে কমান্ডার লোকটা এক পায়ে একটি খালি ড্রাম টেনে তার উপর বসে মুড়িমাখানো হাসি হেসে বলে, ওরা ভুলে যাবে। ভয়ে একটু পরেই জ্বর আসবে সবার। ফেবুলেসলি হাই ফিভার। আবোল তাবোল বকবে। জ্বর থাকবে সাত থেকে পনেরো দিন। তদ্দিনে ওদের ঘিলু ধুয়ে ফকফকা হয়ে যাবে। মেমরি পুড়ে মিষ্টি আলুর মত তুলতুল হয়ে যাবে। বাচ্চা্রা তখন নিজেরাই গল্প বানাবে, রাইফেল কাকুরা খুব ভালো। আমরা ভেসে যাচ্ছিলাম ওরা এসে বাঁচিয়েছে। আর সাঁতার ম্যাম আমাদের পানিতে ফেলে কোথায় যেন পালিয়ে গেছে। কি বাজে এই সাঁতার ম্যাম। ম্যামকে কুমিরে খেয়ে নিলে খুব ভালো হয়।
সৈনিকরা তাই শুনে ঠা ঠা করে হাসে। ওদের দাঁতগুলো ওদের কোমরে ঝুলানো পেতলরঙ্গা বুলেট মালার মত পরিপাটি, সাজানো ঝকঝকে। ওরা সুর করে গেয়ে ওঠে, জোরসে বলো, তালে বলো, আরে প্রাণে বলো, সবাই বলো, তোমার বাড়ি আমার বাড়ি নকশালবাড়ি নকশালবাড়ি।
কমান্ডার দু হাতে চুটকি বাজিয়ে তালি দিয়ে পা নাচায়। তারপর দুঃখ দুঃখ ভাব করে আমাদের পাশে এসে বসে। আমার ভেজা চুলগুলো জোরে টেনে দিয়ে অন্যদের চুলও টেনে দেয়, বাচ্চুরা তোমরা তো জানো, বড় নদি থেকে একটি কুমির ঢুকে পড়েছিলো এই নদিতে। মানুষখেকো কুমির। ইসস তোমাদের সেফ করতে পারলাম। কিন্তু তোমাদের সাঁতার মিসকে বাঁচাতে পারলাম না। সো স্যাড বাচ্চুরা। প্রে ফর হার।
ততক্ষণে আমাদের চোখ বুজে আসতে শুরু করেছে। গা তেতে উঠছে জ্বরে। সবকিছু কেমন লাল লাল দেখতে লাগছে। আবার তার সাথে হঠাত প্রচন্ড ঠান্ডাও লাগতে শুরু করেছে। জ্বর তপ্ত কানে শুনতে পেলাম কে জেনো বলে উঠলো, স্যার চারু মজুমদার ধরা পড়েছে ক্কত দিন আগে। এনকাউন্টারে তার মৃত্যুও হয়ে গেছে। খবরটি যদি সত্যি হয় তো এরা এখনো কিসের আশায়---
কড়া তামাকের গন্ধে অদ্ভুত ভালো লাগায় ভরে যায় জলপুলিশের লঞ্চ। আরামে মাথা খুলে খুলে ভেসে যাচ্ছে আকাশে বাতাসে। আমি গাইছি। হাসছি। ছড়া বলছি। অন্যরাও খুশি খুশি। তারা চেঁচাচ্ছে। গাইছে, হাসছে। এরম করতে করতে আমরা নেতিয়ে যেতে থাকি। ফেবুলেসলি হাই ফিভারে আমরা শুয়ে পড়ি জলপুলিশের লঞ্চের পাটাতনে।
কারা যেনো ত্রস্তে আমাদের কোলে করে নিয়ে যাচ্ছে। কে যেনো নিজের শার্ট খুলে আমাকে পেঁচিয়ে ভালো করে ঢেকে ঢুকে দিয়ে চেঁচিয়ে ডেকে উঠলো, বড়কাকা বুনুর যে অনেক জ্বর। বাসায় নেবো, নাকি ফার্মেসিতে নিয়ে যাবো ?
আমি যেতে যেতে দুহাতে ফ্রকের কোণা মুচড়ে, চৌকি দিয়ে বানানো মঞ্চে পায়ে তাল ঠুকে, গলা উঁচু করে মাইক্রোফোনের ফুটো ফুটো রূপালি ঠোঁট ছুঁয়ে বলি, আমার নাম রুখসানা কাজল। আমি এখন একটা ছড়া বলব। বলি ?
উঠোন জুড়ে মা, চাচি, ফুফু, মাসি, কাকিরা ফুরফুর করে হেসে হাত দোলায়, আচ্ছা আচ্ছা বল্‌ বল্‌। তাড়াতাড়ি বলে ফেল বাপু। তোদের ন্যাংটোপোংটোদের আসর শেষ হলেই হেমন্তের গান শোনাবে বরুণ। ও বরুণ অনেকগুলো গান গাবি কিন্তু ভাই! থামবি না মোটেও। ফাঁকি দিলি কিন্তুক মার আছে তোর কপালে এইবেলা বলে রাখলাম!
ষ্টেজের পাশ থেকে মাথায় গাট্টা মারার ভয় দেখিয়ে আপুলি বলে, এক্কেরে এক মিনিট তোদের জন্যে। মনে থাকে যেনো। তোর পরে নাজমা ছড়া বলবে। নাজমা কই রে ! এই নাজমা এদিকে আয় এখুনি। লাইনে দাঁড়িয়ে থাক। যা, জলদি যা --
আমি হাত দুলিয়ে নদি বানাই, লাফিয়ে লাফিয়ে নদি পেরুই আর ছড়া বলতে থাকি, এ নদিতে কুমির নাই, হাপুসহুপুস নেয়ে যাই। হাপুসহুপুস নেয়ে যাই, এ নদিতে কুমির নাই। জোরসে বলো, তালে বলো, সুরে বলো, প্রাণে বলো, জানে বলো, সবাই বলো, জলদি বলো, তোমার বাড়ি আমার বাড়ি নকশালবাড়ি নকশালবাড়ি----