বালুঘড়ি

নিবেদিতা আইচ

এক।।

ধৃতিমান ভাবছে আজ একবার লবণের চরে যাবে। লবণের চর খুব দূরে নয়, হেঁটে গেলে পনেরো মিনিট, রিক্সায় পাঁচ মিনিট। একটা সময় ধৃতি দৌড়ে দৌড়েও যেতো। জায়গাটা কি আর আগের মতো আছে! সময়ের চোরাস্রোতে গন্তব্য আর পথ কত সহজে আমূল বদলে যায়। লবণের চরে এখন মাল্টিস্টোরেড বিল্ডিং দেখতে পেলেও অবাক হবার কিছু নেই।
কাছে কোথাও ঝাঁইঝমাঝম গান বাজছে। বহুবছর এসবের অভ্যেস নেই ধৃতির। কিন্তু আগেও এমন হতো। লাউড স্পিকারে গান ছেড়ে পূজার আনন্দ শুরু হতো ছেলেদের।
মিহিদানা রোদ বিছানো ছাদে খালি পায়ে হাঁটতে আরাম লাগে ধৃতির। অনেক গাছ লাগিয়েছে মা। গতবার এসব দেখেনি। সত্যিই কত দ্রুত সবকিছু বদলে যায়! তারও আগে, বহু আগে তো রেলিং ছিল না এই ছাদে। দিদিরা দুপুরে বরফপানি খেলতে এসে রোজ কানমলা খেতো। 'আয় ঠ্যাং আমিই ভাইঙ্গা দিই' বলতে বলতে ঘাড় ধরে সবাইকে নিচে নামাতো মা।
মা বড় দাপুটে ছিল। চৌধুরী বাড়ির যোগ্য কর্ত্রী। আজকাল বয়সের ভারে ক্লান্ত হয়ে গেছে এই যা। ধৃতিমানের বাবা চিত্তরঞ্জন দে চৌধুরীও ভীষণ উদ্যমী আর আমুদে লোক ছিলেন। একটা উপলক্ষ পেলে সমস্ত আয়োজনের ভার নিজের কাঁধে নিয়ে নিতেন। প্রতিবছর দুর্গাপূজার সবকিছু একাই সামলাতেন তিনি। ওরকম করিৎকর্মা লোক আর আজকাল দেখা যায় না। ধৃতিমান কিংবা তার ভাইবোনের কেউই এই গুণটি পায়নি।
সকালবেলা রোয়াকে বসে সরোজিনী দে চৌধুরী ছেলেকে এই কথাগুলোই বলছিলেন। বছর সাতেক পর গতকাল রাতে ধৃতিমানের সাথে মায়ের দেখা হয়েছে। এসব প্রসঙ্গ চলে আসা তাই খুব স্বাভাবিক। ছেলেকে কাছে পেয়ে আবেগে গলা কাঁপে সরোজিনীর।
অলক নাই, সব দায়িত্ব আমার একার!
মেঝদা তো রয়েছে..দিদিরাও আছে।
তুই, রনো সবাই এক। অলকটা একটু বুঝদার ছিল, ঠাকুর নিয়ে গেলেন...
ধৃতি নিরুত্তর বসে থাকে। অভিযোগটা মিথ্যে নয়। ওদের মতো বড়দা অলকেশ দে চৌধুরী এতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন ছিল না। বরং মায়ের ভীষণ অনুগত ছিল। হার্টের রোগটা ঠিক মতো ধরা পড়বার আগেই তাড়াহুড়ো করে চলে গেছে মানুষটা।
কিন্তু ধৃতি বুঝতে পারে না মায়ের একা একা এত ঝক্কি পোহাবার দরকারটাই বা কী! প্রতিবছর ঘটা করে পূজা করতেই হবে! তবে কথাটা কখনো মুখ ফুটে সে বলতে পারেনি। বহু বছরের রেয়াজ ওর একার ইচ্ছায় যে বন্ধ হবে না তা ঠিক অনুমান করা যায়। সরোজিনী দেবী যতদিন আছেন এই পূজা ধুমধাম করেই হবে।
বাড়ির পূজা! বাবুরে তো আনতে পারতি।
ধৃতির ভাবনার সুতো কেটে যায় মায়ের কথায়। তবু ভালো মা এখনো অণুর কথা জানতে চায়নি।
তোমার বাবুর এখন আঠারো হয়ে গেছে মা, সে আমার কথা শুনবে কেন!
বাবু কত লম্বা হইছে রে?
আমার কাঁধ ছাড়িয়েছে অনেকদিন আগে।
এত ব্যস্ত কেন সে? আসলে বুড়ির হাতের পায়েস খাইতে পারতো।
বাবু খুব স্টাবর্ন! বলতে গিয়েও বললো না ধৃতি। বললো
-বন্ধুদের সঙ্গে ক্যাম্পে যাবে বলে আসতে চাইলো না।
বউয়ের কি তার মাবাপকেও দেখতে ইচ্ছা করে না? নাকি চুপেচাপে দেখে যায় তাদের?
না সেরকম কিছু নয়। ওরও ব্যস্ততা আছে।
অণুর প্রসঙ্গটা অস্বস্তিকর। বরাবরই নিজের মতো থাকতে চেয়েছে সে। অণুর ব্যাপারে তাই বেশি কিছু বলতে চায় না ধৃতি। মা হয়তো বুঝতে পারে। স্নান আহ্নিকের সময় বলে উঠে পড়ে ওখান থেকে।
সত্যি বাড়িতে এখন অনেক কাজ। কাল ষষ্ঠীপূজা। সেসবের যোগাড়যন্ত্র করতে হবে। এবছরের পুজোটা ব্যতিক্রম। সরোজিনী দেবী এবার সবাইকে বাড়িতে আসার জন্য একমাস আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন। ধৃতি ব্যস্ততার জন্য সময় করতে পারবেনা বলেছিল। কিন্তু ফোনে মায়ের গলাটা অন্যরকম শোনাচ্ছিল। এমন জরুরি তলবের কারণটা জানতে পারেনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধৃতিমান চলে এলো এবং একাই এলো। অণু ওর অফিস থেকে ছুটি পায়নি। তাছাড়া এত হৈ হুল্লোড় ওর পছন্দও নয়।
ধৃতি সবার সঙ্গে দেখা করবার লোভটা সামলাতে পারেনি। তবু বড়দির সঙ্গে এবার দেখা হবে কিনা ঠিক নেই। ওর বাড়িতেও নাকি দু'বছর ধরে পূজা হচ্ছে। মেঝদি আসবে সপ্তমীর দিন। সবার ছোট অলি আর মেঝদা রণজিৎ দে চৌধুরী একসঙ্গে ঢাকা থেকে আজ রওনা দেবে।
দুপুরে ভরপেট খেয়ে চোখ লেগে এসেছিল ধৃতিমানের। ঘুম ভাঙলো মিষ্টি একটা ডাকে। দূর থেকে মনে হলো বুঝি অলি দাঁড়িয়ে আছে। চোখ কচলে তাকাতেই বুঝতে পারলো অলির মেয়েটা কত বড় হয়ে গেছে! হাতের ইশারায় ওকে কাছে ডাকলো ধৃতিমান।
এসে টুক করে পা ছুঁয়ে পালিয়ে গেল মেয়েটা। হাসি পায় ধৃতির। অলিও এরকম বেড়ালের মতো নিঃসাড়ে চলাফেরা করতো। বড়দা নাম দিয়েছিল মিনিবিড়াল, সংক্ষেপে মিনি। অলি রেগে যেতো ওকে এই নামে ডাকলে।
মেঝদার সঙ্গে তখুনিই দেখা হলেও অলির সঙ্গে দেখা হলো রাতে। বাড়ি আসা অব্দি মায়ের সাথে মন্ডপের কাজে ব্যস্ত ছিল অলি। রাতে খাবার টেবিলে বসতেই এসে হাজির হলো। কতদিন পর ভাইবোনের দেখা! ওকে জোর করে করে খাওয়ালো অলি।
তুই বড্ড রোগা হয়ে গেছিস রে দাদা!
আর তুই পাকা গিন্নী!
না হয়ে উপায় আছে? মেয়ের বিয়ে দিতে হবে ক'দিন বাদে ! এই দেখ মাথার চুল কতখানি পেকেছে।
এত জলদি বিয়ে দিবি?
কলেজটা শেষ করুক, দিয়ে দেব।
হ্যাঁ রে মিনি, তোর মেয়েকে দেখে আমি তো প্রথমে তোর সাথে গুলিয়ে ফেলেছি!
আবার ওই নাম?
দাদার পিঠে একটা কিল বসিয়ে দেয় অলি৷ ধৃতির ভালো লাগে এই খুনসুটি। অলি বদলায়নি। নইলে এতগুলো বছরের অদেখায় সবাই কেমন অচেনার মতো হয়ে গেছে বলে মনে হয়। মেঝদা তো কেমন কাঠ কাঠ হয়ে আছে তখন থেকে। মা কেন জরুরি তলব করেছে সেটাই জিজ্ঞেস করছিল বারবার। এর বাইরে কিছু জানতে চায়নি। বাবুর কথা জিজ্ঞেস করেছে একবার,তাও শুধু সৌজন্যের খাতিরে। ধৃতি অবশ্য কখনো এসবের ধার ধারেনি। কিন্তু এবার বাড়ি এসে একটু মন খারাপের মতো হচ্ছে। ধৃতির মনে হয় সে এ বাড়ির অতিথি, সবকিছু থেকে দূরে সরতে সরতে কবে যেন বাইরের কেউ হয়ে গেছে সে।

দুই।।

ধৃতিকে ঝুঁকতে দেখে সরোজিনী চিলচিৎকার দিয়ে ওঠেন। সবাই চমকে তাকায় সেদিকে।
ছুঁইস না খোকা, আগে স্নান কইরা আয়।
ধৃতি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অলি ছুটে এসে পঞ্চপ্রদীপটা সরিয়ে নিয়ে যায়। যাবার আগে তাড়া দেয় - শিগগির স্নান করে আয় দাদা, অঞ্জলি দিবি।
ধৃতির মনে ছিল না। বহু বছর ধরেই অষ্টমী পূজার দিন চৌধুরী বাড়ির মন্ডপে প্রচন্ড ভিড় হয়। অঞ্জলি দিতে পাড়ার লোকজন সব এখানে চলে আসে।
মেঝদি একবার ডেকে গেছে ওকে। খোলা দরজা দিয়ে উঠোনের উল্টোদিকে মন্ডপটা দেখা যায়। খুব ভিড়। ধৃতি দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে আসে। এত হইচই ভালো লাগছে না।
সকালে একবার বাবুর সঙ্গে কথা হয়েছে। সবসময় ভ্রু কুঁচকে কথা বলে ছেলেটা। ধৃতি জানে ফোনের ওপাশে ওর চোখেমুখে বিরক্তি ছিল। বাড়ির গল্প শোনায় আগ্রহ নেই ওর।
সবাই তোর কথা জানতে চাইছে বাবু।
টেল দেম আই অ্যাম ড্যাম বিজি।
তুই পূজায় কত মজা করতিস মনে আছে? আরতি শেষ হবার পরেও তোর নাচ থামানো যেতো না!
আই ওয়াজ এ কিড!
তুই সত্যি এনজয় করতি এবার এলে। দুই সপ্তাহের জন্য কী এমন ক্ষতি হয়ে যেতো?
কাম অন বাপী স্টপ ন্যাগিং লাইক মা। কিছু বলার থাকলে বলে ফেলো!
কিছু আনবো তোর জন্য?
হোয়াটেভার ইয়্যু লাইক! জাস্ট কাম ব্যাক সুন, আই নিড টু টক টু ইয়্যু! কবে ফিরবে তুমি?
এক সপ্তা পর। তোর ঠাকুমার সাথে একটু কথা বলবি, ডেকে দিই?
ওহ প্লিজ! নট নাউ! রাখছি এখন। বাই।
সারাক্ষণ তাড়াহুড়ো ছেলেটার। নিজস্ব একটা কক্ষপথ বেছে নিয়ে সেটা ধরেই ছুটছে৷ ঘরে মন নেই ওর। শুধু ওর একার দোষ নয়। জ্ঞান হবার পর থেকেই দেখেছে বাবামা ঘরবাড়ি ছেড়ে বিদেশবিভুঁইয়ে পাড়ি দিয়েছে। নাড়ির টান সম্পর্কে কোনো ধারণাই হলো না ওর। এবাড়ির উঠোনে ওর নাড়ি পোতা আছে, বাপ জ্যাঠাদের মতো। তাতে কী! বাবা যেমন ঘর ভুলেছে বাবুও তাই করছে এখন।
ফোন রেখে ধৃতি টের পায় অলির ছোট ছেলেটা ভেতরে এসে বসেছে। খুব মিশুক হয়েছে সোনাই। প্রথম দেখায় এসে হাত ধরে বলেছে- তোমার পকেটে কী আছে?
বাবুও এমন ছিল ওই বয়সে। সবকিছুতে কৌতূহল। বড় বড় চোখের পাতায় রাজ্যের প্রশ্ন।
ভাগ্নেকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ে ধৃতি। হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে খুব পরিচিতের মতো গল্প করে দু'জন।
এখন কোন ক্লাসে পড়িস?
ক্লাস টুতে।
তোর ভালো নাম কী রে?
সুপ্রভাত মজুমদার।
বাহ্ খুব সুন্দর নাম তো!
থ্যাঙ্কিউ! বাবা রেখেছে। আর মা রেখেছে সোনাই।
এই নামটাও মিষ্টি। তুই আমাকে চিনিস, সোনাই?
হুম,চিনি তো!
বল দেখি আমি কে?
তুমি ছোটমামা৷ লন্ডনে থাকো।
আমার কথা আর কী কী জানিস?
তুমি মস্ত বড় ডাক্তার।
কে বলেছে তোকে?
সবাই বলে, মা বলে, দিদা বলে। আমিও তোমার মতো ডাক্তার হবো একদিন।
ধৃতিমান ভাগ্নের মাথায় হাত রাখে। বাবুর ছোটবেলা মনে পড়ছে। ছেলেটা কখনো ডাক্তার হতে চায়নি। বাবার মতো হতে চায়নি কখনো।
তুমি কি পুজো দেখতে এসেছো ডাক্তার মামা?
হ্যাঁ রে, পুজোয় কত মজা হয় তাই না?
হুম খুব মজা।
তুই আরতি করতে পারিস?
খুব পারি কিন্তু মা দেয় না, ধূপের আগুণে হাত পুড়বে বলে বকা দেয়। কিন্তু নাচতে আমার খুব ভালো লাগে।
আজকে আরতির সময় তুই নাচবি। মাকে আমি বকে দিব।
সোনাই ফোকলা দাঁতে হাসে। ওর হাসি দেখে ধৃতির আরেকবার মনে হয় বংশগতির সূত্রটা কত নির্ভুলভাবে বয়ে চলেছে। বাবুর সাথে সোনাইয়ের কোথাও একটা মিল আছে। প্রথমবার দেখে সেটা বুঝবার উপায় নেই। কিন্তু মিল আছে নিশ্চিত।
সোনাইকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগছে ধৃতির। আপনমনে বকবক করছে ছেলেটা ।
আমরা কোথায় যাচ্ছি?
তুই কাশফুল চিনিস?
উম্ কখনো দেখিনি কিন্তু বইতে পড়েছি।
বইতে কী পড়েছিস?
একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা।
আজকে তোকে সেই কাশবন দেখাবো৷

অলি হয়তো ওদের লবণের চরে নিয়ে যায়নি কখনো। নইলে কাশফুল ওর চেনার কথা। আজকাল বোধ হয় সব বাবামাই বাচ্চাদের এমন ঘরকুনো করে রাখছে। লবণের চর আবিষ্কার করার আনন্দ এদের জানার কথা নয়।
সোনাইয়ের হাঁটার গতি কমে এলে ধৃতি ওকে কোলে তুলে নেয়। সাথেসাথেই হাত পা ছুঁড়ে আপত্তি জানায় ছেলেটা।
কী হলো তোর?
ছেড়ে দাও আমাকে, আমি হাঁটতে পারি।
দূরে সাদা রঙের মুকুট পরা সবুজ রেখাটা দেখতে পেয়ে সোনাই আঙ্গুল তুলে দেখায়- একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা!
সেদিকে তাকিয়ে ভীষণ অবাক লাগে। কী আশ্চর্য! লবণের চর ছোট হয়ে এলেও কাশবন আগের মতোই আছে। ধৃতির ভেতরের বালক মনটা সঙ্গে সঙ্গে ছুট দেয় সেদিকে।
সারাবছর এই কাশফুলের অপেক্ষায় থাকতো ধৃতি। মাসের হিসেব রাখা ওই বয়সে কঠিন ছিল। স্কুলে যাবার পথে এই চরের বুকে কাশফুল ফুটতে শুরু হলে ধৃতি টের পেতো আশ্বিন মাসে সমাগত। ফুরফুরে হাওয়া পেঁজা তুলো মেঘ উড়িয়ে নেবার সময় ওর চুলেও বিলি কেটে দিয়ে যেতো। কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হতো নতুন জামাকাপড় কেনার ধুম, ভাইবোন মিলে দর্জির দোকানে গিয়ে মাপ দিয়ে আসা। তারপর বহু প্রতীক্ষিত ঢ্যাম কুড়কুড় ঢাকের শব্দ, চণ্ডী পাঠ! বড় মিষ্টি ছিল সেসব দিন।
তিন।।
বিজয়ার পরদিনই সরোজিনী ধৃতিকে ডেকে ওর রেখে যাওয়া জমির কাগজপত্র বুঝে নিতে বললেন। হঠাৎ এই প্রসঙ্গ কেন এলো ধৃতি বুঝতে পারছে না। এর আগেও বহুবার বললেও প্রতিবারই নানা অজুহাতে এড়িয়ে গেছে সে। এসব ব্যাপার ওর বড্ড ঝামেলার বলে মনে হয়।
বড়দা আর মেঝদা তাদের ভাগের জমিজমা আরো আগেই বুঝে নিয়েছিল। চিত্তরঞ্জন মৃত্যুর আগে ছেলেদের জন্য উইল করে গিয়েছিলেন। সে বছর ধৃতি ডাক্তারি পাশ করেছিল। সেসময় নিজের চাকরি নিয়ে ব্যস্ত ছিল বলে সম্পত্তি নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় পায়নি সে। কিন্তু মা এবার নাছোড়বান্দা। তিনি একা বহুবছর সামলেছেন, আর পারছেন না। তাই এবার কোনো যুক্তিতর্কের কথা শুনলেন না।
এসব কথা শেষ করে সরোজিনী নিজের গয়নার বাক্স খুলে বসলেন। পুরনো গয়নাগুলো তিন মেয়ে আর ছেলের বৌদের ভাগ করে দিলেন তিনি। অণু নেই তবু সেও একজোড়া ঝুমকা আর একটা সীতাহার পেলো।
এই ব্যাপারটির জন্য ধৃতিমান মোটেও প্রস্তুত ছিল না। বড়দি,মেঝদি বোধ হয় খুশি হয়েছে। অলির মুখ দেখে কিছু অনুমান করা যাচ্ছে না। কিন্তু মেঝদা বেশ খোশমেজাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে । হয়তো তার সদিচ্ছাতেই এত তাড়াহুড়ো করেছে মা।
অলি খুব ব্যস্ত। ওরা আজ বিকেলে ফিরে যাবে। সোনাই আরো কিছুদিন থাকবার জন্য বায়না করছে। ভাগ্নের হয়ে সুপারিশ করেছে ধৃতি, তাতে খুব একটা লাভ হয়নি। অলি গোছগাছ করতে বসে গেছে।
তোর মনে আছে মিনি, বিজয়ার পরে তোর প্রতিবারই পেট ব্যথা হতো?
তা হবে না কেন পেট ব্যথা! বছরে একবার মাত্র মামাবাড়ি যেতাম, অত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে হতো?
বলছিস? তাহলে এবার সোনাইয়েরও পেট ব্যথা হোক!
উফ! দাদা তুই আগের মতোই আছিস!
অলির হাসিটা কেমন ছেলেমানুষের মতো দেখায়। ধৃতির খুব ইচ্ছে করে সেই দিনগুলি ফিরে পেতে। মেঝদা তখন এত গম্ভীর মানুষ ছিল না। অলিকে কথায় কথায় কাঁদানো যেত। বড়দা এসে সবার হল্লা থামাতো। মা ভীষণ ব্যস্ত থাকতো মন্ডপের কাজে। তখন ওদের নাওয়া খাওয়ার দায়িত্ব নিতে হতো বড়দিকে। একই পাতে ভোগের প্রসাদ নিয়ে বড়দি মুখে তুলে খাইয়ে দিত ওদের।
তোর ঘরে মা একটা স্যুটকেস দিয়ে গেছে। দেখিস দরকারি কিছু আছে কিনা।
অলির কথা শুনে ধৃতি ঘরে গিয়ে স্যুটকেসটা খুলে বসে। অনেক পুরনো জিনিস ওটা, কলেজ লাইফে বড়দা কিনে দিয়েছিল। তেমন দামী কিছু নেই। শুধু কিছু পুরনো চিঠি পাওয়া গেল, নষ্ট হয়ে যাওয়া ছবির অ্যালবাম আর একটা হারমোনিকা। এটা ধৃতি নিজেই কিনেছিল ফুটপাথ থেকে। কবে কখন তা অবশ্য এখন আর মনে পড়ছে না।
'এই মেঘলা দিনে একলা' সুরটা ছিল সবচেয়ে প্রিয়। ধৃতি সেটাই বাজানোর চেষ্টা করে কয়েকবার। টের পায় অনভ্যাসে সব হারিয়ে যাচ্ছে।
অলি এসে বিছানায় বসেছে। সোনাইও এসেছে মায়ের পিছু পিছু। ধৃতিমান চোখ মেলে ওদের দেখতে পায়।
থামলি কেন? ভালো লাগছিল শুনতে।
আমার তো বেসুরো লাগছিল।
দাদা তোর নিরুর কিথা মনে আছে? আমার সাথে স্কুলে পড়তো!
ধৃতির চট করে মনে পড়ে না। নিরু মানে নিরুপমা নামে একটা মেয়ে ছিল ওর বন্ধু। বোধ হয় ধৃতির প্রতি কিছুটা আগ্রহও ছিল তার।
মনে নেই? নিরুপমা দাস, দুই বেনী, চোখে চশমা?
এবার মনে পড়েছে! কেন বলতো? তার কী হয়েছে?
তার আর কী হবে! ভালো আছে। ঢাকায় নিজের বাড়ি গাড়ি সব আছে, বর বিজনেস টাইকুন। তোর বাজনা শুনে ওর কথা মনে পড়ছে।
বেশ! সুখে থাকুক সবাই।
এই দাদা, জানিস কদিন আগেও একবার দেখা হয়েছিল ওর সঙ্গে। যাবার আগে তোর কথা ঠিক জানতে চাইলো। তোর মনে আছে সেবার সিঁদুর খেলায় কেমন রঙ লাগিয়ে দিয়েছিলি? মা খুব বকেছিল।
ধৃতিমান মৃদু হাসে। অলিটা বরাবরই এমন। কিচ্ছু ভোলে না। এতকিছু ধৃতিও মনে রাখেনি। হঠাৎ আগল খুলে যাওয়ায় এবার নতুন পয়সার মতো ঝকঝক করে উঠছে স্মৃতির ফুলঝুরি।
এটা আমায় দেবে? দাও না প্লিজ!
বলতে বলতে ওদের কথার মাঝখানেই সোনাই হাত বাড়িয়ে দিল। অলি চোখ রাঙালেও সেদিকে খেয়াল নেই ছেলেটার। ধৃতি হাসিমুখে হারমোনিকাটা দিয়ে দিল ওকে। অলি বাঁধা দেবার আগেই সোনাই একদৌড়ে পালিয়ে গেল ওখান থেকে।
ওটা বাবুর জন্য রেখে দে দাদা।
দাদার কাঁধে হাত রাখে অলি। ধৃতির বড় ভালো লাগে এই ছোঁয়াটা। মনে মনে আশা করে অলি আরেকটু থাকুক।
জানালার বাইরে চোখ রাখে ধৃতি। একটা ছেলে উঠোনের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটছে। মাঝেমাঝে হারমোনিকায় এলোমেলো সুর তুলছে । দূর থেকে দেখে কখনো ওকে সোনাই মনে হয়, কখনো আবার ওকে বাবুর মতো দেখায়। একটু পরেই মনে হয় ওটা আর কেউ নয়, ধৃতিমান দে চৌধুরী, এ বাড়ির ছোট ছেলে।
আমি ওটা রেখে যাবো,তুই মনে করে ব্যাগে ভরে নিস।
আহ্ অলি! ওটা থাকুক না সোনাইয়ের কাছে। বাবুর হারমোনিকার দরকার নেই। এত সময় কোথায় ওর!
অলি জানেনা ওখানে কাশবন নেই। নিরুর মতোও কেউ নেই । বিসর্জনের পরে বাড়ি ফেরার সময় হাত ধরে কেউ বলে না- আমায় মনে রাখবে তো? কারো বুকের গোপন কুঠুরিতে বালুঘড়ির অন্যপ্রান্তটাকে ফিরে পাবার আকুলতা নেই ওখানে।
বেলা গুটিয়ে আসে। ধৃতির চোখের তারায় মৃদু ধূসরতা খেলে যায়। অলি হয়ত তা দেখতে পায়। অনুচ্চারিত কথাগুলো কান পেতে শুনে নেয়। কিংবা হয়তো শোনে না৷