এক প্রচণ্ড দর্শনীয় খিঁচুনি

অদ্বয় চৌধুরী

‘ভুল’— এই শব্দটি উচ্চারণের পরমুহূর্তেই একটি অবশ্যম্ভাবী অথচ অদৃশ্য ব্যবধানরেখা অঙ্কিত হয়ে যায় যার উল্টো পারে ‘ঠিক’-এর বসবাস। এই ‘ঠিক’ এবং ‘ভুলের’ বাইনারি সিস্টেমের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত অন্য একটি বৃহত্তর সূচক— ইডিওলজি। যারা বা যা কিছু ইডিওলজির কাপুরুষসূলভ অনুগামীত্ব স্বীকার করে না সেই সব নিয়মবহির্ভূত ব্যক্তি বা বিষয় ‘ভুল’ হিসাবে চিহ্নিত হয়। কিন্তু এই ইডিওলজি আসলে এক আরোপিত নিয়মানুবর্তিতা যা থেকে নির্গত হয় সুষম মানবপ্রেমের একপ্রকার ছদ্মসুগন্ধী। যে চিন্তা সুসংবদ্ধ মিছিলের মতো সরলরৈখিক ক্রমানুসারে এগিয়ে চলে না, যে কাজ ট্রাম লাইনের ট্র্যাকের মতো পূর্বনির্দিষ্ট পথে সংঘটিত হয় না তা অবশ্যই ‘ভুল’ যা ইডিওলজি দ্বারা আরোপিত সত্য, সমাজের মায়াবী স্থিতিশীলতা— স্থিতিশীলতার মগ্নতাকে বিদীর্ণ করে প্রসব করে এক বোধ— এক বচন যা প্রতিবাদের, প্রতিরোধের, বিদ্রোহের। এই বচন আকার ধারণ করে সমাজের নিরিখে, তন্ত্রের প্রেক্ষিতে। অতএব, সমাজ ও তন্ত্রের পক্ষে, মানবজাতির পক্ষে ইডিওলজি দ্বারা সৃষ্ট ছাঁচের বাইরে অবস্থানরত সবকিছুই অস্বাভাবিক, অপ্রয়োজনীয়, এমনকি বিপজ্জনক। তাই সজ্ঞানে অথবা অজ্ঞানে সংঘটিত কোনরূপ ‘ভুলই’ কাম্য নয়, বরং ‘সঠিকের’ দ্বারা সেই ‘ভুলের’ প্রতিস্থাপন হয়ে ওঠে একমাত্র উদ্দেশ্য ও অবশ্যকর্তব্য।

অবশ্যপালনীয় কার্যক্রম সুনির্দিষ্ট হয়ে যাওয়ার পরেও অবশেষ রূপে পড়ে থাকে কিছু শাশ্বত অথচ তীক্ষ্ণ প্রশ্ন যা নীরবতার অতল গহ্বরে নিরুত্তর থেকে যায়। মার্ক্সীয় মতাদর্শে এই ইডিওলজি হল এক ‘ফলস্ কনশাসনেস’ বা মিথ্যা চেতনা— বাস্তবতার এক কল্পিত উপস্থাপনা। আবার, সত্য ও মিথ্যা, বাস্তবতা ও মিথ্যা চেতনার শাস্ত্রীয় দ্বন্দ্বের উপরে সর্বাঙ্গীণ নির্ভরশীল এই ইডিওলজি পোস্টস্ট্রাকচারালিস্ ট মতাদর্শ অনুযায়ী এক সর্বগ্রাসী পরিভাষা যা আবশ্যিক রূপে অস্বীকার্য। এই রূপে ইডিওলজির সারবত্তা ও অস্তিত্বই যখন প্রত্যাখ্যাত, অস্বীকৃত হয়, প্রশ্নহীন মান্যতা হারায় তখন ‘ঠিক’ এবং ‘ভুলের’ আরোপিত ব্যবধানরেখাও ক্রমশ ধূসর হতে হতে একসময় বিলীন হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়া ইডিওলজি দ্বারা আরোপিত সত্য, সেই সত্যের ঝকঝকে মোড়ক ভেদ করে আরও গভীর সত্যের দিকে স্পর্ধিত পদচারণে যাত্রা করে। এই সত্য হল দহ্যমান বাস্তব।

‘ঠিক’ এবং ‘ভুলের’ ব্যবধানরেখার এই ক্রমবিলীয়মান অবস্থার বাস্তব উপস্থিতি দৃশ্যমান হয় গোয়েন্দা কাহিনীতে। যে কোন গোয়েন্দা কাহিনী গঠিত হয় একটি অপরাধ— একটি নৈতিক ভুলকে আবর্তন করে যে ভুল সমাজের স্থিতাবস্থার ভিত্তিমূলে এক ভীতিজনক স্পন্দন জাগায়। এই উদ্ভূত অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সমাজে অসহনীয় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। ঘনায়মান সেই অবাধ্য পরিস্থিতিতে যাবতীয় সামাজিক বুনট ও কাঠামো ধ্বংসই হয়ে ওঠে প্রত্যাশিত এবং অমোঘ। নিয়মবহির্ভূত এই ধ্বংসের যাবতীয় দায়ভার কিন্তু শুধুমাত্র একক ব্যক্তির উপরেই আরোপিত হয়— অপরাধী— যে ব্যক্তি একক ভাবে সেই নৈতিক ভুলের দায়ভার বহন করে। সমাজের বাধ্য আবহাওয়ায় সেই ব্যক্তির ফুসফুস উদ্গীরণ করে চলে শুধুই অমান্যতার বিষ। এই প্রতিস্পর্ধী বিচ্ছিন্নতাকে সুচারু কৌশলে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করে সামাজিক স্থিতাবস্থা পুনঃস্থাপনের মাধ্যম হয়ে ওঠে গোয়েন্দা— বৃহত্তর দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। ‘ভুলের’ বিরুদ্ধে যুদ্ধরত এই গোয়েন্দা অবশ্যই ‘সঠিক’ চিন্তা, কাজ ও আচরণের প্রতিভূ। তার চিন্তা ও কর্মপদ্ধতি অজুহাতহীন ভাবে ন্যায়নিষ্ঠ এবং ‘সঠিক’। কিন্তু বাস্তবে সেই স্বীকৃত ‘সঠিক’ এবং নিষিদ্ধ ‘ভুল’ হয়ে ওঠে অবিভেদ্য। চিন্তাধারা এবং কার্যপদ্ধতির নিরিখে বাস্তবে গোয়েন্দা এবং অপরাধী হয়ে ওঠে একাত্ম— ‘সঠিক’ এবং ‘ভুলের’ ভেদরেখা অবলুপ্তির মাধ্যমে তারা হয়ে ওঠে সমভাবাপন্ন, একে অপরের প্রতিরূপ।

গোয়েন্দা এবং অপরাধীর, ‘ঠিক’ এবং ‘ভুলের’ চিন্তাধারাগত এবং কর্মপদ্ধতিগত সাদৃশ্য এবং অভিন্নতার উদাহরণস্বরূপ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় সৃষ্ট সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সীর একটি গল্পের উল্লেখ করা যায়— ‘সীমন্ত-হীরা’। কুমার ত্রিদিবেন্দ্রনারায়ণ রায় বাহাদুরের কাকা বিখ্যাত শিল্পী এবং বৈজ্ঞানিক স্যর দিগিন্দ্রনারায়ণ রায় সীমন্ত-হীরাটি অন্যায় উপায়ে হস্তগত করেন। ব্যোমকেশের উপর দায়িত্ব ন্যস্ত হয় সেই হীরাটি পুনরুদ্ধারের। গল্পটি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে ব্যোমকেশ এবং দিগিন্দ্রনারায়ণের বুদ্ধির যুদ্ধে। কিন্তু এক সময় গোয়েন্দা এবং অপরাধীর চিন্তাস্রোত একই ধারায় বাহিত হয়। ব্যোমকেশ তার প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতিটি পদক্ষেপ নির্ভুল অনুমানে পাঠ করতে সক্ষম হয়। সেই নির্ভুল অনুমানশক্তির মাধ্যমেই সে মীমাংসা করে ফেলে অপরাধী নটরাজ মূর্তির মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে হীরাটি। সেই মূর্তি সে নিজের দখলেও নিয়ে আসে— সৎ উপায়ে, স্বচ্ছ পদ্ধতিতে। কিন্তু দিগিন্দ্রনারায়ণ ব্যোমকেশের ঘর থেকে পুনরায় মূর্তিটি হাতসাফাই করে। এরপরে অন্তিম পদক্ষেপ হিসাবে ব্যোমকেশকেও অপরাধীর কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করে অনৈতিক হাতসাফাইয়ের মাধ্যমেই হিরাসহ মূর্তিটি হস্তগত করতে হয়। এখানেই ব্যোমকেশ এবং দিগিন্দ্রনারায়ণ— গোয়েন্দা এবং অপরাধী— সম্পূর্ণ রূপে একে-অপরের প্রতিরূপ হয়ে ওঠে। ‘ঠিক’ এবং ‘ভুলের’ সীমারেখা অবলুপ্ত হয়ে যায়।

গোয়েন্দা কাহিনীতে ‘ঠিক’ এবং ‘ভুলের’ সীমালঙ্ঘন সম্ভবত সর্বপ্রথম পরিলক্ষিত হয় এডগার অ্যালান পো’র ‘দ্য পারলয়েন্ড লেটার’ গল্পে। গোয়েন্দা দ্যুপঁ অপরাধী মিনিস্টার ডি -এর চিন্তাধারা এবং কার্যপ্রণালী হুবহু অনুসরণের মাধ্যমে উদ্ধার করে আনে মহারাণীর অতি মূল্যবান চিঠি। সত্যজিৎ রায়ের ‘বাক্স-রহস্য’ গল্পে প্রায় একইরকম পরিস্থিতি উদ্ভূত হয় যখন এয়ার ইন্ডিয়ার অফিসে ফেলুদা তার নকল নীল হাতব্যাগটি এক অজানা ব্যক্তির আসল নীল এয়ার ইন্ডিয়া ব্যাগের সাথে বদল করে। যদিও সেখানে ঐ গল্পের অপরাধীর কর্মপদ্ধতি হুবহু অনুসৃত হয় কি না বোঝা যায় না, বা অপরাধীর সঙ্গেই এই ‘অপরাধ’ ঘটে না, কিন্তু অপরাধ ও অপরাধীর সংজ্ঞা বদলে যায় আমূল। সেই পরিবর্তিত সংজ্ঞার প্রতি নির্দেশ করে জটায়ুর আপাতসরল অথচ অতিমূল্যবান প্রশ্ন নিক্ষিপ্ত হয় যা অবশ্যম্ভাবী ভাবে নিরুত্তর থেকে যায় আত্মমগ্ন গোয়েন্দা প্রদোষ মিত্রের থেকে:
“আচ্ছা মিস্টার মিত্তির, খুব ভালো গোয়েন্দা আর খুব ভালো ক্রিমিনাল— এই দুটোর মধ্যে বোধহয় খুব একটা তফাত নেই, তাই না?”


জটায়ু দ্বারা নিক্ষিপ্ত সার্বজনীনতা স্পর্শ করা এই প্রশ্নটি বাস্তবে নিরুত্তর থেকে যায়, কিন্তু এই অবহেলিত প্রশ্নের সুদূরপ্রসারী অভিঘাত ক্রমশ একটি নির্দিষ্ট সীমা ছাড়িয়ে সেই মাত্রায় পৌঁছে যায় যে মাত্রা অতিক্রমণের পরে সংঘটিত ভূমিকম্প এক অতি সংবেদনশীল সিসমোগ্রাফ যন্ত্রও মাপতে পারে না। এই প্রচণ্ড অভিঘাতের ফলস্বরূপ ‘ঠিক’ ও ‘ভুলের’ প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিমূল এক দর্শনীয় খিঁচুনি দ্বারা কম্পিত হয়, এবং অবশেষে ভেঙে পড়ে তাদের নিষ্প্রাণ বিভাজন-প্রাচীর। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে শুধুমাত্র সেইসব বিষয় এবং ব্যক্তি ঋজু আকারে উঠে দাঁড়ায় যাদের ‘ভুল’ হিসাবে নির্দিষ্ট করা আর সম্ভব নয়, ‘ঠিক’ রূপে মান্যতাপ্রদাণও অসম্ভব। তারা ‘ঠিক-ভুলের’ প্রাতিষ্ঠানিক সীমালঙ্ঘন করে এগিয়ে চলে এক অবিভাজিত সত্যের উদ্দেশ্যে, এক অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতার পথে।