নিঃশব্দে কোলাহল

ইমরান নিলয়


মায়ের মৃত্যুর কিছুদিন আগে আমি প্রথমবারের মতো জানতে পারলাম- মা কানে শুনতে পান না। একেবারেই না। ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য ছিলো। এবং দুর্বোধ্য।

ডাক্তার যখন বলছিলেন- মায়ের কানে শুনতে না পারার ব্যাপারটা, তিনি এতো স্বাভাবিকভাবে বললেন যে আমি ঠিকঠাক বুঝতে পারলাম না- তিনি কি বলে চলেছেন। শুধু হু-হা করে গেলাম। ডাক্তারের চেম্বারে আমার এই বিভ্রান্তি ধরা পড়লো না। ডাক্তাররা বড় রোগ বোধহয় যত সহজে ধরতে পারে, ছোট রোগের বেলায় হয়ত ততটা দক্ষতা দেখান না।

অথচ আমরা ভেবেছিলাম শেষ বয়সে এসে মায়ের মাথা খারাপ হয়ে গেছে বা তিনি হয়ত বার্ধক্যজনিত স্মৃতির সমস্যায় ভুগছেন। কারণ তিনি ইদানিং আমাদের কোনো কথাই বুঝতে পারেন না। খাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করলে মিটমিট করে হাসেন, কিছু বলেন না, আমরা খাবার নিয়ে আসি। এখন শরীর কেমন জিজ্ঞেস করলে করুণ দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। ওষুধগুলো ঠিকমতো খাচ্ছে কিনা জানতে চাইলে ভাঙা ভাঙা স্বরে বলেন- না, তার কিছু লাগবে না, তিনি ভালো আছেন।

অথচ, আসল ব্যাপারটা হলো- আমাদের মা একজন বধির, যিনি কীনা মোটেও কানে শোনেন না। আর আমরা, তার সন্তানেরা ব্যাপারটা জানতেই পারিনি কখনো।

মা কি জন্মবধির? না বোধহয়। মা কথা বলতে পারেন। যারা জন্ম থেকে বধির তারা বোধহয় কথা বলতে পারে না- যেহেতু তাদের শোনার ক্ষমতা নেই। কথা বলার সাথে শোনার একটা সম্পর্ক আছে হয়ত।

কী জানি। আমার সঠিক জ্ঞান নেই এই বিষয়ে। একবার মনে হলো অনলাইনে খুঁজে দেখি। আরেকবার মনে হলো- ডাক্তারের সাথে এ নিয়ে খোলাখুলি কথা বললেই ভালো হতো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব কিছুই খুব বেশি গুরুত্ব পেলো না। গাড়ির জানালা দিয়ে আমি বাইরে তাকিয়ে থাকলাম। রাস্তার পাশের দোকানপাট, ঘরবাড়ি, গাছ, ট্রাফিক সবকিছুই পাশ কাটিয়ে দ্রুত পেছনে চলছিলো- আমি যেদিক থেকে এসেছি সেদিকে।

বাবা কি মায়ের এ ব্যাপারে জানতেন? না বোধহয়। কারণ তাকেও সারাজীবন মায়ের সাথে স্বাভাবিক ব্যবহার করতে দেখেছি আমরা (যদিও তার স্বাভাবিক ব্যবহার ছিলো অনেকটাই অস্বাভাবিক)।

তাহলে কি বিয়ের সময় তাকে বলা হয়নি মায়ের এই খুঁত সম্পর্কে? মেয়ের বধিরতার কথা গোপন করে মাকে বিয়ে দিয়েছিলেন নানা-নানীরা? নাকি তারাও জানতেন না... আর আমার মা কখনো কাউকে বুঝতেও দেননি যে তিনি কানে শুনতে পান না।

কিন্তু মা এটা কিভাবে করলেন? কিভাবে শুনতে অক্ষম হয়েও তিনি স্বাভাবিক মানুষের মতো কাটিয়ে দিতে পারলেন গোটা জীবন? কেনই বা দিলেন?

নিজেকে আমি মায়ের জায়গায় কল্পনা করে গোটা ব্যাপারটা মাথায় নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলাম।

একটা সম্ভবনা হতে পারে মা খুব ভালো লিপ রিড করতে পারতেন। কারো ঠোঁট নাড়া দেখেই বুঝে যেতেন তাকে কি বলা হচ্ছে। কিন্তু এই সম্ভবনাটা খুব মনে ধরলো না। মা যদি আজীবন আমার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে কথা বলতেন- ব্যাপারটা কখনো না কখনো ঠিক চোখে পড়তো।

অথচ মা ছিলেন সবসময় হাসিখুশি। অন্য আর দশজন মা যেভাবে সন্তানের দেখাশোনা করেন- কখনোই তারচেয়ে কম যত্ন করেননি বোধহয়। সকালে সময়মত স্কুলে পাঠানো থেকে শুরু করে স্কুলের অভিভাবক দিবসে গিয়ে ক্লাস টিচারের সাথে দেখা করা- সবই ঠিকভাবে করেছেন তিনি।

দ্বিতীয় সম্ভবনা হতে পারে যে তিনি সবসময় আগেভাগেই বুঝে নিতেন আরেকজন কি বলতে পারে। তার মেয়েটা এখন কি চায়, ছেলেটা এসে সকাল সকাল মাথা চুলকে কোন কথাটা বলছে। যেহেতু গোটা সংসারটাই তার কাছে নিজের হাতের তালুর মতো চেনা, সেহেতু এটা বেশ সম্ভব একটা সম্ভবনা। এবং দুর্বোধ্য।

সামনে বামে একটু রেখে দেন গাড়িটা।
ড্রাইভারকে ভাড়া মিটিয়ে রাস্তার পাশের পার্কটাতে ঢুকে পড়লাম। চারিদিকে দুপুর দুপুর। মানুষজন তেমন একটা নেই সেরকম। কিছুক্ষণ হেঁটে ছায়া পড়া একটা বেঞ্চির উপর বসলাম। হাত থেকে ডাক্তারের দেয়া নতুন হিয়ারিং যন্ত্রটা নামিয়ে রাখলাম পাশে।

দূরে দুপুরের রোদের দিকে তাকিয়ে আমার এই প্রথম মনে হলো- মা তার বধিরতার কথা গোপন করে বেশ ভালোই করেছেন। নইলে আমার ক্লাসের ছেলেরা হয়ত আমাকে রোজ ক্ষ্যাপাতো বয়রার ছেলে বলে। হয়ত ক্লাসের ক্যাপ্টেন হিসেবে আমাকে পছন্দ করতো না এমন হলে। কিংবা হয়ত কোনো বখাটে ছেলে উল্টাপাল্টা বলতো মাকে জড়িয়ে। আর আমরা ধূলায় গড়াগড়ি করতাম। যদিও বেশি মার জুটতো আমার কপালেই।

কিন্তু এসব কিছুই হয়নি। আমার মা সফলভাবে সবকিছু সামলেছেন। তিনি কারো কথা শুনতে পাননি কখনো। এমনকি ঝগড়ার সময়ে বাবার উচ্চারণ করা কুৎসিত শব্দগুলোও শোনেননি। যেগুলো অন্য ঘরে বসেও আমাদের কানে আসতো, আর আমরা চেষ্টা করতাম সেগুলো না শুনে থাকতে। অথচ মায়ের কোনো ঝাঁঝালো জবার ভেসে আসতো না, প্রতিউত্তর-প্রতিবাদ কিচ্ছুটি না। কখনো কখনো রাগ হতো মায়ের এমন নির্বাক আচরণে। আবার বড় হয়ে মনে হতো মা-ই হয়ত ঠিক ছিলেন- সবাই তোমার উত্তর পাবার যোগ্যতা রাখে না।

কিন্তু এখন আমি সত্যিকারভাবে জানি- কেন মা এতো সুখী ছিলেন। আমাদের দুর্যোগ-হতাশার দিনগুলোতেও কিভাবে তিনি অভিযোগহীন থাকতে পেরেছিলেন। নিজের দুর্দশা প্রকাশের কি অর্থ থাকতে পারে যদি তুমি নিজেই তা শুনতে না পাও?

ধীরে ধীরে বিকেল হতে শুরু করেছে। আমি দারুণ একটা ঘুম থেকে জেগে ওঠার মতো করে উঠে দাঁড়ালাম। বাইরের পৃথিবী দখল করে নিচ্ছে চমৎকার আলো।

মা যেন হঠাৎ করেই আমার সামনে উপস্থিত হলেন একজন দারুণ একাগ্র শিল্পী হিসেবে- যিনি তার দুরাবস্থাদের কথা শুনবেন বলে, তাদের অপেক্ষা করতে বলে, ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে একমনে ব্রাশ চালিয়ে যাচ্ছেন, মাঝে মাঝে তুলি ভিজিয়ে নিচ্ছেন নিজের তৈরী করা রঙে। দুরাবস্থারা বিরক্ত মুখে পাশের চেয়ারে বসে আছে। তাদের অপেক্ষা কিছুতেই ফুরাচ্ছে না।

একটা ফুরফুরে ভঙ্গিতে পা আমাকে টেনে নিয়ে চললো পার্কের বড় গেটটার দিকে। আমার হাত ভুলে গেলো ডাক্তারের দেয়া কানে শোনার যন্ত্রটা বেঞ্চ থেকে তুলতে। আর মন তাকে তৎক্ষণাৎ ক্ষমা করে দিলো, সে যখন কীনা উড়ছে একটা নরম পৃথিবীর হাওয়া কেটে।