পুজোর গন্ধ

ঈশানী বসাক

টাইমমেশিনে চড়ে হুস করে কয়েকবছর আগের দিনগুলোতে ফিরে গেলে দেখি পুজো তখন খুব ভাললাগত। পুজো মানে তখন শুধু নতুন জামা আর ঠাকুর দেখা ছিল না। কত কিছু জড়িয়ে থাকতো আষ্ঠেপৃষ্ঠে এই পুজোর সঙ্গে।
একমাস আগে থেকেই প্রতিবেশীদের আনাগোনা শুরু বাড়িতে। ছোটপিসি শাড়ি দিয়ে যেতো। জানে অষ্টমীর দিন শাড়ি না পরলে ভাললাগেনা। বড়পিসী এসে কখনো শাড়ি , কখনো টাকা। বাবা মা ও ব্যস্ত কাছের মানুষদের নতুন জামা দিতে। তখন তো অত ব্র্যান্ড বুঝতামনা, ছিল ও না। বেশিরভাগ সময় শাড়ি , সালোয়ার পিস। আরেকটু ছোট থাকতে রঙবেরঙের ফ্রক।
একদম ছোটোবেলায় আমার মুখস্থ ছিল ঠিক কী কী ধরনের ফ্রক দেওয়া হবে। মা কিনতেন ফ্লোরাল মোটিফের ফ্রক। জামার উপরদিকটা একটা কালার আর নীচের অংশে বড়ো বড়ো ফুল। এখনো মনে পড়ে সেই কালোর উপর লাল গোলাপ, নীলের উপর সাদা রঙের ফুল, সবুজ জামার নীচটা পুরো সূর্যমুখী মোটিফ। বাবা আবার কিনতো জিন্সের ফ্রক। সেই ভিতরে টিশার্ট তার উপর স্ট্র্যাপ দেওয়া ফ্রক। তবে একটা ফ্রকের ব্যাপারে বাবা মার বেশ মিল ছিল। ফ্রিল দেওয়া একটা পার্টি ফ্রক।পুরো গোলাপি, পুরো সাদা, পুরো কালো। সিলভার লাইনিং দেওয়া থাক থাক ফ্রিল। সঙ্গে থাকতো পামশু মাথার কাছে বো দেওয়া।
কতশত হেয়ার ব্যান্ড নিয়ে আসতো বাবা নিউ মার্কেট থেকে। একবার কালো ব্যান্ডের উপর লাল লাল গোলাপ বসানো ব্যান্ড এনেছিল। এতবছরের পুরনো সেই ব্যান্ডের সেই কালো লাল গর্জাস ঝলকটা হারালেও সে পড়ে আছে ঘরের কোণে। তাছাড়া ফল , ফুল আঁকা সাদা ব্যান্ড আর ডজনখানেক ম্যাচ করে পড়বো বলে হেয়ারব্যান্ড মা এনে রাখতো। আমাদের ছোটবেলায় এত কৃত্রিম মেক আপ ছিল না। ফ্রক, ব্যান্ড, পামশু আর মুখ ভর্তি সাদা পাউডার। লিপস্টিক , নেলপালিশ নৈব নৈব চ। ভাগ্যি ওসব পড়তে দিতো না। বড়ো হয়েও এখন তাই ওসবের অভ্যেস নেই । একটু বড়ো হতে মাঝে মাঝে সালোয়ার পরবো বলে বায়না ধরতাম। কিন্তু সে ওড়না দিয়ে সালোয়ার পরার ধৈর্য আর শাড়ি পরার পর চোদ্দোবার কুচি আর আঁচল ঠিক করার লড়াই যত কম করা যায়। তখন তো আর এখনের মতো আকৃতি , বিবা, রঙ্গমঞ্চ নামের বড়ো ব্র্যান্ড ছিল না। উড়িষ্যা, কেরালা যেখানেই যাওয়া হতো পিস কেনা হতো। পিসিরাও জামার পিস দিতো। তখন চুড়ি পা ছিল না। সর্ট সালোয়ার সেই যেমন হারেমের বেগমরা পরতো। ওরকম ফ্যাশন বাজারে আসতেই দর্জির কাছে বায়না, ও জেঠু ওরকম উমরাও জানের মতো বানিয়ে দাও। চুড়িদার মানেই টিপ, বয়ঃসন্ধিতে মন্ডপে চুল খোলা রেখে মায়ের দিকে তাকানোর নাম করে পছন্দের ছেলেটির দিকে তাকানো। কখনো চিঠি অথবা ফোন। এইটুকু চাহিদা তাও ল্যান্ডফোনের বিল বাড়লে বাবার শ্যেনদৃষ্টি ঘিরে ধরতো।
পুজো মানে তখন খালি বেরোনো ছিল না। পুরো সংখ্যাতত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলাম। নর্থের এই এই ঠাকুর , সাউথের নাকতলা, একডালিয়া , কসবা। একশো ঠাকুর দেখতেই হবে। বাবা মা পড়তেন বিপদে। সারা বছর কলেজ, এ কদিন ও রোজ বেরোতে হবে। এখন বুঝি তাদের করুণ মুখের কারণ। একটাদিন ও গ্যাপ যাবেনা। তাছাড়া আরতির সময় মন্ডপে যেতে হবে, ঢাকের তালে পাড়ার বাচ্চারা নাচবো। একবার ঢাকিজেঠুকে বলেছিলাম, চলো না ঠাকুর দেখবে চলো। জেঠু বলেছিলো আমাদের পুজোর পর পুজো। তখন বুঝিনি এ কথার মানে।
ক্যাপ ফাটানোর আজব ইচ্ছে। বন্দুক কিনে এর তার কানের কাছে ফাটাচ্ছি। এখনকার মতো তখন অতো থিম ছিল না। মন্ডপে বসতে পারতাম ঘন্টার পর ঘন্টা। কখনো কখনো পাড়ার কাঁচিকাকু দেখতাম চার্লি চ্যাপলিন সেজে হাসাচ্ছেন সবাইকে। কখনো বা দেখতাম মন্ডপের পাশের স্টেজে নাটক অবাক জলপান অথবা মান্না দে, ইন্দ্রাণী সেনের গান। পাড়ার ছেলেরা চাঁদা নিতে এসে বলতো এবারে অমুককে আনবো, হেবি গান গায় । কাকু একটু তাই চাঁদাটা... তখন মঞ্চ ভর্তি থাকতো না পুরস্কারে। দুর্গাপুজো তখন বুর্জোয়া ছিল না। এখন প্রতিটা পুজোই টিপটপ ব্যবসায়ী।
ষাটকেজি সোনা, হিরের সেট এসব দিয়ে প্রতিমা সাজানোর ক্ষমতা ছিল না। কোনো পুজোর আসল গয়না পরাবে শুনলে গিয়ে দেখতাম। একটা হয়তো হার পরিয়েছে খালি সোনার। তাই দেখতাম দাঁড়িয়ে । তখনো বিস্মিত হতে জানতাম।
তখন বর্ষাকাল পুজোতেও ভাসাতো। প্যান্ডেল মোড়া প্লাস্টিকে। আকাশের দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে প্রার্থনা করতাম, ঠাকুর বিকেলের মধ্যে বৃষ্টি বন্ধ করে দাও। ঠাকুর দেখবো তো। কী অদম্য উৎসাহ!
আজকাল পুজোর আগে খুব ভয় করে। সারা কলকাতা যেন বিজ্ঞাপন দিয়ে মুড়ে ফেলেছে। যেখানে সেখানে বাঁশ দিয়ে রাস্তা আটকানো, দম আটকানো ভিড়। বাড়ি ফিরতে হলে এমন সব জায়গায় আটকায় যে দু কিমি ঘুরে ফিরতে হয়। মনে হয় নিজেকে ঘরের ভিতর নচেত দূরের পাহাড়ে আটকাই। নিশ্ছিদ্র শান্তি এই থিম আর অর্থের দ্রিমদ্রিম থেকে। চেষ্টা করি বাইরে থাকতে। এখন বুঝি বাবা মা ওরকম অসহায় মুখে আমাকে নিয়ে কেন ঠাকুর দেখতে বেরোতো। যদিও তখনকার পুজোর আন্তরিকতা ছিল। পুজো এলে এখন একা হয়ে যাই। কোথাও যেতে হলে ভিড় পেরোতে হবে। সবাই ঠাকুর দেখতে বেরোচ্ছে। আমি সন্ধ্যার জানালায় তাকিয়ে। মন্ডপে সানাই বাজছে যেন নববধূ ফিরেছে। কখনো বা বেজে উঠছে , রানার রাপার , রানার ছুটেছে ...
ফ্যাসিজম, নাৎসি ক্যাম্প, কতোকিছু ভেসে ওঠে। কনসেনট্রেশন ক্যাম্প আর ডিটেনশন ক্যাম্প, এন আর সি আর ভোটার আপডেট বাধ্যতামূলক, ডিমনেটাইজেশন , জোর যার মুলুক তার। প্রচুর ডিগ্রি নিয়ে ও আজ চাকরি নেই। বেকারের সংখ্যা বাড়ছে হু হু করে। দুর্গাপুজো আর পুরস্কার ও বেড়েছে। এখন আর ক্যাপ ফাটানোর জায়গা পায় না বাচ্চারা। শাড়ির আঁচলের কাছে আঙুল ছুঁয়ে দিয়ে ছেলেটি চলে যেতে পারেনা। বিজয়ার প্রণামে হলদিরামের কাজু বরফি আর গুরুজনের আশীর্বাদ উপলক্ষে একশো টাকা। সারাবছরের হাতখরচা। এটুকুই ছিল আমাদের পুজো। এখন নখ আঁচড় দেওয়ালে গ্যাস চেম্বারে বেড়ে উঠছি আমরা। মা কলকাতায় এখন প্লেনে আসেন। মায়ের মুখ চিনতে পারিনা আর। দশমীর দিন মায়ের চোখ চিকচিক করতো। এখন করেনা। আমাদের মায়েরা একা থাকা শিখছেন।