শ্রীচরণেষু মা

সোনালী চক্রবর্তী

শ্রীচরণেষু
মহামায়া,

সেই পুজোটা কবে এসেছিলো যার আর কখনো না আসার বিষাদজলের আলোয় আমার দর্পণ থই থই করে,স্মৃতিতে আসেনা।কারন,আজীবন দশমীর সন্ধ্যায় ভূতের মত সিঁদুরমাখা, ঠেসে দেওয়া সন্দেশ উপচে পড়া,পান্না রঙের অসুরটির করুণ মুখের দিকে মায়ের রক্তলাল আঁচলের ভিতর থেকে যে মেয়ের দৃষ্টি সবচেয়ে আগে যায়,ঝাড়ের আলোয় দশভূজার গর্জন তেলের ঔজ্জ্বল্য তার কাছে স্টেশান ছেড়ে চলে যাওয়া ট্রেনের সিগনালের বেশী দীপ্তি কী করেই বা দেবে?বিশেষ কোন খামতি?না তো।বনেদি ব্রাহ্মণ পরিবারের একমাত্র সন্তান হওয়ার গৌরব ও দায় সে জন্মাবধি বহন করেছে প্রাচুর্যের ভিতরেই।তবুও কীসের যেন গলাব্যথা শরত মাত্রেই নির্বিবাদে এসেছে,এর যে একেবারেই কোন চালচিত্র নেই,তা বোধকরি নয়।স্বাতন্ত্র‌্যের মতো পলিটিকালি কারেক্ট শব্দের বাইরে যে অনেকটা উঠোন পড়ে থাকে,সেখানে একাকিত্ব অনেকটা প্যস্টল নীলে রাঙানো আকাশ।শিশু থেকে নারী হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতারা সেখানে কখনো নিপুণ আলপনা আঁকে,আবার ধুয়ে গিয়ে তুলোবরণ মেঘ হয়ে দিগন্তে ভেসে যায়,হারিয়েও যায়।'দেবীপক্ষ' বলে কিছু কি হয়?জন্ম থেকে নির্বাণ,এই সময়কালে প্রতি অস্তিত্বকেই অতিক্রম করতে হয় অজস্র,অজস্র জীবন।এই সত্য স্বীকারের জন্য কারোর নারীবাদী হওয়াটা নিষ্প্রয়োজন।পশমিনা বুনতে বুনতে বৃদ্ধ হয়ে যাওয়া আঙ্গুল যেভাবে ভুলে যায় প্রথম কোন ফোঁড়ের সূঁচ গিঁথে রক্তের দানা রোঁয়ায় মিশে গিয়েছিলো,সেভাবেই কোন এক সময় থেকে যাপন নামক জীবন উৎসবের প্রতিটি অঙ্গ ঐশীর মেটাফোর হয়ে ধরা দিতে শুরু করে যে বিশ্বাস হয়ে গেঁথে গেলো,এমন কোন সন্ধিক্ষণ আর এলোই না,যাতে তার বলি হয়।পিতৃপক্ষের দিক থেকে ঠাকুমা বেনারসের বাড়িতে নির্জন সাধিকা হয়ে কাটিয়ে দিলেন জীবনের শেষ কুড়িটি বছর।ভরা সংসারের রং তাঁর রুদ্রাক্ষে এতোটুকু ধুলোও ফেলতে পারলোনা।মাতৃকূলের পক্ষে দিদিমা ছিলেন সিংহ রাশির জাতিকা।ঢাকাইয়া পোলার জমিদারি ঔদাসীণ্যকে থোড়াই কেয়ার করে প্রায় একার দায়িত্বে সন্তানদের শিক্ষিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করে তোলায় তাঁর জুড়ি একমাত্র সিংহবাহিনীর সঙ্গেই মেলে।এহেন সর্ব অর্থেই মাতৃতান্ত্রিক কাঠামোর ফসল যে অকালবোধনে নিজস্ব বিষণ্ণতার কুপি জ্বেলে কুমোরটুলীতে ক্লান্ত মুখেদের খুঁজে বেড়াবে প্রতিমার আড়ালে,এতে আর বিচিত্র কি?

উপহারে জামা-জুতো অনেক প্রাপ্তি ঘটতো। একান্নবর্তি কালে পৃথিবীটা অন্যরকম ছিলো আদতেই। ইতিহাসের বিশ্লেষণে সেদিন খুব দূরে নেই যেদিন স্পষ্ট হবে সময়ের দুটি বিভাগ। মোবাইল ও অন্তর্জাল পূর্ববর্তী কাল এবং পরবর্তী সভ্যতা। আজ বড় বিস্ময় (এখনও অবশিষ্ট আছে) লাগে, জলঙ্গির দুই পাড়ে প্লাবনের মত কাশের সমুদ্রে দাঁড়িয়ে তর্পণ দেখবো বলে যখন বাড়ি থেকে বেরোই, মফস্বলের সবাই সারারাতের অন্তর্জালিক ক্লান্তি মেখে গাঢ় ঘুমে, দুই একটি গৃহস্থালি মাত্র, যারা আমাদেরই মতো এখনও প্রাচীন অশ্বথ্বের মায়ায় জড়িয়ে মড়িয়ে বেঁচে আছে, চণ্ডীপাঠের প্রস্তুতি নিচ্ছে।অথচ সেই কবে, প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় আগে, এই দিনে,বেনারসের পীতাম্বরপুরাতে গমগম করে ধ্বনিত হতো বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র নামের সেই প্রবাদ প্রতিম পুরুষটির কণ্ঠ, সূর্যের প্রথম আলো কেদার গঙ্গার কিনার স্পর্শের আগেই আজ যে দশমহাবিদ্যার অফিসিয়াল এরাইভাল ডেট, জেনে যেত বিশ্বনাথের গলির মারোয়াড়ি পান বিক্রেতাটিও। তাঁরা তাদের মতো করে,তাদের উচ্চারণেই একবার স্বাগত জানিয়ে দিত এক গা গয়না দিয়ে বেনারসী পরা, স্বামীটিকে রেখে কিন্তু মায়ের স্বভাবধর্মে পুত্র-কন্যা নিয়ে বচ্ছরকার দিনে বাপের বাড়িতে সোহাগ মাখতে আসা উমাকে।সেই একটি দিনে অন্ততঃ, প্রকৃতই,ঘন্টাধ্বনি আর আজানের অনায়াস সিম্ফনি ইথার জুড়ে তার সপ্তক ছুঁতোই, এ সত্য ব্রহ্মবাদিনী জানেন। বাঙালি ভীষণ দ্রুততায় কার্নিভাল পালনের মতো আন্তর্জাতিক হয়ে গেলো না আমিই স্থির হয়ে রইলাম জলশন্খটির বিবর্ণ পিতল হয়ে, নির্ণয়ে পৌঁছতে পারিনি।

বঙ্কিমচন্দ্রকে যখন পড়ছি, জনৈক আত্মীয়া খুব শ্লেষ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন-"ওহ!বঙ্কিম? সুন্দরী নারী ছাড়া তো পৃথিবীতে মেয়ে নেই",ধাক্কা খেয়েছিলাম বেশ।কৈশোর তো কাঁচা পলির মতো হয়,বড় নরম,দাগ বসে যায় সহজেই।এখনো তা পুরোপুরি মোছেনি তাই মায়ের কথা লিখতে সঙ্কোচ আসে,যদি কেউ বলে ওঠেন তির্যক কিছু।অথচ কী করে অস্বীকার করি (নিজের মা না হলেও বলতাম) পৃথিবীতে অমন দেবীরূপ বিরল।শান্ত দিঘির মত যে কোন অভিব্যক্তি,আবেগের কোন বহি:প্রকাশই যেখানে উচ্চকিত নয় বরং ধারণ করে নেওয়ার।এর সঙ্গে মিশেছিলো অদ্ভুত নির্লিপ্তি ।সম্ভবতঃ অন্তর্লীন আধ্যাত্মিকতা এর জন্য দায়ি।বাবা কর্মসূত্রে বহুদূর থাকতেন ।ফলত: মায়ের একান্ত নিজস্ব জগৎটি যে গভীর গণ্ডি বেষ্টিত ছিলো,তাকে ভেদ করার ঔদ্ধত্য কারোর ক্ষমতায় কুলোয়নি।আমি গর্ভধারিনীকে পেয়েছি এই অপার্থিব আলোকবৃত্তেই।উজ্জ্বল হয়ে উঠতে হয় যাঁর সংস্পর্শে এলেই কিন্তু ছুঁয়ে গৃহস্থ করে ফেলা যায়না।এই যে মায়াময় বিপুল দূরত্ব,সেই চরাচরে মা বুনে দিয়েছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ট সাহিত্যগুলোকে জানার নেশা,শাস্ত্রীয় নৃত্যের মুদ্রা আর রাগ-রাগিণী সনাক্তকরনের জন্য উপযুক্ত কান তৈরির তালিম।ঈশ্বরী না হলে সম্ভব?চিরদিন তাই দক্ষকন্যার জন্য কলম ধরলে আমার মায়ের কথাই আসবে,অভিন্ন যে।এই বোধ করি রহস্য উপলক্ষ উদযাপনে ঔদাসীন্যের,আমার তো জীবন জুড়ে শারদীয়া।

তবে দুর্গোৎসবের সবচেয়ে ভালো দিকটা হলো বেশ কয়েকটা দিন টানা ছুটি পাওয়া যায়,সেই ছাত্রীজীবন থেকে এখনকার কর্মজীবন,সমান আনন্দের প্রাপ্তিযোগ। ত্রিনয়নির দীঘল টানের কাজলের মত দুপুরগুলোতে পড়ে ফেলা যায় সারা বছর ধরে অসমাপ্ত থাকা পাতাগুলো,শুনে ফেলা যায় নতুন নতুন এক্সপেরিমেন্ট আর সন্ধ্যারতির সময় লক্ষ তারাখচিত নীল চাঁদোয়ার নিচে ইন্দিবরের চুপিচুপি কোরক বিস্তারের মত দু:সাহসে স্বপ্নকে অধিকার দেওয়া যায় জীবনের প্রিয়তম কবিতাটিকে লিখে ফেলার কথা ভাবতে।এই বিস্ফারটুকুই আমার অঞ্জলি।আমার ব্যক্তিগত সমর্পণ।

প্রার্থনা করবো,ভ্যুলোক দ্যুলোক একাকার করে কোটি যোগিনী পরিবৃতা হয়ে মহিষাসুরমর্দিনি যেন আবির্ভূতা হন যুগ-যুগান্তর ধরে।আমি তার মধ্যে বড় একা এক পরমাসুন্দরীর একক সংগ্রাম দেখি।প্রতি উপাচার অর্পণকালে অভিমানের শ্বাস শুনতে পাই।প্রতি মন্ত্রচ্চারণের ভিতরে তার অশ্রুবিন্দুকে হিরে ভেবে ভ্রমে থাকি।প্রদীপের প্রতিটি শিখাকে আত্মাহুতির এক মহাযজ্ঞের মধ্যে লীন করে ফেলি।তবু, প্রসীদ............
প্রসীদবহ্নে শুচিনামধেয় প্রসীদ বায়ো বিমলাতিদীপ্তে ॥

প্রসীদ মে পাবক বৈদ্যুতাভ প্রসীদ হব্যাশন পাহি মাং ত্বম্ ।
এসো মা ...........