যে গাছের নাম নেই

উমাপদ কর

পড়বি তো পড় একটা মেয়েলি গাছের সামনে। নাম শেফালি। একটু সেকেলে নাম। রুরা অবাক হয়ে দেখে শেমিজ আর লম্বাহাতা ব্লাউজপরা শীত-শেফালিকে। রুরা, ৬৫, ধূসর-শেফালিফুল চুল, আরও একবার দেখে আঢাকা শেফালিকে, কোথাও একটা ফিরে যায় ভাবনায়, তারও নামটা বেশ সেকেলে, রুক্মিণী রায়, কলেজের বন্ধুরা রুরা করে দিয়েছিল, আধুনিক বানাতে। তখন সবে আধুনিক/আধুনিকা শব্দদুটো তাদের শহরে ডানা মেলছে। অনেকেরই সেকেলে নাম বদলে একেলে করে দেওয়ার একটা ধুম চলছে। মা, রুরা শুনে চমকে উঠলেও মিচকি হেসেছেন মাত্র। দশ বছর বয়সে যে মেয়ে বাবকে হারায়, তাকে বোধহয় কিছু বলাও যায় না। কিন্তু মা, তার ‘মিনি’ বলে ডাকাটা পালটায়নি। শেফালির দিকে আরেকবার তাকিয়ে তাকে মৃদু হাসতে দেখল। রুরা ভেবে পেল না এই মোহিনী হাসিটা তাকে কেন? এ-তো পুরুষ-ভোলানো হাসি। তা-বলে এই ড্রেসে, আর এই একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের প্রায় শেষে! আরেকবার দেখে। হ্যাঁ, সেই চোখ, যে হাসিটা ঠোঁটে নয় চোখে খেলে, কিছুটা ভুরুতে। বেচারার নিশ্চিত মতিভ্রম হয়েছে। একে এই পোশাক, তায় সামনে তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকা মহিলা। তাকে দেখে কেন ওই হাসি? অনেকটা বোকার মতো দাঁড়িয়ে থেকে বাগানে ঢোকার মুখ থেকে রুরা ঘরে ফিরে আসে। ছোটদিনের বেলা, একটু গড়ানোর উপায় নেই, থাকলেও আজ কিছুতেই সে বিছানার ধারে গিয়ে স্থির থাকতে পারেনি। রাহিকে স্কুল থেকে নিয়ে আসতে হবে।
শাড়ি বদলাতে গিয়ে রুরা অনেকটা পিছনে চলে গেল। শৈশবে মাকে সে এই পোশাক পরতে দেখেছে, মা কি কোনও গাছ ছিল? নাম তো শেফালিকা-ই ছিল। কী অসধারণ স্বাদের খিচুড়ি আর লাবড়া রাঁধত। বাবা মুকুট খসিয়ে দেবার পরও মাছ স্পর্শ না-করা মা চব্বিশ শীত কাটিয়ে শ্রীপঞ্চমীতে কাঠচিতায় উঠেছিলেন। মা গাছ ছিলেন। এমন সিদ্ধান্তে আসার পর রুরা আর আয়নার সামনে দাঁড়ালো না। যদি নিজেকেও সে গাছ বলেই দেখতে পায়!
স্কুল থেকে ফেরার পথে রাহি, ৭, বকর-বকর করেই চলেছে। রুরা চুপ পায়ে পায়ে। এক-আধবার অবশ্য হুঁ-হাঁ করতেই হচ্ছে যখন রাহি হাত ধরে টান মারছে।
--কি গো আম্মি কথা বলছ না কেন?
--না, বলছি তো!
--কোথায় বলছ? আমি এতগুলো হাসির কথা বললাম, তুমি সেই এখনও সকালের মতো কালো মুখ। কী হয়েছে তোমার, আম্মি?
--কিছু না সোনা! হাতটা ছাড়ো, গ্রিল খুলতে হবে।
--আম্মি সকালে তুমি কাঁদছিলে?
উত্তর হয় না এমন প্রশ্নের দিকে না-তাকিয়ে রুরা ঘরে ঢুকে স্কুল-ড্রেস ছাড়ানোর সময় খেয়াল করল সোনার মুখটাও কেমন মেঘলা। খারাপ লাগল তার। শিশু। হাসতে চেষ্টা করল সে।

ছটায় ঘরে ফিরবে শান্তা। হাত-মুখ ধুয়ে সালোয়ার-কামিজটা পালটে কিছু মুখে দিয়েই সাড়ে-ছটার মধ্যে মেয়েকে নিয়ে ছুটবে নাচের স্কুলে। আজ বৃহস্পতিবার। সপ্তাহে দু-দিন। শনিবারটায় এত তাড়াহুড়ায় ছুটতে হয় না। শান্তার জন্য খারাপ লাগে রুরার। কিন্তু বলার কিছু নেই, সেই নিয়ে যাবে। ফিরবে ন’টা নাগাদ, তখন ছেলেও অফিস থেকে। ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো রুরা। ওরা যাচ্ছে। ফিরে নিজের ঘরে ঢুকে একবার আয়নায় দেখবে নিজেকে। গাছ মনে হয় কিনা নিজেকে! হলে কী গাছ? শেফালি নয়তো! যা, মাকে দেখে মনে হত। শেফালি হলেই বা ক্ষতি কী? পাতার ঘন-সবুজ, শাদা ধবধবে ফুল, ঘন ছায়া, অরুচিতে কচিপাতার বড়া, কিংবা ডাল-এ তেতোভাব আর সুগন্ধী একসঙ্গে আনা, চৈত্র-সংক্রান্তিতে আরও কিছু পাতার সঙ্গে হামানদিস্তায় থেতো করে হাফ-কাপ করে রস, মা কত কিছু যে শেফালি দিয়ে। সেও তো ধারাটা বজায় রেখেছে বহুকাল। এখন আর হয় না। কুড়ি বছর বয়সে সে এসেছিল এই বাড়ি। তার আগে কৈশোর আর প্রথম-যৌবনের দশ বছর কাটিয়েছে মার সঙ্গে। প্রথম পাঁচ বছর দাদা ছিল। দাদা বয়সে তার চেয়ে অনেকটাই বড়ো। বাড়ি ছাড়ে ছুটকো কারণ দেখিয়ে, বৌদিকে খুশি রাখাটাই তার কাছে বড়ো হয়ে পড়েছিল। মা একটি কথাও বলেনি। গাছ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মেয়ের পড়াশোনা, বিয়ে, নিজের বাকি জীবনটা ঘুরছিল তার মাথায়। অবশ্য দাদা মাস গেলে নিয়মিত নির্দিষ্ট পরিমান টাকা দিয়ে যেত মার হাতে। একটাও কথা না-বলে হাত পেতে টাকাটা নিতে মা নিজের কষ্ট আড়াল করত গাছ হয়ে। হয়তো তখন ভাবত বাবার কথা, পেনশনের সামান্য কিছু মাসিক টাকা ছাড়া যিনি আর বিশেষ কিছু রেখে যেতে পারেননি। সেসময় মার লড়াইটা গাছের মতই, ঝাঁঝালো রোদে দিনের পর দিন যে জল পায়নি, গোড়ার মাটি উসকে দেওয়ার মতো কেউ ছিল না, এতটুকু গোবরসার যার পাওয়ার কথা ছিল, অথচ পায়নি। মা গাছ ছিল। তার বিয়েতে দাদার একটা বড়ো ভূমিকা ছিল। বেরিয়ে আসার সময় সে অঝোরে কেঁদে গেলেও মা কাঁদেনি এতটুকু, অন্তত সামনে না। তারওপর ষোলোটা বছর বেঁচে ছিল একা। মা গাছ ছিল, এই শেফালিগাছটার মতই গাছ, শেফালিকা। আমৃত্যু মা মহীরুহ হতে পারেনি। মা গাছ হয়েই লোকান্তরিত। আজ কেন যে এত মাকে!

নিজেকে আয়নায় ফেলল রুরা। গোটাটা। কী দেখছে সে? সিঁথিটা— দুপাশের ধূসর সাদার মধ্যে আরও গভীর এক লম্বাটে শাদা, চোদ্দটা শীত যেখানে সিঁদুর ছোঁয়াতে পারেনি। গোটা মুখটা— চোখদুটো ফোলা, নাকটা সামান্য বেঁকেছে, গালের চামড়ায় বয়সের কোঁচকানো। এই তো স্বাভাবিক। ব্লাউজঢাকার পর হাতদুটো-- তারা কৌলীন্য হারিয়েছে। স্বাভাবিক। ব্লাউজ আর শাড়ির মাঝখানের পেট ও কোমরের একাংশ— বহু যত্নশীল হয়েও সেখানে বাড়তি কয়েকটা ভাঁজ। স্বাভাবিক। পায়ের পাতা যতটুকু দেখা যাচ্ছে— সবুজ। চমকে উঠল রুরা। সবুজ? কালো হতে পারে, ফ্যাকাসে হতে পারে, সবুজ কেন? সেও কি গাছ হয়ে গেল? মায়ের মতো গাছ? শেফালিগাছ? আজকেই বিকেলের আগে দেখা বাগানের মুখে শেফালি? হাসছিল। সে হাসি তাহলে পুরুষভোলানো ছিল না? তাকেই ভ্রুকুঞ্চিত করে হাসি? আরেকবার তাকালো আয়নায়, যেখানে মুখটা আছড়ে আছে। ওমা, সেকি? সেখানেও সবুজের আভা? কোত্থেকে এল? ভুল দেখছে কি? খানিক আগেও নিজবর্ণে ছিল, পালটে গেল কীভাবে? কিন্তু শেফালি গাছ যে নয়, সেটা বুঝতে পারছে। কী গাছ তবে? মানসিক ব্যাপার নয়তো? তাই বলে স্পষ্ট দেখবে সবুজাভ মুখ? সে কি গাছ হয়ে যাচ্ছে? নাকি এতদিন গাছই ছিল, বুঝতে পারেনি, আজ প্রথম এই মুহূর্তে টের পাওয়া? সহস্র প্রশ্নে জর্জরিত, বিবশ রুরা বিছানায় এলিয়ে পড়ে।

আবার পিছনে ফিরল রুরা। তার শ্বাশুড়িও ছিল গাছ। কিন্তু সে তালগাছ। খুব বেশিদিন পায়নি তাকে। লম্বা, রুক্ষ, চোঁচালো। রুরা তার মুখ থেকেই শুনেছে তার শাশুড়ি আর স্বামী মিলেই তাকে এমন তিরিক্ষে বানিয়েছে। এগারো বছরের এক কচি চারাগাছকে ঢ্যাঙা তালগাছ বানিয়েছে। রুরার ভাগ্য সেদিক থেকে কিছুটা ভালোই বলতে হবে। শাশুড়ি বংশানুক্রমিক কোপন-রোষণ না-বাড়িয়ে বরং কমিয়েছে। তালগাছ আরেকটা তালগাছ বানানোর উল্লাসে মাতেনি। তাহলেও রুরা আজ নিজেকে গাছ দেখল কেন? কেন? সকালের চোখের জল কি তার দিব্যদৃষ্টি খুলে দিয়েছে? সোনাও জানতে চাইছিল, ‘আম্মি তুমি কাঁদছিলে?’ একটা শিশুর নজর এড়ায়নি। তাহলে কি শান্তাও খেয়াল করেছে তার চোখের জল, কালো মুখ? ওফ! তাহলে খুবই বিশ্রি ব্যাপার হবে! সে তো এমন ভুল কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। বলেওনি খারাপ কিছু। সংসারে থাকতে গেলে যেটুকু কিচিরমি্চির তা বাদে শান্তা তাকে যথেষ্ট সম্মান করে, খেয়াল রাখে, এমনকি ছেলে ওষুধের কথা ভুলে গেলেও সে ভোলে না। সেই শান্তাই তো আজ সকালে রুরাকে প্রথম বলেছে ‘আপনি কি গাছ হয়ে গেছেন?’। কোনও প্রশ্নেরই জবাব দিচ্ছিল না রুরা। বুলুর মা চা দিয়ে গেল ঘরে। তার পরপরই শান্তা হাতে চায়ের কাপ নিয়ে ঢুকল।
--- মা, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?
--- হ্যাঁ, বলো না বৌমা। কী এমন কথা?
--- বহুদিন থেকে ভাবি জিজ্ঞাসা করব, কিন্তু করা হয়নি, আজ জানতেই হবে। মা, আপনার ছেলের কাছে যা শুনেছি, তা কি সত্যি?
--- কী শুনেছ মা, তা না-জানলে বলব কীকরে সত্যি কিনা!
--- আমার শশুড় মশাইয়ের কথা, তাঁর জীবনের একটা বিশেষ দিকের কথা, তা কি সত্যিই?
আর একটাও কথা বলতে পারেনি রুরা। আর শান্তা—
--- মা, আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি, শুনতে পেয়েছেন?
--- আপনি সইলেন কীভাবে, আর কেনই বা?
--- আপনি তাঁর নোংরামিতে বাধা দেননি কেন?
--- যে সয় সে রয়, তাই ভেবেছিলেন?
কোনও উত্তর নেই। চা কাপে ঠাণ্ডা হচ্ছে। শীতেও ভীষণ গরম লাগছে। শান্তা শেষবার—
---আপনি কি গাছ হয়ে গেছেন?
বেরিয়ে যায় শান্তা, চোখ দুটো কিছুটা লাল, কাল রাতে কি ঘুমায়নি ওরা! রুরার পায়ের নীচের পাথর আলগা মনে হলো, মুখটা গুঁজবে কোন অন্ধকারে ভেবে পেল না, একটা লুকোনো ঘায়ে কেউ যেন খুঁচিয়ে দিল। কালো মেঘ জমলো, দু-চার ফোঁটা বৃষ্টিও বোধহয় হয়েছিল, যা ওই সাত বছরের শিশু ঘরে ঢুকতে গিয়ে, আম্মিকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে, আবার ‘মা মা’ বলে ফিরে গিয়েছিল।

আটটা বাজে। ওদের ফিরতে আরও এক ঘণ্টা। অস্থির রুরা একবার ব্যালকনি গিয়ে আবার ফিরে এল ঘরে। বিছানায় একটু গড়াতে গিয়ে উঠে বসল। জল খেল এক গ্লাস। আয়নার সামনে যেতে গিয়েও মাঝঘরে দাঁড়িয়ে পড়ল। আবার বিছানায় বসে দু-হাতে নিজের মুখ ঢাকল। ফিরে গেল পিছনে। তারই খুড়তুতো বোন, রাধারানি, তার চেয়ে বেশ কয়েক বছরের ছোট, কিন্তু বিয়ে হয়েছিল তার পরপরই, সাদামাটা কেরানিঘর, একই শহরে, বাচ্চাও তাড়াতাড়ি, থ্রি-তে পড়ে, সুখ সইল না, হঠাৎই স্বামীর হার্ট-অ্যাটাক, মৃত্যু, অগাধ জলে পড়ল, শশুড়-শাশুড়ি কেউ নেই, রুরাই স্বামীকে অনুরোধ করেছিল রাধা আর তার ছেলেকে যেন দেখে, যেন ভেসে না-যায়। কথা রেখেছিল সোনার ঠাকুরদা। দিন-রাত এক করে ভায়রার পি-এফ, গ্র্যাচুইটি, ও রাধার সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করেছিল। রুরার মেয়ের বয়স তখন পাঁচ। স্বামী রাধার পরিবারকে বাঁচিয়ে নিজে জড়িয়ে গিয়েছিল, প্রথমে কিছুই বুঝতে পারেনি রুরা, অনেক পরে যখন প্রথম আঁচ পেয়েছিল, তখন দেরি হয়ে গেলেও, নিজেকেই সন্দেহবাতিক বলে ভেবে স্বামীর সামনে লজ্জায় কিছু বলতে পারেনি। আর যখন প্রায় সবারই গোচরে আসে বিষয়টা, তখন লজ্জায়-ঘেন্নায়-ছেলেমে ের-সমাজের ভয়ে আর নিজের ও রাধার শালীনতার কথা ভেবে চুপ থেকেছিল। শুধু নিজের শোওয়ার জায়গাটা বদলে নিয়েছিল। স্বামী অবাক হয়ে কিছু একটা বলতে গিয়েও আর নাটক করতে পারেনি। আমৃত্যু তার সামনে একটা অপরাধবোধে থেকেছে, কিন্তু বাড়তি সম্পর্কটুকু ভুলতে পারেনি। তার মৃত্যুর দিনে রাধার প্রাণপণ কান্নায় সে নিজে কাঁদতেও ভুলে গিয়েছিল। হয়তো তখন থেকেই সে গাছ হয়ে গিয়েছিল।

রাতে খাবার টেবিলে সোনাই যা কিছু কথা বলল। কিছুটা সহজ হতে চাইল রুরা। হয়তো পারল, হয়তো পারল না। শান্তাও চাইছিল, পারল না। ছেলে একবারই শুধু বলল, ‘রাহি! আম্মিকে রাতে জ্বালাস নাতো? মার কিন্তু ঘুম খুব দরকার’।

সোনা আর রুরা, রুরার ঘরে এক বিছানায়। এটাই ব্যবস্থা, বছর দুই ধরে। আজও, ‘আম্মি একটা গল্প বলো না!’ রুরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে, মাথার চুল নেড়ে দেয় সোনার। আহা! একটা ছোট্ট চারা-গাছ। গল্প শুরু করে, কিছুটা এগোতেই সোনার শ্বাস গাঢ় হয়ে পড়ে, আম্মির বুকে রাখা হাতটা সরিয়ে নেয়। রুরা ঘুমোতে চেষ্টা করে। পারে না। উঠে একবার টয়লেট, কিছুটা জল। অন্ধকারে একবার আয়নার সামনে দাঁড়ায়। আশ্চর্য আয়নায় একটা গাছ। চমকায় না। শুয়ে পড়ে। সারাদিন রিওয়াইন্ড হতে থাকে মনে মনে। বারবার পেছনের দিকে হেঁটেছে সে। আর নয়। এবারে বর্তমানটা ভাবতে চায়। রাধাও তো একটা গাছ, গাছ হয়ে আরেকটা গাছ কেটে ফেলতে পারল? গাছ কি গাছ কাটে? রাধার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-সংশয়-ভ বিষ্যৎচিন্তা ছিল কি ছিল না, সে জানে না। থাক সেটা। বারোটা বাজে, ঘড়িটার জানান। আচ্ছা, এতদিন পর শান্তা কেন আজই এমন সব প্রশ্ন? ও-তো বলল অনেকদিন আগেই সে জানে ছেলের কাছ থেকে। তাহলে আজ কেন? আগে কেন নয়? শান্তা কি গাছ হতে যাচ্ছে? তার মনেও কি ছেলেকে নিয়ে কোনও প্রশ্ন জেগেছে? ছেলে কি বাবার পথে যাচ্ছে, যার সামান্য আঁচ লেগেছে শান্তার মনে! হায়! যদি হয়, সে জানে না শান্তার ভূমিকা কী হবে? শান্তা সয়ে নেওয়ার কথা জিজ্ঞাসা করছিল, প্রতিবাদের কথা জিজ্ঞাসা করছিল, বাধা দেওয়ার কথা জিজ্ঞাসা করছিল। যদি হয়, তবে কি সে শেফালিগাছ না-হয়ে ক্যাকটাস হয়ে উঠবে? বা নিজেও রাধাচূড়া হয়ে যাবে? অজানা আশংকায় গলা শুকিয়ে আসে। ওঠে, টয়লেট, জলপান। বিছানায় উঠে চারাগাছটাকে একবার জড়িয়ে ধরে। ঘুমের মধ্যে চারাগাছ বড়োগাছের জড়ানো ছাড়াতে চেয়ে ‘আম্মি’ বলে ওঠে। সব মেয়েরাই কি গাছ? ভাবতে থাকে। বেলায় দেখা শেফালিগাছের চাউনিটা একবার মাথায় খেলে যায়। মেলাতে থাকে, তার দেখা মেয়েলি গাছগুলো। মা শেফালিগাছ, শাশুড়ি তালগাছ, রাধা রাধাচূড়া, শান্তা লেবু কিংবা বাবলা কিংবা ক্যাকটাস—এখনও নির্ধারিত হয়নি, সোনা চারাগাছ, কিন্তু নাম? হতে পারে টগর। আর সে নিজে কোন গাছ? গাছ ঠিকই, কিন্তু কোন গাছ? বৌমা যে বলল, ‘আপনি কি গাছ হয়ে গেছেন?’ কী গাছ, তা-তো বলল না! আয়না কি জানান দিল কিছু? জানান দিলেও সে বুঝতে পারেনি। পাঁচটা হবে। শীতের রাত, তাই এখনও অন্ধকার। উঠল রুরা। লাইট জ্বালল। সোনা চোখ কুঁচকে ওপাশ ফিরল। আয়নার সামনে দাঁড়ালো এলোচুল নির্ঘুম রুরা। আয়না কী বলছে? বলছে গাছ। রুরা দেখছেও গাছ, কিন্তু কিছুতেই নির্ধারণ করতে পারছে না গাছের নামটা। আরেকবার চোখে জল পড়ো-পড়ো। ঠাঁয় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে রুরা।