নষ্ট - আল অথবা কাল্পনিক জিয়া কথন

তমাল রায়

তখন প্রেম ছিলো কি ছিলোনা, একটা দরাজ আকাশ ছিলো, আর দুমদাম বেরিয়ে পড়া। শেষ রাতে রাকা মাইন স্টেশনের লাইনে কান পেতে... পরের ট্রেনে সে আসছে... সে মানে কে? সে মানে চিরআকাঙ্ক্ষিতা কেউ, সে মানে রাত্রি, কুহেলী, শিউলি, মৈত্রেয়ী বা অন্য কেউ। যাকে আমি চিনি, হৃদয়গত! কিন্তু কখনও, দেখিনি। সে আসলে সামনে আসতে চাইও না, ধরা দিতেও না। যদি সেই এসে ধরা দেয়,পাখির নীড়ের মত মুখ তুলে বলে, এতদিন তাতেই হবে! এর বেশি তো কিছু পাবার ছিলো না কখনোই। অক্ষর ছুঁয়ে হারিয়ে যাবো অন্ধকারে!

সে এক অলৌকিক উত্থানের সময়! প্রথম কবিতার মত দুঃসাহস বুকে অপুর পথে হেঁটে চলা! আমাদের বিভূতিভূষণ ছিলো না,নকশাল আন্দোলন ছিলো। মাথার ওপর রাতের আকাশে যখন তারা ফুটতো একে একে, গৌতম চট্টোপাধ্যায় জানান দিচ্ছেন- পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে, স্যাটেলাইট আর কেবলের হাতে ড্রয়িংরুমে রাখা বোকা বাক্স বন্দী, আহ হা হা হা...

রাকা মাইনসে কেউ আসেনি। কেবল তারা জ্বলেছিলো সারাটা আকাশ জুড়ে। এক একটা তারা ছিলো এক একটা ফুলের মতই। ধর শালুক। ধর পদ্ম। আর সেও শরৎকাল...

রাত দুপুরে ট্রেন থেকে নেমে আসছে বাসন কোসন,হারানো তৈজস পত্রাদি,হারানো গান,’মধুমালতী ডাকে আয়!’ কে আসবে? নির্মলা মিশ্র,প্রতিমা মুখার্জি না সন্ধ্যা ?
মাগো আমার শোলোক বলা কাজলা দিদি কই? কাজলা দিদি কি তারা হয়ে গেছিলো? যেমন,নরেন স্যার।

হারানো নদী! যে নদী হারায়ে পথ ফিরিতে না পারে,সহস্র শৈবাল দাম বাঁধে আসি তারে! কেন এমন হয়? চিত্রা,সোনাই,কপোতাক্ষ. ..একটা নদী কি শুধুই নদী? তার বুঝি প্রাণ নেই? তার দু-তীর জুড়ে কত শতাব্দীর গো-পালন, কৃষি-চারণ, ন্যাংটা, ঘুটি, ইন্টি, বিন্তি নিয়ে সংসার! আর সন্ন্যাসী, সন্ন্যাসী আমার বন্ধু ছিলো, তখন ক্লাস এইট, গঙ্গায় স্নান করতে গেল, আর ওঠেনি। একটা বৃষ্টি সকাল, টুপটাপ বৃষ্টি পড়েই চলেছে, আর একতলার ঘরে বসে দেখছি পাশের বাড়ির পাঁচিল, জমা শ্যাওলা, মানচিত্র বদলে যাচ্ছে! বদলানোর আগেই যে মানচিত্র, সেখানেই কি স্বপ্নের দেশ ছিলো? জমি, সবুজ ছেয়েছে দিগন্ত, মাঠ জুড়ে সুর্য ডুবছে... কিছু পর কুহেলি আসবে। সাথে পুলিশ কনস্টেবল হবু বর। আর বলবে, ‘তোমার মা পাগল। আমাদের বিয়ে হওয়া অসম্ভব! আমি মোমআগুনে হাত পোড়াবো... পুড়তে পুড়তেই কি সোনা খাঁটি হয়?

আসলে জানো এক জীবন দুঃখের সেঁকো বিষ জিভে দিয়ে নীল হতে হতেও আমরা বলতাম-

এক মিনিট স্থির হয়ে বসা এক ইঞ্চি বুদ্ধ হয়ে ওঠা। আমরা একটা সকাল গড়েছিলাম। একটা সন্ধ্যে রাত, দূরের দলমা পাহাড়ে যখন এক এক করে আলো জ্বলে উঠছে, মশার কামড় খেতে খেতে নেমে আসছি... আমাদের অবতরণ আছে! উত্তরণ? বাড়ির পাশে আরশিনগর সেথায় পড়শী বসত করে! কে আমার পড়শী? অতীত? এই যে অতীত নিয়ে বেঁচে আছি এতগুলো দিন, গায়ে, শ্যাওলা জমেনি? সুবর্ণরেখাকে ডান দিকে রেখে ডিঙি নৌকোয় ওপারে যাই...

কিন্তু যাবো কি করে, মাঝি তোর নাম জানিনা, আমি ডাক দেব কারে?

মা উল বুনতে বুনতে গায়, জুড়াইতে চাই কোথায় জুড়াই...

অনেকটা যন্ত্রণার অমনিবাস – এ আমির আবরণ! আমাদের তেমন কিছুই হল না! কেবল ওই শাপভ্রষ্ট মানুষের মত দিন থেকে দিনে পৌঁছে যাওয়া। এরপর একদিন চৌকিদার নামক অমিত বা নরেন্দ্র এসে বলবে তোমরা এ দেশের নাগরিক নও! মাথা পেতে সরে যাবো, অপুর পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাবো লবটুলিয়ায়৷ সত্যচরণ যেখানে জমি জরিপ করতে এসে দোবরু পান্নার নাত্নী ভানুমতীর প্রেমে পড়ে। কিছু পর ধাতুরিয়া বালক ট্রেনের নীচে গলা দেবে! হা! জীবন, সব চরিত্রই কাল্পনিক তবু নস্টালজিক হও! গ্রামার মানো বা না মানো, হে অসিদ্ধ পুরুষ, তুমি হেরো তাই অতীতচারী! হয়ত তাই! তবু এ সংখ্যা জুড়ে শরৎ তাই একক আর নিভৃতচারী! এসো অপুর পথে হাঁটি। পথের পাঁচালিতে আমরাও রইলাম সাদা আর কালোয়, ব্যাটেলশিপ পোটেমকিন, পেরামবুলেটর নেমে আসছে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে...

ঐহিক অন লাইন এলো! খুঁত থাকুক৷ তবু তো জীবন, কুয়াশায় হাঁটছি পেছন দিকে, আর আপনি?