সিন্ধুলিপির ব্যবচ্ছেদঃ নেচারের একটি জার্নালের সাম্প্রতিক সংখ্যায় প্রকাশিত বহতার গবেষণা পত্র

বহতা অংশুমালী




আমাদের ভারতবর্ষের স্কুল কলেজে শিক্ষিত লোকেদের মধ্যে খুব কম লোকই আছেন, যাঁরা তাঁদের ছোটবেলায় ইতিহাসের ক্লাসের উদাস দুপুরগুলোতে কখনো না কখনো গালে হাত দিয়ে ভাবেন নি সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতার লিপির কথা। সেই লিপি না কি পড়াই যায় নি এখনো। আমরা যারা কম্পিউটারের যুগের আগে ছোট থেকে বড় হয়েছি, তাদের হাতে তো ইণ্টারনেট ছিল না। ছিল না, নানান অনলাইন মিউজিয়াম বাড়িতে বসে ইন্টারনেটে সার্ফ করবার চাবিকাঠি। আমরা ছোটবেলায় জানতামই না সিন্ধু লিপি নিয়ে দেশ বিদেশে কী পরিমাণ গবেষণা হয়েছে, এবং হয়ে চলেছে। আমরা অনেকেই জানি মিশরের ইজিপশিয়ানদের হিয়েরোগ্লিফ (Hieroglyph) পড়ে ফেলেছিলেন শাঁপলিয়ঁ, তাঁর কপ্‌টিক (Coptic) ভাষাজ্ঞান আর রোসেটা স্টোন (Rosetta Stone) এর দ্বিভাষিক লিপিদ্বয়কে কাজে লাগিয়ে, যেখানে গ্রিক লিপি আর হিয়েরোগ্লিফিক লিপিতে রাজা পঞ্চম টলেমির অনুশাসন লিখে রাখা ছিল। এই দুই লিপির দুই অনুচ্ছেদে যেহেতু লজেঞ্চুশ এর মতো দেখতে কার্টুশ আকারের বন্ধনীর (  )মধ্যে রাজাদের নাম লেখা ছিল, সেই নামগুলি পড়তে পারা গ্রীক লিপির অক্ষরের সঙ্গে তখনো অব্দি না পড়া যাওয়া মিশরীয় লিপির চিহ্নগুলির অবস্থান মিলিয়ে মিলিয়ে, শাঁপলিয়ঁ প্রথম আবিষ্কার করেন কিভাবে পড়া যাবে মিশরীয় চিহ্নের সাহায্যে রাণী ক্লিওপ্যাট্রার নাম। কিন্তু সব প্রাচীন স্ক্রিপ্টের ভাগ্যে তো আর রোসেটা স্টোন জোটে না। আমাদের সিন্ধু সভ্যতার কপালেও জোটে নি কোন দ্বিভাষিক লিপি খোদাই করা পাথর। তাই অনেক মানুষ মনে করেন যে সেই লিপি পড়াই যাবে না কোনদিন। আর বাকিরা যে, যে ভাষা জানেন, সেই ভাষার দেবদেবীর নাম, প্রাচীন মানুষজনের নাম এই সব বেমালুম নিজেদের ইচ্ছে মতো পড়ে ফেলতে চান সিন্ধুলিপির ঘাড়ে চেপে। তবে সবাই কি তেমন? নাঃ। খুব গুরুগম্ভীর অগাধ পণ্ডিত অনেক স্কলার কাজ করেছেন সিন্ধু লিপি নিয়ে, করেও চলেছেন। যেমন Asko Parpola, যিনি ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সর্বার্থে বেদজ্ঞ, পৃথিবীর সবচাইতে অগ্রগণ্য ইণ্ডোলজিস্টদের মধ্যে একজন। আর ছিলেন পদ্মশ্রী ইরাভথম মহাদেবন, প্রখ্যাত তামিল-ব্রাহ্মী এবং সিন্ধু-লিপির গবেষক, যিনি পেশায় একজন ব্যুরোক্র্যাট হয়েও প্রথম সিন্ধুলিপির ডিজিটাইজ্‌ড কর্পাস তৈরি করেন সেই কবে ১৯৭৭ সালে, যার ভিত্তিতে তিনি নিজে, এবং আরো অনেকে সিন্ধু-লিপির উপরে বিজ্ঞান সম্মত গবেষণা করেছেন আর করছেন। আছেন আরো কত জগদবিখ্যাত আর্কিওলজিস্ট, লিঙ্গুইস্ট, ইণ্ডোলজিস্ট, যাঁরা এই বিষয়ে অক্লান্ত গবেষণা চালিয়ে গেছেন। বিখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ পুরাতত্ত্ববিদ Jonathan Mark Kenoyer এর নির্মিত harappa.com ওয়েবসাইটে গেলে এই সব সম্পর্কে সম্যক জানতে পারবেন উৎসাহী পাঠক। আমি, বহতা অংশুমালী মুখোপাধ্যায়, পেশায় সফটওয়ার ডেভলপার, কি জানি কেন আদার ব্যাপারি হয়ে এইসব জাহাজীদের কাজ দেখতে গেছি, আর ডুবেই গেছি সেই অগাধ জ্ঞানের সমুদ্রে। অনেক হাঁপিয়ে হুঁপিয়ে বছর কয়েকের দমবন্ধ ডুবুরি অধ্যবসায়ে, জলের তলা থেকে খানিক মণিমুক্তো যা আনতে পেরেছি, তার একভাগ প্রকাশ পেয়েছে Nature ব্র্যাণ্ডের জার্নাল Palgrave communications এর জুলাই, ২০১৯ সংখ্যায়। বাকি ভাগ ছেপে বেরোবার টানেলে এখনো জায়মান, আলোর মুখ দেখেনি পুরোপুরি।
আমার গবেষণার কাজটি সিন্ধুলিপির পাঠোদ্ধারের পথে একটি অতি প্রয়োজনীয় সিঁড়ি। সিন্ধু-লিপির প্রায় সবগুলি দিকই ভীষণ রকম ভাবে বিতর্কিত। যখন Steve Farmer, Richard Sproat, Michael Witzel নামক বিখ্যাত গবেষকেরা দাবী করেন যে সিন্ধু লিপি কোন ভাষাগত লিপিই নয়, তখন Bryan Wells, যিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই লিপি নিয়ে ডক্টরেট এবং এই বিষয়ক দুটি বই এর লেখক, আর পারপোলা, যিনি স্বনামধন্য অগ্রগণ্য ভাষাবিদ, তাঁরা বলছেন এই লিপি লোগোসিলেবিক, যেখানে এক একটি লিপিচিহ্ন এক একটি অক্ষরকে বোঝায়, আবার কোথাও কোথাও একাক্ষরী শব্দকেও। আবার এই থিওরির বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে মহাদেবন আদি গবেষকেরা দাবী করেছেন যে এই লিপি লোগোগ্রাফিক, চিহ্নগুলি শব্দচিত্র, একটি চিহ্ন একটি শব্দকে বোঝায়। আমি তো শুধু কয়েকজনের নাম করলাম। এমন কত যে দিগগজ পণ্ডিত গবেষক আছেন, যাঁদের কাজের এক একটি অংশ নতুন দিগন্ত খুলে দেয়, আবার অন্য এক একটি অংশ হয়তো খুবই অযৌক্তিক। এঁদের কারোর কারোর কাজের আর একটি সমস্যার দিক হলো এই যে, শব্দের মতো করেই হোক, বা অক্ষরের সঙ্গে অক্ষর জুড়েই হোক, যখন এনারা সিন্ধুলিপি পড়তে মনস্থ করেন, তখন যাঁর যেমন ইচ্ছা প্রায় তেমনটিই পড়ে ফেলেন। সেই পড়া খানিকটা আমাদের রামকৃষ্ণ ঠাকুরের বলে যাওয়া "যত মত তত পথ" এর মতো। আর, প্রতিটি লিপিচিহ্ন, এনাদের এই তর্কবিতর্কে অতিষ্ঠ, ঝালাপালা। যেমন, চিহ্নটি সিন্ধুলিপির অধিকাংশ বাক্যাংশের শেষভাগে বসে। এটি সিন্ধুলিপির সবচেয়ে বারংবার ব্যবহৃত চিহ্নও বটে। এখন মহাদেবনের মতে, এই চিহ্নটি দ্রাবিড়ীয় পুংলিঙ্গবোধক একবচনের সর্বনাম, যা বাক্যাংশের শেষে বসে। তা ছাড়াও মহাদেবন মনে করেন যে এই চিহ্নটি যাগেযজ্ঞে ব্যবহৃত উৎসর্গ পাত্রও বোঝায় কিছু ক্ষেত্রে। কিন্তু ব্রায়ান ওয়েলসের মতে,  চিহ্নটি ক্রিয়াপদের শেষাংশ যার ধ্বনি খানিকটা "-ay" এর মতো শোনায়, আর যা ক্ষেত্রবিশেষে আদি-দ্রাবিড়ীয় শব্দসংগ্রহে "গরু" এবং "মা" শব্দের সমার্থক। বুঝুন অবস্থাটা। একই চিহ্নকে এক পণ্ডিত বলেন "উৎসর্গ পাত্র", অন্য পণ্ডিত বলেন "মা" এবং "গরু"। একজন তাকে বলেন সর্বনাম, অন্যজন বলেন ক্রিয়াপদ। আবার Steven Bonta-র মতে,  একটি মূল-শব্দাংশ (root) যা কিনা অধিকার-জাতীয় শব্দ, মানে "আমার", "তাহার", ইত্যাদি বোঝায়। এইজন্যই বিখ্যাত গবেষক Gregory Possehl বলে গেছেন “কোনো কোনো গবেষকের ক্ষেত্রে কিছুটা অধৈর্য তাঁদের প্রারম্ভিক কিছু প্রাক্-কল্পনা দ্রুত এক গুচ্ছ সিদ্ধান্ত ও পাঠে পৌঁছে যেতে প্ররোচিত করেছে”।
আমার কাজের মূল লক্ষ্য সিন্ধু শব্দচিহ্নগুলিকে কোন বিশেষ আইডিয়ালিজ্‌ম এর চশমায় না দেখে, তাদের মানে, তাদের ধ্বনিরূপ আগেভাগে বার করতে না চেয়ে, তারা কেমন ভাবে একে অন্যের সঙ্গে আগে পরে নিয়ম মেনে বসে, তাদের আকার আকৃতি কীরকম, তারা কেমন ধরণের বস্তুসামগ্রীতে খোদাই করা হয়েছিল, সেই সামগ্রীগুলি কেমন কেমন জায়গায় আর কোন কোন প্রাচীন বস্তুর কাছাকাছি পাওয়া গিয়েছিল, এইসব পর্যালোচনা ক'রে দেখা। সেই দেখার ভিত্তিতে অনেকানেক কথা বলা যায়। যেমন গ্রীকদের অতি প্রাচীন লিপি লিনিয়ার-বি (Linear B) ঠিক হরপ্পান লিপির মতই দুর্দশাগ্রস্ত ছিল এককালে। যে যেমন খুশী সেই লিপিকে পড়ে ফেলতো। অনেকের আবার গভীর সন্দেহ ছিল যে, গ্রীক খোদাই গুলিতে হোমারের গীতিকাব্যের কাব্যাংশ সমূহ লুকিয়ে আছে। কিন্তু মহামান্য গবেষিকা Alice Kober, এই সব ভুলভাল অপচেষ্টার ভয়ঙ্কর রকম বিরোধিতা ক'রে, নানান সাংস্থানিক (structural) বিশ্লেষণের এর মাধ্যমে লিনিয়ার-বি লিপির পাঠোদ্ধারের প্রথম সোপান রচনা করেন। তাঁর পথ ধরে, নিজের আবেগ এবং মেধাকে কাজে লাগিয়ে লিনিয়ার-বি লিপির পাঠোদ্ধার ক'রে ফেলেন মাইকেল ভেন্ট্রিস, যিনি পেশায় এক আর্কিটেক্ট ছিলেন, ভাষাবিদ বা ঐতিহাসিক ছিলেন না। আমি সেই অসামান্যা নারী অ্যালিস কোবারকে গুরুপদে বরণ ক'রে, আমার গবেষণা পত্রে নানান গাণিতিক এবং ইন্টারডিসিপ্লিন্যারি পদ্ধতি প্রয়োগ ক'রে দেখিয়েছি যে বেশিরভাগ সিন্ধু খোদাই কোনভাবেই ফোনেটিক্যালি লেখা নয়। সেই চিহ্নগুলির নানান শ্রেণীকরণ ও করা হয়েছে আমার গবেষণায়। তাই, সুধী, এখন থেকে, এক্স-চিহ্নটি হলো "গা", ওয়াই-চিহ্নটি হলো "ধা", এরকম ক'রে তৃতীয়সুর ষষ্ঠসুর মিশিয়ে, যদি কোন গুপী বহুদূর চলে যেতে চায় পাঠোদ্ধারের সিঁড়ি বেয়ে, তাকে পত্রপাঠ নিজ মস্তিষ্ক থেকে বহিষ্কৃত করবেন প্লিজ। অত্যন্ত লজ্জার সঙ্গে জানাই যে, আমার অতি সৌভাগ্য, আমার গবেষণায় করা সিন্ধুলিপির ব্যবচ্ছেদকে বিশ্ববরেণ্য কিছু গবেষক, সিন্ধুলিপির শব্দচিহ্ন হবার সপক্ষে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হিসেবে নির্ধারিত করেছেন। কিন্তু এসমস্তই যদি মনে হয় বিরক্তিকর কচকচি, যদি আপনার মনে প্রশ্ন জাগে যে "সবই তো বুঝলাম, কিন্তু পাঠোদ্ধারটি হলো কই"? তাহলে আংশিক পাঠোদ্ধার সহ দ্বিতীয় গবেষণা পত্র আসিবে, শীঘ্রই আসিতেছে, আসিতেছে আসিতেছে। কিন্তু সেইটি পড়তে চাইলে, আগে এইটি একটু পড়ে দেখুন। অনেক অনেক ধন্যবাদ।
বিস্তারিত পড়তে ক্লিক করুন