বিলাসের ভুল

প্রশান্ত গুহ মজুমদার

ভুলের অনেক চক্রবর্তী আছে। এখানে সেখানে তারা ফাঁক পেলেই নাক গলিয়ে দেয়। সে ভারি অস্বস্তিকর। বাহুসন্ধির উপযোগিতা যে এ কারণেই, তা ওদের থেকে আর কেউ বোধহয় ভালো জানে না। আমার কিন্তু হাসি পায়। আমার কাছে যে ওই সব ভুলের কোন মোকাসিন-ও যে নেই, এটা ভুলসব ঠিক জানে, তবু এমন। তাই হাসি। আমার তো ভুল জন্ম। তাই ভুলের সঙ্গে আড়ি আমার। সেই যেদিন, চাঁদ আর আকাশের ভারি মাখামাখি, বাতাস নেচে নেচে সঙ্গত করছে, সবে কাছে নিচে কোথাও বাড়ির নতুন বৌ বাজিয়ে দিল শাঁখ কত না আশা আর আশঙ্কায়, আমার কচি হাতটা ধরে কড়িবরগার ছাদে নামিয়ে দিতে দিতে একজন বলল, কি রে থাকবি এখানে? আমার খারাপ লাগছিল না! হালকা ধোঁয়ার সঙ্গে বেশ একটা সোঁদা গন্ধ, অনুপম বাতাস ধুয়ে দিচ্ছে আমার ন্যাংটো শরীর, এক সাদা স্থির অথচ আকুল মূর্তি, অপেক্ষায়। আমি আর ভাবি নি কিছু। সে আমার আরেক জন্মের শুরু। এক প্রবাসী জীবন। ঠিক জন্মের উল্টোদিকে।
ক্রমে অবশ্য ভুলেরও সদর অন্দর বুঝতে পারছিলাম। কিংবা কোন কিছুই আমার এই পৃথিবীতে ভুল নয়। যা আমি করছি, যা আমি করব, সবই অনিবায এবং সে কারণেই ঠিক। বুঝেছিলাম, সদরে অনেক ভাগ। মেটিস-এর কথা মনে পড়ে। গ্রীক দেবতা জিউসের স্ত্রী মেটিস। বেশ চৌখস মহিলা ছিলেন। তারা দু জনেই কিছু ভুল করেছিলেন। তা কেমন ভুল! এই ভুল সদরের। যেমন ইওস আর টিথোনাস-এর ব্যাপারটা। যেমন দশরথপুত্রের। রোমান নাট্যকার প্লটাস এ ভুল ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বেশ নাড়াচাড়া করেছেন। আর অন্দরের ভুল কেবল নিজেকে পোড়ায়। দু দিকেই জ্বলতে থাকা মোমবাতির মত। ফুরিয়ে যায়। কবিদের মত। যেমন বিদুর। সেখানেও কি রবীন্দ্রনাথ নেই!
আমি বিলাস। আমার এ সব নেই। না আছে রাজ্যপাট হারানোর ভয়, না প্রেয়সী। ভুল তো সেটাই, যা কিনা আমাকে নিয়ে যাবে ঠিক থেকে দূরে। আমার ঠিক বলে কিছু নেই! তা হলে ভুল কি ভাবে আমার হবে! কিম্বা আমার সবটাই ঠিক। ঐ যে একদিন অচেনা ঠিকানায় নেমে পড়লাম, মুখটা গুঁজে দিলাম চির-সাদা উষ্ণতায়, সেটাই তো আমার তখন ঠিক ছিল। সেটাই আমার অন্তিম ভুল। তারপর আর ভুল করি নি। ভুলের স্বপক্ষে স্মরণীয় জনেরা যতই বলুন না কেন।
আসলে হয়েছে কি , আমি তো থাকি এক দিগন্তবিস্তৃত আর্শির উল্টো পিঠে। সেই খেলা ঘরে যেমন অনেক কিছু। যেমন বাসনা। যেমন ভালবাসা। এখানে সবই সোজা এবং অনিবারণীয়। ঐ যে ওমর খৈয়াম তাঁর রুবাইয়াৎ- এ বলেছেন, এই বিরাট বিশ্ব-সংসার কোন্‌ নিয়মে চলে, কি করলে ঠিক কর্ম করা হয়, এসব বোঝা তোমার আমার সাধ্যের বাইরে। অতএব যে দুদিন এ সংসারে আছ সে দুদিন ফুর্তি করে নাও; মরার পর কে কোথায় যাবে, কি হবে, না হবে তার কোন ঠিকঠিকানা নেই। এদিকে আমার এই প্রবাসী জীবনে তো মরার ভয় নেই, শুধু ফিরে যেতে হবে কখনো, এই যা। বয়ে যেতে হবে। তাই ঠিকবেঠিক-এর তোয়াক্কা করা আমার কম্ম নয়। তাই পরান্নং প্রাপ্য দুর্বুদ্ধে, মা প্রাণেষু দয়াং কুরু। পরান্নং দুর্লভং লোকে প্রাণাঃ জন্মনি জন্মনি।। দিনরাত্রি নিজেকেই বলছি, ওরে মূর্খ, নেমন্তন্ন পেয়েছিস, ভালো করে খেয়ে নে। প্রাণের মায়া করিস নি। ভেবে দ্যাখ, নেমন্তন্ন কেউ বড় একটা করে না। বেশি খেয়ে যদি মরে যাস, তাতেই বা কি! ভগবান তো প্রাণটা ফ্রি-তেই দেয়, তার জন্য খর্চা তো আর করতে হয় না। অবশ্য আমার সবটাই মুফতে। একেবারেই পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা।
সেই নিমন্ত্রণে আমার জায়মান জীবন। সেখানেই আমার ঠিক-এর যত সালতামামি। একবার শুনশান দুপুরে তুলসি আর মনীন্দ্র কাঁটার ঝোপ থেকে আমার সঙ্গে এসেছিল এক মানুষ। নাকটা খসেছে, পায়ের চারটে আঙুল যেন ছিল না কখনোই, চোখদুটো আছে তবে তেমন আর দেখতে পায় না। দু হাতেই সাদা ফেট্টি। তাকে নিয়ে এসেছিলাম। সামান্য খনখনে গলায় দুটো ভাত চেয়েছিল। চারপাশে তখন বড্ডো হট্টগোল। ঐ তাদের চাঁদের মত ছেলে গেল বুঝি চিরকালের মত। ভাত মেখে তাকে দিয়েছিলাম সামান্য। সে তার সাদা হাত রেখেছিল আমার ছোট্ট কাঁধে। বাইরে পা রাখার পর সে আমার প্রথম ঠিক কাজ।
একবার সন্ধ্যার অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছিল কারো বা একটা ছাগল। পাশের পুকুরের ও পাড়ে সে গিয়েছিল। কোন লোভে, কে জানে! ফিরে আসতে পারে নি। খুঁজে খুঁজে যখন তাকে, গলায় ফাঁস আটকে পুকুরপাড়ে ঝুলছে। গলায় একটা অপার্থিব শব্দ শুধু। কোন ভাবেই ফাঁস থেকে ওকে ছাড়িয়ে আনতে পারি নি। হাতে ছিল বাঁশের একটা ছিলকা। খুব সর্ন্তপনে কয়েকবারের চেষ্টায় ওর গলাটা, তারপর মাথাটা নামিয়ে আনতে পেরেছিলাম পুকুরের লাবডুব জলে। চাঁদ তেমন ছিল না। না হলে বোঝা যেত কতটা রঙ পাল্টে ছিল সেদিন ঐ জল। বহুদিন তারপর ওপারে আমি যাই নি। ঠিক কাজগুলোর কাছে আমি বারবার যাই না।
ঐ যে মেয়েটা। শীতের খুব দুপুরে প্রায়ই আমাকে ডাকত। তখন আমি কৈশোর পেরোচ্ছি। বড় কৌতূহল শরীরে, শরীরে। সব সময়েই যেন দেখতে পেতাম শ্রাবণ ঐ সব অনিন্দ্য গ্রীবা ছুঁয়ে ফুটে ওঠা আনন্দকুঁড়ি জুড়ে খেলতে খেলতে নেমে যাচ্ছে এক গভীর তপোবনে। সেখানে শবরীর অপেক্ষায় অকূল দরজা। এতখানি আমি দেখতাম। আর ঐ মেয়েটা, শীতের বিকেল পেরিয়ে যখন কমলা হয়ে আসছে, আমাকে মনপসন্দ আহার তুলে দিত অক্লেশে। ও ভুল করছিল। ও, টের পেতাম, তখন সুন্দরের কথা ভাবত। আমি নই। সুন্দরে আমার বিশ্বাস নেই। একদিন খুব আর্ত দুপুরে ওর সবটুকু সঞ্চয়, ওর অশোকলতা আকুল তুলে দিতে চাইল আমার শাসনে। ওর মুখটা, ওর ঘন আশ্লেষে বন্ধ হয়ে আসা চোখ একবার দেখেছিলাম শুধু। ঐ অনিন্দ্য গ্রীবা। একটা লাল তিল। তারপর শুধু সামান্য চাপ। আমি ভুল করি না। ও কেন প্রচলিত সুন্দরের দিকে যাবে!
ভুল আমি পছন্দ করি না। বদলে দেওয়ার সে ছিল এক তুমুল দিন। রাত্রিগুলো ছিল শুধু এক নতুন প্রভাতের অপেক্ষায়। এমন এক রাত্রে গুপ্তি, জমিদারবাড়ির অন্যতম এক আহরণ, তুলে দিয়েছিলাম এক সহযোদ্ধার হাতে। নিয়েছিলাম আমি শুধু একটা ছ ইঞ্চি লুকিয়ে যাওয়া ছুরি। সে গুপ্তি ও যখন এক বুর্জোয়ার বাঁ দিকের পিঠে অব্যর্থ প্রবেশ করিয়ে দিতে তন্ময়, মনে হয়েছিল ভুল হচ্ছে। একটা কোথাও আটকে যাচ্ছিল ও। মুহূর্তে পিছন থেকে ওর গলাটা শাক্তমতে ছিন্ন করেছিলাম। ভুল আমার পছন্দ নয়।
স্ব-অধীনের এই জীবনে কোথাও আটকে যাওয়া একেবারেই না-পসন্দ আমার। এক কবি বন্ধু বিশ্বাস করতেন, ‘...ভাঙ্গার শব্দ ছবিত আমাদের মূর্খ আয়নায়...’। ওকে নিয়ে গড়ের মাঠে গিয়েছি। ৬ তলায় সংঘমিত্রার সামনে বসিয়ে খুলে খুলে দেখিয়েছি ওকে পদ্মের গভীর কুসুম। তবু একা ঘরে ও লেখে,’...একা একা এমন অশ্রু ঘুরে ঘুরে কেন তোমার নিভৃতে...’। ক্রমে বিপরীতে চলে যাচ্ছিল ও। যেমন মেনিটা। বড় বেশি নেওটা হয়ে পড়ছিল আমার। পায়ে মাথা না ঘসলে ওর ঘুম আসতো না। জড়িয়ে পড়ছিলাম যেন। এক শীতের দুপুরে কাজটা করেই ফেললাম। ওর চামড়া ছাড়িয়ে মেলে দিলাম চিলেকোঠার আলসেয়। ভাল পাপোষ হতে পারে কারো। আমার নয়। ঘুমের আর কোন প্রয়োজন অন্তত ওর হবে না। আমার কবিবন্ধু ঐ সব প্রাচীন শব্দ আর ভাবনা শুনিয়ে শুনিয়ে প্রায় পেড়ে ফেলছিল আমাকে। আর্শির সামনে দাঁড়ানোর ইচ্ছাটা চাগিয়ে দিচ্ছিল। এক বৈশাখে সমস্ত রাত্রিজুড়ে কবিতা শোনার পর, আলো তখনো তেমন ফোটে নি, সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললাম। আমাকে বা কোন কবি-আড্ডায় ওর কবিতা আর শুনতে হবে না কোনদিন। ভুলের বেসাতি কত সহ্য করা যায়! বিশেষ করে তা যদি সংক্রামক হতে শুরু করে!
এই ভাবেই তো এতদিন। পাহাড় ভুল করে না। অরণ্য নির্বিকার। বহুদিন তাই পাহাড় আর বৃক্ষের সহবাসে। যে কোনদিন দূরে যেতে পারি। তাই আছি। তবে ইদানীং মনে হচ্ছে, সব কিছুই একটু আধটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখার। ভুল করার স্বাধীনতা না থাকলে সে স্বাধীনতাপ্রাপ্তি অর্থহীন -গান্ধীবুড়ো শুনিয়েছেন গত বৃষ্টিরাতে। তারপর থেকেই মন ছটপট। আমিও কি কোথাও পরাধীন হয়ে পড়ছি! ঐ যে অশেষ এক ছুতমার্গ, ভুল থেকে দূরে থাকতেই হবে! দেখা তো কম হল না। তবু দেখা হল কি ঠিকঠাক! মনে হয়, ‘“মনুষ্যত্ব মিলিল কই...।... আর কি মিলিবে না?’” এমন ভাবতে ভাবতেই দেখি বিড়াল-এর ছায়া গন্ডী পেরিয়ে যাচ্ছে। ফিরে আসছে আরেকটা বিড়াল। অনুশোচনাহীন, সময়হীন।
প্রবাসী জীবনে বহুকাল পর কোথাও যেন একটা খটকা। দ্বিধা। আয়নার বিপরীতে এ জীবনের শাল-শিমূলে যেন শীতের বাতাস। সব ঠিকটুকুই কি ভুলের ঠিক বিপরীত! আমার সব প্রশ্ন তো শরীরের কাছেই। আর তিতলি এই চক্করে আমাকে। আমার চাওয়া ভুল না। আমার পাওয়াও তেমনই ঠিক। যেমন আমি চাই। যেমন আমি ভাবি। নির্ভুল। কিন্তু তিতলি ধন্দে আমাকে। আজ আবার তিতলিকে তাই। এল ই ডি আলোর ন্যুনতম আলোর পরিসরে তখন চমৎকার স্পেস। ও সামান্য দুলছে। আমিও। বহুবার, তবু নতুন দেখার ইচ্ছে। নতুন যদি কিছু। আরো স্বচ্ছ, ভুলের বহুদূরের কোন নতুন সমীকরণ! পিছনে আলোর নিচু স্বর। একে একে সব আভরণ, সব আবরন। কাঁধের ওপরে বাদামী চামড়ায় আলো। সাহসী স্তনের নিচে সামান্য ছায়া, নাভির আভাস।
-এগিয়ে এস।
তর্জনী সোনালী রেশমে। ও কি একটু শিউরে উঠল! ওর একটা বুকে ওষ্ঠ, করতলে বাম স্তন। দু হাত দিয়ে ও চেপে ধরল আমার মাথা।
-পাচ্ছো?
উৎসুক ও। উত্তর দিলাম না।
-যেটা এমন খুঁজছো, পেয়েছ তার কিছু?
নিজেকে আরো ভিতরে। পেতে তো আমাকে হবেই।
-এত বারবার মাংসের এই সামান্য বিস্তারে কি খুঁজেছ তুমি? নাভি ছুঁয়ে যোনির অতুলে তখন নিজেকে। সেই বহুচেনা চড়াই উৎরাই, সেই গন্ধ।
-আঃ লাগছে! এবার পেয়েছ? তোমার সেই নতুন?
দমবন্ধ হয়ে আসছিল আমার। উঠে দাঁড়ালাম। এক উন্মুখ ঈষৎ বাদামী শরীরের মুখোমুখি। বহুদিন পর তীব্র ক্রোধ! কি খুঁজছি? কবে পাব তবে! ওর চোখদুটো প্রায় বন্ধ। ওর হাতদুটো আমার রোমশ পিঠে। একটা চড়-ই যথেষ্ট ছিল। ওকে চুপ করানোর জন্য। আমাকে নির্ভেজাল একটা ভুলে রেখে দেওয়ার জন্য।
ততক্ষনে চারপাশে হাজার আয়না। খুব শব্দ করে নেমে আসছে কেউ। নাকি সমস্ত সিঁড়িগুলোই! তবু ডানা মেলতেই একটা ব্যথা, একটানা এক শব্দ। তোমার জন্য কলঘরে কেউ জল তুলে রাখছে তখন। তোমাকেই ভাবতে ভাবতে কেউ গুছিয়ে রাখছে তোমার এই জীবনের সামান্য কিছু অবলম্বন।
তিতলি এই প্রথম আমাকে একটা ভুল ঘরে রেখে গেল।