কবিতাগুচ্ছ

ফারুক আহমেদ

কৈশোরকে, দর্জি দোকানে

বন মর্মরের ডাক। গহীন বনের ভেতর যে শান্তি ছড়িয়ে থাকে, তাই মৌমাছির মতো তোমাকে ঘিরে ধরে। তুমি ডুবে থাকো ঘিরে রাখা এক অমলধবল শান্তির প্রস্রবণে। এটুকু লেখার পর থামিয়ে দিলে। বললে- এ কথাগুলো তোমার কৈশোরসংশ্লিষ্ট। তোমার কৈশোরকে নাকি আমি একটা সবুজ ট্রেতে করে সবার সামনে হাজির করলাম। তাই যদি হয়, তাহলে আমার কৈশোর; সে কোথায়? সে কি মগড়া নদী পেরুতে গিয়ে সাঁতার ভুলে হারিয়ে গ্যাছে? সে কি গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফিরে আসেনি? সে কি সবুজ কার্পেটের মতো মাঠের পোকা হয়ে সেখানেই রয়ে গ্যাছে? এমন সব প্রশ্ন লাউয়ের ডগার মতো মাথা তুলে তাকিয়ে থাকে।

এসব নিয়ে দর্জির দোকানে হাজির হই। গিয়ে বলি- হেমন্তের ফাঁকা মাঠ, টুপটুপ শব্দে শিশির পড়ার রাত, তাল পরা ভাদ্রের দুপুর, পানিতে ভেসে বেড়ানো কলাগাছের ভেলা আর ধানগাছের ডগায় থাকা শিশির একসঙ্গে সেলাই করে দিতে। বলি- এই টুকরো টুকরো দৃশ্যগুলো দিয়ে আমাকে একটা কৈশোর বানিয়ে দিতে। বলি আর ভাবি- এমন একটা কৈশোর, যা আমার হয় আবার হয় তোমারও।



আমার কাছে এলেই

আমার কাছে এলেই তুমি পাখি হয়ে যাও,
আমার কাছে এলেই তোমরা পাখি হয়ে যাও।
আমি কি যাদুকর? আমার স্পর্শের ভাঁজে কি
লুক্কায়িত আছে উড়ে যাওয়ার তাড়না?
না, তোমরা জন্ম থেকেই উড্ডীনশীল প্রাণ
তোমরা জন্ম থেকেই উড়ে যাবে, উড়ে যাবে
শুধু এতোদিন ভুলে ছিলে প্রতিভা।

ভয় লাগে, আমি ছুঁয়ে দিলে যদি পাঁকুড় গাছটি উড়ে যায়
ভয় লাগে, আমি ছুঁয়ে দিলে সবুজ মাঠ যদি হাওয়ায় মিলিয়ে যায়
ভয় লাগে, যদি কুয়াশা হয়ে যায় মেঘদল, শর্ষেক্ষেত বউ কথা কও পাখি।
তোমার সঙ্গে দেখা হওয়াও তখন মনে হয় বিপজ্জনক এক সাঁকো;
ছুঁয়ে দিলেই যদি হয়ে যাও শঙখচিল, পানকৌড়ি।



গুমরে ওঠার প্রাণ

বন্দর ঘুরে বেড়ানো নাবিকের সঙ্গে দেখা হলে
টের পাওয়া যায়, চোখে লেগে থাকা লোভের জৌলস।
তার বিপরীতে রাখালের বাহু ছুঁয়ে আসা হাওয়া নিয়ে দাঁড়াই।
বলি এ হাওয়া শর্ষেক্ষেতের- সবুজাভ, হলুদের ঘ্রাণমাখা।
তার বিপরীতে কংস নদীর বিকাল নিয়ে দাঁড়াই।
বলি- শেফালির হাসির থেকেও অপরূপ ও নদীর বিকাল।
উত্তর নাই। শুধু হাসি, সিগনাল বাতির মতো মিটিমিটি-
এ বুঝি মিটিমিটি অপেক্ষার বন্দর।

পৃথিবীর দূরবর্তীবন্দর অনেক বেশি আকর্ষণীয় কাছের নদীর বিকাল থেকে
বন্দর বেড়ানো নাবিক গাঙের স্মৃতিওয়ালা বালকের থেকে বেশি আকর্ষণীয়;
তবু বালক যে তার পকেটে রেখে দিয়েছে একটি গাঙের মোমবাতি।
তবু বালক যে অবিকল তোমার মুখের মতো একটি সলতে জ্বালিয়ে আছে।
তার উত্তর কী?
গাঙের বালক সমুদ্রের স্মৃতিওয়ালা নাবিকের কাছে কুপোকাৎ
যুগ যুগ ধরে একটা সন্ধ্যা এসে দিনকে কুপোকাৎ করে দেয়।
তবে সেই যে গুমরে ওঠা-
নীরু যখন বাঁশি বাজাচ্ছিল, তখন রোম গুমরে উঠছিল
ক্রুসেডের আগুনে যখন দলিত অ্যাক্রে তখনও গুমরে ওঠাই...
পৃথিবীতে বন্দর ঘুরে বেড়ানো নাবিক এবং গাঙের বালক,
একরম দুটি প্রাণ আছেÑ তাদের আমরা চিনি খুব করে।