ইলিয়াসের গল্প, গল্পের ইলিয়াস

মুম রহমান



সকলেই জানেন, জীবনভর লেখার কেরানিগিরি করেন নাই তিনি, বরং লেখাই পোষা বেড়ালের মতো তাঁহার পায়ে পায়ে ঘুরিয়াছে। দৈনিকের পাতায় পাতায় তাঁহার লেখা নিয়ত চোখে পড়ে নাই আমাদের। তাহার একেকটি গল্প কিংবা উপন্যাসের জন্য পাঠককে অপেক্ষা করিতে হইয়াছে মাসের পর মাস, কখনোবা বৎসরাবধি। নেহাত সবুরের ফল মিঠা বলিয়াই যে তাঁহার লেখার জন্যে পাঠক অপেক্ষা করিয়া সফল হইয়াছেন এমত সরল সমীকরণ করা যায় না; কেননা তাহা হইলে তাঁহার সাধনার মূল্য থাকে না। তাহার সাধনা ও সাধ্যের তুল্য মূল্য দেয়া অবশ্য সহজ নয়। যেমত সহস্র কয়লা বা কয়লাখনি ঘাটিয়া কদাচিৎ হীরক পাওয়া যায় তেমনি বাংলা সাহিত্য পাইয়াছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে। আমাদের সাহিত্যাসরে তিনি হীরার খনি, তাহার প্রতিটি লেখাই কালের বাজারে হীরক মূল্যে বিবেচ্য হইতে পারে। বলিয়া নেয়া ভালো, এহেন ক্ষুদ্র রচনায় তাঁহার লেখনির মূল্যায়নের সাধ বা সাধ্য নাই। কেবল, তাঁহার ‘জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’ গল্পগ্রন্থখানি প্রসঙ্গে দুএকখানি ব্যক্তিগত বাখানির পিপাসাতেই কী বোর্ডে আঙুল রাখিয়াছে অধম লেখক।
মাত্র পাঁচখানি গল্প নিয়া জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল গ্রন্থখানি সজ্জিত হইয়াছে। তেমন ফুল হইলে পাঁচখানা ফুলেই যে কতো মনোহর তোড়া হইতে পারে আলোচ্য গ্রন্থ তাহারই প্রমাণ বহন করিতেছে। ইলিয়াস যে বরাবর পরিমাণে নয়, লেখার মানে বিশ্বাসী এই গ্রন্থ তাহারও প্রমাণও বটে। মলাটবদ্ধ পাঁচখানা গল্প ১৬ বছর সময়কালে রচিত। গ্রন্থিত প্রথম গল্প ১৯৭৯ সালে [প্রেমের গপ্পো] এবং শেষ গল্প ১৯৯৫ সালে [রেইনকোট] রচিত। দীর্ঘ ব্যবধানে রচিত পাঁচটি গল্পই বিষয় বিচিত্রেও উল্লেখযোগ্য ভিন্নতার দাবী রাখে। রেইনকোট এবং শিরোনাম গল্প জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল [১৯৯২ সালে রচিত] গল্প দুটি মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত। রেইনকোট গল্পটি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের সময়কে তুলিয়া আনিয়াছে, তুলনায় জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল গল্পটির সময় ও কাহিনী ব্যপ্তি বৃহৎ। ছোটগল্পের আটোসাটো বাঁধুনি, দৃঢ়বদ্ধ কাহিনী গুণ বজায়ে রেখেও এ গল্প ঘটনা ও সময়ের বিস্তৃতির কারণে অনেকটা উপন্যাস পাঠের বর্ধিত আঙ্গিনায় নিয়ে যায়। এ গল্পটি নিয়েই আলোচনা শুরু করা যাক।
লালমিয়া বন্ধু ইমামুদ্দিনের পুত্র বুলেটকে স্বপ্ন বর্ণনা করিতেছেন - এই দিয়াই গল্পখানি শুরু হয়। বুলেট বারবার নানা প্রশ্ন করিয়া লালমিয়ার স্বপ্ন বর্ণনার উৎসাহে ভাটা আনিয়া দেয়। বুলেট অবশ্য ইচ্ছাকৃত এমত করে তাহা বলা যায় না। কেননা বুলেটের নিহত বাবাও একদা এমন করিয়াই লালমিয়ার সঙ্গে তর্ক করিতো। ধরা যায়, বংশগত এক প্রবণতাই তাহার আচরণে বিরাজমান। গল্পের পূর্ব ইতিহাস রূপে আমরা জানিতে পারি যে, ইমামুদ্দিন এবং লালমিয়ার বেড়ে ওঠা একত্রেই। লেখকের ভাষায় - ‘হাজার হলেও তারা বাচপানের দোস্ত। রায়সাবাজার পুলের উপর মসজিদে কায়দা-আমপাড়া পড়া শুরু করে মাঝখানে খান্ত দেওয়া থেকে রূপমহল মুকুল নাগরমহলে একসঙ্গে সিনেমা দেখা, বাংলাবাজার ইস্কুলের সামনে ১০ টায় ৫ টায় গিয়ে টাঙ্কি মারা, চৈত্র সংক্রান্তি দিনে ঘুড়ি ওড়াতে এর ঝাদ থেকে ওর ছাদ থেকে পড়তে গিয়ে কার্নিশ ধরে ঝোলা, এমনকি বলতে নাই, তওবা আস্তাগফেরুল্লা, খানকিপট্টিতে কয়েকবার ঘোরাফেরা করা - সব তো সম্পন্ন করা হয়েছে একসঙ্গে, একই সাথে।’ একসঙ্গে, একসাথে সব কাজ সম্পন্ন হইলেও, জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় তাহারা আলাদা হইয়া যান। ইমামুদ্দিন মুক্তিযদ্ধে চলিয়া যান, আর লালমিয়া রাজাকার মহাজন নাজির আলির লন্ড্রি সামলানোর দায়িত্ব নেন। ইমামুদ্দিনের কথায় নিজে যুদ্ধে যাওয়া তো দূরের কথা বরং তাহাকেই যুদ্ধে যাইতে না-করিয়াছিলো লালমিয়া। কিন্তু বন্ধুর কথা শোনে নাই সে। যুদ্ধে সে মারা যায়। লালমিয়ার দুঃখ ‘ইন্ডিয়া যাবার আগে লালমিয়াকে ছেলে সম্বন্ধে একটি কথাও যদি ইমামুদ্দিন বলে যায় ‘তর বাপে আমারে কইয়া গেছিল, দুধের পোলারে রাইখা যাই, দেখিবি’, মৃত বন্ধুর মুখে এই ডায়লগটা ফিট করে দিতে তার একটুও বেগ পেতে হয় না। অনেকবার চেষ্টা করেও লালমিয়া বুলেটের সামনে এই সংলাপ ছাড়তে পারেনি। বেইমানটা স্বপ্নেও যদি আসে তবু তো অনেক কথা বা যায়। মরার পর কি জাগরণে কি স্বপ্নে ইমামুদ্দিন তার সঙ্গে কোন সম্পর্কই রাখল না।’ ইমামুদ্দিনের মৃত্যুকে লালমিয়া মানিয়া লয়, তাহার পুত্র এবং মা’র দায়িত্বও সে গ্রহণ করে। যুদ্ধ শেষ হইয়া যায়। ইমামুদ্দিন ফেরে না, তাহার কোন স্বপ্নও সফল হয় না। বরং রাজাকার নাজির আলি আরও বড় হয়। বুলেট কাজ করে লালমিয়ার মোরগ পোলাওয়ের দোকানে। কিন্তু এইসবই হইলো গল্পের বাস্তব প্রেক্ষাপট। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অনেক নির্মম সত্যর মতোই এ গল্পের মুক্তিযোদ্ধার স্বপ্ন হারিয়ে যায়, রাজাকারেরা প্রতিষ্ঠিত হয়। এ আমাদের জানা গল্প, চেনা আফসোস - কিন্তু আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বরাবরই আমাদেরকে সীমানার উর্ব্ধে লইয়া যান। তাই গল্পের বাস্তব প্রেক্ষাপটের সমান্তরালে চলে স্বপ্নের বুনন। লালমিয়া প্রতিদিনই স্বপ্ন দেখেন। মূখ্যত সেই স্বপ্নই এ গল্পের মৌলিক জাল বিস্তার করে। লালমিয়া ইদানিং স্বপ্ন দেখেন এক উল্টো পায়ের মুসল্লি, বুলেটের কাছে সেই স্বপ্নের বয়ান করতে গিয়েই তিনি বারবার অতীত জালে ফিরে যান। এবং আমরা গল্পের শেষপ্রান্তে এসে দেখি লালমিয়ার মতো বুলেটও স্বপ্নে কেবল উল্টো পায়ের মুসল্লি দেখতে থাকে। সে স্বপ্নের মধ্যে এগিয়ে আসা উল্টো পাঅলা মুসল্লির ঝাঁকে হাউস বিল্ডিংয়ের উঁচু দালান থেকে প্রস্রাব করে দেয়। তার প্রস্রাবের বেগে এড়িয়ে মুসল্লিরা অদৃশ্য আখড়ায় পালিয়ে যায়। আর বুলেটের স্বপ্ন ভেঙে গেলে সে দেখে স্বপ্নের তোড়ে সে সত্যিসত্যিই বিছানা বালিশ ভিজিয়ে ফেলেছে । গল্পটি শেষ হয় এভাবে -‘দাদী কলুটোলার পীরসাহেবের তবিজ এনে দিলে তার বিছানায় পেচ্ছাব করা বন্ধ হয়েছিলো কতদিন আগে, আজ এক শাহ্ সাহেবের অছিলায় সেই তাবিজ কি নাকচ হয়ে গেলে? তবে তার টার্গেট মিস করার দুঃখ প্রবল হওয়ায় বিছানা ভেজাবার লজ্জা আপাতত চাপা পড়ে। টার্গেট মিস করাটা তার ঠিক হলো না। একরকম জোর করে পরপর দুই গ্লাস পানি খেয়ে বুলেট ফের শুয়ে পড়ল। শিওরের বালিশ ঠিকমতো উল্টিয়ে নিলেও ডানদিক সম্পূর্ণ ভিজে যাওয়ায় বুলেটকে শুতে হয় বাঁ-পাশ ফিরে।’ বালিশ উলটিয়ে সে এইজন্য শোয় যেন আবার একই স্বপ্ন সে দেখে। অর্থাৎ স্বপ্নে হলেও এদের গায়ে সে পেচ্ছাব ছিটিয়ে দিতে চায় যাদের চেহারা নাজির আলির মতোই। এইভাবেই এক শহীদ মুক্তিযোদ্ধার বন্ধু ও পুত্রের স্বপ্ন নিয়ে গড়ে ওঠে জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল গল্পখানা।
এই গ্রন্থের সূচনা গল্পটি ইলিয়াসের ভিন্নতর একটি গল্প। ‘প্রেমের গপ্পো’ শিরোনামের মধ্যে তীব্র শ্লেষ লক্ষ্য করা যায়। সাধারণ ‘গপ্পো’ শব্দটিই আমরা গাল-গল্প, বানানো কথা, চাপাবাজি হিসেবে ব্যবহার করি। ইলিয়াস নব বিবাহিত দম্পতির গল্প ফাঁদতে গিয়ে এই ‘গপ্পো’ শব্দটিই ব্যবহার করেন সচেতনভাবেই। এ গল্পেও বর্তমানের পাশাপাশি অতীত হাত ধরে চলে সমান্তরালে। জাহাঙ্গীর তার নববিবাহিত স্ত্রী বুলাকে নিজের অতীত জীবনের নানা প্রেমের গল্প শোনায়। কলেজে পড়ার সময় সে অ্যাথলেটিক সেক্রেটারি ছিলো এবং একাধিক মেয়ে যে তার জন্য পাগল ছিলো জাহাঙ্গীর তার স্ত্রী’র কাছে ‘গপ্পো’ মারে। গপ্পো এইজন্যই যে জাহাঙ্গীর স্রেফ নতুন বউয়ের কাছে নিজের আসন পোক্ত করতেই হয়তো এইসব বানানো গল্প বলে। বুলা স্বামীর এইসব গল্প শুনে হাসে আর জাহাঙ্গীর মুগ্ধ হয় স্ত্রীর সারল্যে। ইলিয়াস এই সরল গল্পের মোড়টা হুট করে ঘুরিয়ে দেন গল্পের মধ্যে মুশতাককে এনে। মুশতাক বলা যায় বুলার বাল্যকালের সঙ্গি। তাহারা একত্রে উস্তাদ সুনীল সেনগুপ্তের কাছে গান শিখিয়াছে। সেই সুনীল সেনগুপ্ত এখন ক্যানসারে আক্রান্ত, মৃত্যুশয্যায়। তাকে কেন্দ্র করেই মুশতাক এবং বুলার একাতœতা জাহাঙ্গীরকে বিদ্ধ করে। হঠাৎ করেই যেন জাহাঙ্গীরের বোধদয় হয়। সে স্ত্রীকে বলেই বসে, - ‘তোমার আসলে বিয়ে হওয়া উচিত ছিল ঐসব হাই-থটের গান-বাজনা করা লোকের সঙ্গে।’ বুলা তখনকার মতো সামাল দেয়। আবার হাসপাতালের বারান্দায় মুশতকাক ও বুলার একীভূত বেদনা দেখে ‘জাহাঙ্গীরের ছলছল চোখ থেকে জল বাষ্প হয়ে উড়ে যায়, চোখ বড়ো-বড়ো করে সে এদের একই বেদনা ও একই স্মৃতির ছোঁয়াছুঁয়িটা দেখে, তার চোখ খটখটে হয়ে আসে।’ কোনরকমে সে সেখান থেকে পালায় আর সারা শহর ভেসপা নিয়ে এলোমেলো চক্কর দেয়। কখনো সে মালিবাগের পুলিশ বক্সের কাছে যায়। সেখানে কলেজে পড়ার সময় যে মেয়েটিকে অন্যদের সঙ্গে সে উত্যক্ত করিতো তাহার সঙ্গে দেখা হইয়া যাওয়ার আশা পোষণ করে। কিন্তু পুলিশ হয়ে যাওয়া সে মেয়ের দেখা সে পায় না। ‘এখন দেখা হলেই বা তাকে কী বলত? কলেজে থাকতেই কথা বলা হলো না, আর অ্যাদ্দিন পর এখন সে কী বলবে? তা বলতে পরত, আমাকে চিনলেন না?’ ‘এখনো কী মস্তান পোলাপানের দলের পেছনে দাঁড়িয়ে মেয়েদের টিটকারি দেন? এখন কিন্তু আমি অ্যারেস্টেড করতে পারি জানেন?’ ‘তা অ্যারেস্টেড হতে ওর আপত্তি কী? তারপর ওরা না হয় ট্রাকের উপর উঠেই কিছুক্ষণ গল্প করত।’ আবার গুলশান বনানীর দিক দিয়ে যেতে গিয়েও তার মনে পড়ে আরেক মেয়ের কথা। ‘কিন্তু শাহীন না শাহনাজ - বুলাকে সে কোন্ নামটা যেন বলেছে - তার বাড়ি তো তার চেনা নেই।’ যে জাহাঙ্গীর স্ত্রীকে কেবল নিজের প্রেমের গল্প বলতে থাকে দেখা যায় সে তেমন করে কারো নামও জানে না। বরং সে বুঝতে পারে বুলার সঙ্গে মুশতাকের একটা সুরের টান আছে। এইসব এলোমেলো বুঝতে পারা নিয়ে সে একা পথে ঘোরে। ‘সুতরাং ভেস্পা চাকাজোড়া তার কেবল গড়িয়েই চলে।’ আর এইভাবেই একটা প্রেমের গপ্পো শেষ হয়ে যায়।
ফোঁড়া [১৯৮০ সালে রচিত] গল্পখানিতে ইলিয়াসের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বোধের পরিচয় পাইয়াছি। কারখানা শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি এ গল্পে দরিদ্র রিকসা শ্রমিকের সংগ্রামী জীবন ফুটে উঠেছে। ‘গতমাসের বারো কি তেরো তারিখে নইমুদ্দিনের কারখানায় ছাঁটাই হলো, মামুনের পার্টি এর প্রতিবাদে স্ট্রাইক কল করল পনেরো তারিখে। এই ডাকে সাড়া দিয়ে মিছিলের সঙ্গে মিল-এলাকা থেকে বেরুবার সময় মালিক পক্ষের গু-ার ডা-ার বাড়িতে নইমুদ্দিনের মাথা ফাটল। তাহলে পঁচিশদিন হলো না? - পার্টির কর্মীদের নিয়ে মামুন প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ওকে হাসপাতালে নিয়ে আসে। অবস্থা যা হয়েছিল, আর পনের মিনিট দেরি হলে গু-ারা তাকে জ্যান্ত গুম করে ফেলতে পারত। মালিকপক্ষ এমনকি ওকে নিজেদের কব্জায় নিয়ে মামুনদের পার্টির নৃশংস আক্রমণের শিকার বলে খবরের কাগজে ওর ছবি পর্যন্ত ছাপিয়ে দিত।’ শ্রমিক পার্টি ও মালিক পক্ষ উভয়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হইলেও নাইমুদ্দিন শ্রমিক পক্ষের তদারকিতেই হাসপাতালে থাকে। এরমধ্যে চলিয়া আসে ঈদ। মামুনের দেয়া একশ টাকা লইয়া পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার আকাঙ্খায় নইমুদ্দিন ডাক্তারের অনুপস্থিতিতেই হাসপাতাল ত্যাগ করে। অথচ তাহার শারীরিক অবস্থা মোটেই ভালো ছিলো না। ঈদের দিন টিফিন ক্যারিয়ারে পোলা, কোর্মা, টিকিয়া, সেমাই-জর্দা নিয়া মামুন হাসপাতালে গিয়া দেখে নইমুদ্দিন নাই। ফেরার পথে যে রিকসাওয়ালা বলে, ‘হামাক চিনলেন না? নুইমুদ্দি হামার মামাতো ভাই।...আপনার মনে নাই? তার এই খবর পায়া হামিই তো তার বৌ-ব্যাটা-বিটিকে লিয়া হাসপাতাল আসিছিনু, আপনার মনে নাই?’ এখান থেকে ইলিয়াসের গল্পে নইমুদ্দিন ও রিকশাওয়ালা সমান্তরাল হয়ে ওঠে। নইমুদ্দিনের ভাগ্যে তার রিকশাওয়ালা ভাই ঈর্ষান্বিতই হয়। সে মনে করে, একটু মাথা ফাটিয়ে নইমুদ্দিনের ভাগ্য ফিরে গেছে। অন্যদিকে তার পাছার ফোঁড়ার কারণে সে ভাগ্যের কাছে মার খেয়েছে। ‘দ্যাখেন না, শালার কত বড়ো ফোঁড়া! এখন পুঁজ সব বার হয়া যায় নাই। পুঁজগুলা বার কর‌্যা দিবার পারলে আরাম হয়!’ ঈদের দিন এই ফোঁড়া নিয়েও তাকে রিকশা চালাতে হয়। বউ বাচ্চার জন্যে একটু সেমাইয়ের ব্যবস্থা করতে চায় সে। নইমুদ্দিনকে নিয়ে শুরু হলেও গল্প ঘুরে যায় নাম-না-জানা রিকশাওয়ালার দিকে। আমরা গল্পের শেষে দেখিলাম, ‘বাড়ির ভেতর য়ুকে গেট বন্ধ করার জন্যে ঘুরে দাঁড়িয়ে মামুন দেে যে লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে রিকশাওয়ালা পা মেলে বসে পড়েছে কাদার ওপর। কাপড় সামলাবার দিকে তার খেয়াল নাই। দুই হাতে ফোঁড়ার চারদিকে টিপে টিপে পুঁজ বার করার কাজে রিকশাওয়ালা মহা ব্যস্ত।’
রেইনকোট গল্পের শেষটাও এই প্রসঙ্গে একটু উদ্ধৃত করার প্রয়োজন বোধ করি - ‘রেইনকোটটা এরা খুলে ফেলেছে, কোথায় রাখল কে জানে। কিন্তু তার ওম তার শরীরে এখনো লেগেই রয়েছে। বৃষ্টির মতো চাবুকের বাড়ি পড়ে তার রেইনকোটের মতো চামড়ায় আর সে অবিরাম বলেই চলে, মিসক্রিয়েন্টদের ঠিকানা তার জানা আছে। শুরু তার শালার নয়, তার ঠিকানা জানার মধ্যে কোন বাহাদূরী নাই, সে ছদ্মবেশী কুলিদের আস্তানাও চেনে। তারাও তাকে চেনে এবং তার উপর তাদের আস্থাও কম নয়। তাদের সঙ্গে তার আঁতাতের অভিযোগ ও তাদের সঙ্গে তার আঁতাত রাখার উত্তেজনায় নুরুল হুদার ঝুলন্ত শরীর এতটাই কাঁপে যে চাবুকের বাড়ির দিকে তার আর মনোযোগ দেওয়া হয়ে ওঠে না।’ অথচ সত্যিকার অর্থে এদের সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখা তো দূরের কথা, তিনি এদের কোন খবরও রাখেন নাই। মিলিটারিরা যখন তাকে জানায়, মিসক্রিয়েন্টরা কলেজে ঢুকেছিল কুলির বেশে এবং ধরা পড়ে তারা নুরুল হুদার নাম বলেছে তখন সে বিস্মিত হয়। ‘আমার নাম? সত্যি বলেছে? আমার নাম বলেছে?’ কিছুক্ষণ পরে মিলিটারির দুটো ঘুষি খেয়ে সে জানায় যে, হ্যাঁ, সে জানে তাদের ঠিকানা, কিন্তু বলবে না। ভীত নুরুল হুদাকে আমরা মুহূর্তেই সাহসী হয়ে উঠতে দেখি। তার শালা মিন্টুর মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া নিয়ে তিনি বিব্রত ছিলেন, সেই শালার রেইনকোট গায়ে দিয়েই যেন সে নিজেও এক মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ওঠেন। এই রেইনকোট গায়ে দিয়ে তার ভিতর কাঠামো-কব্জা কীভাবে বদলে যায় তাই নিয়ে এই গল্প। আর আমরা দেখি, মুক্তিযোদ্ধা মিন্টু নয়, তার রেইনকোটটিই একটি প্রতীক হয়ে ওঠে।
আফাজ আলি গোরস্থানে থাকে। কবর জেয়ারতকারিদের জন্য দোয়া করে। তার এই অভিজাত গোরস্থানে কবরবাসীদের নাম নেই, কেবল সংখ্যা আছে। ‘৭৮০৪ নম্বরের কবর আগাগোড়া পাথরে বাঁধানো, লাল সিরামিক ইটে গাঁথা ৭৮১৯, সাদা সিমেন্টের ওপর মোজাইক করা ৭৯৮৪’ - এইসব কবর নিয়ে তার বসবাস, ব্যবসা, আয়রুজি। কিন্তু কান্না [রচনা ১৯৯৪] গল্পখানি আফাজ আলি নয়, বরং তার মৃত পুত্রকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে। পুত্র হাবিবুল্লা মাদ্রাসা লাইনে পড়েনি। এইচএসসি সেকে- ডিভিশনে পাশ পুত্রের চাকরির জন্যে ঘুষের টাকা জোগাড় করতে ব্যস্ত আফাজ আলি। সামনে শবে বরাত, মানে তার আয় রুজি ঐ দিন বেড়ে যাবে প্রচুর। এ সময়ই তার কাছে খবর আসে পুত্রের দাস্ত হয়েছে। সে পুত্রের অসুখে বিরক্ত হয়, কেননা তার রোজগারের সিজনে পুত্র তাকে বিপদে ফেলে। এ বিপদ যেন আরও বেড়ে যায় যখন পুত্র মারা যায়। ঢাকা থেকে বরিশাল গিয়েই তিনি শোনেন পুত্রের লাশ দাফন হয়ে গেছে। পুত্রের কবরে গিয়ে তার মনে হয়, - ‘এই গোরস্তানের কি ছিরি, এখানে এই দোয়া পড়ে আল্লার কালাম নাপাক করে ফেলা হয় না?’ আর ‘ছেলের রুহের মাগফেরাতের জন্যে আর্জি করতে গেলেই তার গর্দানে লাগে আব্দুল কুদ্দুস হাওলাদারের নিশ্বাস। মোটা গর্দানের তুলনায় পাতলা চামড়ায় ছ্যাঁক লাগে। ছেলের রোজগারে মাসে মাসে, ঋণশোধের রাস্তা তার চিরকালের জন্যে বন্ধ হয়ে গেল। হায়রে নিজের আওলাদ তাকে এটুকু সাহায্যও করল না!’ তার মনে প্রশ্ন জাগে ‘আল্লার এলেম শিখতে শিখতে ছেড়ে দিয়েছিল বলে হাবিবুল্লার ওপর আল্লা কি নারাজ হয়েছে?’ ধর্ম আর পিতৃত্ব, ব্যবসা আর ঋণ যেন এ গল্পে কাঁধেকাঁধ মিলাইয়া পথ চলে। শেষপর্যন্ত পিতৃত্বেরই জয় লক্ষ্য করিয়া পাঠক মুগ্ধ হইবেন। গল্পের শেষে আমরা দেখে অচেনা মুরদার জন্য দোয়া করতে গিয়া আফাজ আলি তার মৃত পুত্রের জন্য কাঁদিয়া উঠেন। সে বলে, ‘আল্লা, তার নাদান বাপটা কি খালি গোর জিয়ারত করার জন্যেই দুনিয়ায় বাঁচিয়া থাকবো। আল্লা!’