নস্য, নস্যি, নাস — (ইতি)হাস

অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়

মানুষের মনের গতি বড়োই বিচিত্র! অদ্রীশ বর্ধন চলে গেলেন এই ২০শে মে, ২০১৯। তাঁর যাওয়ার কথা পড়েই মাথায় এলো তাঁর জন্ম দেওয়া অমর গোয়েন্দা ইন্দ্রনাথ রুদ্রর কথা। অসম্ভব সুদর্শন আর সুবেশ এই গোয়েন্দা নস্যি নিতেন। আর নেবেন নাই বা কেন? আমাদের ছেলেবেলার আগের আর পরের দুয়েক দশকে একটু বখে যাওয়া ছেলেরা বার্ডসাই বা সিগ্রেট ফোঁকা শুরু করার আগে প্রথমে তো নস্যিই নিতো! তার বাহারি কৌটো বা দানি, আর খয়েরি হয়ে যাওয়া রুমাল ছাড়া ভাবাই যেতো না ব্যাকব্রাশ করা বা চুলে ‘আলবোট কাটা’ (মানে প্রিন্স অ্যালবার্ট-এর হেয়ারস্টাইলের)সেই সদ্যযুবাদের। আমার কৈশোরের ভাষাচিন্তায় নেশা শব্দের উৎপত্তিও নস্য থেকেই হয়েছিলো।এমনকি snuff out of existence-এর মানেও বুঝতাম নস্যি নিয়ে হ্যাঁচ্চো ক’রে বের করে দেওয়ার মতো কিছুকে নিকেশ ক’রে দেওয়া। বিশেষ্য হিসেবে snuff-এর মানে যে মোমবাতির পলতের পুড়ে যাওয়া অংশ (the charred part of a candle wick), আর ক্রিয়া হিসেবে যে কোনো মোমবাতি বা শিখাকে নিভিয়ে দেওয়া (extinguish — a candle or flame), তা তখনও জানিনি। মার্টিনের লাইটরেলে ভাইবোনদের ইস্কুল থেকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া আর ফেরা দোর্দণ্ডপ্রতাপ মেজদির কোলে এসে পড়া খুড়তুতো দাদার বন্ধুর তার উদ্দেশে ছোঁড়া নস্যির কৌটো নিয়ে খুড়তুতো দাদার খোয়ার আমার জীবনস্মৃতিতে মহাকাব্যিক গুরুত্ব নিয়ে বেঁচে আছে।
সামাজিক গ্রাহ্যতার দিক থেকে নস্যি সিগারেটের চেয়েও এগিয়ে ছিল, প্রায় পাণের পরেই। আমার ছোটবেলায় যে যে নস্যিকোম্পানির নাম ছিল, তাদের মধ্যে ‘পরিমল নস্য’, টি আর নস্য (বোধহয়) আর ‘সানমুগম মান্দ্রাজী নস্য’-র কথা মনে আছে। বাকিগুলোর নাম মনেও নেই, আর নেটেও খুঁজে পাইনি। পাবো কিভাবে। নস্যি-র ইংরিজি ‘snuff’-এর অর্থের পরে অনলাইন কেম্ব্রিজ ডিকশনারিতে একজাম্পল দেওয়া আছে, ‘very few people take snuff nowadays’। অথচ ‘সভ্য’ পৃথিবীতে আসার পর থেকে নস্যি কী পরিমাণ বাধানিষেধের মধ্যে দিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল! ব্রাজিলের দেশীয় মানুষরাই প্রথম নস্যি ব্যবহার শুরু করে। ফ্রান্সিস্ক্যান সন্ন্যাসী ফ্রায়ার রেমন পানে (Friar Ramón Pané) ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সঙ্গে ১৪৯৩ সালে তাঁর দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রায় যাবার সময় দেখেন যে ছোট অ্যাণ্টিলিস (lesser Antilles)-এর ক্যারিবীয় ইন্ডিয়ানরা ছাড়াও হাইতির লোকরাও নেশা ও চিকিৎসার জন্য নস্যি ব্যবহার করতো। ১৪৯৯-তে আমেরিগো ভেসপুচি ভেনিজুয়েলার কাছেমার্গারিটা দ্বীপে তৃষ্ণা মেটাতে মানুষকে কাঁচা তামাক চিবোতে দেখেন। ফ্রায়ার পানে দেশে ফেরার পর নস্যি ইউরোপের নজরে আসে। ১৫১৯ সালে Ocaranza এবং ১৫২৫ সালে Herrera মেক্সিকান ইন্ডিয়ানদের মধ্যে নস্যি ব্যবহার লক্ষ করেন। ওলন্দাজরা, যারা প্রথম ‘snuff’ কথাটি ব্যবহার করে (স্পেনে এর নাম ছিল rapé) ১৫৬০ থেকেই নস্যি নিচ্ছেন। ১৬০০ সালেই এক ব্যয়সাধ্য নেশাদ্রব্য হিসেবে নস্যি দক্ষিণ আমেরিকা, চিন, জাপান এবং আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ে। ১৬২০ সালে স্পেনের সেভিল শহরে (Seville) রাজকীয় নস্যি কোম্পানি স্থাপিত হওয়ার পর, ইউরোপে নস্যি ব্যবসায়ের বাড়বাড়ন্ত হয়।
১৬৫০ সাল থেকেই নস্যি ফ্রান্স থেকে ইংলন্ডে, স্কটল্যাণ্ডে, ও আয়ারল্যান্ডে চলে যায়। আইরিশরা একে ‘powder’ অথবা ‘smutchin’ বলতেন, স্কটস্‌রা ‘sneeshin’। জাঁ নিকো (Jean Nicot) ফ্রাঁসের রানী ক্যাথারিন দ্য মেদিচিকে মাথাধরার ওষুধ হিসেবে নস্যি ধরান। ইংলণ্ডে রানী অ্যানের রাজত্বকালে (১৭০২-১৪) নস্যিব্যবহার তুঙ্গে ওঠে। তাকে বলা হতো, ‘মানুষের নাকের চূড়ান্ত কারণ বা যাথার্থ্য’ (‘final reason for the human nose’)। সেদিক থেকে ভলতেয়ারের কাঁদিদ নাটকের আশাবাদী প্যানগ্লস বলেছিলেন এই সব জগতের মধ্যে সম্ভাব্য সেরা জগতে চশমা পরার জন্যে মানুষের নাকের উপরে খাঁজটুকুও আছে। নস্যির জন্য নাকের যাথার্থ্যবিধান তার সঙ্গেই তুলনীয়। রাজা তৃতীয় জর্জ আর রানী শার্লটের সময়েও এই তুঙ্গী জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ণ ছিল, এতই যে শার্লটকে ‘Snuffy Charlotte’ বলা হতো। নস্যির বিখ্যাত সেবকদের মধ্যে ছিলেন লর্ড নেলসন, মারি আঁতোনেত, ডিসরায়েলি, অ্যালেকজান্ডার পোপ, স্যামুয়েল জনসন ইত্যাদি। রাজা পঞ্চম জর্জের বিশেষ মিশ্রণ ছিল, যাদের মধ্যে প্রধান ছিল King's Morning Mix, King's Plain, আর King's Carotte। এই সময়ে ঘরে তৈরি নস্যিও ভীষণ চালু হয়। ১৮০০ সালে ইউরোপে হরেক রকমের নস্যি থাকলেও সেগুলো প্রধানতঃ তিন মৌলিক ধরণের ছিল: শুকনো, কড়া, গন্ধহীন, মিহি স্কচ নস্যি; ম্যাক্কাবয় (Maccaboy)নামের আর্দ্র আর অত্যধিক সুগন্ধ নস্যি; আর Rapee বা Swedish snuff নামের মোটা দানার নস্যি। সুইডেনে নস্যি সপ্তদশ শতাব্দীতে এলেও অষ্টাদশেই বেশি জনপ্রিয়তা পায়, রাজা তৃতীয় গুস্তাভের (Gustav III)সময় খুব কেতার বিষয় হয়। উত্তর আমেরিকায় নস্যি যায় প্রথম Pocahontas-এর স্বামী John Rolfe-এর হাত ধরে। ১৮০০ থেকে ১৯৩০ অবধি মার্কিন কংগ্রেসম্যানদের জন্য একটি যৌথ নস্যিকৌটো রাখা হতো। ১৭৩০-এ ভার্জিনিয়াতেই প্রথম নস্যি কারখানা স্থাপিত হয়। তারপর থেকে আজও আমেরিকা জুড়ে বিবিধ ধরণের ঘ্রাণের, চর্বণের নস্যি উৎপাদিত হচ্ছে। সুদানে toombak নামে নস্যি ইজিপ্ট থেকে আসা কোরান শিক্ষক Timbuktu ঘানার মালি থেকে আসার পরে চালু হয়।
বিভিন্ন দেশের রাজা/সম্রাট, চার্চ নস্যির নেশাকে বন্ধ করার চেষ্টা করেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখ্য, ফ্রাঁসের ত্রয়োদশ লুই (১৬০১-৪৩), পোপ অষ্টম আর্ব্যান (১৫৬৮-১৬৪৪), জার প্রথম মাইকেল (১৫৯৬-১৬৪৫)। এঁরা সকলেই কঠোর শাস্তি বিধান করলেও নস্যি বন্ধ হয়নি। কিন্তু বাংলায় আর বিশেষ চালু নেই। নস্যি আর গুটিবসন্ত ছাড়া এভাবে সারা বাংলা থেকে কিছু কি উঠে গেছে? পৃথিবী থেকে বলবো না, কারণ নস্যির বহু কোম্পানি এখনও চলছে। Oregon-এর Directory of Smokeless Tobacco Brands Approved for Stamping and Sale in alphabetical order-তে ২০১৯এও অনেক নাম আছে।
অবশ্যই নস্যির অভ্যাস ভারতে ও বাংলায় বিলেত থেকেই এসেছিল। কিন্তু একসময়ে ইংলণ্ডের তামাকের ও নস্যির প্রয়োজনে ব্রিটিশ ভারত থেকেই রপ্তানি হতো। ১৮৩৯ সালে Robert Montgomery Martin তাঁর Statistics of the Colonies of the British Empire ...: From the Official Records of the Colonial Office (London: WM. H. Allen and Co., 1839)-এ জানাচ্ছেন মসুলিপত্তনমের তামাকের থেকে তৈরি নস্যি ইংলণ্ডে খুব আদৃত। ভারতে তামাকের চাষ ও ব্যবহার বিপুল। আর ইংলণ্ডে এর উপরে শুল্ক কমানো হলে ভারতের বিভিন্ন ধরণের মাটি ইংলণ্ডে এই উদ্ভিজ্জর যোগান বহুগুণ বাড়িয়ে দিতো (পৃঃ ৩৬৬-৬৭।
কিন্তু বঙ্গে অন্য তামাকজাত নেশার মধ্যে নস্যি এলো কবে? ইতিহাসের সূত্র আছে নিশ্চয়! কিন্তু হাতে নেই! তবে পরোক্ষ সূত্র কিছু আছে। পণ্ডিতপ্রবর দীনেশচন্দ্র সেন প্রাচীন বাঙ্গলা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান (১৯৪০) বইতে বলছেন, ‘মুসলমান আগমনের পূর্বে বঙ্গভাষা কোনো কৃষক রমণীর ন্যায় দীনহীন বেশে পল্লী কুটিরে বাস করিতেছিল৷ ... এই সকল অপূর্ব গুণ লইয়া বাঙ্গলা ভাষা মুসলমান প্রভাবের পূর্বে অতীব অনাদর ও উপেক্ষায় বঙ্গীয় চাষার গানে কথঞ্চিত আত্মপ্রকাশ করিতেছিল৷পণ্ডিতেরা নস্যাধার হইতে নস্য গ্রহণ করিয়া শিখা দোলাইয়া সংস্কৃত শ্লোকের আবৃত্তি করিতেছিলেন এবং “তৈলাধার পাত্র” কিম্বা “পাত্রাধার তৈল” এই লইয়া ঘোর বিচারে প্রবৃত্ত ছিলেন ৷ ... ইতরের ভাষা বলিয়া বঙ্গভাষাকে পণ্ডিতমণ্ডলী ‘দূর দূৱ’ করিয়া তাড়াইয়া দিতেন, হাড়ি-ডোমের স্পর্শ হইতে ব্রাহ্মণেরা যেরূপ দূরে থাকেন বঙ্গভাষা তেমনই সুধী সমাজের অপাংক্তেয় ছিল-তেমনি ঘৃণা, অনাদর ও উপেক্ষার পাত্র ছিল’৷ অর্থাৎ বাংলাদেশে ‘মুসলমান আগমনের পূর্বে’-ও নস্যি ছিল। বক্তিয়ার খিলজি গৌড় বিজয় করার পরেও পূর্ববঙ্গ লক্ষ্মণ সেনের দুই পুত্রের অধীনে থেকে যায় ১২৩০ খ্রীষ্টাব্দ অবধি। তারও পর বঙ্গে মুসলিম বিজয় সম্পূর্ণ হতে আড়াইশো বছর লেগে যায়। তখন থেকেই কী পণ্ডিতরা নস্য নিতেন? ১৩২২ থেকে ১৩৩৮ পর্যন্ত ষোলো বছর বাদ দিলে ১২৮৭ থেকে ১৫৩৮ পর্যন্ত বাংলাদেশ দিল্লির সুলতানদের থেকে স্বাধীন ছিল। এর মধ্যে পণ্ডিতরা নস্যি নেওয়া শুরু করলেন কবে?
কেউ বলবেন নস্যি বাঙালিরা নেওয়া শুরু করে কলিকালে। শ্রী হরিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে (১২৬৭ বঙ্গাব্দ) কলিকাতা থেকে প্রকাশিত কলির রাজ্যশাসন গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে কলিরাজা তামাকুকে নিযুক্ত করেন অবাধ্য প্রজাদের শাসন করতে। সেই দ্রব্যাদির মধ্যে তামাকও ছিল।

পরিচয় পেয়ে ভূপ কহেন তামাকে।
পৃথিবী শাসিয়া তুষ্ট করহ আমকে
তামাকু কহেন আর নাহি করি ভয়।
এ বার ভুবন বাধ্য করিব নিশ্চয়।
যদি দুই একজন না খায় আমাকে।
মেয়ে বোলে উপহাস করিবেক তাকে।
শুনিয়া বিদায় দেন কলি নর বর
হরিষে তামাকু যায় নির্ভয় অন্তর।
গাঁজাদির শাসনেতে যার বাকি ছিল ॥
তামাকু তাদের মুখে ত্বরায় উঠিল।
এই রূপে গুড়াকু ভ্ৰমেন অঙ্গে বঙ্গে।
স্ত্রীলোকের মুখে যান তাম্বুলের সঙ্গে ॥
বিধবা রমণী যারা পান নাহি খায়।
পোড়াইয়া খরসান দশনে লাগায় ॥
অধ্যাপক আদি যত ছিল জ্ঞানবান।
নস্য হয়ে তাহাদের নাসিকায় যান ॥
উড়িষ্যা বাসিন্দা যত উড়ে নাম ধরে।
চুরট হইয়া যান তাদের অধরে ॥
বালক বালিকা আদি যুবক যুবতী ।
তামাকের নেশায় সকলে হৃস্টমতি ॥
মতির হারের ন্যায় করিয়া যতন ।
মতিহার নাম তার দিল কোন জন ॥
তামাকে মারিয়া টান মহাসুখে চোরে।
কেহ'ব! রাখিল তার নাম সুখচোরে ॥
কড়ামিটে কড়া আদি নাম সুধাময়।
ভেলশ অম্বুরি যার গন্ধে সুখোদয় ॥
হরেক রকম হুঁকা হইল সৃজন।
থেলো ডাব কলি আদি অতি সুশোভন ॥


কলিকাল যবে শুরু হয়ে থাক, ১৮৬০ সালের আগে তামাকজাত সামগ্রীর মধ্যে নস্যি ভালোরকমে পণ্ডিতদের নাকে ছিল। ১৮৫৭ সালে প্রকাশিত প্যারীচাঁদ মিত্রর টেকচাঁদ ঠাকুর নামে আলালের ঘরের দুলাল নামের বাংলা ভাষার প্রথম উপন্যাসেই তো উকিল বটলর সাহেবের আপিস-এ তাঁকে দেখি নিজের কাজের অবস্থা খতিয়ে দেখবার সময় ‘এক একবার নাকে নস্য গুঁজে হাতের আঙুল চটকাইতে’। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর (১৮১২-১৮৫৯) কবিতায় আছে, ‘সেটা তো পুষ্যি এঁড়ে দস্যি ভেড়ে নস্যি কর তারে’। এই প্রথম বাংলা ভাষায় বিশেষ্য snuff আর ক্রিয়া snuff out কাছাকাছি এলো। পরে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর স্বপ্নপ্রয়াণ(১৮৭৫) কাব্যগ্রন্থে লিখলেন‘জগতের শস্য/ করি আগে নস্য!/ বীর্য দেখা যাবে পরে বজ্রধরেদের’ (পঞ্চম সর্গ, ‘রসাতল-প্রয়াণ’, স্তবক ১০)।
কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত আবার নস্যিকে বাঙালির চিন্তার ভাণ করা, ঘরমুখো কর্মহীনতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। কুহু ও কেকা (১৯১২) কাব্যগ্রন্থে তিনি বাঙালির লুপ্ত অতীত গৌরবের প্রসঙ্গে বলছেন—
তাদের ধারা লুপ্ত হবে? থাকবে শুধু পঞ্জিকা?
ধানের আবাস উঠিয়ে দিয়ে ফসল হ’ল গঞ্জিকা?
করুক তবে সূক্ষ্ম বিচার শাস্ত্র নিয়ে পণ্ডিতে,
নিঃস্ব করুক নস্য-ধানী গোময় লিপ্ত গণ্ডীতে।

রবীন্দ্রনাথ পণ্ডিতদের সঙ্গে নস্যের অনুষঙ্গ ফিরিয়ে আনলেন। ‘জুতা-আবিষ্কার’ কবিতায় দেখি —
যেখানে যত আছিল জ্ঞানীগুণী
দেশে বিদেশে যতেক ছিল যন্ত্রী।
বসিল সবে চশমা চোখে আঁটি,
ফুরায়ে গেল উনিশ পিপে নস্য।


কিম্বা ক্ষণিকা-র ‘যথাস্থান’ কবিতায় দেখি —
পন্ডিতেরা থাকেন যেথায়
বিদ্যেরত্ন-পাড়ায়—
নস্য উড়ে আকাশ জুড়ে
কাহার সাধ্য দাঁড়ায়, ...

কিম্বা সংগীতচিন্তা গ্রন্থের ‘সংগীত ও ভাব’ প্রবন্ধে লিখছেন ‘আজ সংস্কৃত ভাষায় কেহ যদি কবিতা লেখেন, তবে নস্য-সেবক চালকলা-জীবী আলংকারিক সমালোচকেরা তাহাকে কী চক্ষে দেখেন?’ কিন্তু বিশেষ্য snuff আর ক্রিয়া snuff out-এর পানও এর অনেক আগেই করেছেন, বাল্মীকি প্রতিভা-য় ‘আজি বুঝি বা বিশ্ব করবে নস্য, এমনি যে আকার।’-এই দস্যু-সংলাপে।

কিন্তু কলকাতায় নব্যবঙ্গের মধ্যে নস্যির জনপ্রিয়তা কবে শুরু হোলো! ইতিহাসের হদিশ নেই আমার কাছে। তবে শ্রী কালীকিঙ্কর চক্রবর্তী সংবৎ ১৯৩১-এ কলিকাতায় প্রকাশিত সুরলোকে বঙ্গের পরিচয় গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের শুরুতেই দেখাচ্ছেন দেবলোকে সপারিষদ চারদিকের বিখ্যাত আত্মার মধ্যে উপবিষ্ট প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরকে মৃত বাবু কাশীপ্রসাদের আত্মা জানাচ্ছেন যে তাঁর তিরোধানের পরে কলিকাতায় অনেক পরিবর্তনের মধ্যে ‘যবনের ন্যায় প্রায় সকল হিন্দুই শ্মশ্রুধারী হইয়াছেন। ধূমপান প্রায় তিরোহিত হইয়া নস্যগ্রহণের আবির্ভাব হইয়াছে। বিশেষতঃ নস্যদানী কিশোরদিগের করে চিরপ্রণয়িনী হইয়া আছে’ (পৃঃ ৬)।
বাংলায় নস্যির সঙ্গে মগজের সম্পর্ক (তাচ্ছিল্যার্থে হলেও) পণ্ডিতদের থেকে গোয়েন্দাদের বা প্রাইভেট ডিটেকটিভদের কাছে বর্তেছে। অদ্রীশ বর্ধনের ইন্দ্রনাথ রুদ্রর অনেক আগেই বাংলার হাসির গল্পে আর গোয়েন্দা গল্পে নস্যসেবকরা এসেছেন। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘হালখাতার খাওয়াদাওয়া’ গল্পে নাসিকামোহন নস্য কোম্পানীর মালিক চন্দ্রকান্ত চাক্‌লাদার খাতক টেনিদার মামা গজগোবিন্দ হালদারের কাছ থেকে পাওনা টাকা উদ্ধারের ফাঁদে টেনিদাকে এনে ফেলে, বন্দী ক’রে নিজের কারখানার যে বিপদ ডেকে এনেছিল তার কথা কে ভোলে? উপেক্ষিত গোয়েন্দাগল্পের লেখক মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য (১৯০৩-১৯৩৯)-র জাপানী গোয়েন্দা হুকাকাশি শিব্রামের কল্কেকাশির মধ্যে মেটেমসাইকোসিস ঘটিয়েছেন কিনা জানিনা। অন্যথায় উপেক্ষিত। তিনি নস্যি নিতেন। হেমেন্দ্রকুমার রায়ের গোয়েন্দা জয়ন্ত জটিল সমস্যা সমাধানের দূরে থাকলে বা কাছাকাছি এলে নস্যি নিতেন ঘনঘন। নবযুগের মহাদানব গ্রন্থে দেখি জয়ন্ত অন্যমনস্কর মতো বললে, “না, যেটুকু জেনেছি আপাতত তাইতেই কাজ চলবে। মানিক, নস্যের ডিবেটা এগিয়ে দাও তো ভাই!” মানিক জানত অতিরিক্ত খুশি হলেই জয়ন্তের দরকার হয় নস্য। ডিবেটা এগিয়ে দিলে।’
সেই নস্যি আর নেই। কেউ শুধোতেই পারেন একটি পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় ধান ভানতে ঈদের গীতের স্থলে নস্যির বাত কেন? আসলে ঈদের হপ্তাখানেক আগে না-তামাক দিবস গেল যে! আর যে সব কারণে রোজা ভঙ্গ হয় তার একটি কারণ নস্যি নেওয়া। আসুন সকলকে ঈদ মুবারক জানিয়ে আমরা সকলেই তামাক ছাড়ি।