কবীরা ও একটি ঈষৎ সাই - ফাই

অনিমিখ পাত্র

কবেকার কলকাতা শহরের পথে ... পুরনো নতুন মুখ ভরে ইমারতে ... হুঁ হুঁ ... তোমাকে চাই ... হুঁ হুঁ ... তোমাকে চাই ... । যেন গান গাইতে গাইতে কাজ করছিলাম। তা না। গাইছিলাম আর ভেবে যাচ্ছিলাম। অনেক সময়ই গান যেন কেউ এগিয়ে দেয়। চেতনা হারাবার পর চেতনা যখন ফিরে আসতে থাকে , সেই সান্দ্র অবস্থায় , আশেপাশের মুখগুলো এক একবার ঝুঁকে পড়ে আবার হারিয়ে যায়। কেউ কি বললো কিছু ? হাত রাখলো মাথায় কেউ কি ? সেইরকমই এক নির্জ্ঞানের ভেতররাস্তা দিয়ে গান চলে আসে। গান শরীরের অংশ হয়ে যায় । এইবার , আমার ভাবনার ভেতরে কেউ হাসল খুক করে। যেন ডাক্তারের থাপ্পড়। আমার সচেতনতা নড়ে উঠল।
ওহ্‌ , কবীরা এসেছে। এতক্ষণ বসে বসে আমায় দেখছিল। আমার ভাবনাকুটীরে দু - একবার টর্চও ফেলেছে। কিন্তু গান থেকে তোলেনি আমাকে। বাগান তৈরির পর যেমন নিজের পরিচর্যার দিকে খানিকক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে মালি। কিংবা অপরাধী যেমন বারবার অপরাধকে দেখে। কবীরা একজন আপাদমস্তক স্যাডিস্ট – এইরকম ভাবি।
‘ গান দিয়ে তুমি আমার কী বিরাট ক্ষতি করে দিচ্ছিলে , কবীরা ! তারপরও গানের কথায় তোমার হাসতে ইচ্ছে হয় ? ’
‘ সত্যিই ক্ষতি করেছি ? তুমি নিশ্চিত জানো ? ’
‘ তা নয়তো কি ? হস্টেলে সেদিন যদি রাত্তিরবেলা গান না গাইতাম , নিয়মবহির্ভূতভাবে ছেলেরা এসে জড়ো হতো না । হস্টেল সুপারের শাসানিও জুটত না হয়তো। সংবেদনের তারটাও পট্‌ করে ছিঁড়ে যেতো না আমার। আমি পালিয়েও আসতাম না নিশ্চয়ই। আর তা না হলে , এতোদিনে ডাক্তার – ইঞ্জিনিয়ার কিছু একটা নির্ঘাত হয়েই ছাড়তাম । মোটা মাইনে হত। গাড়ি হতো। হলদিয়ায় পচে মরতে হতো না । ’
‘ ভুল করছো না তো ? কবীরার গলায় আত্মবিশ্বাসের অভাব টের পাই , ভুলের অপরপিঠে সবসময় ঠিকই থাকে কি ? অনেকসময়ই কি সেই সিনেমার মতো ব্যাপারটা নোয় যে , তুমি ভাবছো তুমি টস্‌ করে বেচ্ছে নিচ্ছো বিকল্পকে। হেরে গেলে , বা যা বাছলে সেই পছন্দ নিয়ে পরে আফশোষ হলো। হলো , কারণ তুমি মুদ্রার অপরপিঠ খতিয়ে দেখোনি। তাহলে দেখতে পেতে তোমার কোনো বিকল্পই ছিলো না কখনো । দু - পিঠেই হেরে যাওয়া ছিলো ।’
আমার গা - হাত একটু শিরশির করে। আমি তো বেঁচেই আছি স্মৃতিগ্রন্থের ভেতর। তার প্রত্যেক পাতাতেই তো জ্বলজ্বল করছে আমার ভুলগুলো । হ্যাঁ , আমারই ভুলগুলো । ভুলগুলো সত্যিই তো একদিন ফুল হয়ে যায় । সুরভি আসে। এখন বেমক্কা কেউ যদি আমাকে নেই করে দেয় ! আমারই ঘরের নেমপ্লেট থেকে আমারই নাম ঘষে ঘষে তুলে দিচ্ছে কেউ । যেন , এইভাবে স্মৃতিগুলো ফর্সা হয়ে যাবে ! অপরপিঠের এপিডেমিক। হায় ! আমার জন্য কবীরা সেই অঞ্চলে গোয়েন্দাকুকুর সাজিয়ে রাখছে কেন ? ট্রেসপাসার্স উইল বি প্রসিকিউটেড। সামওয়ান উইল প্রসিকিউট দ্য ট্রেসপাসার্স। আমি কেন জানতাম না , কবীরাই গ্রামারের সেই সামওয়ান! অথচ তাকে তো আমি গার্ডিয়ান এঞ্জেল বলে জানি !
কবীরা এবার শান্ত একটা তন্ত্রীর মতো নিজেকে বাজায় , বলে ,
‘ ভুল বলে কিছু হয় না হে ! আসলে এ একটা পেন্ডুলাম। একদিকে ভুল আর অন্যদিকে ঠিক। পেন্ডুলাম এত দ্রুত দুলছে যে ভুল আর ঠিক আলাদা করা যাচ্ছে না । খপ্‌ করে লটারির মতো কোনো একটা তুলতে যেয়ো না । জীবন তোমার বাপু লটারি নয় । এক ভেবে হাত বাড়ালে , দেখবে হাতে উঠে এলো অপরটা ! তুমি যা হয়েছো , তা এক অবিমিশ্র ফল। এর কোনো অপর হয় না। জীবন ল্যাবরেটরিও না । ’
শুনতে শুনতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিলাম। গভীর একটা ফাটলের মধ্যে স্কুবা ডাইভারের মতো ঢুকে যাচ্ছিলাম যেন বা। চাপা পড়া একটা বিশ্বাসের গায়ে হঠাৎ হাত পড়লে যেমন হয় , আমি পড়ে যেতে যেতে আঁতকে উঠি একসময় । কেউ যদি একটানা ভাবনাগুলোর গায়ে দমাদ্দম হাতুড়ি পিটতে থাকে , একসময় বিক্ষোভের জন্ম হবেই। আমারও তাই হলো।
‘ কবীরা , তুমি ঈশ্বর ঈশ্বর ভাব কোরো না তো। তুমি জানো আমার অতিপ্রাকৃত কিছুতে বিশ্বাস নেই । আমি চেয়েছি , তুমি আমার পেছনে থাকো। পাশে পাশে থেকে ভরসা দাও। কিন্তু আমার গন্তব্যবিন্দুতে আগেভাগে দাঁড়িয়ে থেকো না কখনও। রাস্তাটা অন্তত আমার । ’
‘ রাগ কোরো না ভাই ’, কবীরা একটুখানি নিভে যায় , ‘ গান অনেকেরই সর্বনাশের
কারণ । গান ছাড়া আর কিভাবেই বা তোমার সঙ্গে দেখা হতো আমার ? দেখো , তোমারও আর কোনো উপায় ছিলো না। হস্টেল ছেড়ে পালিয়ে এলে , পড়াশুনায় উদ্যম হারালে , কিন্তু আবার কবিতাও লিখলে তো ! কবি’র কোনো অপর তুমি ভাবতে পারো ? বলো এবার , ঠিক হলো না
ভুল ? ’
আমার প্রতিরক্ষা ঈষৎ ঢিলে হয়ে যায় । মস্তিষ্কে বেশ খানিকটা সুবাতাস খেলে যায় যেন । মুখচোখ সম্ভবত উদ্‌গ্রীব হয়ে ওঠে ,
‘হ্যাঁ, তা বটে। আর ধাক্কাটা সইয়েও তো নিয়েছিলাম ধীরে ধীরে। অভিযোজন ক্ষমতা তো আমার কম না! কিন্তু কবিতাটা থেকেই গেলো। দুটোই একসঙ্গে চাওয়া আমার পক্ষে হয়তো বাড়াবাড়িই হতো। একেক জনের জন্য এক একটা মাপ নির্দিষ্ট থাকেই।‘
কবীরা বাধা দেয় আবার আমাকে, ‘এই দ্যাখো, তুমি নিজেই এবার বিধির বিধান মার্কা কথা বলছো! একটা সুযোগ কিন্তু তুমি পেয়েছিলে, মনে করে দেখো।‘
আমি আবার মেনে নিই। কারণ ইহা জলজ্যান্ত সত্যঃ হ্যাঁ , যদি ইংরেজি না বেছে কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়তাম। ছ’মাস ক্লাস করার পর তল্পিতল্পা গুটিয়ে কলকাতা থেকে ফিরে এসেছিলাম। পরের বছর আবার নতুন করে পড়া শুরু করবো। এবার কেমিস্ট্রি । এবার যদি সম্ভব হয় , প্রেসিডেন্সি কলেজ । একদিন আবার পালালাম। সুমনের ওই গানটা বড়ো প্রিয় আমার ... ওই যে ... ‘ ফেরে কি কখনও কেউ ফেলে আসা একই জায়গায়... ’ । আমি কিন্তু ফিরেছিলাম সাহিত্যপাঠে , মৌলানা আজাদে আবার। মাত্রই কয়েকমিনিটের সান্ধ্যখেয়ালে ওই সিদ্ধান্ত । তা যদি না হত ... ভাবলেই মনে হয় ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমায় ঢুকে পড়ছি ক্রমশ। ভুলগুলোকে এডিট করতে গেলেই সমস্তটা সাই - ফাই মুভি। তাহলে ? তাহলে ?
‘ তাহলে আবার কি ? ’ কবীরা আবার স্বমহিমায় অবতীর্ণ হয়। ‘ তার মানে ভুলগুলো ভুল নয় আদৌ। তার মানে ভুল একটা দর্শন । ভুল আমাদের জীবনকে সহজ করে তোলে। ভুল আমাদের সরিয়ে রাখা টাকা। ’
কবীরার ভাবনাটাকে আমি ফের নিজের মতো ভাবতে চেষ্টা করি। তা যদি না হতো ... তা যদি না হতো ... আজ যাদের চিনি তাদের অধিকাংশ মানুষকেই চিনতাম না ... ১/এ সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট মেসবাড়িটি চিনতামই না ... এই জীবনমরণ বন্ধুরা থাকতো না ... অন্য কারা যেন থাকতো
( তারা কি এলিয়েন ? )... এই স্মৃতিগুলো থাকতো না ... অন্য অন্য স্মৃতির একটা পুরোদস্তুর হার্ড ড্রাইভ ... আমার বৌ এর জায়গায় অন্য ... নাঃ কবীরা যখন বলেইছে যে , কোনো বিকল্প কখনোই নেই , তখন আমার এই সামান্য জীবনটায় বেঁচে থাকতে গেলে এই ভাবনাউলের গোলাটাকে থামাতেই হবে । অজানি দেশের না - জানি কি সন্ধান করে আমার লাভ নেই কোনো।
হঠাৎ এই চিত্রমালা রিওয়াইন্ড করে দেখতে দেখতে একটা জায়গায় মন বেবাক স্থির হয়ে গেল। কলকাতা , তাকে আমার হোমটাউন ভাবি , সে যে আসলে বিরাট একটা গ্রাম - তাও কি জানতে পারতাম আমি আমার সেই ঠিকজীবনটায় ? কবীরা ... কবীরা ... এইভাবে নাগরিক জীবন আর গ্রামজীবনের মধ্যবর্তী লুপটায় পা - হড়কে যেত কি আমার ? অনন্তকালের বৃষ্টি ঢেকে দিতে থাকতো আমার বড়ো হয়ে ওঠাটাকে ? আমি যে কখনও কারো হলাম না । যে লোকজীবনের ভেতর জন্মে গেছে , তার গায়ে মনসার ঝাঁপি আর ত্রিস্তর পঞ্চায়েতিরাজ চিরকাল ট্যাটু হয়ে থেকে যায় না কি ? কবেকার এক বৃষ্টি , মাঠের গন্ধ , কাদার মাড় , শ্যামাপোকা তাকে ডেকে ডেকে বেড়ায়। গ্রামকে সে ছেড়ে যায়, গ্রাম তাকে কখনও ছাড়ে না। তুমি বলো কবীরা , এই যে আমি ভাবছি কলকাতা একটা শহররূপ গ্রাম , এও কি একটা ভুল ? আমার ছেলেবেলার উঠোন ভেঙে গেছে। সকলেরই যায়। প্রত্যেকের সঙ্গে সঙ্গে তার গ্রাম - শহরও একটু করে ভেঙে যেতে থাকে। তবে ভুলটা কি ? আমার ঠিকজীবনটায় কি সবকিছু নিরন্তর জোড়া লেগে যেত ? বলো , কবীরা। আমার কি সত্যিই কখনো কোনো বিকল্প ছিল না ?

কোনো সাড়াশব্দ নেই। কবীরাকে আর কোথাও দেখিনা। সে কি উত্তরগুলো সাজিয়ে নিতে
গেল ? না কি সেও বিরাট একটা বনের মধ্যে সামলে নিলো চোখের জল ? আমি জানি , সে এখন বহুকাল আমার পাড়ায় আসবে না। আপাতত , আমার কোনো গার্ডিয়ান এঞ্জেল নেই।