বিষণ্ণতা

শাহনাজ নাসরীন

একটা স্থির বর্তমানে দাড়িয়ে শুধু নিঃসঙ্গতা দেখি। তাকের ওপর থেকে ডিপ্রেশানের অষুধগুলো চেয়ে আছে। এক, দুই, তিন করে প্রতিদিন চারটি। পঞ্চমও আছে একটা, ওটা অপশনাল, বাকী চারটিতে না কুলোলে তবে খেতে হবে। ডাক্তার বলেছে বিষণ্ণতা নয় যে রোগটি হয়েছে তার নাম উদ্বেগ। তবে সাবধান না হলে তার থেকে বিষণ্ণতা, বিষণ্ণতা থেকে সিজোফ্রেনিয়া এরপর আরও কঠিন কিছু হতে পারে। তাই রাত আটটা বাজলেই হুড়োহুড়ি করে কিছু খেয়ে ওগুলো গিলে শুয়ে পড়তে হয়।

বাড়ির মানুষ আত্মীয় স্বজন সবাই দেখতে আসে আর উপদেশ দেয়। তারা মানে যে উদ্বেগ হতেই পারে। মেয়েটা ছেলেটা স্বামীটা কখন পিষে যায় গাড়ির চাকায়, অথবা গুম নতুবা ধর্ষণ আরও কত কী! কখন কোনটা ঝাঁপিয়ে পড়বে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। এদিকে বাজার করতে গিয়ে টাকায় টান পড়ে প্রায়ই। অবস্থা দিনে দিনে খারাপ হতে হতে নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর দিকে যাচ্ছে। মধ্যবিত্তের লেবাস আর ধরে রাখা যাচ্ছে না। একটা ব্যাঙ্কে সঞ্চয়ী হিসাব খুলেছিলাম দশ বছর আগে। বিন্দু বিন্দু করে যদ্দুর যা জমছিল তাও গেল বোধহয়। ব্যাংকই বন্ধ হয়ে গেছে। সবই স্বীকার করে তারা কিন্তু তবু রাগ করে। উদ্বেগ করার কারণ থাকলেই উদ্বেগ করতে হবে নাকি? উদ্বেগ করে সমাধান হয়?

তা যে হয় না সে আমার চেয়ে বেশি কে জানে। সমাধান তো হয়ই না বরং আরো সমস্যা বাড়ে। এই আক্রার বাজারে ডাক্তার দেখানো টেষ্ট করানো এরপর ঘুরতে ঘুরতে মানসিক ডাক্তার এর কাছে যাওয়া, কতগুলি টাকা ধার হয়ে গেছে এই ধাক্কায়! মনে হলেও কান্না আসে। কান্নাও অবশ্য কোন সমাধান দেয় না।

আজকাল অষুধ খেয়ে শিথিল শরীরে হাত-পা ছড়িয়ে বেহুশ ঘুমাই। সে কারণে একটা কাজের লোকও রাখতে হলো। আরেকটি টেনশান। ঘুমানোর সময় কেমন দেখায় আমাকে ভাবি। কুম্ভকর্ণ নাকি ছ’মাস ঘুমাতো আর ছ’মাস খাটতো দ্বিগুনের বেশি। তবে আমি ঘুম ভাঙার পরেও তার মতো সক্রিয় হবার আশা দেখি না। শরীরের ক্লান্তি মনের ক্লান্তি মিলে অর্ধেক জীবিত বা অর্ধেক মৃত এক সত্তা হয়ে আছি। মাথাটা নিরেট, ভালোলাগা-মন্দলাগা, আনন্দ-বাসনা কিছু নেই যেন।

তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি একটা শিশু বট রাক্ষসের মতো কার্নিশ খেয়ে খেয়ে উঠে যাচ্ছে ছাদে, দেয়াল ফুড়ে আমার ঘরেও ঢুকিয়েছে দুরন্ত পা। আমি বিপুল অবসাদ নিয়ে চেয়ে থাকি, ওপড়ানোর কথা মনে আনি না। প্রাচীণ গুহায় জমে থাকা ভারী বাতাসের মতো আমার ভেতরেও পাথর হতে থাকে যাপনের বিষ। অষুধ সেই ভার সামান্যও কমাতে পারে না বরং আজকাল অষুধ খাবার আগে একটা স্পৃহা উল্কার মতো দেখা দেয়, কী হয় যদি সব অষুধগুলো গিলে নিই একবারে একসাথে...