রাতের মধ্যভাগ ও কতিপয় অসুখবিসুখ

নাফিস অলি


১.
আমি যখন রাস্তায় একাকী হাঁটতে থাকি কিংবা বসে থাকি কোনো বেঞ্চিতে চুপচাপ আর মাথার ভেতর একটা চিন্তার পা গজিয়ে হাঁটতে শুরু করে- তখন পেছন থেকে কেউ নাম ধরে ডাক দিলে কিংবা না ডাকলেও তা কান হয়ে মস্তিষ্কে পৌছায় আর তখন আমি পেছন ফিরে তাকাই। এসময় একজনকে দেখতে পাই যে আমায় ডাক দিয়েছে একটু আগে কিংবা দেয়নি, সেই মানুষটি যে পরিচিত কিংবা পরিচিত নয় সে এমনভাবে কথা বলতে শুরু করে যেন আমার দেখা পেয়ে অনেক খুশি। তার মুখের দিকে পুরোটা সময় তাকিয়ে থাকি এবং চেহারাটা এমন করে রাখি যেন আমাদের পরিচয় এবং বন্ধুত্বের কথা পূর্ণমাত্রায় স্মরণ আছে। সে আমার খবর জানতে চায় এবং খবর জেনে নেয়ার আগেই জানায় তার একটা ভীষণ তাড়া থাকায় এখনি চলে যেতে হবে। আমি সামান্য হাসলে বুঝতে পারে এখন সে চলে যেতে পারে। এভাবে মানুষটা চলে গেলে আবার একা হয়ে পড়ি, পুনরায় একাকী হাঁটতে শুরু করি কিংবা চুপচাপ বসে থাকি একটা বেঞ্চিতে আর আমার চিন্তারা পা পেয়ে হাঁটতে থাকে দারুণ খুশিতে। এসময় বিশেষ একটা খেলায় অংশ নিয়ে পথ চলতে চলতে যখন আপাতত একটা গন্তব্যে পৌঁছে যাই তখন সেখানে আরও কিছু মানুষের দেখা মেলে যারা আমার অদেখা এবং অপরিচিত। মানুষগুলো একটা সুশৃঙ্খল লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে এবং একেএকে অভিযোগের কিছু তীর নিয়ে আমার দিকে ছুটে আসে। তীরগুলো গায়ে ছুড়ে দেয়ার আগে প্রত্যেকে জানায়, কী পরিমাণ ভালোবাসে আমায় তা প্রকাশ করার মতো ভাষা এখন তাদের কাছে জমা নেই। এরপর তীরটি আমার দিকে ছুড়ে দিলে জানতে পারি, যখন রাস্তাটা দিয়ে একাকী হেঁটে এলাম বা একটা বেঞ্চিতে চুপচাপ বসে থাকলে আমার চিন্তারা পা গজিয়ে হাঁটতে শুরু করলো তখন তারা আমার পেছন পেছন আসছিল। আমার গতি কিছুটা বেশি থাকায় কিংবা তাদের গতি কিছুটা কম থাকায় আমায় ধরে ফেলতে পারেনি। সশরীরে ধরতে না পারলেও তাদের কণ্ঠ দিয়ে দূর থেকে ধরার জন্য পেছন থেকে বারবার ডাক দেয়। কিন্তু আমি পেছন ফিরিনি বা তাদের সাথে কোনো কথা বলিনি বলে আমায় ধরতে পারেনি। এতে তারা আহত হয়েছে এবং আহতরা সবাই এখানে একত্রিত হয়েছে অভিযোগের তীর হাতে। ভবিষ্যতে যেন এমন আচরণ না করি তার নিশ্চয়তা চায় আহত দলটি। আমি লাইনটার শেষ পর্যন্ত তাকাই আর বুঝতে চেষ্টা করি এখানে পরিচিত কেউ আছে কিনা যার কাছে সত্যটা জানতে পারবো; আসলেই আমি এমন আচরণ করেছি কিনা। সেখানে নানান বয়সের পুরুষমানুষ দাঁড়িয়ে থাকে যাদের মধ্যে কয়েকজনের মুখে লম্বা দাড়ি এবং কয়েকজনের মুখে দাড়ির রেখা দেখা পড়েনি। লাইনটার শেষ মাথায় একজন বয়স্ক মানুষকে দেখা যায় যার বৃহৎ কালো শরীর আর মুখে লাল দাড়ি। লোকটা উশখুশ করে লাইনটার শেষ মাথায় আছে বলে হয়তো। তার দিকে তাকিয়ে আমার খারাপ লাগে ফলে আমি তাকে আগে সুযোগ দিই যাতে সে তীরটা ছুড়ে স্বস্তি পায়। সে যখন তীরটি ছুড়ে দেয় সত্যিকার অর্থেই আমি বিচলিত হয়ে পড়ি। তখন সমবেত দলটার উদ্দেশ্যে বলি, আপনাদের অভিযোগ নেয়ার আগে আমাকে পুনরাগমন করতে হবে। সবাই সম্মতি জানালে যাত্রাটা শুরু করি। আবার আমাকে বিশেষ খেলা শুরু করতে হয় রাস্তায় নেমে। এই খেলা যার কাছে শিখেছিলাম তার নাম জসিম। শৈশবে একটা মাদরাসায় পড়তাম একসাথে। একটা মেয়েকে ভালোবাসতো যার জন্য তাকে মাদরাসা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল এবং মেয়েটা পরে তাকে ছেড়ে গিয়েছিল। জসিম এখন কোথায় আছে জানি না। আমাকে পুরো পথটা হাঁটতে হবে আবার। খেলার নিয়মটা স্মরণ করার আগেই রাস্তায় জসিমকে দেখতে পাই। সে দূর থেকে হাত নেড়ে ডাক দেয়, এই এদিকে আয় তো! আমি কাছে গেলে সে কাঁধে হাত দিয়ে জানতে চায়, কী অবস্থা তোর এখন। চল হেঁটে কথা বলি। আমি জানতে চাই কতদূরে যাবো আমরা কথা বলতে বলতে? আমার একটা ব্যস্ততা আছে বললে জসিম বিশ্বাস করবে না ভেবে চুপ করে থাকি। সে জানায় মাটির রাস্তার শেষে যেতে সন্ধ্যা হতে পারে। আমি হাঁটা থামিয়ে বলি এসময় আমার অতদূরে যাওয়ার ইচ্ছে নেই। জসিম তখন এদিক ওদিক তাকিয়ে দূরে ক্ষেতের মধ্যে একটা সাদাকালো ছাগল দেখিয়ে বলে, চল ওখানে যাই। ছাগলের দূরত্ব দেখে আমার পছন্দ হয়। আমরা মাটির রাস্তায় হাঁটতে শুরু করি। ছাগলটার কাছাকাছি যেতে ওটা বড় হয়ে যায়, ম্যা ম্যা ডাক শুনতে পাই তখন। জসিম বলে, ওই দূরে আরেকটা ছাগল দেখা যায়, চল ওই পর্যন্ত গিয়ে দেখি ছাগলটা কিভাবে ডাকে। আবার আমরা হাঁটতে শুরু করি আর ছাগলের কাছে পৌঁছে যাই দ্রুত। এভাবে কখন যে পথটা শেষ করে ফেলি তা ঠিক বুঝতে পারি না। সে বলে এটা একটা খেলা। যখন তোর পথ চলতে কষ্ট হবে তখন এই খেলার সাহায্যে চলতে পারবি। আমি জসিমের চোখে তাকালে সে বলে, তোকে আরও কিছু শেখাতাম কিন্তু জীবিত ও মৃতদের মাঝে কিছু দূরত্ব থাকতে হয়। তোকে একটা পুকুরের কাছে নিয়ে যেতাম যেখানে চারপাশে জঙ্গল ঘেরা চমৎকার এক জলের বাগান আছে। শুনে আমারও যেতে ইচ্ছে হয় কিন্তু তখন রাতটা নেমে গেছে চারপাশে আর আমি ততক্ষণে পৌঁছে গেছি শৈশবে। আরেকটু সামনে গেলে যেখানে এমন এক পুকুর আছে সেটা কতদূরে বা কোথায় তা জানা নেই। কিন্তু জসিমের সাথে থাকতে আমার খুব ভালো লাগছিল। তাই সিদ্ধান্ত নিই সেখানে যাবো রাত যত নামুক। আমার সিদ্ধান্তের কথা জানালে জসিম রাতের আঁধারে আরেকটা ছাগল খুঁজতে থাকে। যখন আমরা চলতে শুরু করি কয়েক কদম, সামনে অন্ধকার ফুঁড়ে উদয় হয় আমাদের মাদরাসার ফায়জুল্লা হুজুর। দীর্ঘ আঁধারের মেঘে ভেসে আসে তার জোব্বা। সে যখন কাছে চলে আসে তখন তার মুখ সামান্য দেখা যায় অন্ধকারে। আমরা উভয়ে তাকে চিনতে পারি এবং সালাম দিয়ে আবার চলতে শুরু করি। জসিম জানায় রাতের মধ্যে সেই জলপুকুরের কাছে পৌঁছাতে হবে। ফায়জুল্লা আমাদের ভীত গলায় ডাক দিলে দুজনেই স্পষ্ট শুনতে পাই সে ডাক। আমরা তার কাছে এসে আবার সালাম দিই এবং অপেক্ষা করি সে কিছু বলবে। ফায়জুল্লা জসিমের দিকে তাকিয়ে থাকে এমনভাবে যেন সে সিনেমার নায়ক কিংবা ভিলেন এবং তাকিয়ে আছে আরেক নায়ক কিংবা ভিলেনের দিকে। এবার আমার চরিত্রটা পুরোপুরি ফুটে ওঠে যখন কথা বলতে শুরু করি। হুজুর আমি জসিমের সাথে একটা পুকুর দেখতে যাচ্ছি যেখানে চারপাশে ঘন জঙ্গলের মাঝে চমৎকার জল থাকে। আমাদের যাবার অনুমতি দিন যেন রাত থাকতেই সেখানে পৌঁছাতে পারি।
ফায়জুল্লা জসিমের দিকে তাকিয়ে থাকে আরও নায়ক নায়ক কিংবা ভিলেন ভিলেন দৃষ্টিতে। এরপর আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলতে শুরু করে অচেনা গলায়, রাতের মধ্যভাগে তোমার কোথায় থাকা উচিৎ তুমি তা জানো কী? সে আমার হাত ধরে নিজের কাছে টেনে নেয় এবং হাঁটতে শুরু করে আমার শৈশব থেকে কৈশোর, কৌশোর থেকে যৌবনের দিকে। আর যার সাথে এতক্ষণ আমি হাঁটছিলাম একটা পুকুর দেখবো বলে, পেছন থেকে তাকিয়ে থাকে। সে তাকিয়ে থাকে জসিমের মতো।

২.
শীতের মধ্যরাত। বিছানা আর বিছানার সঙ্গিনী আরামদায়ক হয়ে উঠেছে আরও আগে। আমি সব ফেলে উঠে বসি অস্পষ্ট গলায় শব্দ করে। পাশে যে শুয়ে ছিল, মেয়েটা পাশে ঘুমায় জড়িয়ে ধরে সেও উঠে বসে আমার সাথে। জানতে চায় কোনো ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখছি কিনা যাতে এভাবে গরম লেপ ফেলে চুপচাপ বসে আছি ঠাণ্ডায়। সে আমার শরীরে আদুরে হাত বুলায় আর খুঁজতে থাকে শরীর ঘেমে আছে কিনা। ভয় পেয়ে যায় যখন দেখে শরীর স্বাভাবিক এবং আমিও স্বাভাবিক। তার ভয় দূর করার জন্য ব্যাখ্যা করি, আমাকে এখন অযু করতে হবে। কিন্তু সবগুলো ট্যাপের পানি ভীষণ ঠাণ্ডা! আমাকে সবক দিতে হবে তারপর। আহা আজ যদি সবক না থাকতো! আজ যদি আমি বড় হয়ে হয়ে বুড়িয়ে যেতাম। যখন আর মাদরাসায় পড়তে হয় না। আজ শীতের রাতে আমার যদি প্রিয়তমা থাকতো যে আমায় জড়িয়ে রাখতো! যে মেয়েটা এতক্ষণ জড়িয়ে ছিল, যার শরীরের ওম এখনো লেগে আছে আমার শরীরে; সে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে ভয় খেলা করে।

ফায়জুল্লা জানায় এতরাতে আমার কোনো পুকুর দেখতে যাওয়া উচিৎ নয়। তা যদি বয়সে বড় কারও সাথে হয় তবে কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সে দয়া করছে বলে বেঁচে গেছি, নয়তো শাস্তি পেতে হতো। আমি যে অপরাধ করেছি তার জন্য কঠিন শাস্তি দেয়া হয় অন্যদের। চুপচাপ হাঁটি। হেঁটে পা বিষিয়ে যায়। অথচ জসিমের সাথে এই পথটা এত দীর্ঘ মনে হয়নি। হয়তো এখন অন্য একটা পথে চলতে শুরু করেছি। একজন অপরাধীর পা বিষিয়ে যাওয়া নিয়ে ফায়জুল্লা দয়া করবে না। তাই চুপচাপ হাঁটি। দুজনেই অবাক হই যখন সেই জনশূন্য পথে একটা গাড়ি দেখতে পাই। গাড়িটা কিসের তা অন্ধকারে বুঝা যায় না। ফায়জুল্লা আমায় নিয়ে গাড়িটাতে চড়ে বসে আর নতুন এক ধরণের ঘিনঘিনে অন্ধকার আমাদের গিলে ফেলে। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে যাই। ভয়ে চিৎকার দিতে গেলে ফায়জুল্লা আমার শরীর তার শরীরের সাথে চেপে ধরে আর ফিসফিস করে বলে, এইসব অন্ধকার আমার চেনা। তুমি ভয় পেওনা। কিছু হবে না তোমার! এবার আরও বেশি ভয় পাই। তার এই কণ্ঠ আমি কখনো শুনিনি কিংবা অন্ধকারের মধ্যে অন্য একটা লোক আমার পাশে বসে পড়েছে এবং ভয় ধরানো গলায় এইসব কথা বলছে। ভয় পেলেও মুখে কিছু বলি না যাতে ফায়জুল্লা বা লোকটা ভয় দূর করার জন্য মরিয়া হয়ে না ওঠে কিংবা নতুন কিছু করে না বসে। তবু আমার শরীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে কাঁপতে শুরু করলে ফায়জুল্লা বা লোকটা তা অনুভব করে- দুটো শরীরের মধ্যে তখন কোনো ফাঁকা নেই। সে আমার শরীরের মতো কাঁপা গলায় এবার বলে, তুমি ভয় পাও কেন! আসো আমার কোলে বসো। কোনো ভয় নেই! আমাকে তার কোলের মধ্যে বসালে বিশ্রী উষ্ণতা অনুভব করি। আর সে কম্পমান গলায় ভয় নেই ভয় নেই বলে নিজেই ভয় পেয়ে আমায় চেপে রাখে তার উত্তপ্ত কোলের মধ্যে। এবার নিশ্চিত হই লোকটা ফায়জুল্লা নয়। সে একটু আগেই শাস্তির ব্যাপারে বলছিল। আর এই লোকটা নিজেই আমার জন্য ভীত হয়ে পড়েছে। তার গলার ভয় নেই ভয় নেই বলায় স্পষ্ট ভয়।
শেষরাতে যাত্রা সমাপ্ত হয়। গন্তব্যে এসে আমার সঙ্গী ক্লান্ত। সে আমায় নিরাপদ ভেবে যখন ফিরে যাচ্ছে আমি স্পষ্ট দেখি ফায়জুল্লা হুজুর। সেই লোকটা কোথায়? এতক্ষণ তবে ফায়জুল্লা গাড়ি চালিয়ে এনেছে আর গাড়ির লোকটা আমায় কোলে বসিয়ে রেখেছিল পুরো পথ? আমার কোনো ক্লান্তি নেই। বরং ঘুম উবে গেছে অজানা একটা আতঙ্কে। ফায়জুল্লা পেছন ফিরে বলে, শুয়ে পড়। ভোররাতে সবক দিতে হবে। কুরআন পড়তে বসে ঘুমালে খবর আছে। গাড়িতে আমায় কোলে নিয়ে থাকা লোকটা ফায়জুল্লা নয় তাতে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে যাই। এত দ্রুত মানুষ বদলায় না। আমায় নিয়ে সে ভীষণ ভীত ছিল। উত্তেজনায় তার গলা, শরীর সব কাঁপছিল।

৩.
এক ব্যস্ত দুপুরবেলায় হান্নান হুজুরের পর্দার ভেতর আমার ডাক আসে। আমি যার তত্বাবধানে; হাবিবুল্লা হুজুরের সাথে হান্নানের সূক্ষ্ম যুদ্ধ চলছে অনেকদিন ধরে। হান্নান এই মাদরাসার পুরানো শিক্ষক আর হাবিবুল্লা সেদিন এলো। কিন্তু হাবিবুল্লার মতো কুরআন এখানে কেউ পড়তে পারে না তাই অন্য শিক্ষকদের মুখে সারাক্ষণ, হাবিবুল্লা হাবিবুল্লা। সে অঘোষিত প্রধান হয়ে গেছে হান্নানকে পরাজিত করে। সব কম বয়সী আর ধনীর ছেলেরা হাবিবুল্লার দখলে। আমাদের প্রতিপক্ষ বলে হান্নানের হুজরায় আমি কখনো ঢুকিনি। বেশ গরিবি হাল। হান্নান ইশারায় তার কাছে বসতে বলে একটা প্রশ্ন করে, কোরআন কী তুমি জানো? কত পবিত্র তা? আমি মুখ নিচু করে বলি, আমি তা জানিনা। সে ঘোষণা করে কোরআন আল্লাহর নূর। নূর কী তা জানো? নিজেই বলে, আলো। কোনো অপবিত্র আত্মা, নাপাক কলুষিত আত্মা কোরআন গ্রহণ করতে পারে না। আর পাপপুণ্য বুঝার মতো বয়স এখন তোমার হয়েছে। তার দিকে তাকিয়ে থাকি চুপচাপ। আমি ভাবছিলাম ঠিক কোন উপায়ে আত্মা অপবিত্র হয় এই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করবো কিনা? আর হান্নানের কথাটা কতটা সত্য? সে আমায় কাছে টেনে কানের কাছে মুখ এনে বলে, আমি তোমায় স্নেহ করি। খুব বেশি স্নেহ করি। তার মূল্য দিও। হাবিবুল্লা সাহেবের বিদায়ের পর তুমি আমার দায়িত্বে থাকবে। তুমি অনেক ভালো ছেলে, কেবল ইবলিশের পাল্লায় পড়ে বিপথগামী হয়েছো। তোমার আত্মা পরিশুদ্ধ করতে হবে সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। আমি ভেবে পাই না কেন আমার আত্মা নোংরা হয়েছে এবং কেনই তা পবিত্র করতে হবে? আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার কোনো উপায় আমার জানতে ইচ্ছে হয় না। আত্মা পরিশুদ্ধ করার উপায় যাদের আছে তাদের আত্মাই নোংরা হয়। তবু সেদিন সকালে মোতাওয়াল্লি সাহেবের কামরায় উপস্থিত হই আরও কয়েকজনের সাথে। মাদরাসার পরিবেশ কিছুটা থমথমে। প্রায়ই এমন হয়। হান্নান বসে আছে মোতাওয়াল্লি সাহেবের পাশে। সে আমাকে প্রশ্ন করে হাবিবুল্লা সাহেব তোমার সাথে লাওয়াতাতে লিপ্ত হয়েছে? মোতাওয়াল্লি সাহেব জিজ্ঞাসু চোখে হান্নানের দিকে তাকালে সে পুনরায় জিজ্ঞেস করে, হাবিবুল্লা সাহেব তোমার সাথে সঙ্গম করেছে কিনা?

আমি অযু করে দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান সব অপবিত্রতা থেকে পবিত্র হয়ে কুরআন নিয়ে বসি। আমার চারপাশে আরও অনেক ছেলে কুরআন সামনে রেখে ঢুলতে থাকে। শেষরাত। সমস্ত পৃথিবী ঘুমে। ছেলেরা কুরআন সামনে রেখে অসমাপ্ত ঘুমে ঢুলছে। কুরআন পড়তে হবে। যুগে যুগে কাউকে পড়তে হয়। শুরু থেকেই কেউ না কেউ পড়েছে। প্রভু যাদের ভালোবাসেন, যাদের ওপর দয়া করেন কেবল তারাই কুরআন পড়ার সুযোগ পায়। আমি সুযোগ পেয়েছি। এবার পড়ার দায়িত্ব আমার। আমি কুরআন খুলি। তারপর অন্য সবার মতো ঢুলতে থাকি।
মেয়েটা জিজ্ঞেস করে কেন এভাবে ঠাণ্ডা ফ্লোরে বসে ঢুলছি। তাকে অভয় দিয়ে জানাই আমার অভ্যাস আছে। তাছাড়া একটু পরে আমার ডাক আসবে। একটা উষ্ণ বিছানা পাবো এভাবে কিছুক্ষণ ঢুলতে থাকলে। ‘একটা উষ্ণ বিছানা পাবো’ কথাটা যেন মেয়েটার বিশ্বাস হয় না। সে ডাকে, দেখো আমার বিছানা কত উষ্ণ। তুমি এলে এটাকে আরও উষ্ণ করে তুলতে পারবো। কথাগুলো যেন শুনতে না পাই এমন প্রবল বেগে ঢুলতে থাকি। ঢুলতে ঢুলতে একসময় কানে আসে প্রতীক্ষিত বাক্য। ‘কইরে! এদিকে আয়, চালা!’ এই ডাক শুনলে আমরা পর্দার ওপাশে ছুটে গিয়ে কাঁথার তলায় উপুড় হয়ে থাকা হেমায়েতুদ্দিন হুজুরের নিতম্বের ওপর শুয়ে পড়া নিয়ম। আমি আর মোহাম্মদুল্লা। আমরা দুজন বয়সে সবচে’ ছোট এখানে। তাই আমাদের এই দায়িত্ব। প্রতিদিন মোহামদুল্লার সাথে কাঁথা নিয়ে ঝগড়া বাঁধে বলে ওকে সতীনের মতো মনে হয়। তবু ঘুমে ঢুলতে থাকা মোহাম্মদুল্লাকে সচেতন করে উষ্ণ কাঁথার তলায় ঢুকে পড়ি। শুয়ে যখন চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসে তখন পর্দার ওপাশে কুরআন পাঠের সিগ্ধ আওয়াজ কানে বাজতে থাকে। আমি হেমায়েতুদ্দিনের ভারী নিতম্বের ওপর মাথা তুলে দিতে দিতে হাই তুলি।

৪.
আমি যখন তার ঘরে প্রবেশ করি সে বিছানায় উঠে বসার চেষ্টা করে আবার ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ে। বয়স হয়ে যাওয়ায় শরীরে নানাবিধ অসুখ সৃষ্টি হয়েছে বলে জানায়। তার ওপর রোজার মাস। রোজা পালন করতে গিয়ে কষ্টে মৃত্যু হলেও সে মৃত্যু কাম্য বলে সে রোজা ত্যাগ করে না। সারা জীবনে অসংখ্য মাদরাসায় খেদমত করে শেষ বয়সে এই অবসর। এখন বিছানায় তাসবিহ জপেই তার দিন কাটে। আমার গলা থেকে কিছু বের হয় না তার জন্য তাই দাঁড়িয়ে থাকি চুপচাপ। সে আমায় কাছে ডেকে বসায় বিছানার ওপর। তোমার অসুখের খবর শুনেছি। পড়াশোনা শেষ হলো এবার কোথাও খেদমতে লেগে যাবে; তা এখন এমন হলো তোমার! যাইহোক, সবই করুণাময়ের ইচ্ছে। একটা উপহার আছে তোমার জন্য। আচ্ছা এখানে শোও আমার পাশে, তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে কষ্ট হয়। আমি যন্ত্রের মতো বসে থাকি। আমার একটা হাত তার শিশ্নে রেখে বলে, তোমার একটা উপকার করতে চাই, তুমি আমার একটা উপকার করো!
রোজার দিনের জোহরের নামাজের সময় হয়েছে। আমি গোছল করতে ঢুকি পুরানো বাথরুমে। তার মেয়ে বাবার ধবধবে শাদা লুঙ্গি এনে আমার হাতে দেয়।

ঝুম বৃষ্টির রাত। বাইরে বিদ্যুতের ঝলকানি। এইসব রাতে আমার ভুলে যেতে ভালো লাগে, আমি এখনো একটা মাদরাসায় পড়ি। সত্যটা মনে পড়ে একটু পর। আমি একা, ভীষণ একা। আমার চারপাশে কোনো মানুষের বসতি নেই। তবে ভয় পাই না। কেবল গুটিয়ে থাকি নিজের মধ্যে। রাত তখন কত ঠিক জানি না। শীত শীত লাগে। কাঁথাটা পড়ে আছে পায়ের কাছে। গোটানো হাত পা খুলতে ইচ্ছে হয় না। মনে মনে প্রার্থনা করি, পরম করুণাময়! আমায় দয়া করো আজ রাতে। তোমার কাছে আর কিচ্ছু চাই না। তুমি কেবল কাঁথাটা তুলে দাও গায়ে। তুমি দয়া করো! আমার প্রার্থনার অল্প পরেই কাঁথা গায়ে উঠে আসে ধীরেধীরে। আহা সুখ!
কাঁথাটা উঠে আসে গায়ের ওপর আর আমি অনুভব করি সদ্য উঠে আসা কাঁথার ওম। সদ্য উঠে আসা কাঁথার ওম আমার চেনা। শরীরের ওমে ধীরেধীরে মিলিয়ে যায় তা। কিন্তু সাথে উঠে আসা হাতটা আমার অচেনা। কাঁথার মতো হাতটা বেয়ে বেয়ে উঠে আসে শরীরে। গরম কর্কশ একটা হাত। এত বেশি গরম আমার শরীর পুড়ে যায়। এত বেশি কর্কশ আমার শরীর ক্ষত হয়ে যায়। আমি নড়তে পারি না, লোহার মতো হাত আমায় চেপে রাখে। আমি হঠাৎ ভুলে যাই কোথায় আছি। আমার চারপাশে কারা আছে আমি জানি না। তাদের চিনি না বলে ডাক দিতে পারি না। আমার একটা স্বপ্নের কথা ভেবে কিছুটা স্বস্তি হয়। একটা ভয়ঙ্কর স্বপ্ন। তবু স্বস্তি। স্বপ্নটা যখন আমার শরীর বেয়ে ওপরে উঠে আসে, যখন আমার নিতম্ব চষে বেড়ায়, আমার শিশ্ন উন্মুক্ত করে ফেলে ঠাণ্ডা বাতাসে, আমার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠলেও আমি শান্তনা পাই একটা স্বপ্ন ভেবে। এই পবিত্র দেবালয়ে, কুরআন পাঠের ঘরে এমন স্বপ্ন দেখার জন্য বরং আমি লজ্জা পাই। পরম করুণাময়ের পায়ে লুটিয়ে পড়ি আবার। আমার ক্ষমার অযোগ্য এই অপরাধ তুমি মার্জনা করো। প্রবল আতঙ্ক নিয়ে আমি স্বপ্নটা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকি। এবং একসময় স্বপ্নের ভয়ঙ্কর অংশটা শেষ হয়। তবু চলতে থাকে। আমি স্বপ্নের মধ্যে প্রার্থনায় লুটিয়ে পড়ি। এই পবিত্র গৃহ আমি অপবিত্র করেছি বলে। এবার আমার এলোমেলো কাপড় আর সরে যাওয়া কাঁথাটা গোছগাছ করে দেয় সেই হাতটা। আমি মিলিয়ে থাকি। খুব ধীরে চলে আয়োজন। এক সময় শেষ হয় সবকিছু আর হাতটা আমার মশারি ছেড়ে বেড়িয়ে তার মালিকের কাছে ফিরে যায়। একজন মানুষ। যাকে আমি চিনি। না! এসব কিছু স্বপ্ন নয়, সত্যও নয়। আমার ভুল। দরজার দিকে ফিরে যাচ্ছে আমার হুজুর। আমার ভীষণ কান্না পায়। বুক ফেটে আসে। হুজুর আপনি আমায় বাঁচান! এইমাত্র আমি মহা অন্যায় করে ফেলেছি। আমি এই পবিত্র গৃহে চরম অপবিত্র স্বপ্ন দেখে অন্যায় করেছি। আপনি তো এখন তাহাজ্জুদের মহা প্রার্থনায় বসবেন। দয়াকরে আমার জন্য প্রার্থনা করুন। আমার পাপ ক্ষমার অযোগ্য। আমি পাপ করেছি!
হুজুরের সুঠাম দেহ আলোর দিকে হেঁটে যায়। আমার বুকের গভীরের দীর্ঘ বিলাপ তার কানে প্রবেশ করে না। এখন তাহাজ্জুদের সময়। প্রভু নেমে আসবেন প্রথম আসমানে। সবাই যখন গভীর ঘুমে তলিয়ে, প্রভু ডাকবেন তাঁর প্রিয় বান্দাদের। হুজুর এখন প্রভুর ডাক ছাড়া অন্যকিছু শুনতে চাইবে না। তার ভক্ত হৃদয় ও কান এখন কেবল প্রভুকে শুনবে। আমি অপবিত্র, প্রভু কিংবা তাঁর ভক্ত আমার ডাক শুনবে না। তবু আমি বারে বারে হুজুরকে ডাকতে থাকি। সে আলোর দিকে হেঁটে যায়। একটু পরেই পবিত্র কুরআনের মিষ্টি সুর তার পর্দার আড়াল থেকে রাতের প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়ে। দৈব সুরে সমস্ত প্রকৃতি আলোয় ঝলমল করে ওঠে। সব আত্মা প্রভুর পায়ে লুটিয়ে পড়ে। সব সৃষ্টি ধন্য হয়ে ওঠে তাদের সৃষ্টি করা হয়েছিল বলে। কেবল আমি। এক আমি অন্ধকারে পড়ে রই। পবিত্র আলো আমায় স্পর্শ করে না। আমি এক গভীর ও চিরস্থায়ী অন্ধকারে তলিয়ে যেতে থাকি।

আমার মনে পড়ে হাবিবুল্লা হুজুরের বিদায়ের দিন দুপুরবেলায় মোতাওয়াল্লি সাহেবের কামরায় আমরা নয়জন উপস্থিত হই। হান্নান আমাদের সামনে পবিত্র কোরআন থেকে কিছু পাঠ করে। আমরা সবাই বুঝতে পারি সে কোরআনের কোন পাতা থেকে পড়ছে। কেবল অর্থ বুঝতে পারি না। হান্নান আমাদের এক সংবাদ শোনায়। পূর্ববর্তী নবী নূতের সময়ে মানুষ আর শয়তান লাওয়াতাত বা সমকামে লিপ্ত হয়েছিল। তাদের ধ্বংস করেছেন মহান প্রভু। যারা এহেন কর্মে লিপ্ত হয় তাদের আত্মায় কোরআন প্রবেশ করে না। প্রভু প্রবেশ করেন না। অতএব তোমরা আমাদের কাছে ভুল স্বীকার করো এবং মহান প্রভুর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো। একেএকে সবাই স্বীকারোক্তি দেয় হাবিবুল্লা তাদের সবার সাথে যৌনতার বিভিন্ন ক্রিয়ায় লিপ্ত হয়েছে। এবার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে সবাই। আমি দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করি, মধ্যরাতে একটা দুঃস্বপ্ন দেখে ভয় পেয়ে উঠি। স্বপ্নটার শেষ মুহূর্তে আমি একটা হাত অনুভব করি যেটা স্বপ্ন পরবর্তী আমার শরীরের এলোমেলো কাঁথা ঠিকঠাক করে দেয়। তারপর একটা ছায়া দরজার দিকে এগিয়ে যায় যাকে হাবিবুল্লা হুজুরের মতো লাগে। এরপর আমি আর ঘুমুতে পারি না। ফলে চুপচাপ শুয়ে স্বপ্নটা ভুলে যেতে চেষ্টা করি। কিছুক্ষণ পর হাবিবুল্লা হুজুরের পর্দার ওপাশ থেকে মধুর কণ্ঠে কোরআন পাঠের শব্দ ভেসে এলে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। হান্নান আমাকে জানায় যেটাকে স্বপ্ন ভেবে এসেছি এতদিন সেটা আসলে সত্য। হাবিবুল্লা আমার সাথে লাওয়াতাতে লিপ্ত হওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে।

৫.

লোকগুলোর সাথে যখন আমার রাস্তায় দেখা হয় অথচ দেখতে পাইনি তাদের, তখন একটা অসুখের কথা ভাবছিলাম। আর অসুখের ভাবনাটা যখন আসে তখন হাবিবুল্লার কথা মনে পড়ে। আর হাবিবুল্লার কথা যখন মনে পড়ে তখন লাল দাড়ি লোকটা সামনে এসে দাঁড়ায়। তার চেহারায় পেরেশানির ছাপ এবং শরীরের ঘামের সাথে লেপ্টে আছে শাদা পাতলা পাঞ্জাবী। তোমাকে ডেকে ডেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছি কিন্তু তুমি আমার দিকে ফিরে তাকাওনি। সাথে আমার মেয়ে ছিল যে ডাকতে ডাকতে পথের মাঝে ক্লান্ত হয়ে থেমে গেছে। আমি দুঃখিত হয়ে তার দিকে তাকাতে পারি না। আমি আসলে তাদের কিছুই বলিনি তাদের...। বলতে গিয়ে আমার শরীর কেঁপে ওঠে দুইবার। লোকটা করুণ চোখে তাকিয়ে থাকে। লোকটা আমার হাত ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, অনেক সময় চলে গেছে। আমরা ভীষণ মিথ্যার জালে জড়িয়ে পড়েছিলাম। আজ মুক্তি পেয়েছি। মহান প্রভু তার প্রিয় বান্দাদের কলঙ্ক মুক্ত করেন। আমি বাকি জীবন তোমার জন্য তাহাজ্জুদে প্রার্থনা করেছি। কেন জানো? তুমি সত্যের পথে ছিলে। আমার প্রভু পরকালে এজন্য প্রতিদান দিবেন। আমিও জীবনের শ্রেষ্ঠ বস্তু তোমায় উপহার দিয়েছি। তোমার মনে পড়ে না?
আমি তোমার উস্তাদ। তুমি আমায় চিনতে পারোনি? লোকটার দিকে তাকিয়ে বলি, না। কখন যেন আমার একবার অসুখ করেছিল। লোকটা আমার দিকে কাঁদো কাঁদো তাকিয়ে থাকে। তোমার আফিয়াকে মনে পড়ে? আমার মেয়ে আফিয়া? তোমার স্ত্রী আফিয়াকে মনে পড়ে? আমি লোকটার কথায় অবাক হই, কিন্তু শান্ত তাকিয়ে থাকি তার দিকে যেন বৃদ্ধ লোকটা কষ্ট না পায়।

আমি লুঙ্গি পরে হাবিবুল্লার সাথে নামাজে যাই। সে আমায় হাত ধরে বলে, তোমার অসুখটা কঠিন। এই নোংরা অসুখ ইবলিশ তালেবুল এলেমদের মনের মধ্যে সৃষ্টি করে। তাদের স্বপ্নে দেখায় নাপাক বস্তু। আমি জায়নামাজে তোমার জন্য সবসময় দোয়া করি। তোমায় বড় স্নেহ করি। মহান প্রভু তোমাকে সুস্থ করে দিবেন। দেখো এই মসজিদে আমি ২৫ বছর খেদমত করেছি। এরপর তুমি। কী খুশি তো? তার আগে একটা পরীক্ষা দিতে হবে। এরপর সে কিছু অংশ জিজ্ঞেস করে কোরআনের। আমি শান্ত হয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকি। সে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। উত্তর দেও। কী! কোরআন ভুলে গেছো! নাউযুবিল্লাহ! হতভাগা প্রভুর কালাম ভুলে গেছিস! আমি ধীরেধীরে আরও বেশি শান্ত হতে থাকি। কিভাবে এমন হলো? আমার সেরা ছাত্র ছিলি। কোরআনের স্বার্থে তোকে ভালোবাসতাম। সেই কোরআন ভুলে গেছিস! তোর সাথে আর সম্পর্ক নাই। আমি হাবিবুল্লার দিকে তাকাই। আমার তাকানো দেখে সে ভয় পেয়ে যায়। হুজুর আপনি জানেন না? কোরআন কোনো অপবিত্র আত্মা ধারণ করতে পারে না।

রাস্তায় নেমে আমার আর কোথাও ফিরতে ইচ্ছে হয় না। হাঁটতে শুরু করি। জসিম দাঁড়িয়ে সামনে। পাথরের শহরে জসিম। সেই পুকুরে এখনো জল দেখা যায়? জসিম বলে সেই পুকুরের পাড়েই আমার মেস। আমি হাঁটতে শুরু করি। জসিম বলে, যেতে কিন্তু রাত হবে অনেক। আমি বলি আমার আর রাতে ভয় নাই।


***