'কাশ্মীর' থেকে ‘রিজওয়ান’

ফরিদ ছিফাতুল্লাহ



কাশ্মীরঃ সাদা পাহাড় আর নীল জলের ভূ-স্বর্গ


কাশ্মীর আমার স্মৃতিতে খুব উজ্জ্বল একটি নাম। কাশ্মীর নাম শুনলেই আমার মানস পটে ভেসে ওঠে শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াইরত এক বিক্ষুব্ধ জনপদের ছবি। রাজনীতির কূটচালে স্বাধিকার হারানো এক হতভাগ্য জনজাতির নাম কাশ্মীর। নিজেদের সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, সভ্যতা আর ভূখণ্ড থাকা সত্বেও রাজনৈতিক আধিপত্যবাদের শিকার আজকের কাশ্মীর। বনে যেমন কোন নিহত হরিণকে ছিঁড়েখুঁড়ে খায় একাধিক হিংস্র শ্বাপদ তেমনি ভূস্বর্গ কাশ্মীরকে ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছে রাজনৈতিক দস্যু পাকিস্তান, ভারত আর চীন। কাশ্মীর ভ্রমণের পুরোটা সময় এই কথাটিই মনে হয়েছে আমার। কোলকাতা দেখলাম, দিল্লী দেখলাম, শ্রীনগরও দেখলাম। সাদা চোখেই পার্থক্য ধরা পড়লো। শ্রীনগর বা কাশ্মীরে রাস্তা ঘাট, অফিস আদালত দেখলেই বোঝা যায় এখানে বিনিয়োগে বা উন্নয়নে সরকার খুব বেশি আগ্রহী নয়। অথচ তারা শত কোটি রুপি আয় করছে ভূস্বর্গ কাশ্মীরের পর্যটন গন্তব্যগুলো থেকে ।
কাশ্মীরি বংশোদ্ভূত মার্কিন কবি আগা শাহিদ আলীর কাব্য 'The Country Without a Post Office' অবলম্বনে বাংলাদেশের নন্দিত নাট্যনির্দেশক সৈয়দ জামিল আহমেদের নাটক ‘রিজওয়ান’ দেখেছিলাম কবছর আগে। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয় আগা শাহিদ আলীর মূল কাব্যগ্রন্থটি। এর প্রেক্ষিত হিসেবে বিবেচনা করা হয় ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের মুক্তিকামি মানুষের উপর ১৯৯০ সালে পরিচালিত ভারতীয় সেনাদের সাতমাসব্যাপী আগ্রাসন, উৎপীড়ন,খুন,গুম,ধর্ষণ। সেই ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ সময়ে কবি আগা শাহিদ আলীর বাবার বন্ধু কাশ্মীরে নিজ বাড়ি থেকে দেখতে পেতেন নিকটস্থ ডাকঘরে অবিলিকৃত চিঠির স্তুপ। একদিন তিনি সেই ডাকঘরের চিঠির স্তুপ থেকে একটি চিঠি হাতে নিয়ে দেখতে পান চিঠিটি তাকেই লেখা। লিখেছেন তার বন্ধু, কবি আগা শাহিদ আলির বাবা। আশাহীন, আলোহীন, কোন বার্তাহীন এক ভয়াল অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে 'The Country without a Post Office' পরবাসী এক কবির শৃংখলিত মাতৃভূমির মর্মন্তুদ স্মৃতিকাতর বর্ণনা। নাটকটি দেখবার পর সাদা পাহাড় আর নীলজলের ভূস্বর্গ কাশ্মীর মাথায় গেঁথে ছিল বহু দিন। ঘটনাচক্রে এক বন্ধুর কাশ্মীর ভ্রমণের প্রস্তাবে সাড়া দিতে তাই দেরি হয়নি আমার।
নানান বিড়ম্বনা আর অপেক্ষা শেষে তাই ভারতীয় ভিসা পেয়েই বাসায় ফোন করে স্ত্রী-পুত্রকে তৈরি থাকতে বললাম যেন আমি এসেই ওদের নিয়ে বেরুতে পারি এয়ারপোর্টের পথে। এয়ারপোর্টে এক সহকর্মীকে ফোন করে ঢাকা- কোলকাতা- ঢাকা ফ্লাইটে আসন নিশ্চিত করতে বললাম। আর কোলকাতা- দিল্লী- শ্রীনগর যাওয়া আসার বিমান টিকেটের জন্য পরিচিত কয়েকটি ট্রাভেল এজেন্সিতে ফোন করলাম। তারা কোন সাড়া দেওয়ার আগেই ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে একজনের কাছে জানতে পারলাম যে কোলকাতা এয়ারপোর্টে টিকেট কাউন্টার আছে। সেখান থেকে সস্তায় টিকেট পাওয়া যেতে পারে। তাই ঢাকা-কোলকাতা-ঢাকা টিকেট নিয়েই এয়ারপোর্টে পৌঁছলাম। মনে মনে ভাবলাম কোলকাতা এয়ারপোর্টে শ্রীনগর যাওয়ার টিকেট না পাওয়া গেলে বা টিকেট আমার ক্রয়সীমার মধ্যে না থাকলে কোলকাতাতেই দুদিন ঘুরে চলে আসব। এভাবেই কিছুটা অনিশ্চয়তাসহ শুরু হল আমাদের কাশ্মীর ভ্রমণ।
কোলকাতায় পৌঁছলাম যখন, তখন রাত প্রায় ১০ টা। ইমিগ্রেশন কাউন্টারে দেখলাম এক বুড়ো দাঁড়িয়ে পাসপোর্ট আর ইমিগ্রেশন ফর্মটা চেক করে কাউন্টারে পাঠাচ্ছে। ইমিগ্রেশন ফর্মের এক লাইনে লিখতে হয় ভারতের কোথায় থাকব। সেই ঘরটি ফাঁকাই রেখেছিলাম। থাকব তো একটা হোটেলে। দেখে শুনে দাম দর করে। তো কী লিখব সেখানে? বুড়ো দেখলাম প্রত্যেকের পাসপোর্ট আর ফর্ম চেক করবার সময় বেশ উচ্চ স্বরে স্বগতোক্তি করছে- ও আচ্ছা!হোটেল সংগ্রামে থাকবেন? সবাই হোটেল সংগ্রামে থাকবে নাকি কে জানে। আমি লিখলাম - বিমান অফিস, দিল্লী। ইমিগ্রেশন অফিসার আমাকে কিছু বললেন না। শুধু জিজ্ঞেস করলেন - বিমানমে কাম কারতা হ্যায় আপ? আমার ছেলেও পার হয়ে গেল। আরেক কাউন্টারে আমার স্ত্রীকে আটকে দিল। আমাকে ডাকলেন সেই কাউন্টারের ইমিগ্রেশন অফিসার। বললেন - "বিমান অফিস, দিল্লী" ঠিকানা হিসেবে যথেষ্ট নয়। টিকেটের ফ্ল্যাপ থেকে পুরো ঠিকানা লিখে দিলাম। সেখান থেকে বেরিয়ে নীচে নেমে একটি টিকেট কাউন্টার খুঁজে পেলাম। ওখান থেকে টিকেট কিনলাম পরদিন সকালের। কোলকাতা- দিল্লী- শ্রীনগর স্পাইস জেটের ফ্লাইট নম্বর এসজি১৩০। আর শ্রীনগর- দিল্লী- কোলকাতা কিনলাম গো এয়ারে। যাওয়াটাও গো এয়ারে নিলে ভাড়া ৮ হাজার টাকার মত কম পাওয়া যেত। কিন্তু বেশি হলেও স্পাইসজেটের এসজি ১৩০ ফ্লাইটই নিলাম কেননা আমার বন্ধু দিল্লী থেকে এই ফ্লাইটেই উঠবে শ্রীনগরের পথে। ওদের সাথে তাই আমাদের দিল্লীতেই দেখা হয়ে যাবে একই বিমানে।
সেই কাউন্টারেই জিজ্ঞেস করলাম কাছেপিঠে কোথাও রাত কাটাবার মত হোটল পাওয়া যাবে কি না। সে ব্যবস্থা করে দিল। বলল একটু অপেক্ষা করুন হোটেলের গাড়ি এসে নিয়ে যাবে, আবার সকালে এয়ারপোর্টে ড্রপ করে যাবে। এয়ারপোর্ট পিকআপ -ড্রপসহ হোটেল ভাড়া আড়াই হাজার রুপি। সস্তাই মনে হল।গাড়ি এসে নিয়ে গেল হোটেলে। তখন রাত প্রায় ১১ টা। হোটেলটা ছিল যশোর রোডে। আশে পাশের সব দোকানপাট বন্ধ৷ ভারতীয় সিম দরকার একটি। পেলাম না। হোটেলের ফ্রী ওয়াইফাই ছাড়া যোগাযোগের আর কোন উপায় নেই। ভোরবেলা গাড়ি এসে নিয়ে গেল এয়ারপোর্টে। কোলকাতা এয়ারপোর্ট ঢাকার এয়ারপোর্টের চেয়ে অনেক পরিচ্ছন্ন, ঝুটঝামেলাহীন মনে হল। একজনের কাছে পরে জেনেছি ভারত সরকার কোলকাতা এয়ারপোর্ট থেকে অনেক বিদেশি এয়ারলাইন্সের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে ভারতীয় এয়ারলাইন্সগুলোকে সুবিধা দেওয়ার জন্য। আমাদের দেশের সিভিল এভিয়েশন করে ঠিক এর উল্টোটা।
দিল্লী পৌঁছতে আমাদের লাগলো দেড় ঘণ্টার মত। ফ্লাইটে উঠেই স্ত্রী-পুত্রকে সাবধান করে দিলাম সুন্দরী বিমানবালাদের ঠেলে আনা খাবারের ট্রের দিকে হাত না বাড়াতে। কারণ ওগুলো ফ্রী নয়। মূল্য পরিশোধ করতে হবে। তাও আবার বেশ চড়া মূল্য। টিকেটের খোঁজ খবর করার সময় জেনেছিলাম ওয়েব সাইটগুলোতে। দফায় দফায় শুধু ফ্রী পানি খেলাম ফ্লাইটে। দিল্লীতে প্রায় সব যাত্রী নেমে গেল। আমরা ৩ জন আর পেছন দিকে এক নবদম্পতি। আমাদের কিছুটা সামনে এক যুবক। এই কজন এই ফ্লাইটের কোলকাতা-শ্রীনগর যাত্রী। দিল্লী গন্তব্যের যাত্রীরা নেমে যাওয়ার পর পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা উড়োজাহাজটিতে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ শেষ করে নেমে গেল। আমার সামনের সেই যুবক যাত্রীকে দেখলাম তার আসনের সামনের ঝুলন্ত টেবিলটি খুলে বাড়ি থেকে আনা এক বাটি সুজির হালুয়া রুটি দিয়ে খাচ্ছে। দারুন আইডিয়া। আমার স্ত্রীও ভ্রমণে এটি করে থাকে।খাবারের খরচ বেঁচে যায়, আবার খেতেও ভাল।
কোলকাতা এয়ারপোর্টে ফ্রী ওয়াইফাই পেয়ে চেক ইনের পর আমাদের আসন নম্বরগুলো আমার বন্ধুকে মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে বলেছিলাম সে যেন দিল্লীতে চেক ইনের সময় কাউন্টারে আমাদের কাছাকাছি আসনগুলোর জন্য অনুরোধ করে।
উড়োজাহাজের জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছি ওদের দেখা যায় কি না। বেশ খানিকক্ষণ পর দিল্লী থেকে শ্রীনগরগামী যাত্রীদের র‍্যাম্প বাসে করে নিয়ে আসা হল। তাদের মধ্যে আমার বন্ধুকে দেখা গেল না। কিছু পরে পেছন দরজা দিয়ে ওদের উঠতে দেখলাম। আমাদের কাছাকাছি আসন ওরা পায়নি। যাই হোক ওদের সাথে দেখা হয়ে বেশ ভাল লাগলো। ফ্লাইট এসজি ১৩০ উড়ে চললো শ্রীনগরের পথে। একটা জিনিস খেয়াল করলাম। গো এয়ার এবং স্পাইসজেট দুই এয়ারলাইন্সের সব ফ্লাইটেই কেবিন ক্রূ এমারজেন্সি এক্সিটসংলগ্ন আসনগুলোর যাত্রীদের আলাদা করে ব্রীফ করছিলেন জরুরী অবতরণকালে তাদের কী করতে হবে সেই বিষয়ে। অনেকটা মুখস্ত কথা গড় গড় করে বলা আর কি। যাত্রীরাও বুঝুক না বুঝুক মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দেয় ক্রুদের কথায়। এই বিষয়টি বাংলাদেশে কোন এয়ারলাইন্সে দেখিনি।
শ্রীনগর পৌঁছব কিছুক্ষণ পর। ভাবতেই রোমাঞ্চিত হচ্ছিলাম। শ্রীনগর ভারতের সর্বউত্তরের শহর। জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের রাজধানী। অতি প্রাচীন শহর এটি। ঐতিহাসিকদের অনেকেই মনে করেন মৌর্য সম্রাট অশোক এই শহরের প্রতিষ্ঠাতা। কাশ্মীর এক সময় দক্ষিণ এশিয়ায় এক শক্তিশালী রাজ্য হিসেবে পরিচিত ছিল।
সেই প্রস্তর যুগেও মনুষ্য বসবাসের চিহ্ন পাওয়া গেছে কাশ্মীরে। প্রাচীন ও মধ্য যুগে কাশ্মীর হিন্দু ও বৌদ্ধ সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ পাদপীঠ ছিল। সংস্কৃত ভাষায় জ্ঞান বিজ্ঞান দর্শন অধ্যয়ন ও শিক্ষাদানে এর সুখ্যাতি ছিল।এখান থেকেই চীনে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারিত হয় বলে অনেকের ধারণা। কাশ্মীরের দক্ষিণে পাঞ্জাব উত্তরে ও উত্তরপূর্বে চিন পশ্চিমে পাকিস্তান উত্তরপশ্চিমে আফগানিস্থান। কাশ্মীর মূলত এখন তিন টুকরো। এক ভাগ ভারতে, এক ভাগ পাকিস্তানে আরেক ভাগ 'আকশাই চীন' চীনের অধিকারে।
কাশ্মীরের লোকেরা উর্দু ও হিন্দিতে কথা বলে। আর নিজেদের মধ্যে কাশ্মিরী ভাষায় কথা বলে। শিক্ষিত জনগোষ্ঠী ইংরেজিও জানে।
আমরা শ্রীনগর এয়ারপোর্টে পৌঁছলাম দুপুর ১২ টা নাগাদ। ছোট্ট ছিমছাম এয়ারপোর্ট। এয়ারপোর্টের রানওয়ের দৃষ্টিসীমা ছাড়িয়ে দীর্ঘ পাহাড়ের সারি। বৃষ্টি হচ্ছিল বাইরে। ব্যাগেজ সংগ্রহ করে ভাবছিলাম ট্যাক্সি করে হোটেল খুঁজতে শহরে চলে যাব কি না। ভাবতে ভাবতেই সামনে একটা ট্যুরিজম ডেস্ক পড়ে গেল। ওখানে আমাদের চাহিদা জানালাম। আমরা ৫ দিন থাকব শ্রীনগরে। ওরা আমাদেরকে ৫ দিনের একটা প্যাকেজ দিল। সকালের নাস্তা, রাতের খাবার, থাকা আর ঘোরার জন্য গাড়ি। এক রাত থাকব পেহেলগামে। বাকি রাত গুলো শ্রীনগরে। একদিন যাব সোনামার্গ, আরেকদিন গুলমার্গ। ওরা দিন প্রতি ৬ হাজার রুপিতে রাজি হল। ৫ দিনে হয় ৩০ হাজার রুপি। তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেছি রশিদ না নিয়েই। ১০ হাজার রুপী অগ্রিম দিয়ে। পরদিন রশিদের ফটোকপি পাঠালে দেখি সেখানে ৩২৫০০ রুপি লেখা। আমরা তো অবাক। গাড়িতে আমাদের ব্যাগ বস্তা উঠিয়ে নিয়ে একজন আমাদের নিয়ে এলো ডাল লেকের এক হাউজবোটে। ডাল লেক দেখলাম শত শত হাউজবোট দিয়ে ভরে ওঠা এক জঞ্জালে পরিণত হয়েছে। হাউজবোট দেখে আমরা সবাই হতাশ। কার্পেট মোড়ানো মেঝে। খুব সংকীর্ণ জায়গায় দুটি কক্ষ। এমনিতেই শীত লাগছিল খুব। তার উপর কার্পেট দেখে আমার বন্ধু আর আমি ঘাবড়ে গেলাম। আমার আর ওর বাচ্চাদের ধুলোবালিতে এলার্জি আছে। তাছাড়া হাউজবোটে ৪ দিন থাকা পুরো আহাম্মকের কাজ ছাড়া কিছু নয়।
আমরা ওদের বললাম এখানে এক রাতের বেশি নয়। হাউজবোটের মালিকের নাম 'দ্বীন'। বয়স ৬০ এর কাছাকাছি হবে। হাউজবোটের পেছনেই ভাসমান বাড়ি তাঁর। স্ত্রী পুত্র নিয়ে সেখানেই বাস করেন। আমাদের কথা শুনে মুখে তাঁর অন্ধকার নেমে এলো। ততক্ষণে বুঝে গেছি এয়ারপোর্টে প্যাকেজ দিল যে লোক সে প্যাকেজ দিয়ে, তার ভাগের টাকা নিয়ে সরে পড়েছে। এখন আমাদেরকে সে গছিয়ে দিয়েছে দ্বীনের কাছে। দ্বীন আমার বন্ধুকে বুঝিয়ে শুনিয়ে সেই হাউজবোটে ২ দিন থাকতে রাজি করালো। আর বাকি দুদিন হোটেলে। এই পরিবর্তনের জন্য আমাদের আরো ৪ হাজার রুপী দিতে হবে। আমরা রাজী হলাম। বাসস্থান বিষয়ক এই জটিলতার কারণে আর কিছুটা চিলিং ঠাণ্ডার কারণে আমরা বহুলশ্রুত ডাল লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারছিলাম না। তাছাড়া ক্ষুধার্তও ছিলাম। দ্বীন আমাদের বিকেল ধরিয়ে ফেলল খাবার দিতে দিতে। এর আগের দিন কোলকাতায় আমাদের আর দিল্লীতে আমার বন্ধুর পরিবারের খুব কষ্ট গেছে খাবার নিয়ে। দ্বীনের স্ত্রীর রান্না তাই অমৃতসমান লাগলো। আমাদের মতই রান্না প্রায়।
সন্ধ্যেবেলা শিকারা ( সাজানো ছোট নৌকা) করে নেহরু পার্কের দিকে যেতে চাইলাম। দ্বীন আমাদের নিয়ে গেল হাউজবোটের ধান্দাবাজির মার্কেটে। ডাল লেক থেকে কেনা কাটা করতে আগেই আমাদের সতর্ক করে দিয়েছিল অনেকেই। যে শালের দাম ঢাকায় ৫০০ টাকা, সেই শাল ওরা চাচ্ছিল ১৫ হাজার রুপি। ভাবা যায় জোচ্চুরি? ঢাকা থেকে রওয়ানা দেওয়ার আগে কাশ্মীর ভ্রমণ বিষয়ে বেশি কিছু খোঁজ খবর নিতে পারিনি। আসবার সময় পথে মোবাইলে ব্রাউজ করছিলাম। একটা জায়গায় দেখলাম এক ভদ্রলোক লিখেছেন -- কাশ্মীর ভ্রমণের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ কাশ্মীরের মানুষ। এটা পড়ে আমার ধারণা হয়েছিল কাশ্মীরের মানুষ বুঝি খুব ভাল আর সৎ। বাস্তবে এর কোন মিল পেলাম না। পদে পদে ওরা লোক ঠকাবার নানান কায়দা-কানুন, ফাঁদ পেতে রেখেছে। আমি পুরোপুরি হতাশ এই বিষয়ে।
হাউজবোটের বিছানায় দেখলাম প্রায় ১৫ থেকে ২০ ইঞ্চি পুরু লেপ- কম্বলের ৩/ ৪টি স্তর। সেগুলো সরিয়ে বিছানার তলদেশে গা এলাতে হয়। বিছানায় আছে ইলেক্ট্রিক তোষক। সুইচ অন করলে ধীরে ধীরে তা উষ্ণ হতে থাকে। রাত পার করা গেল কোনমতে। বেড়াতে এসে বাসস্থান আরামদায়ক না হলে কোন কিছুতেই আনন্দ খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। সব কিছু নষ্ট হতে বাধ্য। আমাদের বেলাতে সেটাই হয়েছে। সবার মন খারাপ। আমার একটু বেশি।
পরদিন গাড়ি করে আমরা বেরুলাম গুলমার্গ দেখতে। গুলমার্গ হল পাহাড়ি এক জায়গা। গুল অর্থ ফুল আর মার্গ অর্থ পাহাড়। গুলমার্গ মানে তাই ফুলের পাহাড়, ফ্লাওয়ার মাউন্টেন দ্বীন আমাদের বলছিল। দ্বীন খুব ভাল ইংরেজি বলে। শ্রীনগর থেকে গুলমার্গ প্রায় ৭০ কিলোমিটার হবে। ড্রাইভার গুলমার্গের কাছাকাছি এক জায়গায় এনে আমাদেরকে গছিয়ে দিল কতকগুলো লোকের কাছে বুট, জ্যাকেট,টুপি, হাতের গ্লোভস ভাড়া নেবার জন্য। যে রকম ঠাণ্ডা ছিল তাতে ওসব আমাদের না নিলেও চলতো। কিন্তু ওদের চাপাচাপিতে নিতেই হল। আড়াইশ রুপি করে নিল একেক জনের বুট আর গাউনের ভাড়া। আর হাতের গ্লোভস ভাড়া নয় কিনে নিতে হল। ধান্দাবাজি এখানেই শেষ নয়। এরপর এলো ঘোড়াওয়ালা ।পাহাড়ের বিভিন্ন সাইট ঘুরে দেখাবে ঘোড়ায় চড়িয়ে। ঘোড়াপ্রতি দিতে হবে ১৫০০ রুপি। আমি টাকার অংক শুনে ঘোড়ায় চড়া বাদ দিলাম। আমার বন্ধুরা সবাই গেল । দরদাম শেষে বোধ হয় ১২০০ রুপি করে নিয়েছে ঘোড়াপ্রতি। পরে বুঝেছি বুট-গাউন ভাড়া, ঘোড়া ভাড়া সব কিছু থেকেই আমাদের ড্রাইভার কমিশন পেয়েছে। এমনই হয় ওখানে।
গুলমার্গ ঘুরে টুরে দুপুর পেরিয়ে যাচ্ছিল প্রায়। আমরা দুপুরের খাবার খেতে পারলাম না। শ্রীনগর ফিরে এলাম পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা নিয়ে। পথে এক রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়েছিলাম। খাবারের দাম খুব বেশি হওয়ায় ড্রাইভারকে বললাম অন্য কোন সস্তা রেস্টুরেন্টে নিয়ে যেতে। ড্রাইভার বিরস বদনে গাড়ি স্টার্ট দিল। চলতেই থাকল। থামাথামি নেই। সোজা শ্রীনগর ডাল লেকের গেটে এক পাঞ্জাবী রেস্টুরেন্টে গাড়ি ঢুকিয়ে দিল। আমরা ক্ষুধায় এতটাই ক্লান্ত যে গায়ে শক্তি নেই সেখান থেকে উঠে অন্য কোন খাবারের দোকান সন্ধান করি। আমরা ভেজিটেবল খাবো বলে দিলাম। ভেজিটেবিলের স্যাম্পল দেখাতে বললাম। স্যাম্পল দেখে আমার খাওয়ার ইচ্ছে দূর হয়ে গেল। আমি চাইলাম ইডলি। ইডলি মন্দের ভাল একটা খাবার। গুড় ছাড়া আমাদের ভাঁপা পিঠার মত দেখতে আটার পিণ্ড। যাই হোক সেই প্রচণ্ড ক্ষুধা সত্বেও কেউ ঠিক ঠাক খেতে পারল না পনির টনির দেয়া সেই বিস্বাদ খাবার। অথচ দুদিন পর আমরা পাশেই বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টের সাইনবোর্ড দেখলাম। বাংলায় লেখা সাইনবোর্ড -- " সামাদ হোটেল-- এখানে বাংলাদেশি খাবার পাওয়া যায়"। এই রেস্টুরেন্টটির সন্ধান আগে পেলে আমরা হয়তো এর পরের দুদিন শুধু খাবারের কারণে ঐ হাউজবোটে থাকতাম না। সে আরেক কাহিনী। খাওয়া শেষ হলে আমরা শিকারা করে ডাল লেকের ঘাট থেকে হাউসবোটে ফিরলাম। হাউসবোটে থাকা মানে বাকি দুনিয়া থেকে এক রকম বিচ্ছিন্ন। চট করে দু পা ফেলে আশে পাশে ঘুরে আসার কোন উপায় নেই। নৌকায় বন্দি। দ্বীন ভাইকে রাতের খাবার একটু আগে ভাগে দিতে বলা হল। ঐ পাঞ্জাবী রেস্টুরেন্টে কেউ ভাল মত খেতে পারেনি।
পরদিন আমাদের পেহেলগাম যাওয়ার কথা। আমরা যেহেতু দুদিনের বেশি হাউজবোটে থাকব না বলে স্থির করা হয়েছে, তাই আমরা মালপত্রসব নিয়েই গাড়িতে উঠলাম। গাড়িতে মালপত্র থাকবে। আমরা পেহেলগাম ঘুরে, পেহেলগামে আমাদের নির্ধারিত রিসোর্টে রাতটা পার করে পরদিন শ্রীনগরে ফিরে সরাসরি হোটেলে উঠব। দ্বীন ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। তাঁর মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে খুব মায়া লাগছিল। আমাদের স্ত্রীগণ অন্দর মহলে গিয়ে দ্বীন ভাইয়ের স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এলো। দ্বীন ভাইয়ের স্ত্রী নাকি খুবই রূপবতী আর শান্ত-স্নিগ্ধ। আমার অবশ্য উনার সাথে সাক্ষাত ঘটেনি।

আমরা বেরিয়ে পড়লাম পেহেলগামের পথে।
শ্রীনগর থেকে পেহেলগাম প্রায় ৬০/৭০ কিলোমিটার। বরফ ঢাকা পাহাড়ি এলাকা। চারপাশে বিশাল বিশাল পাহাড়।রোদ লেগে ঝিকমিক করছে। ছবিতে যেমন দেখি। গুলমার্গের মত এখানেও বুট-গাউন ভাড়ার লোকেরা এলো। এলো মানে ড্রাইভার ওদের ডেরাতেই গাড়ি থামিয়েছে। এসবের দরকার নেই বলে জানালাম। নিজেরা হাঁটতে হাঁটতে সামনে এগুলাম। ঘোড়াওয়ালারা ঘিরে ধরলো। ৭ টি জায়গা দেখাবে ঘোড়ায় চড়িয়ে। ১০০০ রুপি দিতে হবে ঘোড়াপ্রতি। আমরা রাজী হলাম না। সামনে এগুলাম। পাহাড়ি নদীর তীরে গিয়ে ছবি টবি তুললাম। পাশে একটি পার্ক আছে। পার্কে প্রবেশের টিকেট ৫০০ রুপি শুনলাম। কিছুক্ষণ পর এক লোক এসে ঘোড়ার অফার দিলো। ২০০ রুপি ঘোড়াপ্রতি রাজি হল। ১০০০ রুপির জায়গায় ২০০ রুপি। বহুত সস্তা। আমাদের সামনে এগুতে বলল যেন প্রথম ঘোড়াওয়ালার দৃষ্টিসীমার বাইরে যাই আমরা। প্রথম ঘোড়াওয়ালা দেখে ফেললে হয়তো অসুবিধা আছে। প্রথম ঘোড়াওয়ালা এটা টের পেয়ে দ্বিতীয় ঘোড়াওয়ালার কাছে গেল। দ্বিতীয় ঘোড়াওয়ালা তখন বসে পড়েছে এক জায়গায় আর এমন ভাব করছে যেন তার সাথে আমাদের কোন কথা হয়নি। প্রথম ঘোড়াওয়ালা দ্বিতীয় ঘোড়াওয়ালার কাছে বসে গল্প জুড়ে দিল যেন দ্বিতীয় ঘোড়াওয়ালা আমাদের দিকে আর এগুতে না পারে। বোঝা গেল এখানে একটা সিন্ডিকেট কাজ করে। সেই সিন্ডিকেটের বাইরে যাওয়ার সাধ্য নেই কারো। আমরা সামনে গিয়ে রেস্টুরেন্ট খুঁজতে লাগলাম দুপুরের খাবারের জন্য। কাশ্মীর মুসলিমপ্রধান এলাকা হলেও এখানে গরুর মাংস খুবই দুর্লভ বস্তু। কাশ্মীরের মুসলিমদের কাছে গরুর মাংস তেমন জনপ্রিয় নয়। আমরা কোন রেস্টুরেন্টে পাইনি। হাউসবোটের মালিক দ্বীন ভাইকে বলেও পাইনি। মুসলিম অঞ্চলে গরুর মাংস দুর্লভ হবার কারণ বোধগম্য হচ্ছিল না। কাশ্মীর ঘুরে এসে কাশ্মীরের ইতিহাস পড়তে গিয়ে একটা তথ্য পাওয়া গেল। কাশ্মীরের এক রাজা গোহত্যার শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করেছিলেন। হয়তো সেই থেকে সেখানকার মানুষের খাদ্য তালিকা থেকে গোমাংস দূর হয়ে থাকবে। ভেড়ার মাংস পাওয়া গেল এক রেস্টুরেন্টে। আমার ছেলে ভেড়ার মাংসের গন্ধ সহ্য করতে পারে কি না সেই আশংকা থেকে আমি ওকে বার বার করে বলছিলাম- বাবা ভেড়ার মাংসে সামান্য গন্ধ থাকে, কিন্তু খেতে সুস্বাদু। এছাড়া আমাদের খাওয়ার মত আর কিছু এখানে পাওয়া যাবে না। সবজি, মাছ, মুরগী এসব এখানে পাওয়া অসম্ভব। কিন্তু খাওয়ার সময় দেখা গেল ভেড়ার মাংসে কোন গন্ধই নেই। সৌদি আরবে দুম্বার মাংসে বা আমাদের দেশে পাঁঠার মাংসে যে বিচ্ছিরি গন্ধ থাকে আমি সেই রকম একটা গন্ধের আশংকা করছিলাম। খাবারের অর্ডার দেওয়ার আগে অবশ্য আমি স্যাম্পল দেখে নিয়েছি। মাংস ঝোলসহ রান্না করা। সবাই খুব মজা করে খেল।
খাওয়া শেষে পাশের দোকানে আমাদের স্ত্রীগণ শাল কিনলেন। তুলনামূলক সস্তাই। যে শাল হাউসবোটে ১৫ হাজার বলছিলো সেটা এখানে সাড়ে ৩ শ তে পাওয়া গেল। ১০ / ১৫ টি করে শাল নেওয়া হল। গাড়িতে ফিরে এলাম। গাড়ির কাছে আসতেই আবার সেই প্রথম ঘোড়াওয়ালা প্যান প্যান করতে লাগলো। অবশেষে কিছু কমে, সম্ভবত ৭০০ রুপি করে ৭ টির বদলে ৪ টি স্পট দেখাবে বলে ঘোড়া ঠিক করা হল। ঘোড়ার পিঠে চেপে পাহাড়ের দিকে রওয়ানা করলাম। কিছু ছবি টবি তোলা হল। কিছু দূর গিয়ে একটা সবুজ পাহাড়ি ঢালে নামিয়ে দিয়ে ওরা বলল এটাই মিনি সুইজারল্যান্ড। আমরা মিনি সুইজারল্যান্ড দেখে তো পুরাই হতাশ। ফিরে এসে পরে জেনেছি মিনি সুইজারল্যান্ড ছিল না ওটা। ওরা আমাদের মিনি সুইজারল্যান্ড নিয়েই যায়নি। ধাপ্পাবাজি করেছে।
বিকেলে আমরা এসে উঠলাম লিডার নদীর ধারে চমৎকার এক রিসোর্টে। নাম 'ভ্যালে রিসোর্ট'। এক পাশে উঁচু পাহাড়। পাহাড়ের ধার ঘেষে রাস্তা। রাস্তার আরেক পাশে কিছুটা নীচে নদীর তীর ঘেষে রিসোর্ট। রিসোর্টের পাশ দিয়ে উত্তাল সাগরের স্রোতের মত গর্জন করে বয়ে চলেছে সাদা পাহাড়ি নদী। নদীর অপর পারে আবার বরফাচ্ছাদিত পাহাড়ের সারি। অপূর্ব এক দৃশ্য। রিসোর্ট আর নদীর মাঝে রয়েছে সবুজ ঘাসের চমৎকার উদ্যান। উদ্যানে চেয়ার টেবিল পাতা। বিকেল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত আমরা ওখানেই পাহাড়ি নদী লিডারের ধারে সবুজ উদ্যানে সময় কাটালাম। রাতে খাবারের সময় দেখা হল দক্ষিণ ভারত থেকে আসা এক প্রৌঢ় দম্পতির সাথে। বেশ রসিক মানুষ। আমার বন্ধুপত্নীর নাম জিজ্ঞেস করছিলেন বুড়ো ভদ্রলোক। আমার বন্ধু বলল - ওর নাম আঁখি। She is my eye. তখন বুড়ো তার স্ত্রীকে দেখিয়ে উত্তর দিল- She is my eye.
পেহেলগাম থেকে শ্রীনগর ফিরে গেলাম পরদিন। শ্রীনগর ফিরে আমাদের মুঘল গার্ডেন ইত্যাদি দেখবার কথা। প্রচণ্ড গরম আর ক্ষুধার কারণে সেগুলো সংক্ষিপ্ত করা হল। স্থির হলো শুধু শালিমার গার্ডেন দেখব। শালিমার গার্ডেন মুঘল সম্রাট শাহজাহানের তৈরি। শালিমার গার্ডেনের টিউলিপ বাগান খুব বিখ্যাত। আমরা টিউলিপ বাগানে সামান্য কিছু মৃতপ্রায় টিউলিপ দেখতে পেলাম। টিউলিপ ফুল খুব সংক্ষিপ্ত সময় ফুটে থাকে।সপ্তাহ দুয়েকের মত থাকে। রোদ আর বৃষ্টি সহ্য করতে পারে না টিউলিপ। শালিমার গার্ডেনে মুঘলদের স্মৃতিচিহ্ন পর্যটকদের নিয়ে যায় ইতিহাসের পাতায় । প্রাকৃতিক ঝর্ণাকে বাগানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করানো হয়েছে। ভাবতে ভাল লাগছিল যে - এই উদ্যানেই হাতি ঘোড়ার পিঠে সৈন্য সামন্ত বেষ্টিত মুঘল সম্রাট বা মুঘল শাহজাদারা অবকাশ যাপন করতেন। নাচ গানের আয়োজনে বিনোদিত হতেন তাঁরা এখানেই। রাজকীয় হাতি ঘোড়ার পদভারে প্রকম্পিত হত এই এলাকা এক সময়।
শালিমার গার্ডেন থেকে বেরিয়ে কাশ্মীর ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস চোখে পড়ল। সাদা বাউন্ডারি দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। ড্রাইভারকে বললাম ভাল কোন রেস্টুরেন্টে নিয়ে যেতে। রেস্টুরেন্টে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম রিশতা হবে কি না। কাশ্মীরে ভেড়ার মাংসকে বলা হয় রিশতা। রেস্টুরেন্টের লোক জানালো রিশতা হবে। একেক প্লেটে ৪ পিছ করে থাকবে রিশতা। ৪ প্লেট অর্ডার করলাম। খাবার এলে দেখি পদ্মফুলের মত একটা জিনিস ৪ টি করে এক প্লেটে সাজিয়ে পরিবেশন করা হয়েছে। আমরা সেটা দেখে একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছিলাম। এইটা ক্যামনে ভেড়ার মাংস হইলো। রেস্টুরেন্টের লোককে বলার পর ওরা বলল এইটা ভেড়ার মাংসই, মেশিনে গুড়ো করে কিমা করার পর এই শেপে আনা হয়েছে। এইটা তাদের স্পেশাল একটা ডিশ। কাশ্মীরে খুবই জনপ্রিয় আর দামী খাবার। আমার কাছে ভালই লাগলো। আমি একাই ভাতের সাথে দুই প্লেট খেয়ে ফেললাম। বাকিরা কেউ ওটা খেতে পারল না। ওরা ডাল ভুনা দিয়ে সামান্য ভাত খেল। আমি বাকি রিশতা পার্সেল করে নিলাম। এবার নতুন হোটেলে উঠবার পালা। ড্রাইভার ডাল লেকের পাশে এক হোটেলে নিয়ে এলো। হোটেল আমার বন্ধুর পছন্দ হল না। কারণ আমাদের যে রুমগুলি দেয়া হচ্ছিল সেগুলি হোটেলের পেছন দিকে। আমাদের পরিবারের লোকজনেরও হোটেল পছন্দ হচ্ছিল না। সাথে ছিল অনিবারিত ক্ষুধা। খাওয়ার কষ্টের কথা বিবেচনা করে সবাই দ্বীন ভাইয়ের হাউসবোটেই ফিরে যাবার পক্ষে সিদ্ধান্ত নিলো। দ্বীন ভাইয়ের হাউসবোটেই ফিরে এলাম আমরা আবারো। আমাদের এই সিদ্ধান্তটিও ভুল ছিল। কেননা পরদিন আমরা সেই হোটেলের পাশেই বাংলায় লেখা সামাদ হোটেলের সন্ধ্যান পেয়েছিলাম। এবং ওরা পরদিন সামনের দিকে রুমের ব্যবস্থা করবে বলেও জানিয়েছিল। হাউসবোটে রাত কাটিয়ে পরদিন আমরা চললাম সোনামার্গের দিকে। সোনামার্গ মানে গোল্ডেন মাউন্টেন, সোনার পাহাড়।
সোনামার্গ যাবার পথের শেষ দিকটা খুবই আঁকা বাঁকা পাহাড়ি রাস্তা। রামিনের মাথা ঘুরাচ্ছিল। বমি বমি ভাব হচ্ছিল। রাস্তায় দুবার গাড়ি দাঁড় করিয়ে ওকে বমি করানো হল। সোনামার্গ পৌঁছেও আবার সেই বুট-গাউনের দালাল, ঘোড়ার লোক ঘিরে ধরলো। বললাম আমরা ওসবে আগ্রহী নই। আরেকজন এসে প্রস্তাব দিলো সে গাড়ি করে ঘুরাবে ৪০০০ রুপিতে। আমাদের লোকজন ঘোড়া চড়েছে আগে, সাথে ছোট বাচ্চা থাকায় ঘোড়ায় চড়তে অসুবিধা হয়েছে দুবারই। তাই এবার গাড়িটাই সবাই পছন্দ করলো। গাড়ি ঠিক করা হল ৩০০০ রুপিতে। গাড়ি আমাদের নিয়ে গেল বড় জোর ২ কিলোমিটার। এক জায়গায় ট্যুরিস্ট পুলিশ গাড়ি আটকালো। পুলিশ দেখে ড্রাইভার ভয়ে পুলিশকে একের পর এক 'স্যার আসসালামু আলাইকুম' ' সালাম স্যার' 'স্যার সালাম' বলতেই থাকলো। আমরা বুঝলাম কিছু একটা গড় বড় হয়েছে। পুলিশ একজন জিজ্ঞেস করলো ড্রাইভারকে ভাড়া কত নিয়েছো। ড্রাইভার আমাদের দেখিয়ে বলল-আপহি পুছিয়ে। আমি বললাম ৩০০০ রুপি।এই কথা শোনার পর অনেকক্ষণ ধরে ড্রাইভার আর পুলিশের মধ্যে বিতণ্ডা হতে থাকলো। ড্রাইভার পুলিশের হাতে পায়ে পড়তে লাগলো। কিছুক্ষণ পর আমাদের দিকে তাকিয়ে এক পুলিশ বলে উঠল- ' আপলোগকো বিচমে পড়েলিক্ষে কোন হ্যায়?' শুনে আমার মেজাজ খারাপ। ব্যাটা কয় কী? আমাদের চেহারা দেখে কি সব গুলারে মূর্খ মনে হয়? আমি বললাম - কেয়া বাত ভাইসাব, বাতাইয়ে। সে কয়- হাম ট্যুরিস্ট পুলিশ হ্যায়। আপকা মদদকা লিয়ে হ্যায় হাম। ড্রাইভার আপছে ভাড়া জাদা লিয়া। আইয়ে কমপ্লেইন লিখনা হ্যায়। আমি বললাম - হামারা কয়ি কমপ্লেইন নেহি হ্যায়। পুলিশ ৫০০ রুপির একটা নোট নিয়ে ছেড়ে দিল আমাদের। সামান্য কিছু দূর পর আমাদের নামিয়ে দিল গাড়ির ড্রাইভার। তখন বুঝলাম পুলিশে কমপ্লেইন করাই সঙ্গত হত। এই সামান্য ২/৪ কিলোমিটারের ভাড়া ৩০০০ রুপি মানে শুধু জোচ্চুরি নয় রীতিমতো ডাকাতি। সোনামার্গের বরফাচ্ছাদিত পাহাড়ের ঢালে লোকজন স্লেজ গাড়িতে উঠছে। পাশের নদীতে ছবি টবি তুলছে। এখানেও পর্যটকদের নিরুপদ্রবে থাকবার কোন উপায় নেই। এক স্লেজওয়ালা পুরোটা সময় তার স্লেজে উঠবার জন্য ঘ্যান ঘ্যান করেছে। এছাড়া আছে ফোটোগ্রাফার, ফুচকাওয়ালা ইত্যাদির যন্ত্রণা।
ফিরবার পথে সিন্ধু নদীর তীরে অসাধারণ প্রাকৃতিক শোভামন্ডিত একটি রেস্তোরাঁয় যাত্রা বিরতি করলাম। এটির কথা আমাদের বন্ধু রাহাত ফেসবুকের মাধ্যমে ঢাকা থেকে জানিয়েছে আমরা যখন শ্রীনগর থেকে রওয়ানা দিয়ে কিছু দূর এগিয়েছি। রাহাত না জানালে এই চমৎকার জায়গাটি আমাদের দেখাই হত না। পাহাড়ি নদী। প্রচণ্ড গর্জন করে শক্তিশালী স্রোত দ্রুত গতিতে অমিত বিক্রমে বয়ে চলেছে টুকরো টুকরো পাথরের উপর দিয়ে। পাথর ও স্রোতের ঘর্ষণে সাদা সাদা ফেনায় ভরে উঠেছে নদী। কিছু দূরে বরফের সাদা রুপালি চাদর গায়ে দাঁড়িয়ে বিস্তীর্ণ পাহাড়ের সারি। নদী তীরে সবুজ ঘাসের উপর উঁচু স্থানে রেস্তোরাঁটি। পাশেই নদীর উপর নির্মিত বেইলি ব্রীজ। এই নদীর নাম সিন্ধু হলেও এটি সেই বিখ্যাত সিন্ধু নদী নয় বলে পরে জেনেছি।





‘রিজওয়ান’- এক অভিনব নাট্যচিন্তা

মৃত্যু নয় যন্ত্রণাময়। মৃত্যুভয়ে বসে থেকো না গৃহকোণে যখন তোমার সবুজ পাহাড় আর নীলজল ঝিলের জান্নাত হিংস্র শ্বাপদের বিচরণে কেঁপে উঠতে থাকে । যখন নরপশুদের পাপক্লিষ্টতায় ভেসে যায় চিরকাল জেগে থাকা প্রিয় মাতৃভূমি তোমার, যখন বোন ফাতিমার সম্ভ্রম উষ্ণ লাল রক্তের ধারায় রঞ্জিত করে তোমার জান্নাতের দিগন্তবিস্তারি হিম সাদা বরফ,তখন মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে রুখে দাঁড়াও রিজওয়ান,জান্নাতের দরজার প্রহরী!
"যখন শরীর মরে যায় তখন মৃত্যু হয়, বেঁচে থাকলে অন্য কিছু হওয়া যায়"-- এই অন্য কিছু বহু কিছুর সম্মিলন । বৈচিত্র্যময় মানব জীবনের বিপুল সম্ভাবনা বোধ করি এই অন্যকিছু। বেঁচে থাকা মানুষ ফুল হতে পারে,ঝিলের নীল জল হতে পারে, জান্নাতের দরজার প্রহরীও হওয়া যেতে পারে। এর সবই সম্ভব কেবল বেঁচে থাকলে। খুব সম্ভব ছোট ভাইয়ের জীবনকে শংকাহীন করাও আরেক উদ্দেশ্য বোনের এই 'অন্য কিছু'র আহবানের। তাই ভাইকে জীবনের ঝুঁকি নেয়া থেকে বিরত রাখতে বোন বার বার বেঁচে থাকার এই মাহাত্ম্য ঘোষণা করতে থাকে। একই সাথে জান্নাতের সুরক্ষায় ভাইয়ের বেঁচে থাকার অনিবার্য প্রয়োজনীয়তাও বিবৃত করে সে। অসাধারণ সংলাপটি একই সাথে ধারণ করে যুগল অর্থ।
চিরায়ত সৃজনশীলতা এবং যতভাবে মানুষ অস্তিত্ববান হতে পারে তার সকল সম্ভাবনা এই 'অন্য কিছু'র অন্তর্ভূক্ত বলে অনুমিত হয়। এই সম্ভাবনাগুলোই গতিময় রাখে জীবনের অনন্ত প্রবাহ। বেঁচে থাকলেই কেবল জান্নাতের প্রহরী হওয়া সম্ভব হতে পারে আর মরে গেলে সাদা বরফের দেহ ধারণ করে শুয়ে থাকতে হয় দিগন্তজুড়ে স্ফীতাকার।
মৃত্যুভয় মানুষের স্বাভাবিক শৌর্য বিদূরিত করে। মৃত্যুভয়ে ভীত মানুষ জয়ী হতে পারে না। সে না পারে নিজেকে যথার্থভাবে মেলে ধরতে,না পারে নিজেকে বাঁচাতে, না পারে তার স্বদেশ রক্ষা করতে। জান্নাত রিজওয়ানের মাতৃসম ভূমিখন্ড। নীলজল ঝিলের, সবুজ পাহাড়ের, সাদা বরফের সেই জান্নাত রক্ষায় মৃত্যুঞ্জয়ী এক মরণের সামনে দাঁড়ায় অকুতোভয় রিজওয়ান! দুরন্ত সাহসে অবজ্ঞা করে বোনের সতর্কবাণী।
রিজওয়ান ভূস্বর্গ কাশ্মীরের পরাধীনতার শৃংখল ভাঙতে বদ্ধপরিকর এক তেজোদ্দিপ্ত তরুণের নাম। মুক্তিকামী কাশ্মীরি জনতার প্রতিক সে। তাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় সৈয়দ জামিল আহমেদের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় 'রিজওয়ান' নামের অসাধারণ এক নাটকের কাহিনী। নাটকটিকে কালজয়ী বলা নিয়ে সামান্য দ্বিধায় আছি অনাগত কালের সিদ্ধান্ত সমকালে নেয়া ধৃষ্টতা বিবেচিত হতে পারে বলে।
'রিজওয়ান' মূলত কাশ্মিরী বংশোদ্ভূত মার্কিন কবি আগা শাহিদ আলীর 'The Country without a Post Office' কাব্য অবলম্বনে রচিত। মূল কাব্যের মত নাটকটিতেও সংলাপের পৌনঃপুনিক ব্যবহার করা হয়েছে। সংলাপের এই পৌনঃপুনিকতা দর্শককে নাটকের গূঢ়ার্থ অনুধাবন করতে সাহায্য কর এবং কাহিনীর সাথে একাত্ন করে বিভিন্ন পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা ও ব্যপ্তিতে।
নাটকের কাহিনী ব্যপ্ত হয়েছে পৌনঃপুনিক সংলাপগুলোর সাথে অন্য সকল অনুষঙ্গকে একসূত্রে গ্রন্থিত করতে করতে স্থান কাল প্রেক্ষিতের সীমানা ছাড়িয়ে চিরায়ত মানুষ, সেই মানুষের মুক্তিকামনা এবং একইসাথে জগত ও জীবনের অপার রহস্যভেদের প্রাসঙ্গিকতায়।
১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয় আগা শাহিদ আলীর মূল কাব্যগ্রন্থটি। এর প্রেক্ষিত হিসেবে বিবেচনা করা হয় ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের মুক্তিকামি মানুষের উপর ১৯৯০ সালে পরিচালিত ভারতীয় সেনাদের সাতমাসব্যাপী আগ্রাসন, উৎপীড়ন,খুন,গুম,ধর্ষণ। সেই ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ সময়ে কবি আগা শাহিদ আলীর বাবার বন্ধু কাশ্মীরে নিজ বাড়ি থেকে দেখতে পেতেন নিকটস্থ ডাকঘরে অবিলিকৃত চিঠির স্তুপ। একদিন তিনি সেই ডাকঘরের চিঠির স্তুপ থেকে একটি চিঠি হাতে নিয়ে দেখতে পান চিঠিটি তাকেই লেখা। লিখেছেন তার বন্ধু, কবি আগা শাহিদ আলির বাবা। আশাহীন, আলোহীন, কোন বার্তাহীন এক ভয়াল অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে 'The Country without a Post Office' পরবাসী এক কবির শৃংখলিত মাতৃভূমির মর্মন্তুদ স্মৃতিকাতর বর্ণনা।
নাটকে রিজওয়ান আর তার বোন ফাতিমার মর্মভেদি আর্তনাদ দর্শকমনে সঞ্চারিত করতে থাকে নৃশংসতার জীবন্ত দৃশ্যকল্প। স্বদেশ রক্ষায় জেগে ওঠা জাতিসমূহের সংগ্রামের উপর চালানো বর্বরতার দৃশ্যকল্পগুলো এক সাথে মিলে নাটকে উপস্থাপন করে মানবিক বিপর্যয়ের এক করুণ আখ্যান। আর আখ্যানের পরতে পরতে থাকা করুণ সুর মূর্ছনা ব্যথাতুর করে তুলতে থাকে দর্শক হৃদয়।
মৃতদের জগত আর মৃত্যু বিষয়ক চিন্তাস্রোত আপনাকে নিয়ে যাবে এক ঘোর লাগা জগতে। যতবার এই মঞ্চায়ন দেখবেন এই ঘোর আরো ঘনীভূত হবে বলে অনুমান করি। "কী হয়? কী হয়? যদি চিরকাল যা আছে তা কোনদিন না থাকে?"- এ যেন শূন্য থেকে জগতের সৃষ্টি আর শুন্যতেই জগতের মিলিয়ে যাওয়ার ইংগিত।
নাটকটির এক বৃহৎ অংশ জুড়ে আছে মৃত্যু। মৃত্যুর নানা প্রপঞ্চ জীবন ও সংগ্রামের সাথে কীভাবে জড়িয়ে আছে তার এক অনন্য সাধারণ উপস্থাপনার সন্ধান মেলে এখানে। এখানে মৃত্যুর পর কোন অনুভূতি নেই বলে দৃঢ়ভাবে যে বিবৃতি ঘোষিত হয়েছে তা মানুষের মৃত্যু বিষয়ক চিরকালিন জিজ্ঞাসার আধুনিকতম জবাব বলে অনেকেই ভাবতে চাইবেন। ঋদ্ধ শিল্পচেতনার ছোঁয়ায় এই মৃত্যুচিন্তার সাথে মাটির পৃথিবীর মহোত্তম এক ইহলৌকিক জীবনদর্শনের চমৎকার যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে।
"এই দুনিয়ায় যদি কোন জান্নাত থেকে থাকে তবে তা- সে জান্নাত এই মাটিতে, এই মাটিতে, এই মাটিতে"। এটিকে সর্বপ্রেক্ষিতময় করতে নাটকে ব্যবহার করা হয় এই সংলাপটির চাকমা ভাষারূপ-"এ পৃথ্বীমিত যদি হোনো ছগগো থাহি থে, ছালে ছে ছগগো এ মাদিত,এ মাদিত, এ মাদিত"। খুন,সন্ত্রাস,ধর্ষণ, যুদ্ধ, দখলদারিত্ব, আগ্রাসনে পর্যুদস্ত মানবিকতার আর্তনাদ আর হাহাকার দেশ,কাল আর স্থানের সীমানা ছাড়িয়ে কাশ্মীরের পাহাড় থেকে বাংলাদেশের পাহাড়ে চাকমা ভাষায় উচ্চারিত সংলাপে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময় । অস্তিত্বের জন্য লড়াইরত মানুষের মধ্যে এক সাধারণ তাড়না সঞ্চার করাই উদ্দেশ্য।
স্বর্গ যদি কোথাও থেকে থাকে তা কেবল এই মাটির উপর, মাটির তলে কিংবা আসমানে নয়- এই ইহলৌকিক চেতনা নতুন নয় মোটেই। অলীক মোহাবেশ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে যুগে যুগে। সেই ভ্রান্তির শিকার আর হবে না মানুষ। সংগ্রামরত জাতিগোষ্ঠিগুলির মধ্যে স্বদেশপ্রেম জাগ্রত করতে বাস্তবানুগ পার্থিব চেতনার সঞ্চার করাটাই নতুন বলে মনে হতে পারে।
বর্বর সেনা আগ্রাসন মুমুক্ষু মানুষের কন্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দিয়ে নির্জনতা তৈরি করে আর নাম দেয় শান্তি। এ যেন এক মৃত্যু উপত্যকায় কিংবা শ্মশানে শান্তির অধিষ্ঠান ঘোষণা করা। নির্মম প্রহসন ছাড়া কিছু নয় তা।
নাট্যকার সচেতনভাবে নাটকটিতে কাব্যময়তার একটা আবহ রক্ষা করে গেছেন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। এটি একটি কাব্যভাবনার নাট্যরূপ তা খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যায় এর সংলাপ ও কাহিনী বর্ণনায় উত্তরাধুনিক কাব্যকৌশলের সফল প্রয়োগ দেখে। একটি চমকৎকার উত্তরাধুনিক কাব্যনাট্য বলে মনে হতে পারে এটিকে। সংলাপগুলোর অভিনবত্ব এবং তাৎপর্য নিশ্চিতভাবে দগ্ধ দর্শককে চমকৎকৃত করবে।
কাশ্মীরের পাহাড়ঘেরা এক এলাকায় ঝিলের ধারে বসবাস রিজওয়ানদের। জন্ম জন্মান্তরে রিজওয়ানরা সেই ভূভাগে আসে আর যায়। কিন্তু পাহাড় আর ঝিল সেখানে চিরকালীন। রিজওয়ানের জনগোষ্টির প্রাণ তাদের দেহ থেকে স্থানান্তরিত হয়ে তা প্রবেশ করেছে সেই ঝিলে সেই পাহাড়ে। আর সেই স্থানান্তরিত প্রাণ মৃত্যুহীন চিরকালিন। পাহাড়ের পাশ দিয়েই চিরকাল সূর্য উদিত হয়ে আসছে। এর কোন ব্যত্যয় ঘটেনি কোনদিন, ঘটবেও না। কালের অতল তলে নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন হতে দেবে না বলে ঝিল আর পাহাড় রক্ষায় বদ্ধপরিকর তারা।
সেনা আগ্রাসন হয়, হয় খুন, ধর্ষণ। নাটকে অসাধারণ ব্যঙ্গতায় চিত্রিত হয় ধর্ষণ নামে হিম ঠান্ডা এক 'প্রাকৃতিক মৃত্যু'। সেটি ফাতিমা, রিজওয়ানের বোনের। ধর্ষিতা ফাতিমা ধর্ষণকারী সেনাকে পালটা ধর্ষণ করে বলে যে সংলাপ উচ্চারিত হয় তার অভিনব দৃশ্যায়ণ ব্যতিক্রমী এক শিল্পভাবনা। ধর্ষিতা কর্তৃক ধর্ষককে পালটা ধর্ষণ করার যে বিষয় তা সাহসী, বিদ্রোহী আর অপরাজেয় এক নারীকে আমাদের সামনে হাজির করে যার এই বিকৃতি পুরুষতন্ত্রের পশ্চাদদেশে কসে লাগানো এক লাথির সাথে তুলনীয় হতে পারে কেবল। ভিন্ন লিঙ্গের হবার কারণে শুধুমাত্র নারীকেই ধর্ষণের নির্যাতন কেন সইতে হবে এই প্রশ্ন যথার্থ বলে মনে হয়। এই অভিনব দৃশ্যকল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় নারীর ধর্ষিতা আর পুরুষের ধর্ষক হবার অনিবার্যতা মানুষেরই বানানো। প্রাকৃতিক ভবিতব্য নয় মোটেই। পুরুষতন্ত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা, মূল্যবোধ, সভ্যতার ধারণার কারণে এই পরিস্থিতির উদ্ভব।সমাজে লৈঙ্গিক সাম্যাবস্থা বজায় থাকলে পুরুষকেও আমরা নারী কর্তৃক ধর্ষিত হতে দেখতাম হয়তো। এটির সাথে আধুনিক নারীবাদের একটা অংশের সংশ্লেষ অনুমান করতে চাইলে তা করা যেতেই পারে।
নাট্যকার ধর্ষিতা ফাতিমার মুখে তার মৃত্যুকে প্রাকৃতিক মৃত্যু বলে বর্ণনা করার একটি সংলাপ তুলে দেন। আর দাদাজানকে দিয়ে মানুষের প্রাকৃতিক মৃত্যুর অধিকারের প্রসঙ্গ উপস্থাপন করেন। মানুষের প্রাকৃতিক মৃত্যুর অধিকার প্রাকৃতিকভাবেই পাওয়ার কথা। প্রকৃতিতে অনেক প্রজাতিই প্রাকৃতিক মৃত্যুর এই অধিকার ভোগ করে থাকে। কিন্তু মানুষ সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত।
রিজওয়ানকেও হত্যা করা হয়। তার আগে রিজওয়ানকে অভিযুক্ত করা হয় তার প্রিয়জনদের হত্যা এবং মৃতদেহগুলি বাড়িতে লুকিয়ে রাখার অভিযোগে। রিজওয়ান শুধু নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকারই হয় না সেনাদের হাতে তাকে স্বজন হত্যার মিথ্যা অপবাদে কলংকিত হতে হয়।
মানুষের জীবন -মৃত্যু পর্বদ্বয় নিয়ে সুক্ষ্ণ এক বার্তা দেবার প্রয়াস লক্ষ করা যায় নাটকে। জীবিত মানুষের জগত আর মৃতদের জগতের মধ্যে পুনঃপুন যোগাযোগ স্থাপন এবং একই সাথে অনুভূতিহীন মৃত্যুপরবর্তী জীবনের কথা বলে যে বৈপরীত্য সৃষ্টি করা হয়েছে তাকে একধরণের কূটাভাস বলে ধরে নেয়া যায় বোধ হয়। কিন্তু এর তাৎপর্য বা উদ্দেশ্য খুব স্পষ্ট নয়। আমি তরলমতি অর্বাচীন এক দর্শক। এটিই মনে একমাত্র খটকা । হয়তো দুই জীবনের পরিভ্রমণ নাটকের কাহিনী বা বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য বিকল্পহীন ছিল। আর অন্যটি যে দ্ব্যর্থকতাহীন পরিস্কার বিবৃতি তা সহজেই বোধগম্য।
মৃত্যুর পরের জীবন সম্পর্কে বলা হয় মৃত্যুর পর কোন অনুভূতি থাকে না। প্রচলিত ধারণা ও অভিজ্ঞানের বিপরীত ধারণা ব্যক্ত করা হয়- মৃত্যু যন্ত্রণার কোন বিষয় নয়। মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির শারীরিক অভিব্যক্তি এই বক্তব্য সমর্থন করে বলে জোর ধারণা করি। আজ পর্যন্ত কোন মানুষকে একদম ঠিক মৃত্যুক্ষণে যন্ত্রণায় চিৎকার বা আর্তনাদ করতে দেখা যায়নি। মৃতব্যক্তির মুখাবয়ব সবসময় শান্ত স্নিগ্ধ আর কমনীয় হয়, যন্ত্রণাক্লিষ্ট হয় না। যন্ত্রণা দৃশ্যমান হয় জীবিতকালে, মৃত্যু ঘটার অব্যবহিত আগে। মৃত্যুচিন্তার নানা দিক নিয়ে যাদের মনে জিজ্ঞাসা আছে, যারা মৃত্যুকে এক অভেদ্য অপার রহস্যের বিষয় বলে ভাবতে ভালবাসেন তারা নিশ্চিতভাবেই নাটকটির নতুন ধরণের মৃত্যু বিষয়ক চিন্তা দ্বারা আলোড়িত হবেন।
মৃত্যুপরবর্তী জীবন নিয়ে সংশয় প্রকাশিত হলেও খুব জোরালোভাবে মৃত্যুর আরেক অর্থও বিবৃত হয়েছে এখানে। মহত্তরো জীবন গঠনের জন্য মৃত্যুর এই প্রপঞ্চটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে প্রতিভাত হয়। মৃত্যু আসলে মৃত্যুই। এর আর কোন অর্থ নেই। মানুষ শতাব্দির পর শতাব্দি সহস্রাব্দের পর সহস্রাব্দ মিছেই এর নানারকম কাল্পনিক অর্থ তৈরি করেছে।
"শরীর যখন মরে যায় তখন মৃত্যু ঘটে ,আর যদি বেঁচে থাকি অন্য কিছু হওয়া যায়।" এই সংলাপটি এমন অনিবার্যতা আর নিশ্চয়তা নিয়ে বিপুল শক্তিমত্তায় প্রক্ষেপিত হয় যে দর্শকমনে সুনিশ্চিত প্রত্যয় জন্মায়।
জীবন ও প্রকৃতির বিপুল সৌন্দর্যের নিখুঁত মেলবন্ধন দেখা যায় ঝিল রক্ষার সংশপ্তক শপথে। "কী হয় যদি এই ঝিল না থাকে?"- রিজওয়ানের এই প্রশ্নে ক্ষুব্ধ মা মোমিনা রিজওয়ানকে ঠাস করে এক চড় কসিয়ে বুঝিয়ে দেয় জীবনের সমাপ্তি রেখা এঁকে দেয়া মৃত্যুকে মেনে নিতে হলেও ঝিলের অনস্তিত্ব কিছুতেই মেনে নেবে না তারা। ঝিল চিরকালিন। ঝিল থাকবেই। আর তাই ঝিল টিকে থাকে অনন্তকাল ধরে। মানুষ থেকে সঞ্চারিত প্রাণে সে থাকে বেঁচে অনাগত কালের মানুষের জন্য প্রাণসঞ্চারি বার্তা নিয়ে। জীবনের প্রতিভূ হয়ে সেই ঝিল যেন জীবনের জয়গান।
'রিজওয়ান' আজকের পৃথিবীর জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক। মিয়েনমারের রোহিঙ্গা বা প্যালেস্টাইনের মুসলিম,রাষ্ট্রহীন কুর্দি এমনকি রিজওয়ানের জান্নাত কাশ্মিরেও এখনো চলছে জাতিগত নিপীড়ন। এইসব হতভাগ্য জনসমাজ অপেক্ষায় আছে কবে এক ডাকপিয়ন মাঝি তাদের জন্য নিয়ে আসবে মুক্তির বার্তা লেখা সেই কাক্ষিত চিঠি। রিজওয়ানেরা আবার জন্মাবে কোথাও না কোথাও তেমন একটি চিঠির জন্য যেখানে লেখা থাকে -
" আসসালামু আলাইকুম! আপনারা কেমন আছেন? এখানে সবাই ভাল আছে। শুকরিয়া।
রিজওয়ান।"
নাটকের সংলাপ অতুলনীয়। আবহ সঙ্গীত আর আলোর আয়োজন অভিভূত করবে দর্শককে। রিজওয়ান আর ফাতিমার আর্তনাদ মর্মস্পর্শী। কুশীলবদের অভিনয় গুণ এতটাই ঋদ্ধ যে তা নিশ্চিতভাবে দর্শকের দর্শন ও শ্রবনেন্দ্রিয় পার হয়ে গেঁথে যাবে মনের গভীরে। দর্শক মন আন্দোলিত হবে নাট্যনির্দেশকের অদৃশ্য সুতোর টান অনুসারেই তাতে কোন সন্দেহ নেই। নাট্যযজ্ঞটিতে তুলনামূলকভাবে ফাতিমা চরিত্রের সংলাপ গুলোই সবচেয়ে শ্রমসাধ্য। প্রবল কন্ঠশক্তি দরকার ফাতিমা চরিত্রের। মোহসিনা আক্তারের উচ্চারণে সামান্য অশুদ্ধি লক্ষ করা গেছে। অন্য চরিত্রগুলোর অভিনয়ও কম শ্রমসাধ্য নয়। শিল্পকলা একাডেমীরর পরীক্ষণ থিয়েটার হলের মেঝে,দর্শক গ্যালারীর কিয়দংশ, ছাদ, রূপসজ্জা কক্ষসহ পুরো মিলনায়তন জুড়ে এর মঞ্চায়ণ নাটকটিকে এক অনন্য মাত্রা দান করেছে। নাট্যনির্দেশক শুধু মিলনায়তন ও বিদ্যমান প্রযুক্তির পূর্ণ ব্যবহার করেই ক্ষান্ত হন নাই। মই, রশি ইত্যাদিযোগে ছাদ ও মেঝেতে ওঠা নামার এমন কিছু ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্য ও মুদ্রা রেখেছেন যেগুলো নাটকটির অভিনয়কে সাংঘাতিক শ্রমসাধ্য করে তুলেছে।কুশীলবদের বিশেষ শারীরিক সক্ষমতা ছাড়া এটির মঞ্চায়ন দু:সাধ্য। নাটকটি বেশ লম্বা সময় ধরে আলোচনায় থাকবে বলে ধারণা করা যায়।