পজিটিভ

লিপিকা ঘোষ

টানা বৃষ্টি । তিনদিন ধরে অঝোর । আদি ঘর বন্দী । কলেজ কামাই করছে । গায়ে জ্বর । আদি , আদিত্য , বছর পঁয়তাল্লিশ বয়েস । কলেজে পড়ায় । সঙ্গে শর্ট ফিল্ম , টেলি , ডকু নিয়ে কাজ করে । এটা নেশা । তিনদিন ও পিরানদ্দেল্লো নিয়ে ডুবে আছে । রান্নার মাসিটি আছে প্রায় তের বছর । সরলা মাসি প্রথমে রান্নার মাসি হিসেবে এসেছিল । এখন সে ই আদির দেখ - ভাল করার একমাত্র মানুষ ।
‘ কি খাবে আজ ? কাল ও তো খিচুড়ি খেলে ? ’
‘ যা হোক কিছু একটা কর না সরলা মাসি ’
প্রতিদিন এই একই কথপোকথন ।
বুকশেলফের পাশেই মাটিতে বসে দেয়ালে হেলান দিয়ে বই পড়া , লেখা, আদির অভ্যেস । একরাশ বই নামাবে । সব ফেলে রেখে যখন উঠে যাবে সরলা মাসি আবার সব শেলফে গুছিয়ে রাখবে ।
পিরানদ্দেল্লো ’র ছোটো গল্প গুলো নিয়ে কিছু নতুন কাজ করার কথা ভাবছে আদি । একটা বই শেলফ থেকে টানতেই দুটো লম্বা সাদা বেশ পুরোনো খাম মাটিতে
পড়ল । আদি তুলে নিল । একটা থেকে বেরিয়ে এল তোর্সার একটা ছবি । এরকমই এক মুখর শ্রাবণ দিনে ঘর-বন্দী ছিল ওরা এই ফ্ল্যাটেই । একসঙ্গে
থাকত । কদম ফুল মাথায় গোঁজা তোর্সার নানান ভঙ্গির ছবি তুলছিল সেদিন আদি । প্রিন্ট বের করে আনার পর একটা ছবি হাতে নিয়ে তোর্সা বলেছিল ‘তোর ফিল্মের হিরোইন দের মত আমি এটাতে অটোগ্রাফ করে দিই ?’ তারপর খসখস করে ছবিটার ওপর লিখে দিল ‘ তোর্সা একটি নদীর নাম ’ । ‘একটু বেশি ফিল্মি হয়ে গ্যালো না ? তিতাস একটি নদীর নাম টাইপ ? ’ আওয়াজ দিল আদি । খিলখিল করে হাসছিল তোর্সা ।
ছবিটা হাতে ধরে দাঁড়িয়ে আছে আদি । আরেক হাতে আরেকটা সাদা খাম । কোনো মেডিকেল সেন্টারের । কোনো মেডিকেল রিপোর্ট আছে বোঝা যাচ্ছে । বছর বারো আগে তোর্সার হঠা একদিন আদিকে বিয়ে করতে চাওয়া । আদির তখন সময় নেই। ফিল্ম ফিল্ম করে মেতে আছে । তারপরই হঠাৎ কাউকে কিচ্ছু না বলে বহুদূর পদ্মাপাড়ের অসম্ভব পিছিয়ে পড়া একটা গ্রামে তোর্সার চাকরি পেয়ে গ্রামের মানুষদের উন্নয়নের কাজ করবে বলে চলে যাওয়া , কিছুতেই আর আদির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে না চাওয়া , সব মনে পড়ে গেল । আদি খুব বিরক্ত হয়েছিল , আদির অসম্ভব রাগ হয়েছিল । যন্ত্রনা হয়েছিল । শুধুমাত্র সম্পর্ক টা ভেঙ্গে দিয়ে ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্যই যাওয়া । তোর্সার বাড়িতে যোগযোগ করে ও জেনেছিল বাড়িতেও কিচ্ছু জানায়নি । তোর্সার দিদি তিস্তা শুধু কথা বলতে চায়নি আদির সঙ্গে । আদি অপেক্ষা করেছে । বারবার ফোন করেছে । তোর্সা সব মোবাইল নাম্বার বদলে ফেলে । আদি যেতে চেয়েছে ওর গ্রামে । তোর্সার বাড়ি থেকে বারণ করেছে , বলেছে তোর্সা আর কোনো সম্পর্ক আদির সঙ্গে রাখতে চায় না । আদি মদে চুর হয়ে ডুবে থেকেছে রাত দিন । আদি কাজ করেছে । কলেজে পড়িয়েছে , প্রচুর ডকুমেন্টারী আর শর্ট ফিল্ম বানিয়েছে । কিছু বিদেশ ঘোরাও হয়ে গেছে । দু তিনটে পুরষ্কার আদির ঝুলিতে এখন । সাথে বহু - নারী সঙ্গ । একের পর এক মেয়েরা
এসেছে । মত্ত থেকেছে আদি । চলেও গেছে তারা । সকলেই এসেছে আদিকে আশ্রয় করে কিছু সুবিধে পেয়ে নিতে । অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল আদির । শেষ এল সুলগ্না । ওর ওপর একটু বেশি যেন মায়া পড়েছিল আদির । বেশ কয়েকটা টেলিফিল্মে সুলগ্না কে নায়িকা করে ও । একসঙ্গে মাঝেমাঝেই থাকত ওরা এই ফ্ল্যাটে । সবাই ধরেই নিয়েছিল এবার আদি আর সুলগ্নার বিয়ের নিউজ টা খুব তাড়াতাড়ি সকলে পাবে । একদিন ওর সঙ্গে ফিল্ম নিয়ে কাজ করে তমোজিত নামের ছেলেটি হন্তদন্ত হয়ে আদির কলেজে হাজির । অফ পিরিওডে বসল ওরা একসঙ্গে । তমোজিত সামনে রাখল সুলগ্না র কিছু ছবি , টলিউডি এক প্রোডিউসারের কন্ঠলগ্না । আদি থমকালো , হাসল , একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল ‘ চ, দু পেগ হয়ে যাক , ক্লাশ টা সেরে আসি । জাস্ট ওয়ান্ট টু
সেলিব্রেট ’ ।
তোর্সার ছবি , তোর্সার হাসি বারো বছর পর মুখর শ্রাবণ দিনে আদি কে আচ্ছন্ন করে ফেলছে । কেমন আছে তোর্সা ? কেনই বা ছেড়ে গেল ওভাবে ?
‘ সরলা মাসি ই ই ই ই ’
‘ চিৎকার করছো কেন ? কি বলবে বল ’ । সরলা মাসি ঘরেই ছিল । টেবিল চেয়ার পরিচ্ছন্ন করছিল ।
‘ এই মেডিকেল রিপোর্টটা কোত্থেকে এল ? ’
‘চশমা টেনে নাকের ওপর তুলে সরলা মাসি দ্যাখে , ‘ ওমা , এতো তোর্সা দিদিমনির । চলে যাওয়ার ক’দিন আগেই তো এটা হাতে বাড়ি ঢুকল , বারবার খুলে দ্যাখে আর রেখে দেয় । নিয়ে যেতে ভুলে গেছে । আমি তোমাকে দেখিয়েছিলাম আদি দাদাবাবু , তুমি খুলেও দেখলে না , আমি বই এর মধ্যে করে তুলে রাখলাম’, একটানা কথা গুলো বলে গেল সরলা মাসি ।তাড়াতাড়ি খামটা খোলে আদি । প্রেগনেন্সি কালার টেস্ট রিপোর্ট। পজিটিভ ।
আদির হাত কাঁপতে থাকে । তোর্সার ছবি টা মাটিতে পড়ে যায় । ‘ পজিটিভ ’ ।
পাগলের মত ছুটে যায় ল্যান্ড - ফোন টেবিল টা র কাছে । ওখানে একটা ছোটো নোটবুকে অনেক পুরোনো নাম্বার লেখা আছে । তোর্সার বাড়ির নাম্বারে ফোন করে শিলিগুড়িতে । ওপাশ থেকে যান্ত্রিক স্বর জানান দেয় ডায়াল করা নাম্বার টি আরেকবার চেক করে নিতে হবে । শিলিগুড়ি , তোর্সার বাড়ির ঠিকানা
আদির জানা । কোনো রকমে জামা কাপড় বদলে বেরিয়ে পড়ে আদি । তখনও বৃষ্টি অঝোর ।
‘ আদি দাদাবাবু উ উ উ ’ । সরলা মাসি আতংকিত । ‘ আমি শিলিগুড়ি যাচ্ছি ’ । আদি বেরিয়ে যায় । তিনদিন হল ড্রাইভার কে ছুটি দিয়েছে । অস্থির হয়ে ট্যাক্সীর জন্য ছটফট করতে থাকে আদি । একটা ট্যাক্সী ধরেই শিয়ালদা স্টেশন এনকোয়ারি কাউন্টারে ফোন , নর্থ বেঙ্গল যাওয়ার কোন ট্রেন কখন ছাড়বে । সন্ধে সাতটা নাগাদ একটা ট্রেন আছে । আদি রুদ্ধশ্বাসে ট্যাক্সীর বিল মিটিয়ে টিকিট কাউন্টারে । রিজারভেশন পাওয়া সম্ভব না । তবু টিকিট কেটে নেয় । ট্রেনের অপেক্ষায় বসে থাকে । মোবাইলে অনেকগুলো ফোন আসছে ক্রমাগত । সুইচড অফ করে দেয় । কোনো হুঁস নেই আদির । মেডিকেল রিপোর্ট টা হাতে ধরা । ‘পজিটিভ’ ।
ট্রেন আসে । উঠে পড়ে আদি । পৌঁছতে সকাল ন’টা তো হবেই । চেকার কে বলে আরেকটা লোকের সঙ্গে একটা সিট কোনো রকমে ভাগাভাগি করে নেয় । আদির কোনো হুঁস নেই , ক্ষিধে নেই , তেষ্টা নেই , ঘুম নেই । শুধু একটাই অক্ষর ‘পজিটিভ’ ।
ট্রেন থামে নিউ জলপাইগুড়িতে । সকাল সাড়ে নয় । মেঘলা । নেমে যায় আদি । বাস ধরে । ঠিকানা মুখস্থ । শিলিগুড়ি শহরের একটু কোল ঘেঁষে সবুজ ঢাকা একটা অংশে তোর্সাদের বাড়ি । লোহার বেড়া দিয়ে ঘেরা এখনো । লোহার গেট খোলে । ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে আওয়াজ হয় । মস্ত ফুল বাগান । নেপালী মালী টা খুরপি হাতে উঠে দাঁড়ায় । আদি মোরাম রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যায় বারান্দার দিকে । বারান্দায় গ্রিল লাগানো হয়েছে । আগে ছিল না ।
‘ কে এল পূজন ? ’ তিস্তা বেরিয়ে আসে বারান্দায় । তিস্তা আর আদি একই বয়সী । তোর্সা ওদের থেকে বছর চারেকের ছোটো । তিস্তার চোখে চশমা উঠেছে । শরীর বেশ ভারি । একদৃষ্টে তাকিয়ে তাকে তিস্তা – ‘আদি !’
বিধ্বস্ত আদি । যেন ধ্বংসস্তুপ ।
‘ মাম মাম , পাপাই কে প্লীজ বুঝিয়ে বল না আজ আমরা ঋজু দের বাড়ি যাব। একটা দুরন্ত ফুটফুটে বছর দশ এগারোর ছেলে এসেই ঝাঁপিয়ে পড়ে তিস্তার
ওপর । স্কুল ড্রেস পরা , কাঁধে স্কুল ব্যাগ । পেছন পেছন রঙ্গন দা , তিস্তার হাসব্যান্ড । ছেলেটির সব দুরন্তপনা নিমেশে থেমে যায় আদিকে দেখে । চুপ করে তিস্তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে । তোর্সার মুখ টা যেন অবিকল কেটে বসানো ।
‘ স্কুল বাস এসে যাবে আদি , দেরি কোরো না ’ । তিস্তা বলে ছেলেকে । রঙ্গন দা ছেলেটিকে নিয়ে এগোয় ।
‘ ভেতরে এস ’ , তিস্তা ডাকে আদি কে ।
বসার ঘরের সোফায় বসে পড়ে ক্লান্ত আদি । গা এলিয়ে আসছে ।
‘কেন এসেছো ?’
মেডিকেল রিপোর্ট টা এগিয়ে দেয় আদি । তিস্তা রিপোর্ট টা দেখে দেয়ালের দিকে তাকায় । আদিও তাকায় । তোর্সার একটা বড় ছবি আদিরই তোলা কদম ফুল গোঁজা ছবিগুলোর একটা । মস্ত বড় একটা কদমফুলের মালা ঝুলছে ছবিতে ।
‘ যে গ্রামে কাজ করতে গেছিল , সেখান কার মেয়েদের স্বাস্থ্য - শিক্ষা সচেতনতার জন্য দিনরাত কাজ করত , শরীর ভেঙ্গে পরে , ওখানকার আবহাওয়া সহ্য হয় না । হঠাত ফোন আসে তোমার রঙ্গন দা র কাছে , গ্রামীন হাসপাতালে ভর্তি , আমি আর রঙ্গন ছুটে যাই । ওকে শিলিগুড়িতেই দাহ করা হয় । তারপর মা চলে গেলেন , বাবা ও , পরপর’ । খুব শান্ত গলায় কথাগুলো বলল তিস্তা ।
‘ তোমার ছেলের নামও আদি মানে আদিত্য রেখেছো ? ’ আদি ভুতগ্রস্থের মত জিজ্ঞেস করে ।
‘ হ্যাঁ ’ ।
‘তোর্সা প্রেগনেন্ট ছিল’ ।
‘ হ্যাঁ , তোমার তখন শোনার সময় ছিল না আদি , বোঝার মন ছিল না ’ ।
‘ একবার জানাতে পারতে ’
‘ কি করতে ? তুমি জোর করে অ্যাবরশন করাতে । তোর্সা তা চায়নি ’ ।
ভুতে ধরা পাগলের মত উঠে দাঁড়ায় আদি । তোর্সা বাধা দেয় না। হাঁটতে থাকে মোরাম ধরে । নুয়ে পড়া , একটু যেন ঝুঁকে পড়া আদি । যেন বয়স আশির
কোঠায় । রঙ্গন দা ফিরে আসছে ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে । আদি ক্রশ করে এগিয়ে যায় । খুরপি আতে পূজন মালী আবার উঠে দাঁড়ায় । ‘পজিটিভ’ ।
তোর্সার দিদি তিস্তার তো ইউটেরাস এ পলিসিস্ট হয়ে খারাপ অবস্থা হয়েছিল । ইউটেরাস কেটে বাদ দিতে হয় বিয়ের আগেই । তা হলে বাচ্চা টা ?
ভুতে তাড়া করা আদি আবার দৌড়তে থাকে বারান্দার দিকে । রঙ্গন দা দরজা বন্ধ করছিল । এগিয়ে আসে । ‘ ইউ আর দ্য লুজার মাই ব্রাদার , আদি ’র ওপর পিতৃত্বের দাবি নিয়ে এস না । ও আমাদের ছেলে ’ । দরজা বন্ধ করে দেয় রঙ্গন দা । ঝমঝম করে শিলিগুড়িতে বৃষ্টি নামল । হাতে ধরা মেডিকেল রিপোর্ট পড়ে গেল মোরামে । ভেসে যাচ্ছে জলের তোড়ে বাগানের সরু নালা বেয়ে । ‘ পজিটিভ ’ ।
অবিকল তোর্সার মুখ । টলতে টলতে মোরাম পেরিয়ে লোহার গেটের ক্যাঁচ ক্যাঁচ পেরিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ল । অঝোর ভিজে চলেছে শিলিগুড়ি শহর।আদি কোথায় চলেছে ? বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে তোর্সার খিলখিল হাসির শব্দ ।
‘ তোর্সা একটি নদীর নাম ’
‘ একটু বেশি ফিল্মি হয়ে গ্যালো ’, বিড়বিড় করতে করতে বৃষ্টিতে ঝাপসা হওয়া রাস্তায় মিশে যায় আদি ....