মামণি হোসিয়ারির ছেলেটা

সরোজ দরবার

‘নে তোর পরীক্ষা, আন্দাজ লাগা দিকি।’
প্রমোদের তাড়া খেয়ে চোখটা একটু সরু করে সুজয়। তারপর প্রায় ফিসফিস করে বলে, ‘৩৪-বি’।
প্রমোদ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলে, ‘হবে না, হবে না, কিস্যু হবে না তোর দ্বারা। একটুর জন্য ফেলটু মেরে গেলি।’
‘তাহলে কি শুধু ৩৪?’
এবার কথা না বলে হাত দিয়ে একটা তুড়ি বাজাল প্রমোদ। বোঝা গেল, সে সন্তুষ্ট।

ততক্ষণে যাঁকে দেখে এই অনুমান, তিনি সামনে চলে এসেছেন।

সিমেন্টের উঁচু বেদিটা থেকে পা নামাতেই পেশাদারি ক্ষিপ্রতায় মুখে চেনা হাসিটা টেনে আনল প্রমোদ। ‘আসুন বউদি, অনেকদিন পরে এলেন যে?’
আগন্তুকের মুখেও হাসি। বললেন, ‘কোথায় অনেকদিন, এই তো পুজোর কেনাকাটা গেল সবে...।’

মহিলা এসে দাঁড়ানো মাত্র, সুজয় একটু দূরে সরে গিয়েছিল। তার নিজস্ব জায়গায়। একটা ছোট্ট কাঠের সিঁড়ি। তার দুটো উপর-নিচ পাদানিতে পা দিয়ে, একটু হেলান দিয়ে বাঁকিয়ে কায়দা করে দাঁড়িয়ে ছিল সুজয়। এটাই বলতে গেলে দোকানে তার ফেভারিট প্লেস। সে জানে, এবার প্রমোদ হাঁক দিয়ে বলবে, এই অমুখ নম্বরের বান্ডিলটা নামা। সুজয় তার লিকলিকে শরীরটা গলিয়ে দেবে উপরের খুপরিতে। তারপর নিখুঁত সন্ধানে আধ মিনিটের মধ্যে সঠিক বাক্সটা প্রমোদের হাতে তুলে দেবে।

মামণি হোসিয়ারির কর্মচারী। ওরা দু’জন।

ছোট, সরু একফালি দোকান। কিন্তু বেশ চালু। মালিক দিনে একবারই আসেন। অবশ্য মালকিন বলাই ভালো। বছর চল্লিশের মহিলা। ভারিক্কি গড়ন। বেশি নড়তে চড়তে পারেন না। এসে ক্যাশ কাউন্টারে সন্ধের দিকে বসেন। তারপর চা-টা খেয়ে একসময় চলে যান। দোকান আসলে সামলায় বলতে এই প্রমোদই। তারই নতুন শাগরেদ জুটেছে সুজয়। প্রমোদের পাড়ার ছেলে। দেশ থেকে এসেছে তাও তো হল বছর কয়েক। কিন্তু এখনও আন্দাজে ভুল করে।

মেয়েদের জামার দোকানে কী করে ছোকরা ছেলে কাজ করবে, ভেবে নিজেই অবাক হয়েছিল সুজয়। প্রমোদ যখন তাকে বলল, ‘কলকাতায় কাজ করতে যাবি?’, একবাক্যে রাজি হয়েছিল সুজয়।

কিন্তু কাজের কথা শুনে তো চক্ষু চড়কগাছ।

হুড়মুড়িয়ে সবার আগে সে জানতে চেয়েছিল, ‘আচ্ছা প্রমোদদা, মেয়েরা এসে বলতে পারে? লজ্জা পায় না?’
প্রমোদ চোখ নাচিয়ে বলেছিল, ‘চল না দেখবি। এখন থেকে অত ভাবার কী আছে!’

বেশি আর ভাবেনি সুজয়। তবে মাঝে মধ্যে সে শুধু ভাবে, প্রমোদ পারে কী করে!

যে কোনও মহিলার ক্ষেত্রে এই মাপ একেবারে নিখুঁত বলে দিতে পারে। আজ অবধি ভুল হতে দেখেনি সুজয়। অবশ্য অভিজ্ঞতা বলে তো একটা ব্যাপার আছে। প্রমোদ এই দোকানে তো কমদিন কাজ করছে না! তবু তার দক্ষতা দেখে মাঝেমধ্যে অবাক হয় সুজয়। সে সিওর, প্রমোদ যেভাবে সাইজ বলে দিতে পারে, ওই মহিলাদের বরেরাও তা পারবে না। হয়তো জানেই না। আর যে মহিলারা আসেন - সবরকম বয়সি - সুজয় খেয়াল করে দেখেছে, কোনওরকম লজ্জা না পেয়েই প্রমোদের সামনে তাঁরা সাইজ বলে দেন।

প্রমোদও তখন যেন পুরো অন্য মানুষ হয়ে যায়।

কিন্তু ছেলেরা এলেই কেলো! মাঝে মধ্যে দু-একপিস দাদা যে দোকানে ঢোকেন না, তা নয়। বেশিরভাগ সময়ই জড়োসড়ো হয়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর রুমালে ঘাম মুছতে মুছতে কোনক্রমে বলে ফেলে, ৩২...। সুজয় জানে, ছেলেরা শালা যত স্মার্টই হোক, এই জায়গায় একেবারে ফালতু। একবার একটা পেটমোটা ভুঁড়ি মাল তো কাগজে করে লিখে এনেছিল। সেই নিয়ে পরে তারা কত হাসাহাসি করেছে।

তারপর একদিন কাগজে বেরল, চিনের এক রেস্টুরেন্টে নাকি যার যত কাপ-সাইজ, খাবারের দামে তত ছাড় দিচ্ছে। মেয়েরা নাকি এসে বলেও দিচ্ছে। বলে কী! সুজয় ভাবে, এরকম একটা রেস্টুরেন্ট যদি তাদের এখানে থাকত, আর দাদাদের পাশে নিয়ে বউদিরা সাইজ বলত, তাহলে মালগুলোর মুখের চেহারা ঠিক কীরকম হত! প্রমোদকে বলতে বলেছিল, ‘শুধু ওটাই বা ভাবছিস কেন? নিজের ধান্দা ভাব।’

সুজয় কাঁচুমাঁচু মুখে থাকায়। কলকাতায় অনেকদিন কাটিয়ে ফেলা প্রায় সমবয়সি দাদাটাকে সে বেশ সমীহই করে। কারণ সময় সময় প্রমোদকে বুঝেই উঠতে পারে না সুজয়।

তার সংশয় কাটিয়ে প্রমোদ বলে, ‘আরে খাবারওলারা তো আর সাইজ আঁচ করতে পারে না। যে কেউ বুরবক বানিয়ে দেবে। নির্ঘাত আমাদের মতো কাউকে রেখেছে চেক করার জন্য। আমাদের এখানে এরম রেস্টুরেন্ট থাকলে, খেপ খাটতাম মাইরি!’

হেসে ওঠে মামণি হোসিয়ারির ছেলেদুটো।

প্রমোদের এই আন্দাজ লাগানোটা অদ্ভুত একটা খেলা। সুজয় ভেবে দেখেছে, তাদের দোকানের কাস্টমার মোটামুটি ফিক্সড। সাধারণত এই দোকানগুলোর ক্ষেত্রে এরকমই হয়। দোকানির ব্যবহার, আর কাপড়ের কোয়ালিটি যেখানে ঠিক থাকে মহিলারা সেখানেই স্টিক করে যান। সুজয়ের ধারণা, কাস্টমার মূলত একই বলেই প্রত্যেকের সাইজ নিখুঁত বলে দিতে পারে প্রমোদ। কিন্তু সেই সংখ্যাটাও তো কম নয়। মনে রাখা চাট্টিখানি কথা নাকি! তাছাড়া নতুন কাস্টমারও তো আসে।

‘শিল্প ভাই, শিল্প। তোরা বুঝলি না’, সুজয়ের বিস্ময়ের বহর দেখে গোড়ার দিকে বলত প্রমোদ। আর সুজয় খিস্তি করে বলত, ‘বালের শিল্প’।

অমনি চ্যাটাং করে রেগে যেত প্রমোদ। বলত, ‘নয়তো কী! মাছওয়ালা যে গদ্দান ধরে অতবড় মাছটা ওই পেল্লাই বঁটিতে কাটে, পারতিস তুই? হাত-ফাত কেটে একসা করতিস। আরে ভাই যে যার কাজের একটা শিল্প আছে।’

অনেকগুলো দিন এই দোকানে কাজ করার পরও সাইজ ভুল করতে করতে ইদানীং সুজয়েরও মনে হয়, ব্যাপারটা শিল্পই বটে।


২)

অদ্ভুত শিল্প! পৃথিবীর সমস্ত নারীর স্তনের মাপ এক হলে কী ক্ষতি হত! এত হ্যাপা পোয়াতে হত না সুজয়কে। অথচ এ এক আশ্চর্য শিল্প! কে যেন ইচ্ছে করেই সব আলাদা আলাদা করে রেখেছেন। আলাদা, আবার আলাদাও নয়। কে করলেন এমনটা? ঈশ্বর!

ভাবনা বুড়বুড়ি কাটে সুজয়ের মনে। বেস্পতিবার বিকেলে।

এই একবেলা সে দোকানে ছুটি পায়। যদিও লক্ষ্মীবার। তবু দুপুরে মিঠুনের ভাতের হোটেলে ভরপেট্টা ভাত আর দু-পিস মুরগির মাংস খায় সে। আর এরকম তৃপ্তির মুহূর্তেই ঘুমোনোর আগে তার মনে এইসব ভাবনার উদয় হয়। হোটেলের রাজুর সঙ্গে সেটিংটা তার মন্দ নয়। বেছে বেছে তাকে তাই লেগপিসটাই দেয়। আজও দিয়েছিল। তারই এক কুচি দাঁতের ফাঁকে আটকে গেছে সুজয়ের। শুয়ে শুয়ে জিভ দিয়ে কায়দা করে সেটিকে বার করার চেষ্টা করছিল সে। আর ঠিক তখনই মনের মধ্যে এইসব বুড়বুড়ি।

অবশ্য নিজের প্রশ্নের একটা উত্তরও সে নিজেই খুঁজে নিল। যদি সব মাপ এক হত, তাহলে তো তার চাকরিটা থাকত না। প্রমোদেরও না। তাদের চাকরির প্রয়োজনে অন্তত নারীদের বুকের গড়ন আলাদা আলাদা হওয়া জরুরি।

অতএব এই ভাবনা থেকে সে সহজ একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারল। বলা যায়, পৃথিবীর একটা অদ্ভুত রহস্য যেন তার সামনে খুলে গেল। সুজয় অনুধাবন করল, এ পৃথিবীতে কোনও কিছুই কারণহীন নয়। সবকিছুই এমনভাবে রাখা আছে যাতে কারও না কারও কাজ জোটে। যেমন মাঠ রাখা আছে চাষীর জন্য। নদী রাখা আছে মাঝির জন্য। রাস্তা রাখা আছে গাড়োয়ানের জন্য। এইগুলো যদি না থাকত তবে পৃথিবীতে এত মানুষের জীবিকা নির্বাহ হত কেমন করে?

এই ভেবে সে তৃপ্তিতে পাশ ফিরে শুল। এবার একটা টানা ঘুম দেবে। কিন্তু হঠাৎ এই অবেলায় একটা চকচকে আলো চিড়িক করে তার মাথায় খেলে গেল। নিজের সিদ্ধান্তকে পালটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে সে নিজেই ভেবে ফেলল, এগুলো রাখা আছে মানুষের জীবিকার জন্য? নাকি এগুলো রাখাই ছিল। মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে ব্যবহার করছে মাত্র!

এইবার সে আর আগের মতো অনায়াসে শুয়ে থাকতে পারল না। উঠে বসে পড়ল। ফ্যানের স্পিডটা একটু বাড়াতে গিয়ে দেখল পাঁচেই আছে। তবু ঘাড়ের কাছে বেশ ঘাম জমেছে। আর সুজয় বুঝতে পারছে সে একটা ভাবনার গোলোকধাঁধার ভিতর ক্রমশ ঢুকে পড়ছে। যেখানে না ঢুকলেই তার দুপুরটা শান্তিতে কাটত।

অথচ এটা তো ঠিক যে, নদী নদীর মতোই থাকতে পারত। কেউ কোনওদিন নদীর বুকে ওঠেনি, পার হয়নি এ-পার ও-পার, এরকমটা তো হতেই পারত। যেমন মানাকাকুর আর বিয়ে হল না। তাদের পাড়ায়। জীবনভর আইবুড়ো র‍য়ে গেল। নদী, রাস্তা, মাঠ ঈশ্বর যেমন বানিয়েছিল তেমনই থাকতে পারত। জীবিকার এই যুক্তিটা, যেটা সে নিজেই নিজেকে দিয়েছিল একটু আগে, এখন বুঝতে পারছে সেটা আসলে মানুষ নিজের তাগিদেই বানিয়েছে। এটা ঈশ্বরের প্ল্যানে ছিল না। সে ব্যাটা বোধহয় নিজের খেয়ালেই এসব করেছে। মানুষ সুবিধামতো সব পালটে নিয়েছে।

এই পর্যন্ত ভেবে এবার তার নিজের পেশার কথা মনে হল। নারীকেও তাহলে ঈশ্বর নিজের খেয়ালেই গড়েছিলেন। কখনও ভাবেননি যে, এই উন্মুক্ত বক্ষদ্বয় কাপড়ে ঢাকতে হবে। ভাবলে হয়তো প্রতি স্তনের মাপ একইরকম করতেন। কাপড়ের ঢাকাটা মানুষের তৈরি। ঢাকতে যে হবে, এটাও মানুষেরই ভাবনা। সুজয় দুটো গল্প শুনেছিল। কোথায় কার মুখে শুনেছিল মনে নেই। কিন্তু এখন এই ভাবনার সূত্রে গল্পদুটো তার মনে পড়ে গেল। সে শুনেছিল, পৃথিবীতে এখনও নাকি এমন কিছু জাতি আছে যেখানে মহিলারা এসবের পরোয়া করেন না। অর্থাৎ, বুকের কাপড় নিয়ে তাদের কোনও মাথাব্যথা নেই। দ্বিতীয় গল্পটা একটু অন্যরকম। আমাদেরই দেশের ঘটনা। ঠিক কোথাকার তা এখন আর সুজয়ের মনে নেই। তো এই আমাদের দেশেই নাকি একসময় নিচু জাতের মহিলাদের বুকে কাপড় দেওয়া অপরাধ ছিল। বিশেষত উঁচু জাতের পুরুষদের সামনে। এরকমই চলছিল বহুদিন। পরে খ্রিস্টানরা নাকি সেই মহিলাদের সাহস দিয়ে বলেন, কেউ কিছু বলবে না, কাপড়ে বুক ঢাকো তোমরা। ধর্মে যদি তাতে বাধে তবে খ্রিস্টান হয়ে যেও। পরে সেই নিয়ে বহু ক্যাচাল হয়। মহিলারা সব খ্রিস্টান হয়ে গিয়ে বুক ঢাকা পোশাক পরতে শুরু করে। কিন্তু গল্পটা সুজয়কে যে বলেছিল, সে সবশেষে জানিয়েছিল, বিলেতে তখন শিল্পবিপ্লব হয়েছিল। সেই পোশাক বিক্রির জন্যই নাকি এই মহিলাদের খেপিয়ে তুলেছিল খ্রিস্টানরা।

সবকিছুরই ভালো-মন্দ, যুক্তি-পালটা যুক্তি আছে। এখন এই এতকিছু তো ঈশ্বর আর ভেবে করেনি। সুজয় নিশ্চিত। ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হলে সে একবার খোলাখুলি জেনেও নিতে পারত। কিন্তু সে এখনই অন্তত এটা বোঝে, এই যারা এখনও বুক ঢাকার ব্যাপারে পরোয়া করে না, তারাও দিব্যি আছে। ৩৪, ৩২ এইসব ভেদাভদের বাইরে তাদের কাছে এই অঙ্গের একটা আলাদা সুষম পৃথিবী আছে। সেইটেই বোধহয় ঈশ্বর তৈরি করেছিলেন।

ঢাকাঢুকির ব্যাপার মানুষের তৈরি বলেই আলাদা আলাদা মাপের এই জটিলতা সমস্ত ব্যাপারটাকে জড়িয়ে ধরছে। নইলে একেবারে গোড়ায় তো এই আলাদা, এই বৈষম্য চোখেই পড়ে না।

সুজয়ের মনে পড়ে, শীতকালে স্কুল থেকে ফেরার পথে তারা দেখত, পটুদারের বাড়ির সামনে সারি সারি দেবীমূর্তি রোদ্দুরে শুকনো হচ্ছে। তাদের বুক খোলা। কোনও আবরণ তখনও দেওয়া হয়নি। অবশ্য তাদের শুধু মূর্তি বলাই ভালো। প্রাণপ্রতিষ্ঠা না হলে আর দেবী কীসের! তো সেই মূর্তিদের বুকের গড়ন কি প্রত্যকের এক ছিল! আজ এতদিন পর সুজয়ের মনে হয়, না, তা হতে পারে না। নিশ্চয়ই সেখানেও ঊনিশ-বিশ ছিলই। কিন্তু কখনও তা মনে হয়নি।

নারীদের ক্ষেত্রেও যদি ঈশ্বরের ইচ্ছে শিরোধার্য হত, তাহলে এই ফারাকটা থাকতই না। শুধু নারী কেন! এই নদী, মাঠ, রাস্তা, গাছপালা- এসবের মধ্যেও কত ফারাক আছে। কিন্তু আসলে সে সব ফারাকই নয়। অরণ্যে কোন গাছ ছোট, কোনটা বড় কে জেনেছে বা জেনেই বা কী লাভ! নদীর কোনখানে কত জল, তা নিয়ে নদীর কী আসে যায়! পুরোটা মিলিয়েই তো নদী।

অথচ নদীর জন্য মাঝি, মাঠের জন্য চাষী, এমনকী নারীর স্তনের মধ্যেও যে বৈষম্যের আমদানি তা মানুষের জন্যই। মাঝির সঙ্গে চাষির ফারাকটা না নদী করেছে না মাঠ করেছে না ঈশ্বর। ৩৪-বি আর ৩২-বি’র ফারাকটা না ঈশ্বর করেছে না সুতো। এসব মানুষই বানিয়েছে। কারণ লোকদেখানো এই ফারাকটা তৈরি করতে পেরেছে বলেই মানুষ বেশ দিব্যি করে খাচ্ছে।

অথচ ঈশ্বর তো মানুষকে কিছু বলছেনও না!

এই যে তার সৃষ্টির ভিতর এমন একটা গোঁজামিল ঢুকিয়ে দিয়ে পুরোটা বরবাদ করে দিচ্ছে মানুষ, কই ঈশ্বর তো প্রতিবাদ করেন না। তাহলে ঈশ্বর কি চান? তিনিও কি চান যে, এই ফারাক থাকুক! যে ফারাক রেখেও তিনি মুছে দিয়েছিলেন, সেই ফারাক আবার মানুষ খুঁচিয়ে জাগিয়ে তুলুক, এই কি তাঁর চাওয়া?

ঈশ্বর মানুষ তৈরি করেছেন। মানুষ আবার হিন্দুর ঈশ্বর, মুসলমানের ঈশ্বরকে আলাদা আলাদা করে তৈরি করেছে। তাহলে কি ঈশ্বরও মানুষের এই ফারাক করার কলে পড়ে গেছেন। এক থেকে অনেকগুলো হয়ে নিজের শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন!

এবার দরদরিয়ে ঘেমে ওঠে সুজয়। দ্যাখে, কখন লোডশেডিং হয়ে গেছে খেয়াল করেনি। বিছানায় বসে বসেই পিঠটা ঘামে সপসপ করছে।

দড়ি থেকে গামছাটা টেনে নিয়ে সে খালি পিঠটা মুছতে মুছতে ভাবছিল, শালা রাজু আজ মুরগিতে কী মিশিয়েছিল! এই যে এতগুলো কথা ইনিয়েবিনিয়ে সে ভাবতে পারল, কী করে পারল!

তবে কি এই ফারাক হয়ে যাওয়া ঈশ্বর ছাড়িয়েও আর একজন ঈশ্বর আছেন! পেটে ভাত পড়লে যিনি আসেন, সুজয়ের মাথার উপর ভর করেন!

৩)

‘কীরে ছুটির দিন, না ঘুমিয়ে চলে এলি যে?’ – সুজয়কে দোকানে ঢুকতে দেখে প্রশ্ন করে প্রমোদ। যদিও তাতে কান দেয় না সুজয়।

বেস্পতিবার বলে মহিলারা এদিন কেনাকাটা কম করেন। তাই দোকান ফাঁকা। সুজয়ের তাই এদিন বিকেলটাই ছুটি মেলে।

আজও দোকান ফাঁকা। প্রমোদ বসে বসে ভ্যারেন্ডা ভাজছিল। হঠাৎ, সুজয় তাকে পালটা প্রশ্ন করে বসল, ‘আচ্ছা প্রমোদদা, ঈশ্বর আছে?’

প্রমোদ এ প্রশ্নের জবাব দেয় না। চুপ করে থাকে।

সুজয় আবার বলে, ‘আচ্ছা ধরো, যদি এমন হত যে এই ৩৪, ৩২ বলে কিচ্ছু থাকত না, সকলের একই মাপ। আলাদা যদি হতও, কেউ পাত্তাই দিত না। কেননা কেউ এসব পরতই না। তাহলে কেমন হত?

এবার নড়েচড়ে বসে প্রমোদ। কারণ এই প্রশ্নে তাঁর মনে অনেক উণ্মুক্তবক্ষ রমণীর ছবি ভেসে ওঠে। তারা কারা? বোধহয় ওই বিজ্ঞাপনে যাদের ছবি থাকে তারাই।

যাই হোক, তাতেই বেশ আমোদ পায় প্রমোদ। বলে, ‘বেশ ভালোই হত। সকলে বনবাসী হয়ে যেত। সভ্য-ভব্য বলে আর কোথাও কিছু থাকত না। সব পানু।’

তার বলার ঢঙে হেসে ফ্যালে সুজয়।

সেদিন অনেক রাতে এক আদিম রমণীর সঙ্গে দেখা হয় সুজয়ের। সে প্রাচীনার কত বয়স সুজয় জানে না। কতকাল আগে সে পৃথিবীতে ছিল, তাও তার হিসেবের বাইরে। কিন্তু শুধু সে দ্যাখে, সে রমণীর গায়ে এতটুকু আবরণ নেই। সদর্পে টলটল করছে যৌবনের সমস্ত চিহ্ন। যেমন আমের গাছে বোল ধরে।

চোখ তুলে তাকায় সুজয়। দ্যাখে, সেই প্রাচীনা রমণীর বর্তুল, টানটান দুটি স্তন। এতটুকু নুয়ে পড়া নেই। এমনই উদ্ধত সে।

সুজয় বলে, ‘চৌত্রিশের বি না?’
রমণী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।
‘সাইজ জানো না? সাইজ? মাপ!’
রমণী বিস্মিত হয়।
‘ব্লাউজ, ব্রা পরোনি কখনও?’
ক্রমাগত সুজয়ের কথা না বুঝতে পেরে রমণীর বিস্ময় উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে।
সুজয় বলে, ‘তুমি শহর, গ্রাম এসব কিচ্ছু দ্যাখোনি? সারাজীবন বনবাসী?’
রমণী চুপ।
সুজয় বলে, ‘তুমি হিন্দুদের, না মুসলমান? সেটা অন্তত জানো তো?’
রমণী এখনও চুপ।
সুজয় ফের জানতে চায়, ‘তোমরা কি এমনিই কিছু না পরে থাকো? নাকি কোনও উঁচুজাতের লোক তোমাদের কাপড় পরতে বারণ করেছে?’

রমণী এবার আর থাকতে পারে না। বিস্ময় তুলে রেখে সে এবার সটান জড়িয়ে ধরে সুজয়কে। তার ভারী স্তনের মাংসল স্পর্শ সুজয় টের পেতেই বুঝতে পারে, কী আশ্চর্য সে নিজেও যে এখন সম্পূর্ণ নিরাবরণ!

এসব কী করে সম্ভব হল!

সুজয় বুঝতে পারে, এই স্পর্শের ভিতর ডুবে যাচ্ছে সবকিছু। হিন্দুর ঈশ্বর, মুসলমানের ঈশ্বর, চাষীর মাঠ, মাঝির নদী, গাড়োয়ানের রাস্তা, উঁচুজাত, নিচুজাত, স্তনের মাপ, ৩৪-বি, ৩৬-এ... সবকিছু। সব কিছু মিলে গিয়ে একটা স্পর্শ শুধু স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর অনুভেদ্য হয়ে উঠছে। যেন এই স্পর্শই সেই সেই এক ও আদি ঈশ্বর।

অথচ তার ভয় করে। সুজয় টের পায়, ইতিমধ্যেই কে যেন তাকে টানছে, এই স্পর্শ থেকে দূরে। ঈশ্বর থেকে দূরে।

চোখে খুললেই যেন এই স্পর্শ মিলিয়ে যাবে। তারপর ছড়িয়ে পড়বে ৩৪-বি, ৩৬-এ, মাঠের চাষী, নদীর মাঝি, রাস্তার গাড়োয়ান, উঁচুজাত, নিচুজাত, হিন্দুর ঈশ্বর, মুসলমানের ঈশ্বর হয়ে...

সেই অফুরান স্পর্শের ভিতর ডুবে যেতে যেতে সুজয় অবশ্য ঠিক করেই নেয়, পৃথিবী ওলটপালট হয়ে যাক, এই চোখ সে আর খুলবেই না।