শৈশবের তৃতীয় প্রেম

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

তখন ১৯৮৯ সাল, আমার বয়স ৮। নয়না হচ্ছে আমার জীবনের তৃতীয় মেয়ে, যে আমাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করেছিলো।

যেহেতু নয়নার নাম নয়না। সেহেতু নয়নার সঙ্গে মিলিয়ে আমি আমার নিজের একটা নাম দিই, নয়ন। আমি খাতার মধ্যে, হাতের তালুতে, টেবিলে, বইয়ের পাতায়, গাছের গায়ে, পুকুরের ঘাটে, নানা জায়গায় লিখে রাখি নয়ন চৌধুরী। আমার এই নামের কথা বাবা জানতে পারেন যখন আমি সিক্সে পড়ি। তখন তিনি একদিন আমাকে ডেকে অনেক ভেবে-চিন্তে আমার একটা ডাকনাম ঠিক করে দিলেন। তিনি আমার নাম দিলেন নির্ঝর। কিন্তু আমি গোপনে নয়ন হয়েই রইলাম ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত।

তারপর একদিন অনেকদিন পর ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পরের বছর নয়নাকে দেখলাম সায়েন্স ফ্যাকাল্টির দিকে যাচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানলাম ক্যামিস্ট্রিতে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু আমি আগের মতোই, কথা বলার সাহস নাই। দিন যায় বছর যায়, তাকে দূর থেকে দেখি। ধুতুরার ঝোঁপে আর নাগকেশরের নিচে দাঁড়িয়ে থাকি হ্যাবলা, ক্যাবলা, হ্যাংলা হয়ে। সে দেখেও দেখে না। অথচ অন্যদেও সঙ্গে, অন্য অনেক মেয়ের সঙ্গে কী সহজে কথা বলছি, ঝগড়া করছি, কাদা ছুড়ছি। কেবল নয়নার বেলায় আমি দীঘল জিরাফ, দীঘল গ্রীবা মেলে বোবা হয়ে আছি। হাহাহা।

দেখতে দেখতে একদিন ফেসবুক এসে গেলো পৃথিবীতে। আমি আমার ইয়াহু ইমেইল দিয়ে একটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট করে ফেললাম। এবং ছয়দিনের মধ্যে নয়নাকে খুঁজে বের করে ফেললাম। তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালাম। ইনবক্সে লিখলাম, ‘হেই! ইটস মি।’
সে আমার রিকোয়েস্ট ঝুলিয়ে রাখলো কিন্তু আমাকে রিপ্লাই দিলো, ‘হিহিহি...’
আমি লিখলাম, ‘হিহিহি মানে কী?’
সে লিখলো, ‘তোমার মাথা আর আমার মুণ্ডু... ঝুপড়িতে আসো।’ আমার সমস্ত শরীর কাঁপছিলো। ১৬ বছর পর এই প্রথম তার সঙ্গে কথা বলবো। কী বলবো? আমি প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে ক¤িপউটার ল্যাব থেকে ঝুপড়িতে হায়দারভাইয়ের দোকানে গিয়ে বাঁশে হেলান দিয়ে বসলাম।

নয়না এসে আমার মুখোমুখি বসলো। আমি তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না। জারুলতলায় প্রগতিশীল ছাত্রজোটের একটা মিছিল যাচ্ছিলো আমি সেদিকে তাকিয়ে আছি। আমার হাত কাঁপছিলো। সে বললো, ‘মিছিল গেছে গা। এইবার আমার দিকে তাকাও।’

আমি তাকালাম। আমি তার চোখের ভিতর তাকালাম। এবং ডুবে গেলাম। মনে মনে বোদলেয়ারের কবিতা বললাম তাকে, ‘let me sink into the silent fiction of your eyes.’

‘কী ভাবতেছো?’
‘তোমার চোখ সুন্দর’
‘হিহিহি’
‘হিহিহি মানে কী?’
‘সুন্দর চোখ কারে বলে তোমারে দেখাবো একটু পর।’

আমার মনে হচ্ছিলো ১৬ বছর পর এই প্রথম নয়, নয়নার সঙ্গে আমার প্রতিদিনই কথা হয়।

সহসা আমার হাতের ওপর একটা ছায়া পড়লো। দেখলাম নয়নার পেছনে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। আর ছেলেটার চোখ ভয়াবহটাইপের সুন্দর। আমি থ। আমাকে অবাক হতে দেখে নয়না পেছন ফিরে তাকালো। তারপর ছেলেটাকে হাত ধরে পাশে বসালো। বললো, ‘এই দেখো সুন্দর চোখ কারে বলে।’
‘হুঁ’
‘হুঁ না। ওর নাম আবিদ।’
আমি ছেলেটার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলাম। নয়নাকে বললাম, ‘তোমার বন্ধু?’
নয়না বললো, ‘না। বন্ধু নয়, আবিদ আমার ছেলে-বন্ধু, মানে বয়ফ্রেন্ড, হিহিহি...’