যে জীবন অন্ধকারের

দেবদ্যুতি রায়

টুপ!
চারপাশে ছোট একটা বৃত্ত এঁকে জলের ভেতরে কোথায় ডুব দিল নুড়িটা। তারপর জল আবার সেই আগের মতো নিস্পন্দ। সোহেল এবার আরেকটা নুড়ি খোঁজে। খুঁজেপেতে আরেকটা পায়ও, আগেরটার চেয়ে আকারে একটু ছোট এটা। ছুঁড়ে মারে, জলে ঘাঁই মেরে বৃত্ত এঁকে সেটাও ডুবে যায়- টুপ!
এমন দুপুরগুলো অসহ্য লাগে ওর বরাবর। শুধু দুপুর কেন, এমন বিকেল, সন্ধ্যা, রাত- যেটাই আসে সহ্য করতে পারে না ও। পালিয়ে আসে এই আকন্দ আর হরেক রকম জংলা ফুল আর ঘোলা জলের নদীর বাঁকটার কাছে। ওদের পাড়া থেকে বেশ অনেকখানিই দূরে বাদুরগাছার এই বাঁকটা, তবু এমন মন খারাপের দিনে সে অনায়াসে এক ছুটে এই দূরত্বটুকু পার হয়ে আসে। এমন না যে এখানে এলে ওর মন ভালো হয়ে যায়। আসলে এখানে এলে ও কিছুটা সময়ের জন্য পালিয়ে যেতে পারে পৃথিবীর সবকিছু থেকে।
সবকিছু মানে সবকিছু- মাঝে মাঝে ওর প্রিয় সমস্ত কিছুই ছেড়ে পালাতে ইচ্ছে করে। এই যেমন সেতুর কথাই ধরা যাক। শুধু সেতুর সাথে খেলবে বলেই না সোহেল একদিনও বিকেলবেলা অন্য কোনো কাজ রাখে না। সেতু সকালে স্কুলে যায়। এখানে একটা এনজিওর স্কুল আছে। সোহেল গিয়েছিল কয়েকদিন। স্কুলের পড়ালেখা ওর ভালো লাগেনি বলে আর যায় না। সেতু স্কুল থেকে ফেরার পর ওরা দু’জনে মিলে এক্কাদোক্কা, পুতুলবাড়ি, পাতা লুকোনো খেলা খেলে পুরো বিকেল জুড়ে। শুধু দু’জনে মিলে বউ-চি, কানামাছি, গোল্লাছুট খেলা যায় না বলে এগুলো খেলার সময় কেবল ওরা অন্যদেরও সাথে নেয়।
বয়সে সেতু হয়ত ওর চেয়ে কিছু ছোটই হবে। লম্বায় তো পুরো দশ আঙ্গুল ছোট। যেদিন সেতুকে স্টেশনে কুড়িয়ে পেয়ে ফজু মামা নিয়ে এলো ওদের পাড়ায় আর লতি খালা ওকে নিজের মেয়ে করে কাছে রেখে দিল; সেদিন মা বারবার করে বলছিল- ইশশশ! কোন পরানে মাইয়্যেটারে অর বাপ-মায়ে ফেইলে থুয়ে গেচে!
কোন প্রাণে যে সেতুর আসল বাপ-মা ওকে ফেলে রেখে গেছে তা আজ পর্যন্ত জানে না সোহেল, জানে শুধু এই যে এই বয়স অব্দি সেতুর মতো বন্ধু ওর একটাও নেই। সেতু না এলে হয়ত ওর একটাও ভালো বন্ধু থাকতো না।
তবু আজকের মতো এমন সময়গুলো যখন আসে, তখন ওর সেতুকেও আর ভালো লাগে না। এই তো, আজই যখন ও ঘর থেকে বেরিয়ে দৌড়োচ্ছিল এপাড়ায় আসার ইট বেছানো এবড়োখেবড়ো আর চিকন একমাত্র রাস্তাটা ধরে, সেতু ওদের ঘরের চৌকাঠ থেকে পাখি হয়ে চিৎকার করে ডাকছিল- এই সোহেল, কই যাস, কই যাস, কই যাস…
না, সেতুর সে প্রশ্নেরও কোনো জবাব দিতে ইচ্ছে করেনি তখন। দৌড় থামায়নি ও, আঁকাবাঁকা সরু সরু পথ ধরে এক দৌড়ে এসে থেমেছে এখানে। এই জংলা ভাঁটফুলের আর আকন্দ ঝোপের পাশে। ভাগ্যিস সেতু এই জায়গাটা চেনে না, নাহলে এতখানি পথ ডিঙিয়েও এখানে চলে আসত নিশ্চিত।
হাতের কাছে একটাও নুড়ি নেই আর। একটা শুকনো ছোট বাবলার ডাল পড়ে আছে পাশেই। সেটা কুড়িয়ে নিয়ে সোহেল যেই না পানিতে ছুঁড়তে যাবে অমনি কোত্থেকে এক শুশুক ভুস করে মাথা তুলেই আবার তলিয়ে গেল! ওর একবার ইচ্ছে করে নদীতে একটা লাফ মেরে শুশুকটার মতো তলিয়ে যায়। অনেকক্ষণ ডুবে থাকে পানির নিচে, তারপর মন যখন শান্ত হবে, আবার উঠে আসবে চুপচাপ। কিন্তু এই নদীতে নাকি কুমির এসেছে এখন। মা পই পই করে বলে দিয়েছে যেন কোনোমতেই নদীতে না নামে ও।
ও আল্লাহ্! আবার কেন মার কথা মনে পড়ল? ওর খুব গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কেন আজও একটা মুষকো ষন্ডামতো লোক ওদের ঘরে এলো? কেন ওদের ঘরে যখন তখন ওই মানুষগুলো আসে আর মা সেই সময়টায় ওকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখে নাহলে নির্মলের ওষুধের দোকানে পাঠিয়ে দেয়? সোহেলের ইচ্ছে করে এই নির্জন নদীর বাঁকে ও হাক ছেড়ে কেঁদে বুকের ভার হালকা করে, সব দুঃখগুলোকে বাদুরগাছা নামের নদীটার ছোট ছোট ঢেউয়ের সাথে মিলিয়ে দেয়।
মা বলেছে এবার শাওন মাস এলে সোহেলের বয়স এগারোয় পড়বে। তার মানে ওর বয়স এখন পুরো দশ বছর। এই দশ বছরের জীবনটা ওর খুব প্রিয়। শুধু ওদের ঘরে যখন ওই মানুষগুলো আসে তখন ওর আর এ জীবন ভালো লাগে না। নির্মলের দোকানে বা পাড়ার মোড়ে জড়ো হওয়া লোকগুলো কত পচা পচা কথা বলে মা, লতি খালা, আশা মাসিদের নামে, কেমন বিশ্রীরকম করে হাসে ওদের নানান কথা বলতে বলতে- সে তো শুধু ওই লোকগুলো ওদের ঘরে আসে বলেই। ওরা না এলে মাকে নিয়ে কেউ বাজে কথা বলতে পারত? একদম এক হাত দেখে নিত না সোহেল?
ঝড়ু একদিন ওকে বলেছে- সেতুও নাকি আরেকটু বড় হলে ‘মাগি’ হবে। ওরও ঘরে নাকি এমন সময় নেই অসময় নেই, ‘লোক’ আসবে। সেকথা মনে হলেই ঝড়ুর ওপর রাগে পিত্তি জ্বলে যায় ওর। এমনকী একথা শোনার পর সেদিন আল্লাহর কাছে ও খুব করে চেয়েছে ঝড়ুর যেন জিভ খসে পড়ে! কিন্তু কী আশ্চর্য, সেই জিভ নিয়ে ঝড়ু নিশ্চিন্তে খারাপ খারাপ কথা বলে যাচ্ছে সবার নামে! আল্লাহ্ কেন যে ওর কথাটা শোনেনি!
গণগণে রোদের এই ঝিম ধরানো দুপুরটায় হঠাৎ কাছেই কোথাও কিছু পাখি ডেকে ওঠে। সে ডাকে চমক ফেরে সোহেলের। ইশশশ! ঘেমে নেয়ে গায়ের একেবারে বেহাল দশা হয়ে গেছে। ওর গায়ের হাফহাতা ‘পিত্তি’ রঙের গেঞ্জিটা ভিজে সপসপ করছে। নাহ্। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে ও এখানে এসেছে। এবার ফিরতে হবে। সেই ষন্ডা লোকটা এতক্ষণে ওদের ঘর থেকে চলে গেছে নিশ্চিত।
একটা সবুজ রঙের ‘রকেট’ চলে যায় ভোঁ ছেড়ে। পানি কেটে কেটে চলা সে মাঝারি আকারের রকেটের ডেকে মায়ের কোলে একটা ছোট ছেলে অনবরত হাত নেড়ে চলেছে। সে কি সোহেলকে ‘টা টা’ দিয়ে চলে যাচ্ছে? এই রকেট কোথায় যাবে জানে না ও। কিন্তু মা বলেছে এই নদী ধরে পশুর, বাজুয়া হয়ে নাকি একেবারে সুন্দরবনে চলে যাওয়া যায়। টিভিতে সুন্দরবন দেখেছে ও। বাপ রে- সেখানে বাঘ, হরিণ, বানর আরও কত কিছু যে আছে! আর কত গাছ! কতদিন ওর মনে হয়েছে বড় একটা কার্গোতে চেপে চুপিচুপি সুন্দরবনে চলে যায় কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহসে কুলোয়নি।
রকেটটা চোখের আড়ালে চলে গেলে সোহেল উঠে পড়ে। ওকে বেশিক্ষণ না দেখলে মা কেঁদেকেটেই একাকার করবে। মা ওকে কত ভালবাসে! শুধু এই ভালবাসার জন্যই কোনোদিন মাকে ছেড়ে যেতে পারবে না ও। মা যেমনই হোক, যত খারাপই হোক, এই ভালবাসাটুকু আর কোথায় পাবে ও? আরও ছোট থাকতে রেবা মাসির ছেলে ফণী ওকে বলেছিল- চল সোহেল, এই বেইশ্যেপাড়া ছাইড়ে আমরা পালাই।
না, না। সোহেল পালাবে না মাকে ছেড়ে কোনোদিন। ফনী অবশ্য এই ছোট ছোট ঘুপচি ঘরের নোংরা পাড়াটা ছেড়ে একদিন সত্যি সত্যিই কোথায় পালিয়ে গেছে। আচ্ছা, ওর মা রেবা মাসি তো এখনও এখানে থাকে ফুলকিকে সাথে নিয়ে; এই যে কোথায় হারিয়ে গেল ফনী- মার জন্য, ফুলকির জন্য মন কেমন করে না ওর?

দুই
আজ সকাল থেকে মন খুব ভালো সোহেলের। কাল রাতে ঘুমোতে যাবার আগে মা বলেছিল আজ দুপুরে নাকি বাবা আসবে। আনন্দে তখন ওর মনে হয়েছিল গোটাকয়েক ডিগবাজি খেয়ে নেয় ছোট চৌকিটার ওপরেই।
বাবা আসা মানে সোহেলের খুশি আর খুশি। ঈদের দিনও এত আনন্দ লাগে না ওর। বাবা দু’হাতের ব্যাগ ভরে কত্ত কিছু আনে! শার্ট, প্যান্ট, গেঞ্জি, সোয়েটার, গাড়ি, ভালো ভালো চকলেট, লজেন্স। এই এলাকায় এত ভালো জিনিস কি আর পাওয়া যায়? সোহেল তখন সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে বিস্কুট চকলেট খায়। সেতুকে অবশ্য সে ভাগ দেয় সবকিছুর।
কিন্তু শুধু এ কারণে বাবা এলে ও খুশি হয় না। বাবা যে ক’টা দিন থাকে, সে ক’দিন ওদের ঘরে কোনো ‘লোক’ আসে না। সোহেল জানে এই উটকো লোকগুলোকে মা নিজেও পছন্দ করে না। সে কারণেই না বাবা এলে মায়ের গোলপানা মুখটাকে দেখতে আরও টুকটুকে সুন্দর লাগে!
তবে সোহেলের খুশির পেছনে আরও অন্য কারণ আছে। এই পাড়ার নোংরা মেখে যে বাচ্চাগুলো জন্মায়, তারা কেউই তাদের বাপের পরিচয় জানে না। এ পাড়ায় শুধু সোহেলই তার বাবার নাম জানে, এ পাড়ায় শুধু ওকেই বাবা বছরে দু’বার তিনবার দেখতে আসে। আর কেউ কেন বাবার নাম বলতে পারে না বা আর কারও বাবা কেন তাদের দেখতে আসে না তা অবশ্য ঠিকঠাক জানে না ও।
জানে শুধু এই একটা কারণে রোকন, প্রদীপ, দিশা, আদুরিরা ওকে খুব হিংসা করে। আর সবার এই হিংসা সে মনেপ্রাণে উপভোগ করে।
সকালে খাওয়া দাওয়ার পর ঘর ছেড়ে কোথাও যায়নি সোহেল। বাবার নাকি আসতে আসতে বিকেল হবে আজ। নিজেদের এই ঘুপচি ঘরে শুয়ে বাবার জন্য অপেক্ষা করতে ভালো লাগে ওর। বাবা সাতক্ষীরায় কী যেন একটা চাকরি করে। কতদিন ওর মনে হয়েছে বাবার সাথে সাতক্ষীরায় চলে যায়। মাকে সেকথা বললেই মা হাসে, বলে- সোহু, এই ঘরে আমার মা আমার হাতের উপর মরিচে- এই ঘর ছাইড়ে আমি আর কোয়ানে যাবো রে বাপ!
সোহু ওর আদরের নাম। মার মন মেজাজ যখন ভালো থাকে, ওকে সোহু বলে ডাকে। সোহেলের মনও তখন ফুরফুরে হয়ে যায়।
আজ দুপুরে মা কাইন মাগুর রেঁধেছে- মাছওয়ালা বলাই কাকাকে আগেই বলে রেখেছিল মনে হয়। সোহেলের খুব প্রিয় মাছ কাইন মাগুর, মা ওকে দু’পিস দিয়েছিল। খাওয়াদাওয়া হয়ে গেলে মা তার ছোট্ট আয়নাটা সামনে নিয়ে চুলে বেণী করেছে। ইশশশ! একটু সুন্দর করে সাজলে মাকে কী যে সুন্দর দেখায়! মা যেন একটা পরী- বিষুর চায়ের দোকানের টিভিতে ও একদিন পরীর সিনেমা দেখেছিল; মাকে আজ হুবহু সেই পরীর মতো দেখায়। বিছানায় মটকা মেরে পড়ে থেকে চোখ অল্প অল্প খুলে মার খুশি ঝলমল মুখ দেখে কী যে আনন্দ হয় ওর।
সোহেল জানে বাবা এলে মার খুশি হওয়ার জন্য আর কিছু লাগে না। যে ক’টা দিন বাবা এখানে থাকে সে ক’দিন ওদের ছোট্ট আধভাঙা ঘরটায় যেন খুশির বাতাস ভাসে। ইরানি নানি একদিন মাকে বলছিল- মানুষটা তোর মইদ্যে কী দেখিলো রে, রঞ্জি, সেই যে একবার আসিলো, ছওয়ালটার জন্ম হইলো, সেই ছওয়াল বড়ও হইলো তবু এখনও কেমন বছরে বছরে আসতিচে!
ইরানি নানির সব কথার অর্থ যে সোহেল সেদিন বুঝেছিল এমনও না। তবে মার শ্যামলাপনা মুখটা যে প্রায় লাল হয়ে গিয়েছিল তা ও দেখেছে।
এই সোহু, সোহু উঠ বাপ। দ্যাখ কিডা আসিচে- মায়ের ডাকে সোহেল ঘুমক্লান্ত চোখ মেলে চায়। বিছানায় ওর পাশে বসা হাসিমুখের মানুষটার নাম সাইফুল, ওর বাবা।
আব্বা, তুমি আসিচো! কখন আসিচো? এইবার ম্যালা দিন তুমি আসো নাই ক্যান আব্বা? তোমারে ছুটি দ্যায় নাই?
সোহেলের প্রশ্নে ব্যতিব্যস্ত সাইফুল হাসিমুখে অফুরান উত্তর বলে যায়। বাদুরগাছা নামের গ্রামীণ বাঁকের নদীটার পাড়ে ওদের ‘খারাপ পাড়া’র জীর্ণ ঘুপচি ঘরে তখন প্রশ্নে আর উত্তরে, আদরে আর আহ্লাদে এক রূপকথার রাজ্য নেমে আসে। মা পাত পেড়ে বাবাকে খেতে দেয় কাইন মাগুরের ঝোল দিয়ে সাদা ফুল ফুল ভাত, বাবা সাতক্ষীরার গল্প করে, মার রঙিন শাড়ির আঁচলে খুশির হাজার প্রজাপতি ওড়ে।
কিন্তু ওদের এই সুখ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। রূপকথার দানোর মতোই ওদের আধভাঙা ঘরের ভেজানো দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ে কয়েক জন- পরিমল, যোশেফ, হায়দার, রোস্তম আর জয়ন্ত। যোশেফ আর রোস্তম পাড়ার সামনে মনোহারি দোকান করে, বাকিরা এ পাড়ার নিয়মিত খদ্দের। চেনা মানুষগুলোর চোয়াড়ে চেহারা দেখে কেমন অচেনা লাগে সোহেলের, ভয় লাগে।
এই যে সাহেব, আপনি যে মাগিপাড়ায় এমন কইরে বছর বছর আসেন, ঘরের লোক জানে?
এই ভীষণ পচা কথাগুলো জয়ন্ত ওর বাবার উদ্দেশ্যে বললেও মা এসে দাঁড়ায় সামনে- তোমরা কী চাতিচো বলো তো। কী জন্যি এয়ানে আসিচো?
মার ত্র্যস্ত প্রশ্ন শুনে ঠা ঠা করে হাসে ওরা সবাই। এবার বোধহয় বাবার সাথে সাথে মাও ভয় পেয়ে যায়। হয়ত তার মনে পড়ে আজ ভোরবেলায় মুখে চোলাইয়ের তীব্র গন্ধ নিয়ে দরজায় ধাক্কা দিয়েছিল ফুলবাড়িয়ার মনীশ মেম্বার আর ভীষণ বিতৃষ্ণ মন নিয়ে তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল সে। মনে পড়ে কারণ মনীশের সাথে এদের সবার খাতিরের কথাটা এ পাড়ার সবার মতো সেও জানে।
মার প্রশ্নের জবাব দেয় হায়দার- আপাতত সাহেবের ফোনটা চাতিচি।
তারপর কিছুক্ষণ হুটোপাটির পর বালিশের কোণা থেকে বাবার ফোনটা হাতে পায় জয়ন্ত।
বল শালা, তোর বৌয়ের নাম্বার কী নামে ছেভ করছিস- বাবাকে ধমক দিয়ে ওঠে যোশেফ।
মা কাঁদে ঝরঝরিয়ে- ওনারে ছাইড়ে দ্যাও তোমরা। বাড়িত খবরটা দিয়ে না। মানুষটার এত বড় সর্বনাশ কইরে না।
বাবা মুখ ঢেকে বিছানায় পড়ে থাকে। মার কান্না, বাবার হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়া- এসবের কিছুই বুঝতে পারে না ও। বাবার বৌ কথাটারও মাথামুণ্ডু কিছু বোঝে না, ওটা তো ওর বাবা, মাতো বাবারই বৌ। তাহলে বাবার অন্য বৌ থাকবে কেন?
হ্যাঁ, এই যে শোনেন আপনের স্বামী একটা খারাপ জায়গায় আটকা পড়িচে। জ্বে, জ্বে, বাড়ি থেইকে লোক পাঠান, লোক না আইলে তারে ছাইড়ে দিবো না। আরে রাখেন, বছরে দুই তিনবার কইরে আসে এই লোক...
ফোন কানে জয়ন্তর বাকি কথাগুলো আর শুনতে পায় না সোহেল। ওপাশ থেকে ইথারে কী কথা ভেসে আসে তাও শুনতে পায় না। শুধু বুঝতে পারে আজকের পর এই ‘বাবা’ নামের মানুষটাকে আর কোনোদিন দেখতে পাবে না ও। আচ্ছা, বাবা আর যদি কোনোদিন এখানে না আসে, কী আশায় বাঁচবে তাহলে ও, কী আশা নিয়ে মা ঐ লোকগুলোকে নিতান্ত অনিচ্ছায়ও ঘরে নিয়ে আসবে আর অপেক্ষা করবে একটা ভালো দিনের? সোহেল ভাবতে পারে না, ওর এই দশ বছরের মাথায় এই প্রশ্নকে জগতের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন বলে মনে হয়।
ঘরটাকে ওর সত্যি দোযখ মনে হয়। সোহেলের মনে হয় এই জাহান্নাম ছেড়ে ও আবার পালিয়ে যায় বাদুরগাছার বাঁকটার কাছে। না, না- বাদুরগাছার বাঁক বড্ড কাছে, সেই বাঁক ছাড়িয়ে আরও অনেক অনেক দূরে চলে যাবে ও। এমন কোথাও যাবে যেখানে কেউ ওকে চেনে না, ও কাউকে চেনে না। যেখানে কেউ ওর কাছ থেকে প্রিয় মানুষগুলোকে কেড়ে নিতে পারবে না।
এতক্ষণ বিছানার কোণে গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকা সোহেল এবার উঠে দাঁড়ায়, ঘরের অসমান মেঝের সবটুকু জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা শরীরগুলোর ফাঁক গলে দেয় ভোঁ দৌড়। এই দৌড় কোথায় গিয়ে থামবে জানে না এক বেলায় হঠাৎ অনেকখানি বড় হয়ে যাওয়া সোহেল নামের ছেলেটা।