ভুল সবই ভুল

ঊষসী ভট্টাচার্য


আমাদের বাড়ির সামনে বাগান ছিলনা । বাগানে ফুল ধরেনি । রোদে বাবা আমার মাথায় ছাতা ধরেনি কখনো। রোদ্দুর চড়চড় করে মাথায় বাড়লে , বাবা ভেজা গামছা এনে দিতেন ।
যে চেয়ারে বসে দাদাই জপ করত , সেই চেয়ারে বসে বাবা ছাত্রদের পড়াত । আমি কাছে গেলে
বলেছেন - এই নাও এই সিংহাসন তোমারি জন্য , মা ।
বাবা আমায় কখনো বকেন নি । আদর করেন নি প্রকাশ্যে , স্নেহ দিয়েছেন পর্যাপ্ত ।
মা বলেছেন বারবার - এভাবে মেয়েকে মাথায় তুলনা , মেয়ে বখে যাবে , ভুল করছ ’
বাবা বলেছে বেশ তো , ভাল ।



আমরা অনেক ছোট বেলার বন্ধু , বোধহয় সেই জন্ম থেকেই । ভারি দস্যি মেয়ে । আমার চেয়েও দস্যি । নাম দুষ্টু । বাড়ির সামনের উঠোনে নেচে বেড়াত । দু’পাশে দু বিনুনি , চোখে চওড়া কাজল। ধেবড়ে যাওয়া কাজলের টিপ। বিড়ালের পিছনে মিউ মিউ করে , দৌড়ে বেড়াত । পাশের বাড়ি রেখা কাকিমা , ওকে বাঁদরী বলত ।
ও আর আমি একসাথেই বড় হয়েছি । ওর প্রেমিক ওকে বাঁদরী বলেই ডাকে । যেদিন কষ্ট পেত ,
কাঁদত খুব ।
সারা আকাশ বলত – ‘ ভুল করলি , বাঁদরী কি কাঁদে , দাঁত খিঁচিয়ে ভেঙায় ’
ও বলল - বেশ তো ভাল ।


শ্যামনগরের মেয়ে , নামটি কমলা ।
ছিল ,
ভুল ই বোধহয় ,
সেই যে বেরলো ছেলেটার সাথে ,
এরপর ওকে ওরা চামেলী নামে ডাকে,
বিজন দা দেখেছে ,
দাঁড়িয়েছিল রাস্তার মোড়ে ...


সুজাতা দেবীর গান ,
‘ভুল সবই ভুল
এই জীবনের পাতায় পাতায় ... ’
ছেলেটি মান্না কন্ঠী ছিল , গান গাইত বেশ ।
একবার গান গাইতে গিয়ে আলাপ সুরমার সাথে ।
বিয়ে হোল ধুমধাম করে ।
বাসরে ওরা গান গাইল –
‘ কে প্রথম কাছে এসেছি ’
অষ্টমঙ্গলা সেরে রাতে বাড়ি ফিরছিল বাইকে ,
গাইছিল

‘ এই পথ যদি না শেষ হয় ’
একদল ছেলে ঘেরাও করল ওদের ।
সরমা, রেপড হোল ।
ছেলেটি হোল খুন ।
পাড়ার সবাই বলল –
‘অত রাতে ওভাবে বাইকে ফেরে , খুব ভুল হয়েছে ’



রঙ বদলালো সংস্কৃতির , শহরের , পতাকার ।
রতন দা এম .বি .বি ।এস
চাকরী পেল না ।
নমিতা কাকিমার ভাই ,
টেন পাশ । এখন উচ্চপদস্থ সরকারী অফিসার ।
অবসর নেবে এই বছর , ( পেটে কিল দিলে সুরকী সিমেন্ট ও বেরবে না ) ...
ভোট জেতার দিন , সারারাত পাগলু বাজলো ,
হারল যারা , তারাও ‘শিলা কি জবানী’ ...
দেবু কাকু, বাবাকে বলল –
‘ভুল হোল বুঝলি কালি , মাউন্টব্যাটেন খারাপ কী ছিল ??’



বড় দিম্মার রোগ হয়েছিল ।
কি রোগ তা জানতে দেয়নি দাদান ।
আলোপ্যাথি , নাকি ধর্ম বিরুদ্ধ ।
মামা রা কিছু করেনি , বলেছিল
‘বাবা চাইছে না , কি আর করব ’
আমরা জানতাম , মামা রা খুশি । টাকা খসছে না।
দাদান জানত, ব্যাঙ্কে দশ হাজার আছে, তাতে শ্রাদ্ধ হয় ।
চিকিৎসা না। বড় দিম্মা বিনা চিকিৎসায় পচে মরল, দু’ বছর বাদে।
দাদান কিছু বলল না । নীরবে চোখ মুছল।
ঠাকুরের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে বলল –
‘ভুল করেছি, ক্ষমা করনা’ ।


রেডিওতে প্রায় শুনি বাজে ,
‘ ভুল সবই ভুল ’
অভিধানে ঠিক বানান টা পাওয়া যায় ,
সংজ্ঞা টা জানিনা ,
বলতে পারেন কী ??