মুন্নী এখন কী করবে?

তমাল রায়

একটা পুরুষ হাওয়া আপাতত ঢুকে পড়েছে তাহার ঘরে,সে এখন কী করবে? এই যে রাশি রাশি স্তুপাকৃত বই। এর মধ্যে সন্ধ্যের পর সে ডুবে যায়। স্কুল থেকে ফিরেই। রীনাদি হয়ত শপিং এ যায়। মধুরিমা ফুল মিষ্টি কেনে। বাড়িতে গোপাল ঠাকুর! প্রজ্ঞা যায় প্রেম করতে। সে কোথাও যায় না। যেতে তার ভালো লাগে না ,তাই যায় না। ব্যপারটা ঠিক তেমন নয়। তার সময় নষ্ট মনে হয় পুরোটাই। তার চেয়ে বই পড়াই ভালো। তাই সে চা খায়,বই পড়ে। বুলাদি এসে রুটি তরকারি সামনে এনে ধরে। সে রুটি খায় তো তরকারি ভোলে। তরকারি খায় তো রুটি ভোলে। এভাবেই তার সন্ধ্যের জল খাবার শেষ হতেই চলে যায় পাক্কা দু ঘন্টা। কারণ ,ওই যে বই। আপাতর উপুড় হয়ে খাটে। গাউন নীচে নেমে গেছে। উঁচু হয়ে আছে হাঁটু থেকে ফর্সা পা দুটো। একটা নামছে,একটা উঠছে। সে বই পড়ছে। একটু আগে শেষ করেছে একোর ইন দ নেম অব রোজ। রুদ্ধশ্বাস থ্রিলার। তাই একবারও চোখ সরানো যাচ্ছিলো না। এখন পড়ছে একটা পেপার ব্যাক বই। তিতিরের নৌকো যাত্রা। লিটল ম্যাগাজিনের লেখক। তা হোক। মা এসেছিলো দুবার ডাকতে। কি কি সব যেন আনতে হবে। ডেকেছেন ও,মুন্নীইই...
সে শুনতেই পায়নি। মা বেরিয়ে গেছেন। পরে এসেছিলো বুলাদি,গ্যাস ফুরিয়ে গেছে বলতে। কানে যায়নি। আপাতত সে বই পড়ছে। পড়ছে মানে গিলছে। দেওয়ালের ক্যালেন্ডার থেকে তাকিয়ে রণচণ্ডী কালী’মা। জিভ বের করা। তিনিও কি হাসছেন,মুন্নী ওরফে লাবনীর এই পড়া থুড়ি বই গেলা দেখে...?

একটা পুরুষ হাওয়া আপাতত ঢুকে পড়েছে তাহার ঘরে,সে এখন কী করবে? তার স্কুল খুব দূরে না। কাছেও না। ২৪০ নম্বর বাস ধরে কিছুটা যাওয়া,তারপর অটো,তারপর রিক্সা,তারও পর হাঁটা। শহরতলী নয়। শহরই। তবু...ফেরাও ঠিক একই ভাবে। লাবণী ছত্রিশ ছুঁই ছুঁই। সাজেনা যে তা ঠিক নয়। তবে সাজার জন্য বরাদ্দ তার সাড়ে চার মিনিট। বাকি ৩০ সেকেন্ডে দক্ষ হাতে সে ,আঁচল ঠিক করে। কোলিগরা অনেকেই বলে,তোমার চোখ দুটো খুব সুন্দর। একটু কাজল বোলালে কী হয়! সে হাসে। উস্কোখুস্কো চুল,হাতে করেই ঠিক করে। মধুরিমাদি কত বার বলে একটা চিরুনি রাখতে পারিস না? হাতে নোনা থাকে। অতবার হাত দিলে চুলের ক্ষতি হয়। কিনেও দিয়েছিলেন ম্যস্টিক ফাইবারের একটা চিরুনি কোথায় ফেলেছে কে জানে! জানলা বন্ধ। এসি চালায়নি। ঘরে ভ্যাপসা গন্ধ। এই গরমে কি করে পারো দিদি,বলে বুলা’দিই এসিটা চালিয়ে দিয়েছে। সে অবশ্য জানেনা। এসি চলছে না ফ্যান। এমন কি লেখা? কী এমন লেখা! এত বুঁদ হবার মত,কে জানে!

একটা পুরুষ হাওয়া আপাতত ঢুকে পড়েছে তাহার ঘরে,সে এখন কী করবে?
কারেন্ট গ্যালো। বুলাদি চলে গেছে। দরজা খোলা সদরের। সেটা দিতেও তো যেতে হয়। মা'র হাঁটুর যা অবস্থা,তার পক্ষে সম্ভব না। তার অবশ্য হুঁস নেই! মোবাইলের টর্চ জ্বেলেই পড়ছে...

নীলুর শ্রাদ্ধ করছেন মা। সেই নীলু,যে নকশাল আমলে ঘর ছেড়েছিলো। মা কেবল প্রতীক্ষা করতেন। ক'দিন আগে নীল আমস্ট্রং মারা গেলেন। সেই পেপার কাটিং দেখে ঠাট্টা করতে এসেছিলো গ্রামের এক পাজি ছোঁড়া। মা'র তখন চোখের আর প্রায় দৃষ্টি নেই। তবু সে কথা শুনেই অপেক্ষায় অপেক্ষায় হা ক্লান্ত মা,শ্রাদ্ধ করাই স্থির করেন,ছেলের। শ্রাদ্ধ শেষ। মা আবছা দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে পূর্ণিমার চাঁদের দিকে। নীলু ওরফে নীল আমর্স্ট্রং তো চাঁদের দেশেই...
এবার মা আর থাকতে না পেরে মুন্নীকে ধরে ঝাঁকিয়ে দিলেন। কিছু কথা তো তারও থাকে। সারাদিনে বলবেন’ই বা কাকে! অবশেষে মুন্নী উঠলো। নীচের দরজা লাগালো। মা'র সামনে এসে বসলো এমার্জেন্সি জ্বালিয়ে। মা বললেন জানলাটা খুলতে পারোনা? এই ভ্যাপসা গরম। উফফ! কী করে থাকো তুমি?
মুন্নী জানলা খুললো।

একটা পুরুষ হাওয়া আপাতত ঢুকে পড়েছে তাহার ঘরে,সে এখন কী করবে?
রাতের খাওয়া শেষ করতে করতেই মা হাতের খামটা দিলেন। কোর্টে হাজিরা দিতে হবে। তারিখ পড়েছে। মুন্নীর পুরুষে এলার্জি,এ কথাটা মুন্নী না,কোলিগরা বলাবলি করে। কেন কে জানে। অবশ্য একটা বিয়েও করেছিল সে। পাত্র খুব মন্দ না। মারতো ধরতো খুব,কে জানে! গায়ের জোরে সেক্স করতে চাইতো স্বামী? জানে না কেউই। অন্য এফেয়ার ছিল স্বামীর? তাও কেউ জানেনা। মা কেবল জানলেন,যেদিন মুন্নী ফিরে এলো বাপের বাড়ি। বহু জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন মুন্নীকে। সে কিছুই বলেনি। কেবল উত্তর করেছে,কেন মা,মেয়েদের কি পুরুষ লাগেই? একা থাকতে পারেনা? এর উত্তর মা'র অবশ্য জানা নেই। একবার লুকিয়ে কেবল ফোন করেছিলেন জামাই অরণ্যকে। বাবা ঠিক কি হয়েছে বল তো? অরণ্য উত্তর করেছিল,আপনার মেয়ের কাছেই জানুন। আগে অরণ্য মা,তুমি বলত। সেটা ‘তুমি’ থেকে ‘আপনি’ হয়ে গেছে দেখে আর মা ঘাঁটাননি। একবার আলো জ্বলে চিরিক মেরে আবার নিভলো। আজ কপালে দুঃখ আছে! হায় কপাল!

একটা পুরুষ হাওয়া আপাতত ঢুকে পড়েছে তাহার ঘরে,সে এখন কী করবে?
মা খামটা দিয়ে বলতে গেছি…
মুন্নী পড়ছে 'নাটক'। স্তানিস্লাভস্কি দিয়ে শুরু,অল্প কিছু লাইনের গল্প। শেষ হচ্ছে গল্প,
“ছবিটা ফুলপিসির। নীচে লেখা,
এত অক্ষমতা, তবু এত ভালোবাসো।
- তোমার অপু
১২ফাল্গুন,১৩৫৮”
মুন্নীর বুকের ভেতর কেমন একটা চিন চিন করছে। কেন কে জানে! জানলার দিকে তাকালো মুন্নী,আশপাশে সমস্তটাই অন্ধকার। চার্চের ঘড়িতে বারোটার ঘন্টা বাজছে। মুন্নী এখন পিঠে বালিশ দিয়ে পড়তে বসার আগে,একবার কোর্ট থেকে আসা ডিভোর্সের মামলার কাগজটা হাতে নিলো। দেখতে ইচ্ছে হল না। রেখে দিলো। একটু জল খেল। ফের বইয়ে চোখ রাখলো।

মুন্নীর চোখ এখন ভারতবর্ষ ২০২০ পেরিয়ে, ‘সুজনের পাটিগণিতে’...
সুজন আর তার কন্যা পিউ ফিরে এসেছে,তাদের পুরনো বাড়িতে। স্ত্রী কবেই ছেড়ে গেছে সুজন আর পিউকে। সে এখন অন্যের গৃহিণী। আর বাপ বেটি ফিরে এসেছে সুজনদের পুরনো ভাঙা বাড়িটায়,যেখানে ফ্ল্যাট হবে। রাতের অন্ধকারে বাপ বেটি গিয়ে বসেছে,সেই পুরনো চৌবাচ্চায়,যাতে মাছ পুষতো সুজন। দুজনে গিয়ে বসলো সেই ভাঙা চৌবাচ্চায়। চল্লিশ পেরনো সুজনের নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে। নোনতা রক্ত। মেয়ে জিজ্ঞেস করল মাছ কই? ও'মা দেখে বাপ ডানা নাড়ছে। লেজ ঝাপ্টাচ্ছে,আর বুড়বুড়ি কাটছে...

মুন্নীদের এমন চৌবাচ্চা আজও আছে। মুন্নীও আগে মাছ পুষতো ওই চৌবাচ্চায়। মুন্নীর হঠাৎ ইচ্ছে হল চৌবাচ্চার জলে গলা ডুবিয়ে বসতে। এই বইটার লেখক কি হাত গুণতে জানে? মুন্নীকে নেশায় পেয়ে বসেছে,আজই শেষ করবে বইটা। হঠাৎ মুখটা তেঁতো কেমন যেন। সুজনের জন্য মন কেমন করছে? যাহ! তাই আবার হয় নাকি। নিজেকেই একটা চড় লাগালো মুন্নী! ধুর! উঠে গেল। বাইরের আকাশটা ঘন লাল। ঝড় উঠবে না'কি? ফিরে এলো বইটার কাছে। নীচের ঘর থেকে থালা বাসন পড়ার শব্দ এলো। সুজন নয় তো? উফফ আবার ঠাস করে চড়ালো নিজেকে। বেয়াদবি করছে আজ অন্য মুন্নীটা। কেন কে জানে! ওহ এতো সেই ইঁদুরগুলোর কাজ। উফফ! এবার হাসি পেলো।

কি ভেবে মুন্নী বই এর টাইটেল পেজ ঘাঁটছিলো। ঘেঁটে বার করলো লেখকের ফোন নাম্বার। টেক্সট টাইপ করতে শুরু করলো। তারপর ডিসকার্ড করতে গিয়ে সেভ হয়ে গেল অজান্তেই। বইতে মন দিলো। বাইরে তখন ঝড় উঠেছে। জানলা দিয়ে হু হু করে ঠাণ্ডা হাওয়া ঢুকছে। ক্যালেন্ডারের মা কালী উড়ছে,মুন্নীর চুল উড়ছে। অজানা,অচেনা লেখকের গল্পগুলোও উড়ছে এই ঘরের বাতাসে। মুন্নী এমার্জেন্সি জ্বালিয়ে পড়ে চলেছে,'মা' গল্পটা। শহরে প্রথমবার ট্রেন আসায় মা দেখতে গেছিল সেই ট্রেন,সেই ট্রেন দেখতে। চোখ বড় বড় করে অবাক বিস্ময়ে হাঁ করে মা তাকিয়েছিলো। তারপর মা’র মুখের ভেতর কি করে যেন ঢুকে গেল ট্রেনটা। আর মা হয়ে গেল একটা গোটা ট্রেন। শেষ হচ্ছে গল্প,একটা ভুল সিগনাল,আর মা,না'কি ট্রেন,সমস্ত শরীর ছাপিয়ে রক্ত বেরোচ্ছিল সেদিন। কেমন গা গুলিয়ে উঠলো মুন্নীর। ফোনটা আবার হাতে নিলো,না পাঠানো টেক্সটটা পাঠাবে ভাবলো। না,আগে মা'কে দেখা দরকার। মা কেমন আছে? হাঁফাতে হাঁফাতে,মার ঘরে গেল। মা ঘুমোচ্ছে। ঘুমোচ্ছেই তো ঠিক? নাকের কাছে হাত রাখলো। নিশ্বাস পড়ছে,তবু মা’কে ঠেলে তুললো। মা,মা তুমি ঠিক আছো তো? মা ধরমর করে উঠে বসলেন। মুন্নী কাঁদছে। মা তাকে জড়িয়ে ধরতে যেতেই,দমকা ঝড় ঢুকলো ঘরে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। মা জানলা দরজা সব দিয়ে দাও। আমার ভয় লাগছে খুব। মা থতমত খেয়ে জানলা বন্ধ করলো। দরজাও। মুন্নীর খাটের ওপর রাখা বইটার পাতা উড়ছে,মা ওটা সরাতে গেলে মুন্নী চিৎকার করে উঠলো,না না মা ওটা ওখানেই থাক। মা কিছু বুঝলেন না। জানলাটা কি করে যেন আবার খুলে গেছে। হাওয়া ঢুকছে প্রবল,সাথে বৃষ্টিও।

একটা হাওয়া আপাতত ঢুকে পড়েছে তাহার ঘরে,মুন্নী এখন কী করবে? আচ্ছা হাওয়ার কি আদৌ কোনো জেণ্ডার হয়? ধর নারী বা পুরুষ? মুন্নী এমন করছে কেন?