তুমি আমি ঝরে যাই পৌষের লাল কুয়াশায়

সালমান সাদ

সাতরং মাছরাঙ্গাটি উড়ে এসে বসলো আমার পাশে।
বাতাসের পট থেকে কিছুটা নীলচে সুরমা নিয়ে সে মাখিয়েছে তার লাউডগার মতো কচি অঙ্গে।
এতক্ষণ আঙুলের মাথায় মাথায় নাড়িয়ে চারিয়ে খেলছিলাম যে ইটের ছোট টুকরারাটা নিয়ে, তা পানিতে টুপ করে ছুঁড়লাম।
একটু পানি দুললো, এপাশ ওপাশ কাঁপলো,
কলার ভাসমান ভেলাটি মৃদু নড়ে উঠলো, পরিবেশে একটা চকিত আন্দোলন হলো, তবু মাছরাঙ্গাটি আমাকে লক্ষ্যই করলোনা— এমনভাবে সে এক্কাদোক্কা চালে একটু উঠলো, একটু ঘুরলো, হঠাৎ লেজ দুলিয়ে নাচলো।

আচ্ছা, ও—ই কি আগে আমার মনোযোগ চাইছে ওর দিকে?

মাছরাঙ্গাটির দিকে আমার চোখ গিয়েছে, কিন্তু ধ্যানের আলো এখনো পড়েনি।

কী সুন্দর এক চলনবিল আমার সামনে
কী বিশাল সে
টলমল জল
দুধের নদীর মতো মৃদু স্রোত
শান্ত।
কোষা নৌকা একা একা বেয়ে চলে যাচ্ছে জিরজিরে হাঁড়ের বৃদ্ধ।
কচুরিপনার উৎপাত নেই। কিছু পঁচা কাঠের গুড়ি, কিছু প্লাস্টিকের পুতুল, সুদূরে উচ্ছেদিত পানার দুচারটা আগমান লতা— সবাই মন্থর মন্থর ভেসে ভেসে কোথায় জানি যেতেছে চলে।

চোখের অগাধ সামনে বিস্তৃত দৃশ্যপটজুড়ে নদীর ওই কুল, তার গা-ভর্তি ঘন শ্যামলিমা — বৃক্ষের।
একটা গ্রাম, জনবসতি তার ভেতরে, তবুও মনে হয় একটা গাঢ় রহস্যময় গভীর অরণ্য ওই তীরে।

আমি তখন নদীর পায়ের কাছে নতজানু হয়ে বসে চোখ দিয়ে চুষে নিতে চাইছি পান করে ফেলতে চাইছি সবটুকু নদী...
চোখে আমার কী ব্যাকুল তিয়াস
কত দেখব কত দেখব কত দেখব জগতের এত বিপুল রূপ, এ সৌন্দর্যের সুধাপাত্র কেন ফুরায় না কেন ফুরায় না...
প্রকৃতির এত এলাহি আয়োজনের মধ্যে সামান্যমাত্র মাছরাঙাটির দিকে আমার মনোযোগ তাই আকর্ষিত হলো না। কারণ হয়ত সে — পরে বুঝেছি— নদীর চিত্রর ভেতর থেকে প্রকৃতির একটি অংশ হয়ে আসেনি।
সে এসেছেলো একজনের দূত হয়ে।

২.
জগতে প্রাণের সংখ্যা যেমন অসংখ্য, পাখির সংখ্যাও তেমনই অগুনতি। এঁদের কত জাত কত ধাত কত বর্ণ কত কর্ম কত নাম কত ধাম — উসতক নাগাল পাওয়া সব মানুশের কল্পনার কম্মও নয়।

আমি এই সমস্ত পক্ষীকূলের বিচিত্র সব জবান জানা কোবিদ।
মাছরাঙাটি আমাকে বললে;

ঘাড়টি ঘুরিয়ে ডান দিকটিতে একবার তাকিয়ে দেখেন না ভাই—কী!

আমি তাকালে যা দেখলাম, একটি শ্যামা মেয়ে, এঁটো বাসন-কোসন মাজতে বসেছে প্রবহমান নদীর জীর্ণ ঘাটলায়। শরীর জড়োসড়োভাবে নোয়ানো, মাথায় পুরনো কাপড়ের ঘোমটা মুখের চারপাশে ঘিরে কেমন একটা সলাজ পর্দার প্রতিবেশ করেছে।
আমার দিকে কেমন করে চোখ ঘুরিয়ে একবার পলক শুধু তাকালে,তাকিয়েই রইল, চকিতে আবার কাজে মনোনিবেশ করলো , আমার মনে হলো... মনে হলো...আমার মনে হলো এতক্ষণ নিবিড় আরাধনা করে এই যে নদীর মাতাল সৌন্দর্য পান করতে চাইছি — তার সবটুকুই ওই মেয়ের চোখ দুইখানিতে লেপে দেয়া। কী একটা বুক ঝিমঝিম ভাব মাথায় শরীরে চড়ে বসলো আমার।

হঠাৎ আবিস্কৃত হলাম, আমি মেয়েটির সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছি, আমি আসিনি, আমাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে কেউ, আমার শরীরে কোথাও তীব্র ব্যাথা লেগেছে, আমি গুলিবিদ্ধ পাখির মতো ঝরে পড়তে চাইছি, একটা অদৃশ্য বলয়ের শক্তি চাপ ধরে রাখছে আমার দেহের ভারসাম্য, আমাকে মাটির কাছে পড়তে দিচ্ছেনা।

ওই শ্যামলা মুখের দুইচোখ আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, কী যেন আছে এক তীব্র জাদু সম্মোহন, ভালো লাগার শান্ত আবার অশান্ত তন্ময়তা, কেমন আরামে মনে হয় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছি৷

মেয়েটি পরে আছে একটি পোষাক মাছরাঙার।
কী রঙ আর বর্ণের বাহার তার।
অবিকল ওরকম দুটো ডানা। যেন অশ্রুত কোন মিথের জগত থেকে নিয়ে আসা এই জামা, ঐশ্বরিক দর্জির বানানো সে পোষাক, যার হুবহু বর্ণনার মতো ভাষাদখল — হে পাঠক! আমার নেই।
শত শত মাছরাঙা পাখি মেয়েটার চারপাশে জড়ো হয়ে আছে পোষা কবুতরের ঝাঁকের মতো। সে খেলা করছে তাদের সাথে, হাসছে, মাঝেমাঝেই ছিটোচ্ছে চারপাশ জুড়ে সমবেত শত শত মাছরাঙাদের জন্য
অলৌকিক খাদ্যকণা। যেনবা তার হাত থেকে ছুটছে অনেক আলোর কণা।
আমিও ধরতে চাইলাম পাখিদের মতো করে সে খাবার, তখনই অদ্ভুত কলরব, একশত আটটি মাছরাঙা আমাকে বললো, আজ চলে যান,

"দোকান বন্ধ হয়ে গেছে"।

মসজিদে মিনারের আল্লাহু আকবারে ঘুম ভাঙলো মন্দির পুরুতের, বেজে উঠল সন্ধ্যা-পুজোর ঘন্টা, বাতাস বিহ্বল হলো ধূপের প্রথম ও দ্বিতীয় গন্ধে, বিষণ্ণ সূর্য গলে যেতে থাকলো যেন আঠালো নদীর জলে, মেয়েটিকে ঘিরে মাছরাঙাদের জটলা একসাথে উড়াল দিয়ে পেরিয়ে গেলো আকাশগঙ্গা।
মেয়েটিও মায়াবী কুহকের মতো নড়ে উঠলো, জাদুর দেশের কন্যার মতো সে হেঁটে গেলো না ভেসে ভেসে গেলো, বোঝা গেলোনা— আবার একান্তই মানবীয় রূপে মেয়েটি বিলের দুইপাশঘেঁষা হিন্দু-সমাধিগুলোর বড়ো বড়ো স্মৃতিস্তম্ভের আড়ালে অদৃশ্য হতে থাকলো।
আমি নড়তেই পারলাম না, পা দুটি যেন বাঁশের খুঁটি হয়ে গেছে, আমি মেয়েটিকে ডাকতেই পারলাম না,আমার মুখগহ্বর কেমন ফাঁকা লাগলো, জিহবার অস্তিত্বটা যেন নাই হয়ে গেছে, কোন স্বর বেরোয়না মুখ থেকে।
দেখতে দেখতে কখন সমগ্র আঁধার নেমেছে, চরাচরব্যাপি জমেছে বিস্তৃত কুয়াশা, শীত তার হিমাক্ত দাঁত দিয়ে চামড়ায় আঁকছে অদৃশ্য ক্ষত।

হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেয়ে দেখি কোথাও কেউ নেই। অপরিচিতা মেয়েটি আমার মনের ভেতর রেখে গেছে তার আপন পালক। সেই পালক — থেকে থেকে বুকের ভেতরে বিরহী হাওয়া জাগাচ্ছে।

৩.

আমি পটুয়াখালী জেলার এই মূল সদরে, সরকারী পাওয়ার হাউজ মসজিদে ইমামতির চাকরি নিয়ে আসার সেই কোমল ভোরটিতে, কয়েকদিন আগেরই কথা — আমি এই শহরে নতুন — লঞ্চ থেকে দুইহাত পিঠ কোমরভরা গাট্টি বোঁচকা নিয়ে একটা অটোরিকশা ভাড়া করে মসজিদের ঠিকানায় যেতে যেতে রাস্তার দুপাশে কতকিছু দেখলাম, দেখতে দেখতে হঠাৎ দেখলাম একটা অদ্ভুত কবরস্থান, এমন গোর কখনো দেখিনি আমি, বেশ বিরাট একটি স্থানজুড়ে, কিন্তু অবাক হলাম তার একটি ব্যাপারে।
প্রতি কবরে এক গজ দু'গজ তিনগজ উঁচু, চূড়ো করে বানানো স্তম্ভ।

মুসলমানদের কবর তো এরকম হয় না, আমি দেখিনি কখনো, কাঁচা মাটির হয় সাধারণত, মূর্দার ধনী আত্মীয়রা কেউ কেউ কবর পাকা করিয়ে দেয় বটে, তাও ওরকম চূড়া করে স্তম্ভের মতো করে হয়না, বড় জোর একদেড় হাত উচ্চতা, চারকোণা বক্সের আকারে, কবরের চারপাশটাই শুধু বাঁধিয়ে দেয়া, কিন্তু এইরকম ধরণে কখনোই না।
কী আশ্চর্য, এখানের মুসলমানরা কি তাহলে নতুন কোন ফেরকার?

তখনও জানতাম না এটা যে হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকা।

বিকেলবেলা গতরে হাওয়া লাগাতে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যখন কাছ থেকে জায়গাটা আবার দেখলাম, স্তম্ভগুলোর গামোড়ানো টাইলসে দেখলাম দেব-দেবীর ছবি, হরে হরে হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে রাম...
তখন অনুমানটা স্পষ্ট হলো। আরেকটা খটকা এলো, কারণ আমি জানতাম হিন্দুরা তাদের মড়া কবর দেয়না, শ্মশানে পোড়ায়।
তাদের লাশ কবর দেওয়ার নিয়ম আছে বলে তো জানিনা।

স্থানীয় একজনকে জিজ্ঞাসা করতে তিনি খোলাসা করলেন, মড়া পোড়ানোর পর তার নাভী ও ছাইভস্মের অংশ স্তম্ভগুলোর মধ্যে বানানো একটা তালাবদ্ধ খোড়লে সংগ্রহ করে রাখা হয়।
কে না জানে, মানুষ স্মৃতিপ্রবণ! বারবার সে স্মৃতির দিকে ফিরে তাকাতে চায়। পরলোকগত আত্মজগণের কিছু স্মৃতিও ইহলোকে অবশিষ্ট থাকুক, যেন কোন মলিন বিকেলে হঠাৎ খুব মন খারাপ করলে কারো, যেন এখানে এসে দাঁড়াতে, ভেবে সান্ত্বনা পেতে পারে, এই তো, এই— এইখানেই আছেন উনি!

সন্ধ্যা হলে দেখি, ছোট ছোট রথের মতো সেই সমাধিগুলো, যার মাথার দিকে একটা গোলাকার লৌহচক্রের ভেতর তামার অক্ষরে বানানো 'ওঁ' ধ্বনির প্রতীক, তার ওপরে একটা তিনদাঁত ত্রিশূল— সমাধিস্থল মধ্যবর্তী প্রকাণ্ড ছায়াদার সেই শতবর্ষী গাছের পাতা গুনছে, আর গাছটাও যেন তাকিয়ে আছে নীচে, নিবিড় প্রযত্নে জড়িয়ে রেখেছে তার সবগুলো সৌধ-সমাধি।
প্রত্যেক স্মৃতিস্তম্ভের — এই যে বারবার স্মৃতিস্তম্ভ স্মৃতিস্তম্ভ করছি, আসল নামটি জানিনা বলেই —
মধ্যে কে যেন এসে জ্বেলে দিয়ে গেছে চারটি করে মনমরা মোমবাতি।

৪.

বিকেলবেলা আবার সেই মেয়েটিকে দেখি।

সিমেট্রিতে এসে হাঁটছিল আপন মনে। আমাকে দেখে, যেন গতকালই আমাদের ঘনিষ্ট কথাবার্তা হয়েছে এমন, অতিচেনা ভঙ্গিতে সে আসতে লাগলো আমার দিকে — যেন গ্রীবা বাঁকিয়ে দুলকি চালে আসছে কোন রাজহংসিনী।
আমারও কোন সংকোচ বোধ হতে লাগলো না। কেনো যেন মনে হচ্ছিল খুব স্বাভাবিক, একে তো আমি হাজার বছর ধরে চিনি। কেন মনে হচ্ছে চেনা, জানিনা জানিনা...

মেয়েটি আমার সাথে সেদিন তার নিজের অনেক গল্প করেছিলো।
বিগত প্রেমের বিগত কামের বিগত গ্রামের বিগত জন্মের মূলত বিগত জীবনেরই সে গল্প।

আমি জিজ্ঞেস করি আপনি মারা গিয়েছিলেন কিভাবে।
সে কিছুক্ষণ মাটির দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ রইলো, দুই নগ্ন হাতে মুখ ঢেকে ফেললো তারপর, এবং তার শরীরে ফোপাঁনোর ঢেউ ভাঙতে লাগলো, সে বলছে
আমার জ্যাঠাতো ভাইয়েরা সেরাতে আমাকে —কান্নার গমকে গলায় আটকানো বাক্যগুলো ছিড়েখুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে যেন —
আমার শরীর ছিঁড়েখুবলে খায় তারা, আর তাদের পাড়াতো বন্ধুরা।

অনেকক্ষণ পর্যন্ত তারপর মেয়েটি কাঁদে। দুহাতে মুখ ঢেকে, জড়োসরো শরীর তার কেঁপে কেঁপে ওঠে বিরহী বাতাসে কলার পাতা দোলার মতো। আমার বুকেও কেমন চিনচিন একটা ব্যথা বাজা শুরু হয়।। মনে হয় মেয়েটিকে ছোট্ট চড়ুইপাখির মতো জাপটে ধরে আমার বুকের গহবরে আড়াল করে ফেলি।
তাকে আড়াল করে ফেলি সমস্ত লজ্জা, আতঙ্ক আর বেদনার থেকে।

(আমি বিরতিগুলো উল্লেখ করছিনা)
সে বলতে থাকে—

কী পাশবিক যন্ত্রণা, এখনও বুঝে উঠতে পারিনা সে রাতে ব্যাপারটা কী ঘটে গেলো কী ভাসিয়ে নিলো হঠাৎ ফুঁসে ওঠা সুনামির মতো।

এই যাদের সাথেই হেসেখেলে আমি বেড়েছি কৈশোরে, কী নিষ্পাপ একেকজন আপন রক্ত, সেদিন তারা কী সাংঘাতিক পুরুষ!

আমাদের তো বিশাল যৌথ পরিবার, এই পরিবারের কোন মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহসও ছিলোনা কারো এই পাড়া তল্লাটের।

আমাকে লালসার কামড়ে রক্তাক্ত করার সুযোগ তারা পেয়েছিলো আমারই বাবা ও চাচাদের গোপন আদেশে, প্রশ্রয়ে।

আমি অসহ্য যাতনায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে মাটিতে পড়ে থেকে দেখলাম, আমার অদূরেই সাজানো জীবন্ত চিতায় লেলিহান অগ্নিকুন্ডলী।
তার ওপাশে আমার কাকা-জ্যাঠারা, হিন্দু গ্রাম-পঞ্চায়েত, তাদের আগুন চকচকে চোখ, হলুদ আলোয় তাদের মুখ জল্লাদের মতোন হিংস্র...

মোসলমানের ধর্ম মেনেছিলাম আর ম্লেচ্ছ-যবন ভালোবেসেছিলাম এক—এই অপরাধ আমার।
জানেন, এত কথা আপনাকে যে বলছি, ও ছিলো আপনার মতোই, শহর থেকে সে আসে, এইখানে, ঠিক এই নদীর ঘাটে ওর সাথে আমার দেখা হতো।

রোকসানাদের সাথে আমার সেই ছোটবেলাকার সখ্য। মনে পড়ে এক সন্ধ্যায়, দশম শ্রেণী তখন, আমি সত্যেন স্যারের বাড়ি থেকে ফিরতে ফিরতে ওদের বাসার পাশ দিয়ে যেতে যেতে; ভেতর ঘর থেকে বেরিয়ে আসা বাতাসে কেমন এক ঘোরমাখা সুরের ইন্দ্রজালে থমকে থাকি কিছুক্ষণ। আমার অভ্যন্তরে কী এক অচেনা আলোড়ন ধীরে ধীরে আন্দোলিত হতে থাকে হাওয়ার সুখ লাগা কলাপাতার মতো। আমি রোকসানার কাছ থেকে জরুরি নোট নিতে হবে ভাব করে ভেতরবাড়িতে ঢুকি।
দেখি, দেউড়িতে সন্ধ্যাকুপির মায়াময় আলো জ্বলছে মিটিমিটি, ঘোমটাবৃতা খালাম্মা টেনে টেনে গাঢ় স্বরে পড়ছেন কী এক প্রাচীন গ্রন্থ।
সেদিন প্রথম জানতে পারি এর নাম কোরান। খালাম্মার পাশে সেদিন অনেকক্ষণ বসেছিলাম। না, তিনি নাপাক নাপাক বলে দূর দূর করেননি তার এবাদতগাহ থেকে। অনেক আদরে কোলের কাছটিতে বসিয়ে চুলে তেল বিলি কাটতে কাটতে তিনি আমাকে শুনিয়েছিলেন মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ কোরানের গল্প।

অনেক অনেক দিন আগের পৃথিবীর কোন এক আঁধারক্রান্ত সমাজে বিচ্ছিন্ন গুহায় ধ্যানমগ্ন জনৈক যুবক...

তারপর কী এক অমোঘ আকর্ষণ জানিনা, মাঝেমাঝেই তাঁর কাছে যেতাম, আলোর কথা শুনতাম, গোপনমন্ত্রের মতো রাতভর আওড়াতাম ইসলামের বিভিন্ন মন্ত্র, শান্তি শান্তি...
কোরান, দিনে দিনে ইসলাম ধর্মের আরো বিভিন্ন বইপত্র পাঠ করতাম আড়ালে, কী অদ্ভুত ভালো লাগায়, জানিনা আমি জানিনা।

রাস্তার এপাশে আমার স্কুল ওপাশে ওর মসজিদ।
আরেকটু দূরে আমাদের মন্দির। একদিন বিকেলে এই নির্জন মাঠে তাকে দেখি ফিরতে ফিরতে, ঘাড়ের ওপর ঘন বাবরি চুলের ঢেউ, মুখভর্তি মোচ-দাঁড়ির পেছনে গম্ভীর কান্তিময় টকটকে ফর্সা সেই কোমল মুখ, ভ্রূজোড়া তরবারির বাঁকানো বাটের মতো।
আমি দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দেখছিলাম তাকে আর সে দেখছিলো সামনে প্রবহমান শান্ত নদীর দিকে।

আমার দিকে যখন চোখ পড়লো তার, একবার তাকিয়ে সংকোচে চোখ ফেরালেও দ্বিতীয়বার কেমন তাকিয়েই থাকলো, আর আমার মনে হতে লাগলো এই বুকে ক্রমাগত বিদ্ধ হচ্ছে মধুর যন্ত্রণাক্লিষ্ট শত শত তীর।

ওর সাথে একদিন কথা হয়। ইসলাম ধর্মের উচ্চতর শাস্ত্রীয় বিষয়সমূহে তার অগাধ জ্ঞান। কবিতাও বলে। গান জানে। বই পড়ে। দিন হতে দিন তার প্রতি মুগ্ধতা আমার কেবলই বাড়ে।
একটা সময় টের পেলাম — আমার যে কোন চিন্তাই কেন জানি শেষ হচ্ছে ওর বলা কোনো কথার সূত্রে গিয়ে।
চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠতো মনের আয়নায় নিষ্পাপ মতো এক মুখ।
একেই বুঝি মানুষ বলে— ভালোবেসেছি।

সবকিছু ঠিক চলছিলো, যদিও ঠিক চলার কথাও না এবং সবকিছু ঠিক চললোও না৷ এক চোখ দু'চোখ থেকে তারপর এক কান দু'কান হতে হতে অনেকেরই জানা হলো ব্যাপারটা।

হিন্দুতে মোসলমানে প্রেম মূলত অনাচার আর আমার হিন্দু সমাজ এ অনাচার কখনও মানেনি, মানবেওনা।
আমরা এই গঞ্জ ছেড়ে দূরে কোথাও নির্ভয়ের দেশে চলে যেতে, ইচ্ছেনদীর ঘাটে নাও ভেড়াতে চেয়েছিলাম।

ব্যাপারটির নিশ্চয়তা নিষ্পত্তির জন্য মুসলমান সমাজের উপস্থিতিতে ওকে তো আর দিনেদুপুরে পাকড়ানো যায়না, তবে আমার ওপর শুরু হলো গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারের কড়া নজরদারি— আমার অজ্ঞাতসারেই।

একটা ডায়েরি ছিলো আমার খুব একান্ত।
ওর-আমার অনেক স্বপ্ন সেখানে তোলা ছিলো, শিকোয় তোলা দামী ঘিয়ের মতোন।
একদিন দেখি আমার গোপন বাক্সটা পুরো ফাঁকা, ডায়েরিটা সরানো হয়েছে।

সেই শীতের রাতে আমি মুসলমান ধর্মগ্রহণের কথা স্বীকার করি পরিস্কার। ওকে ছাড়তেও করি শক্ত অস্বীকার। অনেক নির্যাতন সহ্য করি— কী বেদম মারপিট, শরীরে চাক চাক রক্তের দাগ, বেতের আঘাতে সর্বাঙ্গে দগদগে ঘা, মাছি এসে বসছে, কেউ অষুধ বলছে না।

আমার কেবলই মনে পড়তে থাকলো কী এক মুগ্ধসম্মোহন কোরানপাঠে, কী প্রশান্তি সজদায়...

" পাথর চাপানো বেলালের বুক রৌদ্রে যাচ্ছে গলে
বেলাল জপছে পাথর জপছে আল্লা আল্লা বলে "

৫.

মনে হলো আমার শরীরটা প্রচন্ড একটা ঝাঁকুনি দিলো। একটা পাহাড় কি আমার বুকের ওপর ভেঙে পড়লো? এমন পিপাসা অনুভূত হতে লাগলো যেন পৃথিবীর সমস্ত সমুদ্রের পানিও সেই অসীম তৃষ্ণার কাছে একফোঁটা জলতুল্যও নয়।
তবে এরকম অবস্থা বেশিক্ষণ রইলোনা আমার ওপর।
মেয়েটা হঠাত কাঁদতে শুরু করে।
ওর চোখ দিয়ে যেন রক্তের একটা ফোয়ারা জারি হলো। ওর মুখ সমস্তটা মেখে গেল লালে, রক্তে, ওর পোশাক — রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল ওর গা বেয়ে, চুল চুয়ে চুয়ে। ওর নিটোল ফর্সা পায়ের কাছে জমতে লাগলো রক্তলালের স্রোত। সেই স্রোত মনে হল ভাসিয়ে নিচ্ছে আমাকে, আমার দশ দিক, বালুমাঠ, ধানক্ষেত, শহর-গ্রাম, নদী, নৌকা, আকাশ, অরণ্য সব হাবুডুবু খাচ্ছে কিশোরীর রক্তবন্যায়।
তখন মন্দিরে বেজে উঠলো শঙ্খধ্বনি মসজিদে আজান। মেয়েটি যেন মাছরাঙার ডানায় ভেসে ভেসে যাচ্ছে।
দেখলাম এবার স্পষ্ট হিন্দুসিমেট্রির একশ-চব্বিশতম ফলকের কাছে গিয়ে মেয়েটি গিয়ে দাড়ালো কিছুক্ষণ।
তার পরমুহূর্তেই দেখলাম এক প্রচন্ড আক্রোশিত বিস্ফোরণে চূর্ণ হয়ে গেলেও কংক্রিটের স্তম্ভ। গুড়ো গুড়ো হয়ে তুলোর মতো উড়ে যেতে লাগলো আকাশে।

মনে হলো আমার শরীর থেকে ভারি কিছু একটা পড়ে গেছে টুপ করে ঝরা কুল নদীতে পড়ার মতো করে। কোথাও একটা শেকড় আলগা হয়ে খুলে পড়েছে।
আমি পরে যাচ্ছিলাম। মেয়েটি পরম আদরে তার হাতটি বাড়িয়ে আমার হাত ধরে ফেললো।
দেখি আমিও উড়ছি। আমারও হাতের বদলে গজিয়েছে সবুজ পাখির দুটো ডানা— মূতার শহীদ জাফর তইয়ারের মতোন।
মেয়েটি ডাকছে, এসো আমার, এসো!

আরে তুমি এসো!

তোমার তো যাওয়ার কথাই ছিল আমার সাথে, তোমার হাত ধরে পণ করেছিলাম না, নরকে গেলেও যাব একত্রে!
তুমিই আসলে সেই ইমাম। তুমি এখন সবকিছু বিস্মৃত হয়েছো।
আমাকে জ্যান্ত পোড়ানো রাতে অতর্কিত হামলা হয়েছিল তোমার মসজিদেও।
সকালে অর্ধমৃত পাওয়া গিয়েছিল তোমাকে।
তুমি ভুলে গেছো। সব তুমি সব ভুলে গেছ, অবশ্য ভুলেই তো যাবে। মাথায় তোমার প্রচন্ড আঘাত করেছিলো যে পাষণ্ডরা।
হাসপাতাল থেকে যমে মানুষে টানাটানি শেষে এ যাত্রায় ছাড়া পেয়ে গেলে বটে।
আমাকে হারিয়ে আর সেই রাতের বিভীষিকাময় স্মৃতি মাথায় নিয়ে তুমি সুস্থ বেরিয়ে এলেও বিস্মৃত হয়েছিল তোমার সকল অতীত। ভুলে গিয়েছিলে অতীত জীবনের সকলকিছু। পাগল হয়ে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি ছিলে।

ভাগ্যের কী ফের!

সেই পুরনো চেহারা তোমার, অথচ নতুন মস্তিষ্কের আনকোরা স্মৃতি নিয়ে এলে ভাগ্যের ফেরে পাগলা গারদ থেকে পালিয়ে ঘুরে ঘুরে মুসাফির ফিরলে সেই একই গ্রামের মসজিদে!
তুমি কাউকে চিনলে না। কিন্তু এরা সবাই তোমাকে প্রথমেই চিনে রেখেছিল অনন্যা বালা'র ধর্মনাশক পরিচয়ে।

চেয়ে দেখো নিচে, শ্বাপদসংকুল হিংস্র পৃথিবীতে, যেটা ছেড়ে চলে যাচ্ছো তুমি , দেখো, অন্য পৃথিবী— অনন্তকাল প্রশান্তির দিকে, আলোর দিকে ফুলের দিকে সুরের দিকে, অফুরন্ত প্রাণের দিকে।

সেখানে যেতে যেতে আমি শেষবারের মতো তাকাই অনেক দূরে ছেড়ে আসা ক্ষুদ্র ভূখণ্ডের দিকে। দেখি সেখানে নিথর পড়ে আছে আমার ফর্সা সুঠাম দেহটি। আমার নীল রঙা পাঞ্জাবিটি, আমার তারার জমিন আঁকা কালো শালটি।
এসবের মধ্য থেকে আশ্চর্য হিংস্র এক রক্তঝরণা উৎসারিত হচ্ছে। প্রচণ্ড গর্জনে সেই স্রোত পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে তাড়া করে ফিরছে একদল বিষধর সাপকে।