অ-তে অনুভূতি

রাজিব মাহমুদ

জীবনের ত্রিশটি বসন্ত নিজের দেশে ঝরিয়ে যখন কানাডাতে স্থায়ীভাবে থাকতে এলাম, বুঝলাম নিজের অজান্তেই মনের ভেতর নানা শেকড়-বাকড় গজিয়ে গেছে। বহুদিন আমার আমি’র অংশ হয়ে থাকতে থাকতে আমার সত্তার একেবারে অতলে সেঁধিয়ে গেছে এরা। আর এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী শেকড়টার নাম অনুভূতি।
অনুভূতি বোঝেন তো?
আচ্ছা একদিনের কথা শোনেন--
টরন্টোর সাবওয়েতে সেদিন ভীষণ ভিড়। আমার কম্পার্টমেন্টটা’র দরজা’র কাছাকাছি দাঁড়িয়ে একজন কৃষ্ণাঙ্গ যুবক, কানে হেডফোন। পাশের সিটটিতে বসে থাকা একজন শ্বেতাঙ্গ তরুণীর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সে—ঘেঁষে না বলে বরং বলা ভালো সেঁধিয়ে আছে। কেননা এখানে ওখানে তালি দেওয়া তার রং-জ্বলা জিন্সের প্যান্টের নিতম্বের দিকটা মেয়েটার বুকের ভেতর প্রায় ঢুকেই গেছে।
হেডফোন-উৎসারিত সুরের সাথে সাথে যুবকের সারা শরীরে নানা মাত্রার তরঙ্গ খেলে যাচ্ছে। কিন্তু এই দু’জনের কারোরই যেন একে-অন্যের উপস্থিতি নিয়ে কোনো বিকার নেই। ওরা ভাবছে অন্যমনস্ক থাকার ভান করলেই যেন ব্যাপারটা আমি আর খেয়াল করব না।
আমাকে তো চেনো না চান্দুরা। সুতীক্ষ্ম-অনুভূতির দেশের লোক আমি। তোমাদের মত হাবামি’র ভান ধরে ভালোমানুষ সেজে থাকি না আমরা। নিজেদের অনুভূতি’র কদর করে বাঘের মত ফুঁসে উঠতে জানি।
তো সেদিন আমার অনুভূতি-জাত প্রশ্নটা ছিল এরকম-
ছেলেটির বিকার না হয় সঙ্গত কারণেই নেই (!) কিন্তু মেয়েটার?
হাজার হোক মেয়ে মানুষ বলে কথা! এই পরিস্থিতিতে তার মধ্যে কোনোরকম অস্বস্তি থাকবে না? এটা কোনো কথা হলো?
দাঁত কিড়মিড় করতে করতে দেখলাম শালী’র অস্বস্তিতো নেই-ই বরং কাউলা’র গানের তালে তালে মাথা ঝোঁকানো’র সাথে পাল্লা দিয়ে সে-ও খসখস শব্দ করে পড়তে থাকা বইটা’র পাতা কিছুক্ষণ পরপর উল্টে যাচ্ছে। আর বইটাও মনে হচ্ছে কোনো ন্যাংটা ন্যাংটা উপন্যাস।
আমার এই অনুভূতি-জাত প্রশ্নটার সাথে সাথে অনুভূতি-জাত একটা সুতীক্ষ্ম পর্যবেক্ষণও ছিল আর সেটা হলো-
শালা কাউলা’র বাচ্চা সুন্দরী সাদা মেয়ে পেয়ে চান্সে মজা নিচ্ছে! তবে শালীটাও বেহায়া কম না!
আমার ভেতর থেকে কে যেন বললো--
পুরো ব্যাপারটা’র ভিজ্যুয়াল ও অডিটরি রিদমটা দেখেছেন? হেলতে দুলতে ছুটে চলা ট্রেনের ডিক ডিক ডা ডিক ডিক ডা শব্দের পেছনে জানালার বাইরে একে একে পেরিয়ে যাচ্ছে নিচু নিচু রাস্তা-ঘাট, নানা আকারের ঝাঁ চকচকে নীল-হলুদ-কালো গাড়ি, ছবির মত একলা একলা দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িগুলোর সামনে’র লনের সবুজ ঘাস, নিরিবিলি লেইক, ফুটব্রিজের গা-ঘেঁষা কে এফ সি, টিম হর্টন...আর এসব কিছুর ঠিক কেন্দ্রে ছেলে-মেয়ে দু’টোর শরীরও একটা বিশেষ তাল ও লয়ে দুলছে। যেন এম টি ভি’র কোনো সুররিয়েল মিউজিক ভিডিও।
এসব কাব্য কাব্য দর্শনে আমার মন তো গললোই না বরং ততক্ষণে লাল হতে শুরু করে দিয়েছে আমার কান-
ছিঃ ছিঃ এসব কী? এদেশে রাস্তা-ঘাটে যেখানে সেখানে ছেলে-মেয়ে চুমু-টুমু খায় সেটা না হয় বোঝা গেল। কিন্তু নারী-পুরুষের এমন স্পর্শকাতর দু’টি অঙ্গকে পরস্পরের সাথে এভাবে দলিত- মথিত হতে দেখে আমার ত্রিশ বছরের ভাবনা-মিটারের কাঁটা দিশেহারা হয়ে এদিক-ওদিক পাগলের মতো দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিল।
শুধু তাই না, এর সাথে সাথে আমার অনুভূতির কালো মোটা ও লোহার মতো শক্ত কম্পাসটাকে (প্রচণ্ড রাগে এটার কথা রাগে বলতে মনে ছিল না এতক্ষণ) আমি যতই এদিক-ওদিক নাড়াই না কেনো, নিজের সঠিক দিক-নির্দেশনা দেবার কাজটি ভুলে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ওটা শুধু ছেলেমেয়ে দু’টির দিকেই তাক হয়ে রইল।
আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন এই নির্লজ্জ দৃশ্যে কী নিদারুণ আঘাত লেগেছে আমার অনুভূতি-কম্পাসে!
এ কেমন জঘন্য দেশে আসলাম? এদের কি কোনো ন্যায়-নীতি নেই? নীতি-পুলিশ নেই কেনো পাবলিক প্লেসে? আর সেজন্য নীতি-পুলিশের দায়িত্ব কেনো আমাকে পালন করতে হবে?
আমি রাগে থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে নিজের জায়গা ছেড়ে নির্লজ্জ ছেলে-মেয়ে দু’টি’র দিকে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু একী!
বস্তুটা আমি আমার জায়গায় বসে দেখতে পাইনি। ওদের কাছাকাছি এসে এখন দেখতে পাচ্ছি ওটাকে-
মানবসভ্যতার এই অভাবনীয় আবিষ্কার না থাকলে আজ আমার অনুভূতি-এরোপ্লেনের (আগে যদিও কম্পাস বলেছি। রাগে মাথা ঠিক ছিল না বুঝছেন তো?) ক্র্যাশ-ল্যান্ডিংটা কে আটকাতো?
মনটা হঠাৎ স্নিগ্ধতায় অবশ হয়ে এলো-
ওদের শরীর দু’টোর মাঝখানে চরম চিপা খেয়েও দারুণ ব্যক্তিত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা শক্ত-মোটা-আখাম্বা কাঁচ।