নেপথ্যে

সুমী সিকানদার

দৃশ্যে কেবল তিন জন ছিলো । একজন শান্ত মুখশ্রী। গোলাপি রঙের লুজ ফিট কামিজ এবং সাদা প্যান্ট তার পরনে। তিনি মা হতে চলেছেন। আর একজন পুরুষ পরনে জংলী প্রিন্ট এর টিশার্ট । তার বাবা হবার দায় আছে। এবং আরও আছে একটি সাদা প্রিমিও কার। এই গাড়িটি মূলত জড়পদার্থ হলেও এই গল্পের তার গুরুত্ব অসীম। একমাত্র সেই সাক্ষী ছিলো এই তিনজনের একত্র উপস্থিতির।

গাড়িটি কোন প্রমাণ দিতে পারবে না জেনেই তারা দুইজন প্রাপ্ত বয়স্ক নারী পুরুষ এতে বসে কথা বলছিলেন। কেউ কোন ছবি তোলেননি কিম্বা কোন কথা রেকর্ড করা হয়নি। গাড়ীর বাইরে কয়েক বার পাক খেয়ে ছোকরা বাদামওয়ালা চলে গেছে কেউ তাকে ডেকে পাঁচ টাকার বাদাম নেয়নি। মানসিক অস্থিরতায় বাদাম চাবালে মন্দ হতো না।এছাড়া এই দৃশ্যে আছে তৃতীয়জন যার উপস্থিতি ছিলো লুকানো । বাইরের কেউ পরবর্তী দিনগুলোতে তাকে আর টের পায়নি। কেননা সে অনিবার্য ভাবেই আর আসেনি।


একটি জীবন প্রতিদিন জীবন্ত হতে চায়। তার নেপথ্য হৃদস্পন্দন টের পায় নারীটি। পুরুষ সঙ্গীকে জানায় কেউ আসছে। পুরুষটি তুমুল নিরাসক্ত ভঙ্গীতে তার সদ্য কেনা পাঞ্জাবীর বিবরণ দিতে থাকে যা আড়ং এ মাত্র একপিসই ছিলো। সন্তান বিষয়ক আলোচনা তার ভাললাগেনি , ভালোলাগে না। প্রসংগ পালটায় , দ্রুত ঘামতে থাকে , স্পষ্ট ভয় পেয়ে যায় সে। ভয় পেয়ে জানালার কাচ ভেদ করে বাইরে তাকিয়ে থাকে অসে। বড় সহজেই এক দূরে বসেও এক সমুদ্র দূরত্ব রাক্ষা যায়।


নারীটি করুণা বশঃত তাকে আশ্বস্ত করে । পুরুষটিকে ছেঁড়া খবরের কাগজের চাইতেও জরাজীর্ণ দেখায়। নারী বলে , তার দিক থেকে ভয়ের কিছু নেই। তারা দুইজনই যখন বাকিজনের আরম্ভ চায় না সেই আধা ফোটা জীবন কখনও ফুটবে না । দুমড়াতে বাধ্য। বরং সেটাই সকলের পক্ষে মঙ্গল। আনন্দলোকে মঙ্গল আলোকে।

তাদের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে যায়। গাড়ির মিউজিকটি অকারণ লম্ফঝম্প করে সাম্বা ডান্স করতে থাকে। মানুষ দুইজন ভয়ে কিম্বা নির্ভয়ে বাকি সময়টুকু পার করে। এসির বাতাস শুধু শুধু কিছু জান্তব শব্দ করে তাদের নিরবতায় বিঘ্ন ঘটাতে থাকে।

গাড়িটি পুরুষটিকে প্রথমে নিরাপদে নামায় । আপাত সাহসী পুরুষটি প্রচন্ড ভীতু , তার সত্য দেখার শক্তি কম। কাজেই সে তার পাঞ্জাবী নিয়েই ভাবুক । পাঞ্জাবী তাকে বাইরে থেকে বরাবর সুদর্শন করে । সুদর্শন হাত নেড়ে দ্রুত দৃশ্যের বাইরে চলে যায়।


প্রিমিও গাড়িটি এবার নারীটিকে নামায়। সুনসান ফাঁকা রাস্তা । কিছু জলখাবার এবং সদাইপাতি নিয়ে নারী তার বাড়িতে ফেরত আসে। একটু রাইস এবং ভেজিটেবল গরম থাকতেই খেয়ে ফেলে । চিকেন মুখে দিতেই বমির উদ্রেক হয়। বমি যেন তাকে জানান দিতে থাকে। সময় নিজেই সময় কে মনে করায়।

একটি প্রকান্ড রাত ভেতরে ঢিপঢিপ করা অস্তিত্ব কে নিয়ে ঠায় বসে থাকে। তাকে শোনে। তাকে গোনে। তার জন্য গুনগুন করে। তার জন্য ঘুম ঘুম গান করে মৃদু হাসে। এই সময়ে তারা দুইজন দুইজনকে ভালবাসে।

কেউ কারো মুখ দেখবে না , কেউ কাউকে আঙ্গুলে স্পর্শ করতে পারবে না । একজন নারী তার অনাগত সন্তানকে , তার অপরিণত অবয়বকে কালো রঙের স্লেটে বারবার চক দিয়ে আঁকে আর ডাস্টার দিয়ে মোছে। স্লেটের কালো বিনা প্রতিবাদে ধূসর হয়ে ওঠে। যেন কিছু যন্ত্রণা সেও নিতে চেয়েছে। অনির্দিষ্ট আঁকিবুকি শেষ হলে ভোরের দিকে নারীটি ঘুমায় নিবু নিবু শুকতারাকে জানালার পাশে বসিয়ে রেখে। সে জ্বলুক।


সকালে সাদা গাড়িটি স্টার্ট নেয়। নারীটি সারারাত জেগে থাকা ক্লান্ত শরীর মন এবং দুই চোখের প্রাবল্য মুছে নেয় ঝটপট স্মার্ট টিস্যুতে । তাকে অন্য সময়ের চাইতে অনেক বেশী শান্ত দেখায়। সংলাপহীন গাড়িটি ঢুকে যায় একটি সুদৃশ্য হাসপাতালে ।


অনেক দিন বাদে এক ঘ্যনঘ্যনে রাধাচুড়ায় সয়লাব বিকেলে উক্ত নারী পুরুষ এবং গাড়িটিও ফের একত্র হয়। নাহ গাড়িটি পরের মডেলের ছিলো। ততক্ষনে এই দৃশ্য থেকে বিদায় নিয়েছে অতিরিক্ত চরিত্রটিও।


গাড়িটি এরপর থেকে আর কখনই দুজনের মধ্যস্ততা করেনি । নারী প্রায়ই একাই মাঝরাতের দূরপাল্লার সুরে গুনগুন গায়, তাকে শোনে , অবচেতনে স্পন্দন গোনে, ঝিমায়। মোমের আলোয় কতটুকুই আর কারো মুখ দেখা যায়। স্পন্দন আর কোনদিন ঢিপঢিপ করে না নারীর কানে। অপরিণত স্পন্দনটি ভোরেরবেলার আলাপ ভাল বুঝতো ।