হাসপাতালের স্মৃতি

বিধান সাহা

আগামীকাল সকাল নয়টায় সার্জারি। ভোকাল কর্ড পলিপাস। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে অবস্থিত সিরাজ খালেদা মেমোরিয়াল হসপিটালে। এদিকে বইমেলা দুদিন বাড়ানো হলো। বিগত বছর গুলোয় প্রায় প্রতিটি দিনই বইমেলায় যাওয়া হলেও এ বছরই হাতে গোনা কয়েকটা দিন মাত্র যেতে পেরেছি। কত কত বই ইচ্ছা থাকা সত্বেও কেনা বাকি থাকলো! কত কত আড্ডা আর প্রাণের মানুষগুলোর সান্নিধ্য বঞ্চিত হতে হলো এ বছর! ডাক্তার অভয় দিয়ে বলেছেন, 'এটা তেমন মেজর সার্জারি না। ভয় নেই।' তবু ঘর পোড়া গরুর সিঁদুরে মেঘ দেখলে তো ভয় করবেই! আত্মীয় স্বজন ফোনের উপর ফোন করে তাদের দুশ্চিন্তার কথা জানাচ্ছে। বাবা ফোন করে কথা বলতে বলতে আর কথা আগাতে পারলেন না। বুঝলাম, বেচারা কাঁদছেন। আমিও কথা বাড়ালাম না। শ্রী মেয়েটার আজ জন্মদিন ছিলো। চাইছিলাম যতটা আনন্দে কাটানো যায় আজ সেই চেষ্টা করবো। হেসে হেসে কথা বলি দুজনেই। কথা শেষ হতেই বুঝি একটা দুশ্চিন্তার গোপন আতঙ্ক দুজনকেই আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সেটা বুঝতে পেরেই আবার না বোঝার ভান করে দুজনেই হাসতে থাকি। জানি ঠিক হয়ে যাবে সব। সেদিন আশরাফ জুয়েল ভাইও বলছিলেন, 'ভয়ের কিছু নাই। অনেকটা ডেস্ক সার্জারির মতো।' এইসব কথায় ভরসা পাচ্ছি। রফিক ভাই দোঁআশ-এর জন্য লেখা চেয়ে রেখেছেন। এই শুক্রবারেই দেবার কথা ছিলো। হলো না। কবির কবি হয়ে ওঠার গল্প কি বলা মাত্র লিখে ওঠা যায়! এ তো এক আস্ত উপন্যাসে ধরে রাখার বিষয়। রনি বর্মন ওর বামিহাল-এর জন্য লেখা চেয়েছে। অপ্রকাশিত নতুন লেখা তো নাই। দেবো কোত্থেকে? আমার বন্ধুদের মুখগুলো মনে পড়ছে এই মুহূর্তে। তাদের অন্তরের অমৃত এবং গরল সহ। তাদের প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসা অনুভব করছি এই মুহূর্তে। এই মানুষগুলোর কারণেই বেঁচে থাকাটা টের পাওয়া যায়। আমার শত্রুও তো প্রকারান্তরে আমাকে সচেতন থাকার ব্যাপারেই ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। আমার সেই শত্রুবন্ধুর প্রতিও আমার কৃতজ্ঞতা অনুভূত হচ্ছে। আজ, অপ্রাসঙ্গিকভাবে এসব মনে ভেসে আসছে।

বইমেলার না কেনা বইগুলো আমি অবশ্যই কিনবো ফিরে এসে। যতটুকু পারি পাঠ অভিজ্ঞতাও শেয়ার করার ইচ্ছা আছে। সার্জারির পরে হয়তো কিছুদিন কথা বলা যাবে না। ফলে অনেকের ফোনও হয়তো রিসিভ করতে পারবো না। আমার এই দীনতাটুকু, হে বন্ধু, ক্ষমা করো। ওগো নীরব রজনী, প্রকাণ্ড পৃথিবী, আমি সামান্য ভয় পাচ্ছি। আমাকে আগলে রেখো। আগলে রেখো।

*
অপারেশন ঠিকঠাক শেষ হয়েছে। আগামীকাল রিলিজ দেবে। পুরোপুরি ভয়েজ রেস্টে থাকতে হবে দুই সপ্তাহ। অ্যানেস্থেশিয়া ব্যাপারটা যে পুশ করার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে গেলাম এবং গলার মতো সেনসেটিভ একটা জায়গায় কাটাছেঁড়া হলো আর তা একটুও টের পেলাম না এটাই চূড়ান্ত বিষ্ময়ের এখন অব্দি আমার কাছে।

*
অন্ধকার ঘরে থাকতে থাকতে, রুটিন কাজের চাপে থাকতে থাকতে ভোরের রোদ ব্যাপরটাকেই ভুলে গেছিলাম। আজ, এই হাসপাতালে ভোর হলো। রোদ এসে পুরো রুমটাকেই আনন্দিত করে তুললো। ভেবেছিলাম অনেক বেলা হয়ে গেছে। শ্রীকে ইশারায় জিজ্ঞেস করলাম কয়টা বাজে। ঘড়ি দেখে ও জানালো ছয়টা। ভাবলাম প্রতিদিন ঘুমই ভাঙে সাতটায়। তবু রোদের আলো কিংবা ভোরের আমোদ টের পাওয়া যায় না। অথচ আজ এই ভোরবেলা কী চমৎকার একটা রোদের আবহে একটা আনন্দমুখর ভোর নেমে আসছে। কথা বলতে না পারার হয়তো উপাকারিতা এই। অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলো এর ক্ষমতা গ্রহণ করে আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। উদাহরণ হিসেবে সঙ্গীতের বিদগ্ধ শ্রোতা যেমন গান শোনার সময় কখনও কখনও চোখ বন্ধ করে রাখে।

গত রাতেই বেডে দিয়ে দিয়েছে। অনেকটা আমার চাহিদাতেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চেয়েছিলো রাতটা অন্তত পোস্ট অপারেটিভ রুমেই রাখতে। তাতে অসুবিধা হতো শ্রীর। পোস্ট অপারেটিভ রুমে তো আর সাধারণের থাকার নিয়ম নাই। তাহলে এই মেয়েটা একা একা কোথায় থাকবে? ডাক্তার সাহেব আন্তরিক মানুষ। তাকে বিষয়টা ইশারায় বোঝানোর পরে তিনি বেডে দিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। সঙ্গে ডাক্তারের কড়া নির্দেশ আগামী পনেরো দিন কোনোরকম কথা বলা যাবে না। কিছু বলতে হলে লিখে বা ইশারায় বলতে হবে। পনেরো দিন পরে ফের ফলোআপ করানোর পরে কাজ শুরু করতে হবে। এর মাঝে আগামী সাত তারিখে বায়োপসির রিপোর্ট হাতে আসার কথা।

হাসপাতালের প্রসঙ্গে বলতে গেলেই বড় করে যে স্মৃতিটা সামনে আসে তা হলো আমার মা। তার অরুণ-করুণ মুখখানা। হলদে হয়ে যাওয়া শরীর। একটা শুকনো মুখে ইতস্তত তাকিয়ে থাকা। যেন কেউ এসে সত্যিই বাঁচিয়ে তুলবে তাকে। স্মৃতির এই পথটা খুব কঠিন আমার জন্য। এগুতে পারি না।

শ্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম অপরিসীম ধৈর্য্য আর অভিযোগহীন একজন মানুষের প্রতিমূর্তি। কী দুর্দান্ত সাহস মেয়েটার! একা একা, প্রায় একা একা আমার মতো একজন ভীতু প্রকৃতির মানুষকে সাহস দিয়ে আগলে রাখা, হাসপাতালে নিয়ে আসা। সার্জারির সময় বন্ডসই দেয়া... ওর অন্তরটা কি একটুও ভয়ে কেঁপে ওঠে নাই? অথচ সেই জ্ঞান ফেরার পর থেকেই মিষ্টি মিষ্টি দুষ্টামীতে আমাকে বুঝতেই দিতে চাইছে না যে আমার এবং তার উপর দিয়ে কী প্রবল একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

ভোরের রোদটা হাসপাতালের বারান্দা দিয়ে মেঝেতে এসে পড়ছে। বহু বহু দিন এই রোদটাকে আমি অবসর দিয়ে দেখিনি। বহু বহু দিন আমি এমন রোদে আমাদের গ্রামের জমির আইল দিয়ে হাঁটিনি। এমন রৌদ্রজ্জ্বল দিনে আমাদের গ্রামে শ্যালো মেশিনের উত্তেজিত জলে মাথা ডুবিয়ে স্নান করিনি দলবেঁধে।

কোথাও পড়েছিলাম, মানুষের জীবনে রোদনের দিন শেষে হতেই রোদজ্বলা দিনের শুরু হয়।

পাখি, আমার কণ্ঠভরা গান...