তোমাকে ভালোবাসি জীবনানন্দ # তোমাকে ভালোবাসি না জীবনানন্দ !

রুখসানা কাজল

নৈঃশব্দের ঘর থেকে বেজে ওঠল ট্রামের ঘন্টা।
আজ কিছু তারা বৃষ্টিজলে গলে নেমে আসবে পৃথিবীতে । বেত ঝোপে ভেজা ব্যাঙ ভুলে যাবে সাপের আতঙ্ক। দূর নক্ষত্ররা, সাধ্যের বেশি আলো দিয়ে জাগিয়ে তুলবে মানুষের মন। কেউ কেউ তোমাকে মনে করবে জীবনানন্দ দাস।
ছেঁড়া জুতার ফিতেয় গিঁট বেঁধে কোনো যুবক কবি, আর্ত রাত্রিতে নাগরিক অন্ধ বদ্ধ জলে আর্তি ছড়াবে, অইখানে যেও নাকো তুমি। ফিরে এসো, ফিরে এসো ঘাসমন মেয়ে!
গেল সারা রাত সারা দিন পৃথিবী কেঁদেছে গভীর শোকে। ধূলোমাটি লতাপাতা, নক্ষত্র ও চাঁদের কবি, বিপন্ন অনুভবে জবাবাদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় আমাকেও যখন তখন। আমিই কি তবে তুমি ?
তোমার নিঃসঙ্গতার সবল আকষর্ণে আমি বহুবার ছুটে গেছি আর অনুভবের ঘরে জমিয়ে তুলেছি কালো পারদের মত অনুভূতি। বহতা জল আর অতল স্রোতের নিপুন কারিগরি দিয়ে আমাকে তুমি নদী করে তুলেছ। অবিশ্রান্ত জ্যোৎস্নায় ভরিয়ে দিয়েছ হৃদয়ের ক্ষত। একাকীত্বের ঘুম ঘরে তুমি জাগিয়ে তুলেছ আমার ঘুম ঘোরাচ্ছন্ন ডাহুক মন।
শুক্রবারের ভেজা দুপুরে একটি ঝিনুক খুঁজে ফিরেছিলাম।
শক্ত খোলসের বাহুতে যে আমাকে আশ্রয় দিবে । নিয়ে যাবে স্তরে স্তরে বিন্যাস্ত গভীর জলের নিস্তরঙ্গ নৈঃশব্দে। আমার অস্থিরতার ধার ছুঁয়ে নেমে আসবে হাজার বছরের নিঃশব্দ পথচলা। আমি মগ্নতায় মূক হবো । মেঘের ফাঁদে জলবন্দি চাঁদের মত চেয়ে দেখব, নীচে বহু নীচে ভাঁটফুল, শটিবন, ডুমুরের পাতার ফাঁকে অন্ধকার জাগিয়ে তুলছে আমার হারানো প্রেম।
আমার ঘর ভেসে যাবে মধুমতীর জলে। সংসার জল থই থই। সন্তানের ঘুনসিতে বাজবে নিরুদ্দেশের টুংটাং। আমি পাখি হব। উড়ে যাবো মরকতে মোড়া কোনো দারুচিনি দ্বীপে। তুমি আমার সাথে যাবে জীবনানন্দ দাস। তুমি যে আমিই !
স্বজন আত্মীয়দের মুখে বিতৃষ্ণা মাকড়শার জালের মত ঝুলে আছে। সশব্দে ফেটে পড়ছে ক্ষোভ । আমার রক্তের ঠিকানায় ওদের রক্তের মিল আছে কিনা সন্দেহ ছুঁড়ে দিচ্ছে সুউগ্র রাগে। আমার ডাইনে, বাঁয়ে, সামনে, পেছনে অকাব্যিক কোলাহল । কর্কশ মুখরতা। রাগ ও আর্তনাদের ছিছিক্কার। বংশের মুখ রাখতে না পারার ধিক্কারে আমি ত্যাজ্য প্রায়।
আজন্মের অভিমন্যু আমি। তুমিও । গোলকধাঁধার পৌরাণিক সেনাপতি আমরা ।
জানি ত চুল পর্যন্ত ছাড় নেই কোথাও । দুহাতে চোখ ঢেকে বসে পড়ি। আমার স্বপ্নকল্পনার জাদুকর, আমাকে অলৌকিকে নিয়ে যাও। নিয়ে চলো পাখির ডানার নীচে গভীর মায়াবী অন্ধকারে। নির্জনতার কোলে মাথা গুঁজে আমাকে থাকতে দাও হাজার বছর জুড়ে।
দাও নিসংকোচ স্তব্দতা। দাও সোনালী ডানার আশ্রয়। বকফুল আকন্দপাতার শান্তি। ভাসাও ধানসিঁড়ি নদীটির জলে। নিপোশাকে। উদোম। উচ্ছলতায়। বস্ত্র নিস্কোষিত পরম অধ্যাস ফেলে পদ্মভ্রুণের মত কণ্টক মুক্ত করে আমাকে ফুল্ল করে তোলো !
হিজলের ফুল নেবে মানুষ ? বেতফল, মৃগহরিনীর গায়ে লেগে থাকা মিহিন জ্যোৎস্নার পরত ?
চাঁদ ডুবে গেলে শস্যের ক্ষেত খুলে দেয় দুধেল বুক। উজান শিসে বয়ে যায় বাতাস। কোথাও ডেকে ওঠে ঘাই হরিণ। মেঠো ইঁদুর চাঁদ ভালোবেসে চেয়ে থাকে অনন্তকাল। দিনের হতাশা পেরিয়ে অন্ধকার আর জ্যোৎস্না চুমু খায় সকর্ষে। খুলে ফেলে নিবাত আড়ষ্টতা। একটি সকাল জন্ম দেওয়ার আনন্দে, অন্ধকার কাম ঢেলে দেয় জ্যোৎস্নার শরীরে। জেগে ওঠে চরাচর। শিশু অংশুমালী জ্যোৎস্নাকে ডেকে বলে, মা এই নাও শুভ সকাল।
মধুমতীর গেরুয়া জলে খুব ভোরে ঝরে পড়বে জারুলফুল। ভেসে যাবে নারদ নদ। তুলসী, আত্রাই পেরিয়ে বারনাই নদীর জল বয়ে যাবে নাটোরের কোল ছুঁয়ে। সন্ধ্যার উষ্ণতা গায়ে জ্বেলে সেখানে বসে আছে বনলতা সেন। নীলাচলে ঢেকে রাখা শান্তিজলের মায়াদ্রোণী হাতে।
ভেজা বালুচরে নাম লিখেছিলাম তোমার আমার।
গভীর সমুদ্রের দূরাগত খাঁড়ির মতই ভয়ংকর সুন্দর ছিলে তুমি। সমুদ্রের নুন ঢেউ উত্তাল কামনায় যখন তখন আছড়ে পড়ে সাদা বালুচরে। তেমনি আমিও সকাল দুপুর, রাত্রি কি ভোর, বেলা অবেলায়, দেহ ও আত্মায় ঝাঁপিয়ে পড়েছি তোমার বুকে।
প্রেমেরও দায় থাকে জীবনানন্দ। থাকে বেঁচে থাকার মগ্নসংগীত। তারা নিরন্তর বুনে চলে সবুজ সুতোয় স্মৃতিবিস্মৃতির অমর কথাকলি। গাঙ্গুড়ের জলে ভাসা চাঁদ। বেহুলার নাকছাবি। সনোকার হাহাকার।
তোমাকে ভালোবাসি জীবনান্দ। মগজের ফাঁকা ভূমিতে তুমিই বিছিয়ে দিয়েছিলে শীতলপাটির মায়া। বিমলানন্দ সে তো তোমারই সৃষ্টিকল্প। ঘুঙুরের শিঞ্জন তুলে ঝরে পড়ে শিশির। একটি গরম চাদরে লীন হয়ে থাকি দুটি দেহ।

তোমাকে ভালোবাসি না জীবনানন্দ। জেগে দেখি দক্ষিণে বুক খোলা আকাশ। উড়ে গেছে শরতের চাদর। বাতাস গুঙিয়ে কাঁদছে। তুমি মৃত্যুপ্রিয়, জীবন পলাতক। ট্রামের ঘন্টাধ্বনি অযথাই বেজে গেছিল। তোমার দু কান জুড়ে ঢেউ তুলে তখন ডাকছিল বরিশাল শহর, কীর্তিনাশার ঘাট, আয় আয়, কোলে আয় বাছা।
বনতুলসীর ঘন ঝোপ, বুনোপালং আমরুলের হলুদফুল, অর্কফুলের বেগুনি হাসি মাড়িয়ে তুমি একলা চলে গেছ ট্রামের ঘন্টাধ্বনির সাথে। তোমার হৃদয় জুড়ে ঘাস। কেউ কেউ ডেকেছিল, যেও নাকো অইখানে? ফিরে এসো। ফিরে এসো ঘরে ! তুমি শোননিকো অভিমানভরে !
বড় ভয়ে ভয়ে তোমাকে ভালোবাসি কবি।
এই যে হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাজছে স্মৃতির ক্ল্যারিওনেট। অজস্র পালক ফেলে উড়ে আসছে স্মৃতি পাখিদল। মেঘ কাঁদছে মেঘময় সুরে। হিজলের মগ ডালে যে ঘুঘুটা থম দুপুরে একটানা ডেকে যায় সে পাঠিয়েছে জীবনের জয়গান। প্রেম আছে, প্রেম আছে! আছে বেঁচে থাকা। আমি কিন্তু তুমি নই জীবনানন্দ। তুমি মৃত্যু চেয়েছিলে। আমি জীবনে আগুন রেখে বাঁচি ।
মৃত্যু কে চায়! সে তো অপরিসীম শেষকথা। বিস্মৃতির খয়েরি প্রান্তর। কেবলই অতল অন্ধকারে হাত ছেড়ে ছুটে যাওয়া প্রিয় ফুল, প্রিয় মানুষ, প্রিয় প্রেম, ভালবাসার শুভ দিন। আমি প্রেম চাই। চেয়েছি জীবন।
নীলশার্টে সাদা কলার, গুড মর্নিং। আমি রেগেমেগে বলেছিলাম, ছাই মর্নিং। কে তোমাকে এত লম্বা হতে বলেছিল ? আর এই যে, বাংলা পারো ?
খুব পারি। পিতৃদেব নড়াইলের, মাতাজী মাদারিপুরের।
একেবারে নিকট প্রতিবেশী যেনো। আজন্মের চেনা। আধপলা সর্ষে তেল দাও ত মনা, সকালেই ফেরত দিয়ে দেবো গোছের আন্তরিক প্রেম হয়েছিল আমাদের। আমি গোদা হাত নেড়ে বলেছিলাম, হয়েছে হয়েছে। কি কি দেখবে ? কিছু কি ভেবে টেবে এসেছ ? কই লিস্টি দেখি ত!
কিছুই ভেবে আসেনি। আমরা খুশি। বিদেশী ছাত্র ওরা। এইবার জম্পেশ মাতব্বরি করা যাবে। আমাদের উপর দায়িত্ব পড়েছে ওদেরকে ঢাকা ভার্সিটি ঘুরিয়ে দেখানোর।
কিন্তু কে দেখায় কাকে!
শিল্পকলার দেয়ালে বেশ উঁচুতে শাহাবুদ্দিন । তারও আরো উঁচুতে সুলতান। সুলতানের একপাশে জয়নুলের তিনকন্যা। ওরা ছবি তুলবে। আমি নীলশার্ট লম্বুর হাঁটুতে পা রেখে দেখে নিই ভাল করে, কোনটা কার ছবি।
ওর মৃত্যুটাও আমাদের ভালোবাসার মত বাস্তব ছিল।
কিন্তু লৌকিক অলৌকিকের শুন্য উদ্যানে দাঁড়িয় ওকে বাঁচিয়ে তুলি প্রতিদিন। শেষবারের চিঠিতে পাঠিয়েছিল মার্কুইজ, ভালবাসার জন্যে আমি বার বার জন্মেছি। জন্মাব। বার বার মরেছি। মরব। ভালোবাসার অহংকারে আমি এক মগ্নমুখর পাগলপ্রাণ।
তুচ্ছ সান্ত্বনা। তুচ্ছ জন্মমৃত্যু। আমার নৈঃশব্দের চেতনায় বাজে হলুদ মগ্নতা। সেখানে সবুজ ভালবাসারা দিনরাত জীবনের গান গায়। তবুও বিষাদ এলে, ধানসিঁড়ি নদীতে ভাবের বঁড়শি ফেলে তোমাকে তুলে আনি ।
তোমাকে ভালোবাসি কবি। তোমাকে ভালোবাসি না ! তোমাকে ছুঁয়ে থাকি ভয়ে খুব ভয়ে! আমি যে আমার মত। তোমার মতন নই জীবনানন্দ।