বিয়োজন

নিবেদিতা আইচ

এক।।

আকাশ ফুটো করে বৃষ্টি নেমেছে। জল পড়ার শব্দে কান পাতা দায়। শহরের অলিগলিতে হাঁটুজল জমে গেছে। খুলে রাখা ম্যানহোলের ভেতর রিকশার চাকা আটকে গিয়ে যাত্রীসহ চালক রাস্তার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। ভিজতে ভিজতে কয়েকজন এগিয়ে যায় সেদিকে। গর্ত আর খানাখন্দভরা রাস্তায় তাদেরকেও সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে।
প্রায় প্রতিদিনই এভাবে দিন শুরু হয়। অফিস আদালতে ছুটতে থাকা মানুষগুলো ভিড় বাসে বসেবসে অধৈর্য হতে থাকে৷ দেশ আর দশের আলোচনা শুরু হয় একসময়। সবাই বলাবলি করে এ বছর নাকি বন্যা হবার প্রবল সম্ভাবনা।
কেউ একজন মাথা নেড়ে বলে – এভাবে চললে বন্যা হতে দু'টোদিনই যথেষ্ট।
আরেকজন বলে -আল্লাহ আল্লাহ করেন, বন্যা হইলে দেশের অনেক ক্ষতি হইবো। ফসলের মৌসুম, গরীব চাষীরা মরবো।
- আর সেই দিন নাই রে ভাই, এখন চাষীর হাতেও ফোন দিয়া দিছে সরকার।
সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে কেউ অভয় দেয়। কিন্তু কথাটা সবাইকে আশ্বস্ত করতে পারে না। কারো কারো চোখেমুখে বিরক্তি ঝরে পড়ে।
- রাখেন মিয়া আপনের মোবাইল। মোবাইল দিয়া পেট ভরে? আকামের জিনিস। একটা মোবাইল ফোনের লাইগা ঐদিন পোলায় বাপেরে খুন কইরা ফ্যালাইলো!
- ক্লাস সেভেনের একটা পোলা!
- আরেহ এগুলা হইলো আল্লাহর গজব। আর কিছু না। এমন খুনাখুনিই হইবো, সব ভাইসা যাইবো নয় পুইড়া ছাই হইবো… কেয়ামতের দেরি নাই। আল্লাহ আল্লাহ করেন সবাই..
লোকটার কথা প্রমাণ করতেই বৃষ্টি যেন আরো তেড়েফুঁড়ে নামে। আর গরমাগরম আলাপটা হুট করেই থেমে যায়। হয়তো সবাই মনে মনে যার যার সৃষ্টিকর্তাকে ডাকে। অন্তত এই বৃষ্টিটা থামুক, যে যার গন্তব্যে পৌঁছাক - এই প্রার্থনা করে। বাইরে গলা বাড়িয়ে রাস্তায় জমে থাকা জলের উচ্চতা মেপে নেয় কেউ কেউ। আরেক দফা হা-হুতাশ করে।
এসবের মাঝে শুধু আবদাল মিয়া নির্লিপ্তভঙ্গিতে নিজের সিটে বসে থাকে। এই জলমগ্ন শহরটার মতোই জাগতিক খবরাখবর থেকে বিচ্যুত এক দ্বীপান্তরিত লোক সে। তার চুয়ান্ন বছরের জীবনে শেষ কবে এমন জলের ধারা দেখেছে স্পষ্ট করে মনে পড়ে না। বাসের সিটে হা-ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দেয়ার সময় আধবোজা চোখে আরেকটা বর্ষণমুখর দিনের কথা মনে পড়ে যায় তার। আকাশে উড়ে যাওয়া পেঁজা তুলো মেঘ হঠাৎ বদলে গিয়ে যেমন পরক্ষণেই ঝরে যেতে পারে তেমনি মনে করতে না চাইলেও আবদাল মিয়ার স্মৃতির ঝাঁপি খুলে যায়।
শ্রাবণ মাসের স্যাঁতস্যাঁতে একটা দিনে মরিয়মকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিল আবদাল মিয়া। মরিয়ম তখন আটমাসের পোয়াতি। আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামলো। পথেই প্রসব ব্যথা শুরু হলো মরিয়মের!
বড় মেয়েটার জন্ম হলো ঘোরতর বর্ষার সেই সন্ধ্যায়। আবদাল মিয়া মেয়ের নাম রাখলো বৃষ্টি।
বৃষ্টির মুখটা ভাবতে গিয়ে অনেকদিন পর, অনেক বছর পর বুকটা মোচড় দিয়ে উঠে আবদালের। সারাবছর রোগে ভুগতো বৃষ্টি। লিকলিকে শরীরে শুধু বড় বড় চোখ দুটোই নজর কাড়তো সবার। ওর বয়স যখন আঠারো উনিশ মরিয়ম তখন থেকেই বিয়ের দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটাতে শুরু করলো। বিয়ের চেষ্টা শুরুও করেছিল আবদাল। কিন্তু ওদের জীবনের মোড় বদলে গেল হুট করেই।
আজ কত বছর পর বৃষ্টির সাথে দেখা হবে? কমপক্ষে সাত বছর। হ্যাঁ, আবদাল মিয়া মাঝপুকুরিয়া ছেড়ে চলে আসার পর বৃষ্টি একদিনও বাপকে দেখতে আসেনি। মেয়ের কথা যতবারই জিজ্ঞেস করেছে, মুখ ঝামটে দিয়েছে মরিয়ম। বলেছে - খবরদার হারামজাদির নাম মুখোত আনেন না!
আবদাল মিয়া মেয়েকে দোষ দিতে পারে না। বাবা হিসেবে কোন দায়িত্বটা সে ঠিক করে পালন করতে পেরেছে? মেয়ের ওইরকম একটা দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নেবার পেছনে সে নিজেই দায়ী। বাধ্য হয়েই মেয়ে নিজের পথ নিজে বেছে নিয়েছে।
আসলে কাউকেই দোষ দিতে পারে না আবদাল মিয়া। সে নিজেই আগাগোড়া ব্যর্থ, অপদার্থ এক লোক। মরিয়মের জন্যও কিছু করতে পারেনি । এই সাত বছরে মরিয়ম দু'মাস অন্তর একবার দেখতে আসতো ওকে। দু'বছর ধরে সেটা বন্ধ৷ শুরুর দিকে মন কেমন করলেও পরে সয়ে গেছে। তা সয়ে নিতে হতোই, অসুস্থ শরীর নিয়ে মানুষটা এতদূর কী করে আসতো!
খবর পাঠালে আজকে অন্তত ছেলেটা এসে হাজির হতো। কিন্তু আবদাল মিয়ার কাউকেই জানাতে ইচ্ছে হয়নি। সাত বছর তো কম সময় নয়। ওদের মাঝপুকুরিয়া নিশ্চয়ই অনেক বদলে গেছে। পথঘাট, দোকানপাট এমনকি মানুষগুলোও। কেউ সাদরে বরণ করবে না ওকে। সে নিজেও এমন কিছু আশা করে না। সাত বছর আগে চিরকালের নিরীহ, নির্বিবাদী লোকটা একদিনেই সকলের চোখে কেমন অপরাধী হয়ে গিয়েছিল সেটা ভালো করে মনে আছে তার। আবদালের অনুপস্থিতিতে মরিয়ম আর ছেলেমেয়েগুলোর দুর্দশার কথা কল্পনা করতে গেলে এখনো শরীর অবশ হয়ে আসতে চায়।
আজ এতগুলো বছর পর ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। সকাল সকাল রওনা দিলেও এসব ভেবে মনে মনে দমে যায় আবদাল মিয়া। আবার এই খারাপ আবহাওয়া, জলবন্দী অবস্থা তাকে খুব গোপনে একটু হলেও স্বস্তি দেয়, আসন্ন পরিস্থিতির জন্য হয়তো নিজেকে আরেকটু প্রস্তুত করার সময় পায় আবদাল।

দুই।।

‘অতএব, আদেশ হয় যে, আসামী মোঃ আবদাল মিয়া, পিতা মৃত আফিজুল মিয়া সাং ঝুঁটিয়াখালি থানা মাঝপুকুরিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায়…’
সাত বছর আগে আসমানের সমান উঁচু আসনে বসে হুজুরাদালত যখন বরফশীতল কণ্ঠে রায় পড়তে শুরু করেছিলেন আবদাল মিয়ার তখন শব্দানুভূতি বলতে কিছু ছিল না। তার বিরুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসার মামলা প্রমাণ হয়ে গেছে, জেল জরিমানা হবে, মেয়ের জন্য আসা সম্বন্ধটা ভেঙ্গে যাবে, ছেলের ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফি দেয়া হয়নি - এসমস্ত দুশ্চিন্তার কথা তাকে স্পর্শ করছিল না। আবদালের শুধু মনে পড়ছিল তাদের গোলাঘরের ঘুঁটঘুঁটে আঁধারের কথা। সেই কোন ছেলেবেলায় একদিন খেলতে খেলতে গোলাঘরে গিয়ে ঘাঁপটি মেরে বসেছিল সাত বছরের আবদাল, সেই দিনটির কথা মনে পড়ছিল তার। আম্মা সেদিন গোলাঘর বন্ধ করে পাড়া বেড়াতে বের হয়েছিল। আবদাল মিয়ার সেই থেকে আঁধার ভীতি।
সেদিন আড়াই ঘন্টা পর গোলাঘর থেকে মুক্ত হতে পারলেও এবার থাকতে হবে সাতটা বছর। আবদাল মিয়া দূর থেকে দেখছিল মরিয়মের কান্না আর ছেলের বিব্রত, লজ্জাবনত চোখমুখ। তার নিজস্ব কোনো অনুভূতি ছিল না। শুধু জেলখানার আঁধার কতটা নিরেট হতে পারে- সেই ভাবনাই আবদাল মিয়াকে গিলে খেয়ে ফেলছিল।
সেই ভাবনা থেকে তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনে তারই ছেলে। রায়ের পর কাছে যেতেই ছেলে বলে - তোমরা এমন একটা কাম কইরবার পাইরনেন, আব্বা?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি আবদাল৷ মরিয়মকে বলে দেয় ছেলে যেন আর জেলখানায় না আসে। আসামী বাপের সংশ্রব থেকে দূরে থাকাই ওর জন্য ভালো।
শুধু ছেলে কিংবা মাঝপুকুরিয়ার লোকজন না, বহুদিন হয়ে গেছে আবদাল মিয়াও নিজেকে অপরাধী মনে করে। মিথ্যে অভিযোগটা কখন যে সত্যের মতো হয়ে গেছে সে নিজেও টের পায়নি।
জেলখানার বন্ধু হিফজুল বলতো - বারেবারে শুনতে শুনতে মিছা কতাও সত্যর মতন নাগে।
বড় খাঁটি কথা। বাসের দুলুনিতে আধোঘুমের ভেতরেও এই কথাটা মাথার ভেতর কেউ গুণগুন করে যায়।
কন্ডাক্টর এসে ভাড়া চাইলে, গন্তব্য জিজ্ঞেস করলে ঘোর কেটে যায় আবদালের। এ প্রশ্ন তো তারও! কোথায় যাচ্ছে সে? মাঝপুকুরিয়া!
না, সেই আগের মাঝপুকুরিয়া আর নেই। সেখানে ফেরাও খুব জরুরী কিছু নয়। মরিয়ম হয়তো অপেক্ষায় আছে। কিন্তু এতদিনের অভ্যাসে সেও নিশ্চয়ই একা একা বাঁচতে শিখে গেছে। তবে শুধু মরিয়মের জন্য নয়, মাঝেমাঝে ভোরবেলায় ঘুম ভেঙ্গে গেলে ছেলের জন্যও ভাবনা হয় আবদালের। তাই তো এই ছুটে চলা।
অভিমানী ছেলেটা এখন কত বড় হয়েছে খুব জানতে ইচ্ছে করে আবদালের। শুনেছে সে নাকি আজকাল নতুন করে দোকান খুলে বসেছে। বাপের মতো ছেলেও দোকানদার হয়েছে। ওকেও কেউ ফাঁসাবে না তো? দোকানঘরে কেউ যদি নিষিদ্ধ কিছু রেখে যায়? না, এত খারাপ খারাপ ভাবনা ভাবতে পারে না আবদাল। তার ক্লান্ত লাগে।
তারচেয়ে বরং বৃষ্টির কথা ভাবা যাক। মরিয়ম বলেছিল তাদের মেয়ে নাকি দুই কন্যার মা হয়েছে। জামাইটা দুইবেলা নিয়ম করে পেটায় বৃষ্টিকে। মেয়েটার কপালে বোধ হয় সুখ নেই। নইলে এমন মেয়ে নেশাখোর ছেলের সাথে পালাতে পারে! মরিয়ম মেয়ের প্রসঙ্গ এলেই বলতো - নিজের কপাল নিজে খাইচে, হারামজাদির নাম মুখোত আনেন না!
বাপ জেলখানার আসামী, মেয়ে পালিয়ে বিয়ে করেছে - এসব ভাবলে আবদাল মিয়ার প্রতিদিনই মরে যেতে ইচ্ছে করতো। কিন্তু মৃত্যু বড় দুষ্প্রাপ্য। তাকে ধরা দেয়নি কখনো। আবদাল প্রায়ই ভাবে হুজুরাদালত তাকে ফাঁসির হুকুম দিতে পারতেন। তা না দিয়ে দিলেন সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। হিফজুল তখন ওকে বোঝানোর চেষ্টা করে। সে বলে কয়েকটা ‘বাবা’ বড়ির জন্য এর চেয়ে বেশি শাস্তি নাকি হয় না।
আইনকানুন এত জানা নেই আবদালের। আর এই শাস্তিটা ফাঁসির চেয়েও বেশি বলে মনে হয় তার। সাত বছরে এক মুহূর্তের জন্যও সে ভুলতে পারেনি ঐ দিনটির কথা। চোখ বুঁজলেই ছবির মতো দৃশ্যটা দেখতে পায়।
ওদের মুদি দোকানের পেছনে ঝোপের আড়ালে এলাকার বখাটে ছেলেরা প্রায়ই নেশার আসর বসাতো। সেদিন হুটোপুটির শব্দে আবদাল মিয়া দোকানঘর ছেড়ে বের হয়ে আসে। কাঁটাঝোপের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখে ছেলেগুলো এলোপাথাড়ি ছুটছে। আচমকা আবদালের পায়ের কাছে কালোরঙের একটা পলিথিনের পুটুলি ছিটকে এসে পড়তেই পুলিশ তার দিকে তেড়ে আসে। আর সে কী বেধড়ক কিল চড়! ততক্ষণে চারপাশ একেবারে ফাঁকা। একটা কথাও বলার সুযোগ দেয়া হয়নি তাকে। ঐ অবস্থাতেই আবদালকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ।
কতদিন এই দৃশ্যটা দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করেছে! কত রাত নির্ঘুম কেটেছে। তবে সময়ের সাথে সব ক্ষতই তো পুরনো হয়ে যায়। আবদাল মিয়াও ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে কারাগারের জীবনে।
ওখানকার দিনগুলি খুব ছকে বাঁধা ছিল। ঘুম ভাঙতেই শুরু হতো কর্মব্যস্ততা। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর সময়টা সুন্দর কাটতো। সবাই মিলে হাতের কাজ করতে বসতো ওরা। হাতপাখা, বেতের চেয়ার, মোড়া কত কী তৈরি হতো।
আবদাল মিয়ার মনে পড়ে কারাসপ্তাহের দিনগুলি। খুব আনন্দ হতো সেসময়। শেষদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বেসুরো গলায় দলীয় গান গাইতো ওরা। 'মোরে আরো আরো আরো দাও প্রাণ' এই অংশটা এলে গলা বুজে আসতো আবদালের। গানের মর্মার্থ বুঝতে না পারলেও কেমন একটা অনুশোচনার মতো হতো তার। হিফজুল অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখতো ওকে।
ভাই, তোমা নিজোক এত দোষ দ্যান ক্যানে?
জীবনে কত গুনা করছি, আল্লাপাকে সেগুলারই শাস্তি দ্যাওচে।
কী গুনা করছেন?
ওজন কম দিচু, ভাতের চাউলোত খুদি মিশাচু।
হিফজুল মিটিমিটি হাসতো। সেই হাসি দেখে আবদাল মিয়া আর কোনো কথা খুঁজে পেতো না।

তিন।।

‘নিউ বৃষ্টি স্টোর’এ সারি সারি প্যাকেট ঝুলছে। চিপসের প্যাকেট। বয়াম ভর্তি হরেক রকমের বিস্কুট আর লজেন্স। দু’পাশের বেঞ্চিতে বসে লোকজন চা বিস্কুট খাচ্ছে, খবরের কাগজ পড়ছে। কাস্টোমাররা ভিড় করেছে। কেউ দুই কেজি চাল চায়, কেউ চায় মশার কয়েল, কারো প্রয়োজন টুথপেষ্ট, কারো চাই মসলার প্যাকেট। ব্যস্ত ভঙ্গিতে কাজ করছে একুশ-বাইশ বছরের ছেলেটা।
আবদাল মিয়া ভিড় ঠেলে একদম সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ছেলের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, কানের পাশে জুলফি বেয়ে টুপ করে ঝরে পড়ছে সেগুলো। ব্যস্ত হাতে টাকা গুণে রাখছে ছেলেটা। আবদাল মিয়াকে লক্ষ্য করার মতো সময় নেই ওর। ছেলেটাকে বিরক্ত করতে ইচ্ছে হলো না। তাই বেঞ্চির একপ্রান্তে চুপচাপ বসে পড়লো সে।
বাস থেকে নেমে আবদাল দেখেছে ঝুঁটিয়াখালিও জলমগ্ন। একটা ভ্যানে চেপে বাড়ির দিকে যেতে যেতে সে ভাবছিল পরিচিত কারো সাথে দেখা হয়ে গেলে কেমন হয়! তার এখন গালভর্তি দাড়ি, রোগা শরীর, মাথায় অবিন্যস্ত ধূসর চুল। এই চেহারায় কেউ হয়তো চিনবেই না এখন। তারপর হঠাৎ 'নিউ বৃষ্টি স্টোর'এর সাইনবোর্ডটা চোখে পড়তেই আবদালের ভাবনাগুলো কোথায় মিলিয়ে গিয়েছে।
ছেলের দোকানের বেঞ্চিতে বসে চারপাশ দেখতে দেখতে কত পুরনো কথা মনে পড়ে যায়। ঝুঁটিয়াখালির রাস্তাটা আগে এত মসৃণ ছিল না। বর্ষাকালে থিকথিকে কাদায় পা ফেলাই মুশকিল হতো। দু'ধারে এত দোকানের সারিও ছিল না। কাপড়ের দোকান, ফ্লেক্সিলোড আর ফটোকপির দোকান বসেছে বেশ কয়েকটা।
রাস্তার ওপারে ফসলের ক্ষেত আগের মতোই আছে। ধানের ছড়াগুলো জল থেকে মাথা তুলে প্রাণপণে দাঁড়িয়ে থাকতে চাইছে। আর একদিন বৃষ্টি হলেই তারা তলিয়ে যাবে। ডুবে যাবে গরীব চাষীর ফসলের স্বপ্ন। আবদালের মনে হয় সত্যিই তো, এসব হচ্ছে আল্লাহর গজব। নইলে আজকাল লোকের এত দুর্ভোগ কেন? কেন তার মতো নিরপরাধ লোককে এভাবে জেল খাটতে হয়?
দূরে আজান শোনা যায়। আছরের নামাজের সময় এখন। মনটা আবার উদাস হয় আবদাল মিয়ার। সম্বিত ফেরে ছেলের ডাকে৷ কবে ছাড়া পেয়েছে জানতে চায় ছেলে। আবদাল লক্ষ্য করে দোকানঘর ফাঁকা হয়ে গেছে। এই সুযোগে চোখ ভরে ছেলেকে আরেকবার দেখে নেয় সে। চোখের নিচে কালি, চোয়ালে দৃঢ় ভঙ্গি। বয়সের তুলনায় পরিপক্ব চেহারা। দেখেশুনে বড় মায়া লাগে আবদালের।
কোনদিন জেল থাকি ছাড়িল তোমাক?
আইজকায়
খবরটা দেও নাই
বাড়িত সবায় কেমন আছে?
বাড়িত ত কায়ো নাই।
আবদাল মিয়া শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ছেলের দিকে। কথার অর্থটা ঠিক বুঝতে পারেনা।
খবরটা তালে পান নাই? চিঠি ত লেকচিনু একখান। আম্মা মরি গেইচে বিশ দিন হইল।
মরিয়ম মরি গেইচে!
মরিয়ম মরি গেইচে - এই কথাটা নানাভাবে আওড়াতে থাকে আবদাল। যেন বারবার বলে অর্থটা বুঝে নিতে চেষ্টা করছে।
মাঝপুকুরিয়া পাঠাগারের পুকুরটার কথা মনে পড়ে তার। কম বয়সে মরিয়ম প্রায়ই সেখানে বেড়াতে যেতে চাইতো। শানবাঁধানো পুকুরঘাটে বাবলাগাছের চিড়ল ছায়ায় বসে থাকতো ঘন্টার পর ঘন্টা। দু’জনে টুকটাক সাংসারিক আলাপ করতো। ওর হাতে কাঁচের চুড়ি আবদালের চোখে নেশা ধরিয়ে দিতো। সুগন্ধী পান মুখে পুরে গুনগুন করতো মরিয়ম।
এসব ভাবতে ভাবতে আনমনে শার্টের পকেটে হাত চলে যায় তার। মাঝপুকুরিয়ায় পৌঁছে বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রথমেই দু'খিলি পান কিনে নিয়েছিল আবদাল। যার জন্য কেনা সেই আর নেই - ভাবতে গিয়ে বুকের ভেতরটা বড্ড ফাঁকা লাগে। সংসারে ফেরার আর কোনো কারণ রইলো না এবার।
ছেলে তাকে বাড়ি ফিরতে বলে। বলে - তোমরা বাড়ি যাইমেন?
আবদাল মৃদু হাসে। সে জানে এই ডাকে কোনো আহবান নেই, এ শুধু অনাহুতের সাথে মিথ্যে সৌজন্যের কথা। সে উঠে দাঁড়ায়, তারপর অন্যমনস্কভঙ্গিতে হাঁটতে শুরু করে উল্টোদিকে।
বাবলাগাছের ছায়ায় বসে কিছুটা সময় স্মৃতি নিয়ে নাড়াচাড়া করতে ইচ্ছে করে তার । সাত বছর আগে যে আবদাল মিয়া, পিতা মৃত আফিজুল মিয়া সাং ঝুঁটিয়াখালি থানা মাঝপুকুরিয়া ভদ্রসমাজ থেকে বিতাড়িত হয়েছিল আজ আর তার সেখানে ফেরার কারণ নেই।