পঞ্চাশ বছর পরে, কে তুমি পড়িছো বসে ‘অবাক’ গদ্যখানি…

নাহার তৃণা


মানুষ শুধু কল্পনা করেই ক্ষান্ত থাকে না। সে তার কল্পনাকে কাজে রূপায়নের ক্ষমতাও রাখে। আর সে কারণেই এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মানুষই এখন পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ প্রাণী হিসেবে স্বীকৃত। একথা বলা হয়ত খুব অসঙ্গত হবেনা মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের সাথে সাথে কল্পনারও একটা ভূমিকা আছে। সেই সুদূর অতীতের কথাই ভেবে নেয়া যাক, যখন বিজ্ঞান এতটা সপাটে নিজের কীর্তিকলাপের গুরুত্ব নিয়ে মানুষের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত হয়নি। আকাশের উড়ন্ত পাখি দেখে মানুষ নিজেও ডানা মেলে উড়বার কল্পনায় বিভোর হয়েছে, যা পরবর্তীতে প্রযুক্তির হাত ধরে প্লেনের বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। প্রযুক্তি এখন এতটাই উন্নত, যে মানুষ চালকের পরিবর্তে দূরপাল্লার প্লেন রোবটের সাহায্যেও চালানো সম্ভব। তো এমন নানান চিন্তাশীল কল্পনা-ভাবনা বাস্তবায়নের ইতিহাসে সমৃদ্ধ আজকের আধুনিক সভ্যতা। যদি বলি এই সমৃদ্ধিতে খুব সামান্য হলেও কল্পবিজ্ঞানেরও একটা ভূমিকা আছে, অত্যুক্তি হবে কি?

হয়ত প্রশ্ন উঠতে পারে, সাহিত্য কী প্রকারে বিজ্ঞানে কিংবা আধুনিক সভ্যতায় ভূমিকা রাখায় সক্ষম? সাহিত্য তো কেবলমাত্র মনের মাধুরী মিশিয়ে রচনার বিষয় না। বিজ্ঞান ও সাহিত্য দুটোই সত্যসন্ধানী, এমনটা বললে একটুও অতিশয়োক্তি হবে না। কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক একজন লেখকের মধ্যে একই সাথে থাকে সত্যকে জানার আগ্রহ এবং বিজ্ঞানমনস্কতা। কল্পবিজ্ঞানের ইতিহাস ঘাটলে এমন প্রচুর সাহিত্যের নজির আমরা পাই যার অনেক কিছুই আজকের প্রযুক্তিনির্ভর দুনিয়ায় নিরেট বাস্তবতা। কিছু সাহিত্য পড়ে লেখকের কল্পনাশক্তিতে অবাক হতে হয়, ওই অতটা পেছনের সময়ে অবস্হান করেও কল্পনায় কতটা এগিয়ে থাকা সম্ভব সেটি ভেবে।

‘ফ্রম দ্য আর্থ টু দ্য মুন’ ‘দ্য পারচেজ অফ দ্য নর্থ পোল’ বা আশি দিনে কল্পনার ফানুস উড়িয়ে সে সময়ে বিশ্বভ্রমণের কী অবাক নজিরই না রেখেছিলেন জুল্ গ্র্যাব্রিয়াল ভার্ন(Jules Gabriel Verne), যিনি আমাদের কাছে জুলভার্ন নামেই বেশি পরিচিত। তারও আগে মিগুয়েল সার্ভেন্টেস তাঁর 'ডন কিহোটি/কিয়োটি(Don Quixote)'র মাধ্যমে, ইয়োহানেস কেপলার(Johannes Kepler) 'সোমনিয়াম' (Somnium, স্বপ্ন, কার্ল সাগান(Carl Edward Sagan) এটিকে প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি আখ্যায়িত করলেও এ সম্পর্কে অনেকের দ্বিমত আছে)। এছাড়া ফ্রান্সিস বেকনের 'নিউ আটলান্টিস', মেরি শেলির 'ফ্রাঙ্কেনস্টাইন: অর দ্য মডার্ন প্রমিথিউস (Frankenstein: or, The Modern Prometheus)', রবার্ট লুই স্টিভেনসনের(Robert Louis Stevenson) ‘স্ট্রেঞ্জ কেস অফ ডক্টর জেকিল এণ্ড মিস্টার হাইড’ এইচ জি ওয়েলস(Herbert George Wells)এর সুবিখ্যাত সৃষ্টি 'দ্য টাইম মেশিন', ‘দ্য ওয়ার অফ দ্য ওয়ার্ল্ডস’ ইত্যাদি কল্পকাহিনি লেখা সম্ভব হয়েছিল মানুষের কল্পনার সাথে বিজ্ঞানমনস্কতার যুগলবন্দীতেই। এসব কল্পকাহিনি মানুষকে আবিষ্কারের কতশত হাতছানিতে ডাক দিয়েছিল তার সবটা কী আমরা জানি! বাঙালি লেখক বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি 'চাঁদের পাহাড়' এর নামটি এখানে উল্লেখের লোভটা ছাড়তে পারছি না। এটি যথার্থ কল্পকাহিনি না হলেও, ইন্টারনেট সুবিধাহীন, অর্থাৎ আজকের মতো প্রযুক্তিতে সড়গড় না হয়ে, সংশ্লিষ্ট এলাকায় না গিয়েও কীভাবে ওই রকম চমৎকার একটা কাহিনি রচনা সম্ভব ভাবলে অবাক লাগে। আবার এটাও মনে হয়, মানুষের কল্পনার সীমানা হয়ত অসীম বলেই তার পক্ষে এভাবে ভাবতে পারা সম্ভব।

না হলে সেই ১৮৯৫(বাংলা ১৩০২) এ বসে একশ বছর পর পৃথিবী টিকবে কি টিকবে না, তার তোয়াক্কা না করে বুড়ো ঠাকুরটি তাঁর পাঠকের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রেখে যান কোন যুক্তিতে!
“কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি
কৌতূহলভরে--
আজি হতে শতবর্ষ পরে।”

নিঃসন্দেহে কল্পনা আর তীব্র আশাবাদ তাঁকে এমনটা ভাবতে আশকারা দিয়েছিল। কল্পনার সাথে এবার ‘আশাবাদ’ জুড়ে গেল। ঠিক তাই, আশাবাদী মানুষ পৃথিবী আরো বহুদিন টিকে থাকবে, এমনটা ভাবতে ভালোবাসবেন। যদিও আজকের ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী’র ভরাডুবি ঘটে যাওয়ার আশঙ্কায় আমাদের মনে যে কু ডাক দেয় না তাও না। তারপরও ‘কালের ঘরে শনি’ না দেখে ‘সম্মুখে সুন্দর আগামি’ দেখায় যখন লেখকের হুড়োতে পড়বার সম্ভাবনা নেই, তখন সে পথেই বরং হাঁটা দেই। চলুন, ভাবতে চেষ্টা করি আগামি পঞ্চাশ বছরের পৃথিবী কেমন হবে না হবে।


ভবিষ্যতের পৃথিবী

পৃথিবীর বুকে মানব সভ্যতার ২০ হাজার বছরের ইতিহাস বিবেচনায় গত এক হাজার বছরকে সাম্প্রতিক কাল ধরে হিসেব করলে গত একশো বছরকে অতি সাম্প্রতিক কাল ধরা যায়। মহাকালের হিসেবে এক শতক খুব অল্প সময়। কিন্তু মানব সভ্যতার জন্য গত এক শতক যে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে তা বিশ হাজার বছরের সেরা মাইলফলক হিসেবে থাকবে। অষ্টাদশ শতকের শিল্প বিপ্লবের জের উনিশ শতকে এসে দুনিয়া জুড়ে যন্ত্র যুগের সূচনা করে। সেই যন্ত্রযুগের বিস্তার বিশ শতকে এসে আধুনিক প্রযুক্তির স্পর্শে এত দ্রুত এগিয়ে যেতে শুরু করে যে যন্ত্রের আকার ছোট হতে হতে মুঠোর ভেতরে চলে আসে শতক শেষে। বিশ শতক ছিল পুরোপুরি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতার শতক। বিশ শতকেই মানুষ যন্ত্রের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালু করতে সক্ষম হয়। সেই প্রযুক্তিকে সরল ভাষায় কম্পিউটার প্রযুক্তি বলা যায়। জটিল অংকের হিসেব মানুষ নিজের মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে কম্পিউটারের হাতে ন্যস্ত করে। বিশ শতকের শেষভাগে সেই যন্ত্রকে মানুষের হাত ছাড়াই কাজ করতে শেখানোর প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়। সেই প্রযুক্তিকে সরল ভাষায় সফটওয়ার বলা যায়। যে কাজটা আগে মানুষের হাতে করা হতো, সেই কাজটা এখন সফটওয়্যার করতে পারে। বিশ শতকের সেই সফটওয়্যার প্রযুক্তি একুশ শতকে আরো অগ্রসর হয়ে যে নতুন যুগের সূচনা করে তাকে অটোমেশনের যুগ বলা চলে। মানুষের ভাষার মতো মেশিনেরও ভাষা ব্যাপকভাবে চালু হয়ে গেছে একুশ শতকে এসে। বলা হচ্ছে এই শতক চলবে মেশিনের ভাষার দক্ষতায়। এই গতিতে বিশ্ব এগোতে থাকলে একুশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বিবর্তিত হয়ে কতদূরে পৌঁছে যাবে সেটা কল্পনা করা একটু দুঃসাধ্য বটে। গত ৫০ বছরে পৃথিবী এগিয়েছে গত ৫০০ বছরের চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে। আগামী পঞ্চাশ বছরে এই গতি যে বহুগুণ বেশী হবে সেটা বলাই বাহুল্য।


কেমন করে ছুটছে মানুষ যুগান্তরের ঘুর্ণিপাকে
বিশ শতকে মানুষ উড়তে শিখেছে। সমস্ত পৃথিবী আকাশ পথে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে একসময় পৃথিবী ছাড়িয়ে চাঁদে পৌঁছে গেছে বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে। বিশ শতকেই মানুষ নির্মিত আকাশযান সৌরজগতও অতিক্রম করে গেছে। তবু মহাকাশ প্রযুক্তির আরো অনেক পথ অতিক্রম করা বাকী। মনুষ্য নির্মিত যান নিকটতম গ্রহে পৌঁছাতে পারলেও এখনও তাতে চড়ে বসতে পারেনি কোন দুঃসাহসী আকাশচারী। এখনও মানুষ তার নিকটতম প্রতিবেশী নক্ষত্রের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। পারেনি নিজ ছায়াপথকে প্রদক্ষিণ করতে। নিকটতম গ্যালাক্সির প্রান্ত স্পর্শ এখনও কল্পনার ভেতর সীমাবদ্ধ। আগামী পঞ্চাশ বছরের মধ্যে অন্তত এটুকু আশা করা যায় সৌরজগতের সবগুলো না হলেও বেশ কিছু গ্রহে মানুষ পৌঁছে যাবে। মহাকাশের গতি বাড়ানোর নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়ে যাবে। আলোর গতির কাছাকাছি গতি অর্জন করে ফেলবে আগামী একশো বছরের মধ্যে। সেই শক্তিতে মানুষ প্রস্তুত হবে ছায়াপথ গ্যালাক্সি জুড়ে অনুসন্ধান অভিযান শুরু করতে। অন্য গ্যালাক্সির কথা আপাতত থাকুক। ফিরে আসি নিজের গ্রহে। এই গ্রহে আকাশ ভ্রমণে মানুষ ঝুঁকবে অনেক বেশী করে। সড়কপথের ভিড় এড়াতে উদ্ভাবিত হবে নতুন আকাশ ভ্রমণ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে মানুষকে পঞ্চাশ মাইল দূরের এয়ারপোর্টে গিয়ে, অনেক হ্যাপা সেরে লাইন ধরে প্লেনে উঠতে হবে না। প্রতিটি আধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে থাকবে আকাশ ভ্রমণের সুবিধা। ছাদের উপর ছোট্ট এয়ারস্ট্রিপ থেকে উড়াল দিয়ে পৌঁছে যাবে ভিন শহর কিংবা ভিন দেশের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে, সেও আরেকটি অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স, যেখানে আকাশযান ওঠা নামার সুবিধা থাকবে। আজকের অ্যাপার্টমেন্টের গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থার মতো সুবিধাজনক ব্যাপার হবে সেটি। ঢাকা চট্টগ্রামের মতো শহরে ওই প্রযুক্তির বেশী দরকার যেখানে এক ঘন্টার আকাশ যাত্রার জন্য এয়ারপোর্টের পথে তিন ঘন্টার জ্যাম হজম করতে হয়। গাড়ির প্রযুক্তিতেও নানান পরিবর্তন আসবে। চালকবিহীন গাড়ি এখনই আছে, আগামীতে সেই গাড়িগুলোয় আকাশে ওড়ার প্রযুক্তি থাকাও বিচিত্র নয়।



নাই টেলিফোন, নাইরে পিয়ন, নাইরে টেলিগ্রাম
মানুষের অগ্রগতির ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার ঘটেছে যোগাযোগ ব্যবস্থায়। অ্যাণ্ডরয়েড জাতীয় মোবাইল ফোনের যে প্রযুক্তি বর্তমানে বাচ্চাদের খেলনা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, পঞ্চাশ বছর আগে তা মানুষের কল্পনাতেও ছিল না। আগামী পঞ্চাশ বছরে এই উন্নতি কতদূর এগিয়ে যাবে সেটা কল্পনা করাও দুঃসাধ্য। বর্তমানের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিশ্চিতভাবেই পরিত্যক্ত হয়ে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। গত দশ বছরের বিবর্তনে মোবাইল ফোন যন্ত্রটি শুধু টেলিফোন বিষয়ে না থেকে আরো বহু কাজের কাজী হয়ে গেছে। বর্তমানের মোবাইল ফোন গ্রাস করেছে ক্যামেরা, ঘড়ি, ক্যালকুলেটর, গেম, জিপিএস, ইন্টারনেট সহ সকল অডিও ভিস্যুয়াল বিনোদন যন্ত্রকে। মোবাইল ফোনে কী করা হয় না, কিংবা কী করা যায় না সেটা গবেষণার বিষয় হতে পারে। সম্ভবতঃ আহার নিদ্রা পয়ঃনিষ্কাশন ইত্যাদি বাদে বাকী সকল কর্মকান্ড এই ক্ষুদে যন্ত্রটি দিয়ে সম্ভব। আগামী পঞ্চাশ বছর পর মোবাইল ফোন বিষয়টাকেই গ্রাস করার মতো প্রযুক্তি চলে আসবে অনেক বেশী বিস্তৃত সুবিধা নিয়ে।

হয়ত এমনটা ঘটতে পারে ফোনে ফোনে সেরে ফেলা সম্ভব হবে দূরবর্তী স্বজনকে স্পর্শের অভিজ্ঞতা। অনুমোদন সাপেক্ষে প্রিয়জনের কপালে কিংবা গালে টকাশ করে চুম্বনের অনুভূতি উপভোগের ঘটনাও খুব চমকে যাওয়া ব্যাপার হবে না হয়ত তখন। প্রযুক্তি যেভাবে উইলসন বোল্টের মত দৌঁড়াচ্ছে তাতে পঞ্চাশ বছর পর অনেক কিছুই ঘটে যাওয়া সম্ভব মনে করি। এখন তো কোনো রেস্টুরেন্টের মেনু দেখে খাবার অর্ডারের সুযোগ আছে ফোনেই। তখন হয়ত মেনু বাটনে ক্লিক করা মাত্রই প্রোগ্রামকৃত পদ্ধতির মাধ্যমে পছন্দের খাবারের সুগন্ধে ভরে যাবে মনপ্রাণ। অন্যকে মিসকল দিয়ে পয়সা বাঁচানোর ধান্ধা তখন থাকবেই না হয়ত। মোবাইল ফোনে হুমকি ধামকির দিনও শেষ হয়ে যাবে। ফোন খুললেই ভেসে ওঠবে যার যার চেহারা। ‘পর্দে ম্যায় রেহনে দো’র কোন ছুতোয় আড়ালে ঘাপটি মারা চলবে না। চোর-বাটপারের কপালে পুলিশি শনির হিড়িম্বা ড্যান্স দেবার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। নাম্বার টিপে ফোনের রীতিটাও তখন বড্ড বেশি সেকেলে হয়ে যাবে হয়ত। আজকের দিনের এলেক্সা বা গুগলকে ভয়েস কমাণ্ডের মাধ্যমে ফোন কলের ব্যবস্হা তখন চালু হতে পারে সর্বত্র। অর্থাৎ কাঙ্ক্ষিত জনের নামটি বলা মাত্রই ফোনের সংযোগ ঘটে যাবে মুহূর্তে। আবার এমনও হতে পারে, মনে মনে যার কথা ভাবছি তার ছবি আপনাতে ভেসে উঠবে মোবাইল পর্দায়। ব্রেন ওয়েভ টেকনোলজির মাধ্যমে তার কাছেও বার্তা চলে যেতে পারে তোমার জন্য আকুল হয়ে আছে তোমার মঙ্গল গ্রহের বন্ধু। মানুষের মন পড়ে ফেলতে সক্ষম এক ধরনের প্রযুক্তিতে কিছু লেখার জন্য টাইপ করারও হয়তো দরকার হবে না। যা ভাবছি থট রিডিং প্রযুক্তির সাহায্যে তা লেখা হবে স্ক্রিনে। কবি সাহিত্যিকদের জন্য পোয়াবারো হবে ব্যাপারটা। বিশ্বজুড়ে কবিসাহিত্যিকের সংখ্যাও বেড়ে যেতে পারে। তবে এটির ব্যবহারে রাজনীতিবিদেরা বিপদে পড়তে পারেন। ব্যবহারকারীরা যদি হন ডোনাল্ড ট্র্যাম্প বা কিম জং উনের মতো কেউ, তবে হয়ে গেল! ‘লেগেছে লেগেছে আগুন’ এর মূর্ছনায় নিরন্তর মুখরিত থাকবে চারদিক।


যখন তুমি বলবে সিনেমা, টিভি, থিয়েটার, কাগজের পত্রিকা সব অতীতের জারিজুরি
এখন যে বিনোদন আনন্দের সবচেয়ে বড় উৎস, খুব তাড়াতাড়ি সেও হয়ে যাবে অতীতের গল্পের ঝুড়ি। বিনোদনের জন্য টেলিভিশন কিংবা সিনেমার পরিসরটা বেশ ছোট হয়ে যেতে পারে। থ্রি ডি থেকে শুরু করে বহু মাত্রিক ডাইমেশন যুক্ত হবে এসব ক্ষেত্রে। কাগজে ছাপানো সংবাদপত্র না থাকার সমূহ সম্ভাবনা। বিগত বছরগুলোয় নির্বিচারে গাছগাছালি কতলে পৃথিবী প্রায় বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়বে। তাই পৃথিবী তথা নিজেদের রক্ষার তাগিদে সেসময় বনায়নের প্রতি যত্নবান হয়ে ওঠবার সম্ভাবনা দেখা দেবে। গাছ কাটার চেয়ে গাছ লাগানোতে বেশি মন দেয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হবে হয়ত। কাগজের বই ছাপানো কমে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। জীবন যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়ার কারণে কিছু মানুষের হাতে তখন সময় থাকবে প্রচুর। সেসব কুড়িয়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা সময় শিল্প সাহিত্যে বিনিয়োগে উৎসাহী হবেন অনেকেই। প্রযুক্তিবান্ধব বাতাবরণে অবস্হানের ষোল আনা বিনিয়োগ ঘটবে কল্পকাহিনিতে। আজকের মতো ফেসবুক লেখকে সয়লাব অবস্হা দেখা দেবার ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। শিল্পীদের হাতে আঁকা ছবিছাবাতে থ্রী ডি’র জোয়ার লাগবে জোরেশোরে। ওগুলো কদর পাবে। সোশ্যাল মিডিয়া হিসেবে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদির ডায়নোসরের পরিণতি পাবার বিপুল সম্ভাবনা। অবসর বিনোদনের জন্য বেড়ানোর দিকে ঝুঁকবে মানুষ। ভ্রমণের গন্তব্য হিসেবে আজকের সময়ের ব্যাংকক, থাইল্যাণ্ড, ইউরোপ, আমেরিকা আকর্ষণ হারাবে। চাঁদ কিংবা পৃথিবীর নিকটবর্তী কোন গ্রহ হবে ভ্রমণের আদর্শ গন্তব্য। মহাসাগরের নীচে সৃষ্ট মেগা বাবল সিটিগুলোতে বসবে জমজমাট অভিনব বিনোদনের আসর।


নতুন দিগন্তে ডাক দেয় মহাকাল
ইন্টারনেট আসার আগে আধুনিকতম যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল টেলিফোন, টেলিগ্রাম এবং ফ্যাক্স। ইন্টারনেট আসার পর যেন নিমেষের মধ্যে সব প্রযুক্তি প্রাচীন হয়ে গেল। ফ্যাক্সের আয়ু এত স্বল্পকাল ছিল যে তার কথা আজকাল কেউ মনেই রাখেনি। একদিন ইন্টারনেট প্রযুক্তিও প্রাচীন হয়ে যাবে। আগামী পঞ্চাশ বছর পর বর্তমান ইন্টারনেট প্রযুক্তি থাকবে কিনা এখনই বলা যাচ্ছে না। যদি বিকল্প কোন উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা আবিষ্কৃত হয় তাহলে সেই প্রযুক্তিতেই মানুষ অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। তারবিহীন ইন্টারনেট এখনই চালু আছে, নতুন প্রযুক্তিও যে তারবিহীন হবে সেটা বলাই বাহুল্য। বর্তমান ইন্টারনেট ব্যবস্থায় যেসব যন্ত্রপাতি লাগে সেই যন্ত্রপাতিগুলো ছোট চিপের আকারে হয়ে মানুষের শরীরের মধ্যে অঙ্গীভূত হতে পারে। শোনা যাচ্ছে ভবিষ্যতে এমন জামা কাপড় আসছে যেখানে প্রযুক্তির ছড়াছড়ি থাকবে। যোগাযোগ, পড়াশোনা, বিনোদন সবকিছু এখন হাতের তালুতে চলে এসেছে। পঞ্চাশ বছর পর সেটা হয়তো নখের আগায় চলে আসবে আরো বহুমাত্রিক সুবিধা নিয়ে। গুগল আর্থ দিয়ে আমরা বর্তমানে পৃথিবীর যে কোন জায়গার স্ট্রিট ভিউ দেখতে পাই। সেরকম ভিউ একসময় লাইভ দেখা সম্ভব হবে হাতের তালুতেই। পৃথিবীর যে কোন বিন্দুর জীবন্ত চিত্র দেখা সম্ভব হবে একদম সাধারণ মানুষের পক্ষেও।

নতুন একটি ইন্টারনেট প্রযুক্তির নাম হতে পারে হাইপার-ইন্টারনেট কিংবা প্ল্যানেটারি নেট। সমগ্র সৌরজগত নেটওয়ার্কের আওতায় চলে আসবে। এখন যেমন আমরা স্যাটেলাইট দিয়ে গুগল আর্থের মাধ্যমে পৃথিবী, মঙ্গল ও চাঁদের স্থির চিত্র দেখি। নতুন প্রযুক্তিতে সবগুলো গ্রহের জীবন্ত চিত্র দেখা যাবে হাতের তালুতেই।

ঘরে ব্যবহার্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মধ্যে এমন যোগাযোগ থাকবে যাতে হারিয়ে যাওয়া কোন জিনিস খুঁজে পেতে খুব সহজ হবে। ধরা যাক একটি বোতলের ঢাকনা খুলে পড়ে গেল কোথাও, সেটি খুঁজে দেখার জন্য হাতের তালুর কন্ট্রোল ডিভাইসে চাপ দিলে সেই ঢাকনা সাড়া দেবে লুকোনো জায়গা থেকে। এভাবে চুলের ক্লিপ থেকে জুসের বোতল পর্যন্ত সবগুলোই ওয়াইফাই জাতীয় নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত থাকবে।

আজকাল মোবাইলের ব্যাটারির চার্জ নিয়ে মানুষ খুব কাহিল থাকে। যে কোন স্মার্ট ফোন প্রতি ২৪ ঘন্টায় একবার চার্জ দিতে হয়। ব্যাটারি প্রযুক্তির আমূল পরিবর্তন ঘটে এই চার্জ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে আগামী ৫০ বছরে। যে কোন জিনিস বছরে একবার চার্জ দিলেই চলবে। তাছাড়া কয়েক বছরের বাড়তি চার্জ জমিয়ে রাখা, ডিভাইস টু ডিভাইস চার্জ ট্রান্সফার করার মতো প্রযুক্তিও চলে আসবে। নতুন ইন্টারনেট ব্যবস্থায় এইসব ব্যাপার খুব সহজে ঘটবে।

ইতিমধ্যে IOT বা Internet of Things নামে আন্তঃডিভাইস সংযোগ প্রযুক্তি চালু হয়ে গেছে অনেক দেশেই। মানুষের ব্যবহৃত টিভি, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন, চুলা বা জ্বলন্ত সুগন্ধী ক্যাণ্ডেল থেকে অগ্নিসংযোগ প্রতিরোধসহ এন্তার জিনিসপত্র দূর থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আগামী পৃথিবী হবে ওই সুবিধাগুলোর আরো উন্নত সংস্করণে পরিপূর্ণ। মানুষের চাহিদার যেমন শেষ নেই, তেমনি মানুষের উদ্ভাবনেরও শেষ নেই। চাহিদার কারণেই নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন সম্ভব হয়, ভবিষ্যতে তার মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে সন্দেহ কী!


যাকে আমি চাই, এখনো আসেনি যাহা, অপেক্ষায় অপেক্ষায়

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে স্টিফেন হকিংয়ের আশঙ্কা ‘The emergence of artificial intelligence (AI) could be the “worst event in the history of our civilization” unless society finds a way to control its development’ এ খুব একটা পাত্তা না দিয়ে ব্যাপক মাত্রায় তার ব্যবহার শুরু হবে। এই পদ্ধতি খাটিয়ে উৎপাদনে রোবটের ব্যবহার এমন একপর্যায়ে পৌঁছতে পারে যে আফ্রিকা ও এশিয়ার বিশাল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ধনী দেশগুলোর সম্পদের ফারাক সাত আসমানচুম্বী হয়ে ওঠার সমূহ সম্ভাবনা। ব্যক্তিমানুষের চাহিদা শ্রমবাজারে কমতে থাকবে, তার জায়গা নিয়ে নেবে রোবটগোষ্ঠী। ফলে বিরাট সংখ্যক মানুষ কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়বেন হয়ত। অর্ধেক মানব/মানবী আর অর্ধেক প্রযুক্তি’র সৃষ্টি সেইসব রোবট মানুষের শয্যা/যৌন সঙ্গী হওয়ার যোগ্যতা সম্পন্ন হবে। এর ভালোমন্দ দুটো দিক দেখা দেবে। একাকীত্বে আক্রান্ত মানুষ সঙ্গী পাবেন। রোবটসঙ্গী সহজলোভ্য হওয়ায় পথঘাট থেকে ইভটিজিংয়ের হার কমে যাবে। পরকীয়ার মাত্রা হ্রাস পাবে। দাম্পত্যকলহের জের হিসেবে বিবাহবিচ্ছেদের হার নীচের দিকে নামবে। আবার মনে রাখতে হবে বিপরীত প্রতিক্রিয়াও : জনসংখ্যার হার হয়ত আশঙ্কাজনক ভাবে কমতে থাকবে। মানুষে মানুষে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির মাত্রা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে। পরিবার প্রথা মুখ থুবড়ে পড়বে। এমন বাস্তবতায় ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ আরো বেশি রূঢ়তায় গুনগুনিয়ে ওঠবে-
“তারারাও যতো আলোকবর্ষ দূরে
তারো দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে”

পুলিশের বিকল্প হিসেবে রোবোকপ জাতীয় বাহিনী তৈরী হয়ে যাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নততর প্রয়োগে। যাদেরকে ঘুষ দিয়ে বশ করা যাবে না, ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে। আইনের সঠিক প্রয়োগ হবে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি দুষ্টচক্রের হাতে পড়ে নানান হ্যাপা তৈরি করতে পারে।
সম্ভাবনার কোন শেষ নেই। ৫০ বছর পরে আসতে পারে তেমন সম্ভাব্য কোন প্রযুক্তি, যা মানুষের প্রয়োজন, কিন্তু এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। মানুষের জীবনযাপনকে সহজ করার জন্য কিছু প্রয়োজনীয় যন্ত্রের উদ্ভাবন হবে। যা মানুষ পকেটে নিয়ে ঘুরতে পারবে।

- স্বয়ংক্রিয় রোগ নির্ণয় যন্ত্র। যে কোন রোগ ঘরে বসে নির্ণয় করা যাবে। রোগ নির্ণয়ের পর নির্দেশিত ডাক্তারের কাছে যাবে মানুষ। খামোখা ল্যাবে হাসপাতালে ঘুরে মরতে হবে না মানুষকে।
- গন্ধ রেকর্ড করার যন্ত্র আবিষ্কৃত হবে। সুগন্ধ দুর্গন্ধ নির্ণায়ক মিটার থাকবে তাতে।
- চতুমাত্রিক ক্যামেরা - ভিডিও যন্ত্রে দৃশ্য এবং শব্দের সাথে ঘ্রাণও রেকর্ড করা যাবে।
- বাতাসের দুষণ নির্ণয় যন্ত্র সহজলভ্য হয়ে যাবে, এমন যন্ত্র আসবে যা দিয়ে আকাশের মেঘে তাক করে বৃষ্টির পরিমাণও নির্নয় করা যাবে।
- বস্তুতে উপস্থিত উপাদান নির্ণয় যন্ত্র, যে কোন বস্তুকে স্ক্যান করে সেই বস্তু কী কী পদার্থ দিয়ে তৈরি সেটা তাৎক্ষণিকভাবে জেনে যাওয়া।
- শীত বা গ্রীষ্ম সহজে নিয়ন্ত্রন করা যায় তেমন পোষাক বা যন্ত্র। হিটার বা শীতাতপ যন্ত্রের বিপুল আকার ভবিষ্যতে থাকবে না। বিকল্প কিছু বের হয়ে আসবে।
- খাদ্যে জীবানু কিংবা ভেজাল সনাক্তকারী যন্ত্র। রেস্টুরেন্টে বসে খাবার অর্ডার দিয়ে ওই যন্ত্র দিয়ে মেপে নেয়া যাবে কী কী খাচ্ছি। খাদ্যে ভেজাল বন্ধ হয়ে যাবে চিরতরে।

প্রযুক্তির চূড়ান্ত অগ্রগতি ঘটে গেলেও তখন পর্যন্ত ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীর অস্তিত্ব মানুষের কাছে অধরা মাধুরীতেই থেকে যাবার সম্ভাবনা। রোগ বালাইয়ের মুখে আচ্ছা করে ঝামা ঘষার উপায় হিসেবে জিন সম্পাদনায় মানুষ হয়ে উঠবে তুখোড়। ক্যানসার, এইডস এসব রোগ না হলেও নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব যে শুরু হবে না সেটা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। মানুষের গড় আয়ু বাড়বে অনেকটাই।

*****


মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল মাঝে…. ভ্রমি বিস্ময়ে, ভ্রমি বিস্ময়ে!
আসলে আগামি পঞ্চাশ বছরে হতে পারে অনেক কিছুই, যার বর্ণনাও বুঝি শেষ হবার না। মহীনের ঘোড়া গুলি সেই ১৯৯৫ সালে গান বেঁধেছিল,

“পৃথিবীটা নাকি ছোটো হতে হতে
স্যাটালাইট আর কেবলের হাতে
ড্রইংরুমে রাখা বোকা-বাক্সতে বন্দি
--------------------
ঘরে বসে সারা দুনিয়ার সাথে
যোগাযোগ আজ হাতের মুঠোতে
ঘুঁচে গেছে দেশ-কাল-সীমানার গন্ডি”

২০১৯ এ দাঁড়িয়ে এ বাস্তবতায় আরো কয়েক প্রস্হ প্রলেপ চড়েছে...পৃথিবী সত্যি সত্যি আরো ছোট হয়ে এসেছে। বোকাবাক্স থেকে মুখ ফিরিয়ে মানুষ এখন ইন্টারনেটের দুনিয়ায় জাল ফেলে দূরকে টেনে আনছে নিজের চৌহদ্দিতে। হাতের মুঠোয় এখন বিশ্ব। কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয় কিংবা মানুষের দুষ্টবুদ্ধির শয়তানিতে যদি পৃথিবী ধ্বংসের মুখে না পড়ে যায়, তবে আগামি ৫০ বছরে হাতের মুঠোয় চলে আসা পৃথিবীতে লাগবে আরো কত সব পরিবর্তনের হিড়িক। কত বিপুল মাত্রায় লাগবে প্রযুক্তির জোয়ার, তার সবটা ঠিকঠাক ঠাহর করাও কষ্টসাধ্য। তবুও মনের সুখে কল্পনার ফানুসে ভাসবার কোন কসুর রাখিনি। হয়ত শিব গড়তে গিয়ে বাঁদর গড়া হয়ে গেছে। আরো পঞ্চাশ বছর উজিয়ে তখনকার পৃথিবীর এক ফাইন মর্নিংয়ে কোন খেয়ালি (বাঙালি)মানুষের সার্চ ইঞ্জিনে যদি এই লেখা ভেসে ওঠে, লেখকের কল্পনার দৌঁড় দেখে সেই মানুষটি অট্টহাসি দেবেন কিনা জানি না। দিলেও, মাইণ্ড করবার জন্য তখন তো আর ‘সেই প্রভাতে নেই আমি!’