যে কটা দিন

সত্যম ভট্টাচার্য

গত পনেরোটা দিন যেন ঠিক একটা ঘোরের মধ্যে কেটে গিয়েছে।এটা যে হতে পারে,এমনটা যে হতে পারে স্বপ্নেও কখোনো তার মাথায় আসেনি।আর যখন হয়েছিলো, নিজেকে নিজে বিশ্বাস করা যাচ্ছিলো না প্রথমে।তারপর ধীরে ধীরে যখন সব সয়ে এলো,স্বপ্ন না সত্যি এই দোলাচল কাটিয়ে বাস্তবে ফিরে এলো সে,তখন থেকেই এক একটা দিন যেন প্রজাপতির ডানায় ভর করে তাকে সঙ্গে নিয়ে উড়ে যাচ্ছিলো।আর এমন একটা সময় এই সমস্ত কিছু ঘটছিলো যখন শীত চলে গিয়ে বসন্ত আসছে।ফলে যা হবার তাই হল।সারাদিন শুধু ঐ চিন্তা।এই সময়টায় কতগুলি জিনিস বেশ একসাথে হয়।এবারেও তাই হল।মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হয়,দুপুর থেকেই দমকা হাওয়া দেয় ধুলো উড়িয়ে,পলাশ মাদার গাছে ভরে ফুল আসে,রাস্তা জুড়ে পড়ে থাকে শুকনো পাতা,মুখের চামড়ায় কেমন যেন একটা টান টান ভাব ।আর এই সময়টায় মনে সেই উড়ু উড়ু ভাব চলে আসে।কিছুই যেন ভালো লাগে না।তো এই সময়টাতেই কান্ডটি ঘটলো।

অনেকদিন ধরেই লেখালেখি করে আসছে সে।লেখা বলতে মূলতঃ কবিতাই।তাও ব্যাপারটা দশ বারো বছর তো হবেই।একটা সবেধন নীলমণি বইও আছে তার।কিন্তু এত দিন ধরে লেখালেখি করেও তার কপালে খুব একটা নেম বা ফেম জোটেনি।চেষ্টা যে করেনি তা নয়।প্রথম প্রথম বিভিন্ন দিকে লেখা পাঠাত নিজেই ঠিকানা জোগাড় করে।এখনোও মাঝে মাঝে ভাবে সে।ব্রাউন খামে হাতে লেখা কবিতা ঢুকিয়ে ডাকটিকিট সেঁটে পোস্টাপিসে গিয়ে ডাকবাক্সে ফেলতো সে।দুটো একটা ছাপাও হয়েছিলো এদিক সেদিক।বড় জায়গাতেও পাঠিয়েছিল সে কবিতা।একেবারে সিরিজ।সুন্দর করে লিখে রেজিস্ট্রি ডাকে ফেলেছিলো।কিন্তু কপালে শিঁকে ছেড়েনি।আর তারপর সংসার সীমান্তে ঢুকে পড়বার পর তো অবস্থা আরো তথৈবচ।এখন লেখাই হয় কালেভদ্রে।ফলে সে নিজেও মাঝে মাঝে ভুলে যায় যে সেও একসময় লেখালেখি করেছে চুটিয়ে।বিস্তর কবিসম্মেলনেও গিয়েছে।বছর দুয়েক আগে যখন গাঁটের কড়ি খরচ করে নিজের বইটা করেছিলো,করেছিলো খানিক জেদ করেই।ভেবেছিলো সেও যে লিখতো তার প্রমাণ কিছু তো একটা থেকে যাক।

তো তার সেই সবেধন নীলমণি বইটি সে মাঝেমাঝেই অনেককে দেয় আর ভাবে পড়ে হয়তো বলবে কেউ কিছু।কিন্তু গু্টিকয়েক কবিবন্ধু ছাড়া সেরকম বেশীরভাগই করেনি।সবাই দারুণ দারুণ বলে বইটা নেয়।আর বই নেবার পর সেটা পড়ে কেমন লাগলো তা জানানোরও প্রয়োজন বোধ করে না।আদৌ পড়েও না হয়তো।যাই হোক সেই পুরোনো অভ্যেসেই তবু সে বই দেয় অনেককে।সে অভ্যেসেই সেদিন বইটা দিয়েছিলো বিশিষ্ট শিল্পী সুগন্ধাকে।দিয়ে ভাবেওনি কিছু।ঐ তো হবে,একটু উলটে পালটে দেখবে বড়জোড়।তারপর ফেলে রেখে দেবে।এইসব বিশিষ্টজনেদের ঘরের টেবিলে রবীন্দ্রনাথ জীবনানন্দের পর সুনীল শক্তিরই বই থাকে।সে তো কোন ছাড়।তার মতো এমন কবি গোটা বাঙ্গলায় প্রচুর ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।তাদের কারুরই কপালে বড় পত্রিকার পাতা জোটেনি।

যাইহোক,পরদিন সকালে হোয়াটসএপে অচেনা নাম্বার থেকে একটা টেক্সট।দেখে চক্ষু তো চড়কগাছ।সুগন্ধা বইটা পড়ে বই এ দেওয়া তার মোবাইল নাম্বার এ হোয়াটসএপে মেসেজ করেছেন।মেসেজ পড়বার আগেই তো তার অবস্থা আরো খারাপ।একি দেখছে সে নিজের চোখের সামনে?তার কবিতার লাইনের ছবি তুলে সুগন্ধা তার প্রোফাইল পিকচার করেছেন।নিজের চোখকেই সে নিজে বিশ্বাস করতে পারছে না।এ কি হতে পারে?সুগন্ধা বইটার পাতা উল্টেছেন।আরো তিনি মেসেজে বলেছেন তার বিভিন্ন কবিতার নাম করে যে তাদের প্রেক্ষাপটের গল্প তাকে বলতে হবে।বলেছেন একদিন আড্ডা দেবেন তার সাথে এইসব কবিতা-লেখালেখি নিয়ে।ঠিক পনেরো দিন আগের এই ঘটনা।সেইদিন থেকে আজ অব্দি,এই দুপুর অব্দি যেন স্বপ্নের মতো চলে গেছে দিনগুলো তার।

মাঝেমাঝেই তার অনেকরকম কিছু মনে হয়েছে।এই যে সম্মান,এই যে প্রাপ্তি তাকে সুগন্ধা দিয়েছেন এ কি স্বাভাবিক তার জন্য?সে তো বহু পেছনের কবি।গত কয়েক বছরে নিজেদের লিটলম্যাগ ছাড়া অন্য কোথাওই তার কবিতা ছাপা হয়নি।সে তো প্রায় ভুলতেই বসেছিল তার লেখালেখির চর্চাকে।নাকি এটাই তার কবিতা জীবনের চরম ও পরম প্রাপ্তি যে তার একটি কবিতার কয়েকটি লাইনকে সুগন্ধা হোয়াটসএপে তার প্রোফাইল পিকচার করেছেন।আর এটাও কি সত্যি যে সুগন্ধা শুনতে চায় তার বিভিন্ন কবিতার প্রেক্ষাপট!এমন কি কবিতার নাম করে সে বলেছে যে অমুক অমুক কবিতার পেছনের গল্পটা তাকে বলতেই হবে।এমন কি এটাও তো ঠিক যে যতটা উচ্ছাস সুগন্ধা তার কবিতা নিয়ে দেখিয়ে মেসেজ করেছে সে অতটা উচ্ছাস দেখাতে পারেনি প্রত্যুত্তরে।ভেবেছে সুগন্ধা যদি কিছু মনে করে বসে।বরাবরই এটা তার অভ্যেস।দোলাচলে থাকতে থাকতেই তার জীবনের অনেকটা কেটে গিয়েছে।এভাবেই কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিয় বান্ধবীদের সে কোনদিনই বলতে পারেনি নিজের মনের গোপন অনুভূতির কথা।তাদের সময় মোবাইলও ছিলো না।আর এখনকার মতো কোন মিডিয়াও আসেনি যে সামনাসামনি কথা না বলে তার মাধ্যমে অনুভূতির প্রকাশ করতে পারবে।যা মুখের সামনে বলা যায় না তা কিন্তু লিখে জানানো যায়।ফলে এই সময় অনেকটাই সহজ অনুভূতি ব্যক্ত করা।সে মাঝেমাঝেই ভেবেছে সুগন্ধা কি তার প্রতি অনুরক্ত?যে রকম মেসেজ এসেছে তার হোয়াটসএপে তা থেকে অনেকটা এমন মনে হতেই পারে।আবার পরক্ষণেই সে ভেবেছে এও কি কখোনো সম্ভব?এ মনে হয় সুগন্ধার স্বাভাবিক উচ্ছলতার প্রকাশ।সে তো উচ্ছল ঝর্নার মতো একজন।স্বাভাবিক চপলতাতেই সে লিখেছে তার ভালোলাগা।কোথাও গিয়ে তার কবিতা কম্যুনিকেট করেছে সুগন্ধার সাথে।এটাই তো তার লেখালেখির সার্থকতা।

তবে সুগন্ধা এভাবে লেখালেখি নিয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করাতে সেটার ফল খুব পজিটিভ হয়েছে তার কাছে।যে লেখালেখিকে সে প্রায় ভুলতেই বসেছিলো গত পনেরো দিনে সেটাই তার কাছে হয়ে উঠেছে প্রতিদিনকার নিয়ম।ভোর ভোর ঘুম ভেঙে উঠে সে বসে যাচ্ছে তার লেখা নিয়ে।কখোনো কবিতা লিখছে,কখোনো গদ্য।কখোনো বা এমনিই মনের খেয়ালে যা কিছু একটা।কাজে কর্মে এক অদ্ভূত গতি এসে গেছে তার।আসলে দারুণ অপার্থিব এক আনন্দের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে সে এইসময়।সে জানে এই আনন্দের স্রোত বেশিদিন টিকবে না।খুব বেশিদিন সুগন্ধা তার লেখা কবিতা নিজের প্রোফাইল পিকচারে রাখবে না।আর সেটাই তো স্বাভাবিক।তাই দিন গুনে চলেছে সে।একেকটা দিন পেরিয়ে যাচ্ছে আর তার মনে হচ্ছে তার মুকুটে আরো একটি পালক যোগ হোলো।এভাবেই এক এক দিন করে সাতদিন যখন পেরিয়ে গেলো তার উচ্ছাস আর কে দেখে?যদিও ইতিমধ্যেই হোয়াটসএপে কথাবার্তা অনেকটাই কমে এসেছে।প্রথমদিকে সুগন্ধা যেভাবে মেসেজ করতো তার কাছ থেকে সেভাবে প্রত্যুত্তর না পেয়ে সেও কমিয়ে দিয়েছে মেসেজ করা।কিন্তু ঐ প্রোফাইল পিকচারটিই কবির কাছে অবসেশন হয়ে উঠেছে।সারাদিনে কতবার যে সে এমনিই হোয়াটসএপ খুলে দেখে আর গোনে কতদিন গেলো।হয়তো সুগন্ধা ভুলেই গেছে বিষয়টি,তবু তার আনন্দ আর শেষ হয়না।এভাবেই পেরিয়ে গেলো দিন দশেক।বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে দেখে গোটা মাঠ জুড়ে বসন্তের হাওয়ার সাথে সাথে পাক খাচ্ছে ঝরে পড়া পাতারা।দূরের মাদার গাছ তার লাল ফুলগুলি নিয়ে ঝকঝক করছে নীল আকাশে।অনেকদিন ঘুরতে যাওয়া হয় না কোথাও।সেই যে মাস কয়েক আগে ট্রেক করে ফিরলো,তার পর থেকে আর বের হওয়া হয়নি কোথাও।সুগন্ধাকেও সে বলেছে তার এই ঘোরার নেশার কথা।কোথায় কোথায় সে গেছে।এমনকি ইতিমধ্যেই বলা হয়ে গিয়েছে দুটো তিনটে কবিতা কোন প্রেক্ষাপটে বা কোথায় ঘুরতে গিয়ে লেখা।

কিন্তু আজ সকালে ঘুম ভেঙ্গে বারান্দায় যেতেই মনটা যেন আনন্দের বদলে কেমন একটু মুষড়ে পড়লো তার।এই কদিনের সেই ঝকঝকে নীল আকাশটা আজ আর নেই।তার বদলে আকাশটা কেমন যেন ঘোলাটে হয়ে গিয়েছে আজ।মনে হচ্ছে সকাল সকাল কেউ যেন ছবি আঁকতে গিয়ে বেশ খানিকটা গ্রে রং ঢেলে দিয়েছে আকাশের বুকে।ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে।শীত যেতে গিয়েও এই বসন্তের বেলায় আর একবার যেন পেছন ফিরে তাকিয়েছে।ইংরেজিতে যেমন মেঘলা দিন বলতে অনেক সময় ডাল বা গ্লুমি শব্দ ব্যবহার করা হয়,এই দিনগুলো যেন ঠিক তেমনই,মেঘলা আর ঘোলাটে।সে গুনে দেখলো অভ্যেসমতো,গতকাল চোদ্দদিন মানে দুসপ্তাহ পেরিয়ে গেছে।আজ পনেরো দিন।তারপর হোয়াটসএপ খুললো।না আছে,এখোনো আছে।মাঝেমাঝেই সে ভাবে যেই মুহূর্তে সে দেখবে তার কবিতার লাইন সুগন্ধার প্রোফাইল পিকচারে নেই,কি মনে হবে তার?কি অনুভূতি হবে?ফাঁকা ফাঁকা কি লাগবে অল্প?তা তো লাগতেই পারে।সুগন্ধারও যেমন প্রোফাইল পিকচার পালটানো স্বাভাবিক তারও তো তেমনই ফাঁকা ফাঁকা লাগাটাই স্বাভাবিক।নাকি খুব ক্যাজুয়ালি সে নিতে পারবে সে বিষয়টাকে?তবে আজ সকাল থেকে মনটা কেন মুষড়ে পড়লো?কেন অকারণেই কোথাও একটা কুডাক দিচ্ছে মনে?বেশ কদিন কোন মেসেজও আদানপ্রদান হয়নি সুগন্ধার সাথে।সুগন্ধা কি ভুলে গেছে তার কথা?নাকি নিজের কোন অনুষ্ঠানে ব্যস্ত আছে খুব,তাই।

দুপুর নাগাদ;তখোনো মনে হয় টিফিন আওয়ার শুরু হয়নি।মাঠে জায়গায় জায়গায় বড় গাছটার থেকে ঝরা পাতারা হাওয়ার সাথে সাথে অল্প তাল দিয়ে ঘুরছে।কোথাও দূরে না দেখা কোকিল ডাকছে একটা।থামে হেলান দিয়ে এতদিনকার অভ্যেসমতো পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলো সে।ডেটা অন করতেই ঝপ করে অনেকগুলো মেসেজ ঢুকলো।সেগুলো চেক করে এগোতে এগোতে সে দেখলো-না,সুগন্ধার কোনো মেসেজ নেই।অনেক পেছন দিকে চলে গেছে সুগন্ধা।সেখানে পৌছতে গিয়ে একবারে অনেকটা স্ক্রল করে দিলো সে।এতদিন একবারেই সে নিজের কবিতার লাইনগুলো দেখে থামিয়ে দিত।আজ তো চোখে পড়লো না লাইনগুলো একবারে।মনে হয় বেশি তাড়াহুড়োতে সে মিস করে ফেলেছে।এবারে আস্তে আস্তে আবার উঠতে লাগলো উপরে।সেখানে ম্যাড়মেড়ে কবিতার লাইনের বদলে উজ্জ্বল পোশাকে দাঁড়িয়ে আছে সুগন্ধা।