অপঠিত চারুপাঠ

শাশ্বত নিপ্পন

‘বো’ পাড়ায় অন্ধকার নামছে গিরগিটির মতো বুকে ভর দিয়ে। কোনো কোনো বাড়িতে জ্বলে উঠেছে সাঁজাল। কুঠি প্রাসাদের জঙ্গল থেকে উঠে আসা প্রমাণ সাইজের মশাগুলোকে এদিকে ঘেঁষতে না দেওয়ার জন্যই এ ব্যবস্থা। মশাগুলো বড় স্বাস্থ্যবতী। ওদের হুলে ম্যালেরিয়ার জীবাণু থকথক করে। শীর্ণ গরুগুলো নোংরা জল কাদায় পা ডুবিয়ে তৃপ্তির জাবর কাটা ভুলে ভয়ার্ত চোখে দেখতে থাকে সাঁজালের আভায় আরো ঘন হয়ে ওঠা অন্ধকারকে।

অন্ধকার নামছে হিন্দু পাড়াতেও। কালো কালো মানুষগুলো ছোট জাতের হিন্দু। ওরা সারাবেলা খাটে আর আধাবেলা খায়। বৌগুলো সারা বছর না খেয়ে আর সাত-আট মাসের ভরা পেট নিয়ে সারা পাড়া ঘুরে বেড়ায়। ঘরে ঘরে অভাব আর রুগ্ন বাচ্চা-কাচ্চা কিলবিল। মরে আবার শূন্যস্থান পূরণ হয়ে যায় বছর না ঘুরতেই। পাশাপাশি পাড়া হলেও এদের মধ্যে বৈপরিত্য আছে অনেক। ‘বো’ পাড়ায় যখন আজান হয় তখন হিন্দু পাড়ায় বাজে কাঁসার। ও পাড়াতে যখন রোজা আসে তখন এখানে চলে পূজার আয়োজন। কোরবানীতে যখন ওরা রসুন-পেঁয়াজ দিয়ে রান্না করে গো-মাংস, খুসবু ছোটে বাতাসের আগে। এ পাড়ায় তখন সে গন্ধ তাড়াতে সাঁজাল জ্বালে। কেউ পোড়ায় শুঁটকি, কেউবা ধুপ। পাঁচী কাকীমা পোয়াতীর ব্যথা উপেক্ষা করে ডাকতে থাকে তার আট বছর বয়সী মেয়ে মাধুরী বালা দাসীকে, ‘ও মাধু, মাধুরে; আগুনডা একটু উসকে দেনা মা - ও পাড়া থেইকি গ্যাস আসে যে... ও মাধু...।’

ফিরিঙ্গি চারু চৌধুরী দু’চোখে মাকড়সার ঘোলাটে জাল নিয়ে বসে আছে কাজলা নদীর পাশের ছোট্ট বাজারের দিকে পিঠ দিয়ে। শীতের নরম রোদ তাকে স্বস্তি দিচ্ছে অকৃপণ। তার ঘোলা দৃষ্টি কুঠি প্রাসাদ ছাড়িয়ে বো পাড়ার উপর দিয়ে দূর অজানায়। তখন পাড়ার নাম ছিল ‘ব্রো’। সেখান থেকে অতি সাধারণের মুখে মুখে রূপ নিয়েছে ‘বো’। এ্যালেকজেন্ডার ব্রো সাহেবের নামেই গড়ে উঠেছিল ব্রো পাড়াটি।
আজো ফিরিঙ্গি চারু শীতের নরম সকালে, অথবা গ্রীষ্মের উদাসী দুপুরে কিংবা নির্ঘুম মধ্যরাতে স্পষ্ট শুনতে পায় তেজী ঘোড়ার আওয়াজ। বাতাসে শীষ কেটে যাওয়া চাবুকের শনশন শব্দ। প্রমত্ত কাজলার বুকে সাহেবী বজরার স্রোত কাটার আওয়াজ - আর কুঠি প্রাসাদের প্রাচীর গাত্রে কোলভিল, হিন্দু, মুসলমান, রঙ্গমালাদের আর্তচিৎকার। অবশ্য সেদিন পশ্চিমে ঢলে পড়েছে সেই কবে... এ্যালেকজেন্ডার ব্রো নেই, নেই সেই রঙ্গমালা।

ফিরিঙ্গি চারু চৌধুরী এখন আকুব্বর মণ্ডল... তবুও স্মৃতিগুলো পড়ে থাকে মরা সাপের কঙ্কাল হয়ে; দিনান্তের আলো যখন রাঙিয়ে যায় কুঠি প্রাসাদের শ্যাওলা ধরা প্লাস্তার চেরা প্রাচীর। তখন এই লাল স্মৃতিগুলো ভিড় জমায় চারু ফিরিঙ্গির মগজের মাঝে। আকুব্বর মণ্ডল বিড়বিড় করে, “আমি কে? চারু চৌধুরী, আকুব্বর- খ্রিস্টান নাকি মুসলমান? কে দেবে উত্তর?”

এ্যালেকজেন্ডার ব্রো ছুটাচ্ছেন একটা কালো ঘোড়া। এ অঞ্চলের মানুষ কালো ঘোড়া কোনোদিন দেখেনি। ঘোড়াটি চলছে গ্রামের পথে উঁচু নিচু দেখে; খানা খন্দ এড়িয়ে - কিন্তু, ক্ষিপ্রতার সাথে। এ্যালেকজেন্ডার কাজলা তীরবর্তী এলাকা দেখে ফিরছেন, মাঠ-ঘাট, মানুষ-মেয়ে মানুষ আর আবাদী জমি পরখ করে। তিনি এখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন খুব সম্প্রতি। এ অঞ্চল নীল চাষে ভরিয়ে দেওয়াই তার প্রধান কাজ।
কুঠি প্রাসাদের সামনে পিছমোড়া করে বাঁধা আছে জনাদশেক নিরন্ন চাষী। কাতার দড়ির চাপে তাদের হাতের মাংস কেটে গেছে। জ্বালা করছে রীতিমতো। কিন্তু, পোকা মাড়কের মতো জীবগুলো টুঁ-শব্দটি করতে সাহস পাচ্ছে না। সামনে ব্রো সাহেব দাঁড়িয়ে। তিনি বললেন, ‘কেনো তুমোরা নীল চাস করিতিছনা... বোলো বোলো... আনসার মি।’ পিছমোড়া করে বাঁধা মাকড়গুলো একজন অন্যজনের দিকে চায় উত্তর করে না। ব্রো সাহেব হুঙ্কার দেয়, ‘টেল মি।’ ইয়াকুব আলী সাহস করে বলে, ‘সাহেব ধানটা করে নেই, তারপরে গা...।’ কথা তার শেষ হওয়ার আগেই ভাটপাড়ার বাতাসে শনশনিয়ে ওঠে ব্রোর চাবুক। বর্ষা ভাঙ্গা তীব্র রোদে সাহেবের চাবুক শঙ্খচূড় সাপের মতো ঝিলিক দ্যায়। অল্প সময়েই বয়স্করা জ্ঞান হারালো।
এ্যালেকজেন্ডারের জামা ঘামে ভিজে উঠল ক্রমেই। তারপর হাঁফ ধরা গলায় সাহেব বললেন, “শুন তুমোরা, এখন নীল সোয়িং রাইট টাইম; যে ডান তুমারো তৈয়ার করিয়াছ তাহা মহারাণী, মাই এক্সিলেনসি.. এর জায়গার উপর... উইদাউট এনি পারমিশন; কালই কোম্পানির লোকেরা তাহা ডেসট্রয় করিবে; আর তুমোরা নীল লাগাইবে।” সকলের হাতে এক সের নীল বীজ তুলে দিল সেপাইরা।

এ কয়মাসে ভাটপাড়া সবুজ চাদরে ঢেকে গেছে। চারদিকে এখন সবুজ আর সবুজ। ঝিরঝির বাতাসে নীলগাছে সবুজ পাতাগুলো এক অদ্ভুত ছন্দে আন্দোলিত হয়। যে রাস্তায় ঘোড়া ছুটাতেন ব্রো সাহেব সেটি এখন ব্রো পাড়া; মুসলমান চাষীদের বাস; উল্টোদিকে হিন্দুদের। দু’পাড়াতেই অভাব এখন বাঁধনহারা। সকাল হলেই জমির শেখ, গোবিন্দ বাগদি, মুত্তালেবরা ধানশূন্য মাঠের আইলে দাঁড়িয়ে বিষণ্ণ দৃষ্টিতে নীলগাছের সবুজ পাতার বাহার দেখে আর সংগোপনে চোখের জল মোছে। পাছে ব্রো সাহেবের চোখে পড়ে যায়।

এখন সকাল গড়িয়ে দুপুরের দিকে। সেই বিষাক্ত সবুজের আইল দিয়ে আসছে রঙ্গমালা। তার কাঁখে শূন্য কলসি, ঘাড়ে গামছা আলগোছে ফেলা- খাটো কাপড় আর ফর্সা লোভনীয় পিঠ, কোমরের বাঁক আর নিটোল বুককে সম্পূর্ণ আব্রু করতে পারেনি। রঙ্গমালার চঞ্চল পায়ের ছন্দে তার বুক আন্দোলিত হচ্ছে নীল গাছের মত। সে চলেছে শান্ত ভৈরবের জলে শুচি হতে। সাঁতার কেটে ডুব দিয়ে শরীর ঘষে নিজেকে পূর্ণিমার আভার মত মোহনীয় করে তুলবে সে। ভৈরবের শান্ত জলে নিজেকে সঁপে দিয়ে সে হয়ে ওঠে কিশোরী। মুহূর্তে সে ভুলে যাবে তার বৈধব্য, তিন বছরের চারুর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, চারপাশের পাথর কঠিন নিষেধের চৌহদ্দি আর তার উথাল পাথাল নেশাধরা যৌবনের কথা। স্নানে যাওয়ার আগে রঙ্গমালা চারুকে বলল, ‘ও চারু কুথাই রে বাছা - আই ঘাটে যাই...।’ চারু তখন কাদা ঘাটতে ব্যস্ত। সে বলে, “তুই যা মা, আমি কাজটা সেরে নি খন।” রঙ্গমালার বাঁধনহীন ছন্দিল পদক্ষেপে তার প্রায় অনাব্রু বুক বর্ষার পদ্মবিলে বৃষ্টির দমকে পরিপুষ্ট পদ্মকুঁড়ির মত দুলতে থাকে। ব্রো সাহেব এই অপূর্ব দৃশ্যটি অপলক দৃষ্টিতে দেখছেন। ঠিক দেখছেন না বরং গিলছেন; চেটে পুটে তুলে নিচ্ছেন অজ পাড়া গাঁয়ের এই সৌন্দর্য। এ্যালেকজেন্ডার ব্রো তার প্রিয় ঘোড়ার স্নানের তদারকি ভুলে মুগ্ধ কামাতুর চোখে দেখতে থাকে দুরন্ত রঙ্গমালাকে। আপন মনে সে বিড়বিড় করে, “বিইউটিফুল!” “ওয়াট আ বিইউটি!” তারপর হুকুম করে, “¯স্ন্যাচ হার ইমিডিয়েটলি।” তার এই আওয়াজ আষাঢ় মাসের চাপা নিনাদের মতো শোনায়।

আজ কুঠি প্রাসাদে সন্ধ্যা নামল সন্ধ্যার আগেই। প্রাসাদের মধ্যে এক বিশাল কামরায় রঙ্গমালা জড়সড় হয়ে বসে আছে। তার চোখের নোনা প্লাবন শুকিয়ে গেছে। দুচোখে এখন তার আতঙ্ক আর শংকা। বিশাল এই কক্ষে ব্রো সাহেব যখন ঢুকলেন তখন বাইরে অন্ধকার দানা বেঁধেছে; ঝিঁঝিঁ পোকারা একসাথে গলা ফাটাচ্ছে। সাহেবের পা টলছে। আকণ্ঠ পান করেছেন এ্যালেকজেন্ডার ব্রো। সে রাতে সাধ্যমত বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করছিল রঙ্গমালা- কিন্তু ব্রো সাহেবের কামানলে সে বাধা খড়কুটোর মত পুড়ে যায় নিমিষেই। তারপর আর বৃথা চেষ্টা করেনি সে বরং সাহেব উঠে গেলে রঙ্গমালা খাটো কাপড় ফেলে কালো গাউন শরীরের উপর দিয়ে লজ্জা ঢাকার খেলা করেছে। দিনে দিনে রঙ্গমালাকে গাউনে বেশ মানিয়ে যায়। সারাদিন সে প্রাসাদেই থাকে। ব্রো সাহেবের খাস কামরার পাশের ঘরে।

শেষ পর্যন্ত চারু প্রাসাদে স্থান পেয়েছে। তবে তার মায়ের সাথে তার আর দেখা হয় না। চারু এই বিশাল প্রাসাদে কাদা নিয়ে খেলার সুযোগও হারিয়েছে। সে এখন শুকনো মুখে প্রাসাদের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ায় আর সাহেবের ঘরে ঝোলানো ভারী পর্দাগুলোর মৃদু আন্দোলন দেখে; চারু কিছুতেই বুঝতে পারে না - এই বাতাসহীন দুপুরে সাহেবের ঘরে বাতাস আসছে কোত্থেকে! এই ঘরে নাকি মা থাকে - সে শুনেছে, হাওয়ার কান পেতে। মার হাতে কি পাখা আছে? মা কি ঐ নিষ্ঠুর লোকটাকে হাওয়া করছে?... বৈচিত্র্যহীন স্থবির এই অশুভ দুপুরে চারুর ঘন কাজল চোখ দুটো প্রায় ভিজে ওঠে। তারপরও দুমুঠো ভাতের জন্য, একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য চারু ক্রমেই ভুলতে থাকে আঁতুড় ঘর, আত্মীয়-অনাত্মীয় - আর এর মাঝেই চারুর বংশ, জন্ম-পরিচয় হারিয়ে যায় এ অঞ্চলের মানুষের দুঃখ কষ্টের হাহাকারের স্তুপের নিচে।

এর পরের সময়গুলো যেন একটু দ্রুতই চলে যায় অগস্ত্যের টানে। এর মাঝেই আস্তে ধীরে ঘন নীল গাছের গোড়ায় জমতে থাকে বিদ্রোহের নোনা। কুষ্টিয়ার অদূরে আমলা নামক স্থানের জমিদার রাণী প্যারী সুন্দরীর নীল বিদ্রোহের আহ্বানে দেশের যুবা-বৃদ্ধরা প্রস্তুতি নিতে থাকে শেষ বারের মতো জ্বলে উঠবার। এ্যালেকজেন্ডার সাহেবের ডাক পড়ে কলিকাতায়। রঙ্গমালার শরীরের আঁচ সামান্য ফিকে হওয়ার আগেই ব্রো সাহেবের আগ্রহে আসে ভাটা। তবে সাহেবের ফিরতি বজরায় ঘোড়ার পাশের একটা ছোট্ট কামরাতে রঙ্গমালার স্থান হয়েই যায়। চারুর কথা সবাই ভুলে গেলেও রঙ্গমালা ভুলে না। এরপর থেকে রঙ্গমালার কথা আর কেউ জানে না। হয়তো সেও মিশে যায় সাহেবের ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্টের গাদায়। হয়তো কাজলা থেকে গঙ্গার বিপুল জলরাশিই তাকে স্থান দেয় কোনো এক অমাবশ্যায়। তবে, ভাটপাড়া কুঠি প্রাসাদ ত্যাগ করার আগে এ্যালেকজেন্ডার ব্রো নেশার ঘোরেই হোক, অথবা তাচ্ছিল্যের বশেই হোক প্রাসাদের আশেপাশের সাতশো বিঘা জমি রঙ্গমালাকে দান করে যান। যার একমাত্র উত্তরাধিকার হয়ে দাঁড়ায় বংশ পরিচয় লোপ পাওয়া, শিকড়হীন এতিম চারু। আর এটা জানাজানি হতেই সে হয়ে যায় ফিরিঙ্গি চারু চৌধুরী রাজা। এ সবই ইতিহাস।

সময়ের এই প্রবহমান ধারার মাঝে ফিরিঙ্গি চারু চৌধুরী হয়ে যায় এক অমীমাংসিত অধ্যায়, এক অসহনীয় মানবিক যন্ত্রণা। ভূমিসত্ত্ব বা জমিদারী প্রথার বিলুপ্তির সাথে বড় জমিদার, ছোট জমিদার, মধ্যস্বত্ত্বভোগী জমিদারদের মতো চারু রাজাও নিঃস্ব হয়। সে তার পাঁচ কাঠার মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু ছাড়া সবই হারায়। তারপর থেকে চারু ফিরিঙ্গি রাজা অশীতিপর বৃক্ষের মতো ছায়া হয়ে আজো ভগ্নপ্রায় প্রাসাদের চারপাশে ঘুর ঘুর করে। তবে এই সব হারানোর নহবত বেজেছিল অনেক আগেই। তখন রঙ্গমালা মিলিয়ে গেছে দূর অজানায়। চারু রাজার তখন যৌবন। তার চোখে এক ফালি সংসার; একটি লক্ষীমন্ত বৌ- এর স্বপ্ন উঁকি দিতে থাকে। শ্রাবণের ঝুম বর্ষণ রাতে চারুর মধ্যেও জেগে ওঠে একদঙ্গল এ্যালেকজেন্ডার ব্রো। সেই অত্যাচারী সাহেবদের দমনের শক্তি চারুর নেই। সে শূন্য তক্তপোষে শুয়ে হিস হিস করে বলে, “বউ চাই, ঘর ভর্তি ছেলি-পুলি চাই, মেয়ে মানসের নরম গতরের মিষ্টি গন্ধ নিতে চাই...”

কিন্তু, যৌবন পেরিয়ে যায় তার বিয়ে হয় না কিছুতেই। সমস্যা একটাই চারু দো-আঁশলা; অনেকেই তাকে মনে করে, সে সাহেবের ঔরস। সে নিজে মুসলমান ঔরসজাত, তা প্রমাণ করাও তার পক্ষে এখন আর সম্ভব না। চারুর খাৎনা হয়নি। বাপহীন অভাবী ঘরের ছেলেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলমান বানাবে কে! নিজের চেষ্টা ছেড়ে মেয়ের বাড়ি ঘটক পাঠায় সে অনেক টাকা-পয়সা খরচ করে। ঘটককে হবু বিবির আব্বা বলে, “চারু? ফিরিঙ্গি চারু? আসতাগফেরুল্লাহ। ফিরিঙ্গির ছেলির সাথে আমার ফাতেমার নিকাহ! তুমি জানো আমার দাদার বাপজান, বোম্বাই গিয়েছিল হজ্ব করতে।” ঘটক লজ্জিত হয় কিন্তু, দমে না। এভাবেই দিন চলে যায়। চারুর যৌবন গড়িয়ে যেতে থাকে সকাল থেকে দুপুর, দুপুর থেকে সন্ধ্যার দিকে। কিন্তু, ঘটক ক্লান্ত হয়। হুক্কার আগুনটা উসকে লম্বা একটা টান দিয়ে ঘটক বলে, “কন্যা পাওয়া ভার হচ্ছি ফিরিঙ্গি।” “কারণ”? ঘটক কিছুটা সময় ভাটপাড়ার সোঁদা মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে তারপর বলে, “কারণ তুমাকে সবাই ফিরিঙ্গি জানে।” “নাহ। বাজে কথা আমার দাদাজান মুবারক আলি, আমি শালা চারু; তবে ফিরিঙ্গি নই - ঘটক আমি দুটো ভাতের জন্যি- লোভ নয়, বাঁচার জন্যি- সাহেব বাড়িতে থাকতাম।” “না না আমি তো সে সব জানি; ঝামেলাটা ছোটলোকগুলোকে নিয়ি।”
শীতের এই সাঁজাল জ্বলা সন্ধ্যায় চারু বড়ই অসহায় বোধ করে। বড় নিঃসঙ্গ বোধ করে। ঘটক হুক্কায় শেষ টান দেয়। হুক্কার আঁচে ফিরিঙ্গি রাজার মুখটা আরো হাঁড়ি কাঠে আটকে যাওয়া পশুর মত দেখায়। কোনো কারণ ছাড়াই ঘটকের গলায় মমত্ব ঝরে পড়ে-- “চিন্তা করনি, ব্যবস্থা একটা হবিনি।” চারু একটা দীর্ঘশ্বাস গিলে ফেলে; তারপর তাকায় তারায় ঢাকা ঝকঝকে শীতের আকাশের দিকে; আজ আকাশটাকে বড় অচেনা লাগে তার।

বছর ঘুরে আবার ফিরে আসে আষাঢ়। আকাশ ভাঙ্গা বৃষ্টি চলে সারা দিনমান। চারদিকে থৈ থৈ করে জল। বর্ষণ চলে অবিরাম। জমাট অন্ধকারে জেগে ওঠে প্রমত্ত কাজলা, কুঠি প্রাসাদ, বিষধর সাপ আর অভাব। এর মাঝেই ঘটক আসে। ফিসফিসিয়ে বলে, “কন্যার বয়স কম; বাড়িতে অভাব; বিয়েটা সম্পন্ন হলেই জাতের সমস্যাটা ঠিক হয়ে যায়।” “বয়স কত?” “মানে, আজকালের মেয়ি তো জন্মালেই বিয়িদারী হয়ে ওঠে”- “বয়স কত?” “চার- মানে সাড়ে চার।” “ঘটক, আমি মানুষ তো নাকি পশু?” সামান্য ঘাবড়ে ঘটক উত্তর করে, “জ্বে মানে, তুমি যে মুসলমান তা প্রমাণ করার একটা বড় সুযোগ;- চারু বিষণ্ণ হয়ে যায়। বিড়বিড় করে সে বলে, “জাত ছাড়া কি মানুষ হয় না?...

টাকা একটু বেশিই খরচ হয়ে গেল; কিন্তু লাভটাও কম হলো না। চারু ফিরিঙ্গির বিয়ে হয়ে গেল হতদরিদ্র সুবল চন্দ্র কৈবর্ত্যরে চার বছরের মেয়ে সাবিত্রী কুমারীর সাথে। বিধি মোতাবেক সাবিত্রী মুসলমান হল; নাম হল হানুফা বেগম। তিন গ্রামের মসজিদে খানা দিয়ে চারু ফিরিঙ্গি রাজা হয়ে গেলে আকুব্বর মণ্ডল। সুবল চন্দ্র পরিবারকে চারু লিখে দিল তার মাথা গোঁজার ঠাঁই পাঁচ কাঠা জমি। পরবর্তীতে সুবলরা আর এ অঞ্চলে থাকেনি। মেয়ে বিক্রির পাঁচ কাঠা জমি আর তাদের বসত ভিটে বিক্রি করে দিয়ে চলে যায় কাজলা, ভৈরব পার হয়ে তেহট্ট শহরের কোন এক অঞ্চলে। কিন্তু, দিন পর খবর আসে সুবলের বৌ কমলা রাণী মেয়ে বিক্রির শোকে গলায় দড়ি নিয়েছিল। আর সাবিত্রী বালা খিদের জ্বালা মেটাতে গরুর মাংস মুখে দিয়ে সেই যে বমি শুরু করল আর থামেনি- নাড়ি বের হয়ে মরেছে ধুঁকে ধুঁকে। অন্যদিকে এ অঞ্চলের মানুষের হাতে খানার সুগন্ধ মেলাতেই তারা “আকুব্বর” কে চারু এবং চারু ফিরিঙ্গি বলেই ডাকতে শুরু করে পুনরায়।

এখন চারু ফিরিঙ্গি শতবর্ষী। এই সুদীর্ঘকাল জীবন তরীর বৈঠা সে একাই বেয়েছে। কখনো খেয়ে থেকেছেÑ কখনো না খেয়ে- কখনো বা ভিক্ষে করেছে বাঁচার তাগিদে। তবে এখন আর খিদে বোধ হয় না তার। ভাটপাড়া বদলে গেছে আমূল। চারু কিছুই দেখে না। তার দৃষ্টি মাকড়সার জালের মত ঘোলা। শরীর মাথা কাজ করে না। এলাকার শিশুরা এই জীর্ণ শীর্ণ বৃদ্ধকে দেখলে, “ফিরিঙ্গি” “ফিরিঙ্গি” বলে পিছনে লাগে দল বেঁধে। আবার একা দেখলে ভয় পায়।

চারু ফিরিঙ্গি ওরফে “আকুব্বর মণ্ডল” শীতের সকালে বাজারের দিকে পিঠ দিয়ে বসে ঘোলা চোখে প্রাসাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। চকচকে রোদে তার ঘোর লাগে; তাকিয়ে থাকতে থাকতে, তার মগজের মধ্যে ঘোড়ার খুড়ের শব্দ ছোটে ধুলো উড়িয়ে; শঙ্খচূড় সাপের মত সাহেবি চাবুক শনশনিয়ে ওঠে; অসহায় রঙ্গমালাদের চিৎকার প্রাসাদের বিশাল প্রাচীর গাত্রে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনি তোলে। চারুর মনে হয় চিৎকারটা যেন আসছে ভারী পর্দাঘেরা সাহেবের ঘরটি থেকে। চারু ব্যাকুল হয়ে ওঠে; তার এই হঠাৎ উত্তেজনা শতবছরের পুরনো শরীর বরদাস্ত করে না। সে গড়িয়ে পড়ে কাজলা নদীর ঢাল বেয়ে।

সকালের বাজার এখন তুমুল আড্ডায় সরগরম। সামনে মহরমের মেলা। কে কোথায় দোকান দেবে তার আলোচনায় সরগরম চারদিক। চায়ের কাপে উঠছে তুফান সেই সাথে বিড়ির নীলচে ধোঁয়া হালকা পর্দা তৈরি করছে। সেই তুফানে চারু ফিরিঙ্গি রাজার গড়িয়ে যাওয়া কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। শুধু একটা নীল মাছি কোত্থেকে এসে ফিরিঙ্গি রাজার হাঁ হওয়া মুখের কোটরে অযথা উড়েই চলে। চকচকে রোদে নীল কুৎসিত মাছিটাকে আরো নীল দেখায়।