যে আগুন নিভে যায়

সাদিয়া সুলতানা


ভোরবেলায় অযাচিতভাবে ওরা ডাকতে থাকে। কিচকিচ, কিচমিচ, কিচিরমিচির। কোনো দাওয়াতপত্র নেই তবু গ্রিলের ফাঁক গলে এ বাড়ির চৌহদ্দিতে মাথা ঢুকিয়ে ডাকাডাকি করতেই থাকে। ডাক শুনে শুনে উঠবো উঠছি করে যেই বারান্দাতে দাঁড়াই, বিনা উস্কানিতে ওরা পালিয়ে যায়। ছেঁটে দেওয়া গোলাপ গাছের নির্ভীক কুঁড়িগুলোর দোদুল্যমান লালচে পাতা মাথা জাগিয়ে ওদের প্রস্থানপথে তাকায়; আমি তাকাই পাতাদের দিকে। সজীব পাতার তিরতিরানি দেখতে দেখতে ঘুমের আমেজ কেটে যায়।
গতমাসে তিনটা টকটকে লাল গোলাপসহ গাছটা কিনেছিলাম। নার্সারির চাচা বলেছিল, ফুলগুলো ঝরে গেলে অনাকাঙ্ক্ষিত ডালপালা ছেঁটে ফেলতে, নতুন 'কুশি' বের হবে। ছাঁটাছাঁটির পরিচ্ছন্ন জীবন পাওয়া গোলাপ কুঁড়িগুলো আজ বিশ্বজয়ীর হাসি হাসছে। এমন একটা সকাল পেলে আমারো ইচ্ছে করে জীবনের সব অনাকাঙ্ক্ষিত বিষাদ ছেঁটে ফেলি। হাওয়ায় হাওয়ায় উড়িয়ে দিই মেকি দুঃখের ধ্বংসাবশেষ।
তাই-ই করি। কানায় কানায় ভরা সুখ সুখ অনুভবে আরো নিবিড়ভাবে চারপাশ দেখি। এই বাড়ি লাগোয়া বাড়িটার গেটের কাছে একটা শিউলিগাছ ছিল। ফুল কুড়ানো ভোরে কারা যেন আমার আগেই হাজির হতো। বারান্দা থেকে উঁকি দিয়ে দেখতাম গাছের নিচে চ্যাপ্টা ম্লান ফুল ছাড়া কোনো ফুল নেই। গাছটাও নেই এখন। টিনশেড বাড়িটার উঠানের অনেকটা জুড়ে ইট সুরকি, আরেকপাশে মাচায় ওঠানো সিম গাছ, লাজহীন কলাবতী আর মাটিতে নোয়ানো হলুদ, ম্যাজেন্টা সন্ধ্যামালতীর ঝোপ। কদিনপর শিউলির মতো এরাও এ বাড়ির মায়া ছাড়বে। বাম পাশের মতো এ দিকটাতেও ধাই ধাই করে উঠবে নতুন ভবন।
মাটি গিলে খায় মানুষ, মানুষকে গিলে খায় লোভ। লোভের শিখা লকলকিয়ে ওঠে, কৃষকের সোনা বরণ মাটি পোড়ায়। আমি পুড়ি। ভোরের বাতাসে ছাই মাখামাখি শরীর এলিয়ে দিই।
পাখিদের কলরোল থামেনি এখনো। বাড়ির পাশের জলপাই গাছে জটলা বেঁধে শলাপরামর্শ করছে। ওরা থাকুক ওদের মতো। আমি টবের গাছগুলোতে পানি দিতে গিয়ে দেখি রাতের বৃষ্টি ওদের আপাদমস্তক ভিজিয়ে দিয়ে গেছে। সবুজ পাতার শিশিরবিন্দু ঝরবে ঝরবে করছে। বৈশাখের খরতাপে ঝিমিয়ে পড়া গাছগুলো একরাতের মধ্যেই চকমকিয়ে উঠেছে। ম্যাজিক!
সাতরাজার ধনরত্নের মতো এদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি। স্পাইডার প্লান্ট, কসমস, পুদিনা, তুলসি, মেহেদি, পুঁইলতা...এদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে বুকের ভেতরে কী একটা হয়। গতকাল খবরে দেখেছি সোনালি ধানে আগুন লাগিয়ে কৃষক আগুনচোখে দেখছে। ঝিরঝির বাতাসে আগুনের শিখা দুলছে...দুলছে...কৃষক কাঁপছে। তার রোদে পোড়া চেহারায় আগুনের আঁচ।
আমার বুকের আগুন জল হয়ে যায়। বোম্বাই মরিচ গাছটায় ঝুমঝুমিয়ে মরিচ এসেছে, পূর্ণগর্ভা গাছের পাতায় আঙুল দিয়ে খেলি। শিশিরের টুংটাং ছন্দে সন্ধ্যাজির গান কানের কাছে বাজে, ‘কী মিষ্টি দেখো মিষ্টি কী মিষ্টি এ সকাল। সোনা ঝরছে, ঝরে পড়ছে কী মিষ্টি এ সকাল।’
কান পাতি। পাড়া জাগেনি এখনো। আশেপাশের সব বাড়ি সুরহীন আনন্দে এখনো ঘুমাচ্ছে। ছেলেবেলায় বাবার ঘরে ক্যাসেট প্লেয়ারে হৈমন্তী শুক্লার গান বাজতো, ‘ডাকে পাখি খোলো আঁখি দেখো সোনালী আকাশ বহে ভোরের ও বাতাস।’ এখন সব বাড়ির আদি রেডিও কিংবা ক্যাসেট প্লেয়ার মিউজিয়ামে। স্মার্ট জীবনে অভ্যস্ত শহরবাসীর রাতজাগা ক্লান্তির ঘুম হয়তো এখনই গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে। রোমে রোমে প্রভাতিয়া লাগার শৈশব এখন আমার আত্মজারও নেই।
পুঁইলতার বড় বড় পাতা গোল গোল নকশায় কেটে খেয়ে গেছে শুককীট। গাঢ় বাদামী রঙা ডানার সাদা দাগ কাটা একটা শরীর পাতার আড়ালে লুকিয়ে আছে। আগ্রাসী হাতে পাতাটা ছেঁটে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলি পিচঢালা রাস্তায়। যাক, মরুক গে...
মনের কাদামাটি এখনো নরম। সেখানে লম্বা ঠোঁট দিয়ে একটা ধবল বক হলুদ ঠোঁটে ছপছপ করে কিছু একটা খুঁড়ে চলে। আজকাল প্রায় সকালেই এমন হয়। সময় জানান দিচ্ছে, বয়স হচ্ছে। বুকের ভেতর নীরবে বাড়ছে শংকা-আশংকার চোরা শেকড়। হুশহাশ করে আপদ তাড়াই। যায় না। দুই পা দিয়ে বুকের পাঁজর খামচে ঠিক দাঁড়িয়ে থাকে। চোখের সামনে আগুনের শিখা সদর্পে দাঁড়ায় আবার। কৃষকের আগুনচোখ এখন অবনত। আমি পালাই।
গোলাপগাছে একটা লাল ফড়িং এসে বসেছে। নতুন কুঁড়ির মোহে নির্জীব বসে থাকা ফড়িংটাকে আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দিই। চুপচাপ আদরলোভীর মতো বসে থাকে। ছেলেবেলার মতো অবাক হয়ে ছেলেকে ডাকি, ‘আয়, আয়, ফড়িং দেখবি আয়!’ ‘কই মা?’ মায়াবী কণ্ঠে বিরক্তি জড়ানো। ছোট ছোট পা দুটি আমার পায়ের সমান্তরালে এসে দাঁড়ায়। এবার আমি ফড়িং রেখে ছোট্ট চঞ্চল পা দুটি দেখতে থাকি। শুনতে থাকি, মেঘ ভাঙা বিজলির হাসি।
আহ!দৃশ্যত এ সকাল আশ্চর্য সুন্দর। এরচেয়েও অদ্ভুত সুন্দর এই বেঁচে থাকা। সেই সুন্দরের ঘোরে নিমগ্ন হতে হতে টের পাই, সব আগুন নিভে গেছে।

-ব্যক্তিগত গদ্য