নীতেশের লাল ব্লাউজ

শুভ্র সরকার




দূরে একটা কুকুর হাই তুলছে। আর তাকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছে নীতেশ।

এদিকে মহিষের স্নান শেষে ফাঁকা শালতার গাঙ জুড়ে দুপুরের সন্ত্রাস। গাঙের জলে মহিষের পশম মনে করিয়ে দেয় কোথাও শীতকাল মা হারা মেয়ের মতো পথ ভুলে গেছে ঘরে ফেরার। সমস্তকিছু একপাশে সরিয়ে পারাপারহীন নৌকায় মাঝিদের সাথে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে শামুকের খোল। হাঁসের গুগলি খাওয়া সন্ধ্যাবেলা আটকে আছে পুকুরের খাঁজে। কেউ তার হাত ধরে নিয়ে আসুক।

তখন তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বেলে মা’র জড়োহাতে প্রণামের শেষটুকু নিয়ে দৌঁড়ে পালিয়ে যাচ্ছে সদ্য কৈশোর পেরোনো নীতেশ। কীর্তন শেষে বাড়ি ফেরা গাইয়েদের কাঁধে ঝোলানো পুটলিতে জল বাতাসার শান্তি হয়ে থাকে সে।

নীতেশদের উঠোন শেষেই ধানখেত। খেত জুড়ে পাশের বাড়ির নতুন বউটার গায়ে পড়া স্বভাব পেয়েছে হাওয়া। নুয়ে আছে পেকে ওঠা ধানের ছড়ায়। ধানখেত ফেটে চোখের মতো দুটো পুকুর তাকিয়ে আছে। পুকুর পাড়ে মেহগনি, জল ছুঁইছুঁই নারিকেল, হেলেঞ্চা, কলমির বোঝাপড়া। খলসে মাছের বাদরামিতে ককিয়ে ওঠা জলের সরলতা। তার মধ্য দিয়েই পুকুর থেকে চান সেরে একা আলপথ আবার ফিরে এসেছে উঠোনে। হাঁসের দুলতে থাকা গলা সেই পথে ধরে চলে যাচ্ছে।

‘মা, গামছা দাও। চান করে আসি’— নীতেশের এই কথায় রূপকথা নেমে আসে ধানের মতো পেকে ওঠা রোদে। একবার পুকুরের আধকোমড় জলে দাঁড়িয়ে আমার হাতটা নিয়ে ওর বুকের ওপর রেখেছিল। আর আমার আঙুলে যেন সমস্ত প্রকৃতি এসে ভর করল। জলে অল্প দোল খাচ্ছে ছায়াদের ঘনিষ্ঠতা। কেউ যেন আত্মাটা ডেকে নিয়ে গেছে। এযেন স্তনের আকাঙ্ক্ষায় চর জেগে আছে নদীর। এত মরু! আমার আঙুল শুকিয়ে যায়। জ্বর পায়।

নীতেশ আমাকে ঠোঁটের ফাঁকে জ্বর লুকিয়ে রাখতে শেখায়। ট্রেনের হুইসেল, পাখির শিস, জ্যোৎস্নার সেতার, ভাঙা মেলা, হাতের ভিতর হাত রেখে ঘোরার আনন্দ আর শেখায় ভেজা শরীর কীভাবে রেললাইনের পাশে আঁড়ে টানিয়ে শুকোতে হয়। না শুকোনো নীল সালোয়ার আর লাল রঙের ব্লাউজে নিজের ব্যথা লুকিয়ে রাখত নীতেশ। ব্যথারা পেকে উঠলে নীতেশ সবকিছু ছাড়িয়ে চলে যেত। যতদূর গেলে দুই আঙুলের ফাঁকে গোটা একটা মানুষ এঁটে যায়।

বুক টানটান করে কোমরটা অল্প পেছনে বাঁকিয়ে শাড়ির কুঁচি গুঁজতে দেখেছিলাম নীতেশকে। এভাবে সুন্দর দেখায় ওকে। ফুলের টবে জল দিতে অল্প ঝুঁকে পড়া মেয়েদের মতন লাগে ওকে। বহুবার নীতেশকে আমি লাল ব্লাউজ পরতে দেখেছি। কালো রঙের বোতাম। আমায় খুলতে বলত। আমি দৌঁড়ে পালাতাম।

রেললাইন হাতের বাঁয়ে রেখে পাকার মোড় পেরিয়ে স্কুলের মাঠে পৌঁছে যেতাম। শিমুল গাছের আড়াল নিয়ে বসতাম। আমার পেছনে স্কুলঘর— সারাদুপুর মাঠে দৌঁড়ে বেড়ানো ময়লা জামায় বাড়ি ফেরা ছেলেটির মতো পুরনো তার চেহারা। দালান ছুঁয়েই জবাফুলগাছ। গাছটার আড়াল নিয়ে সবুজ রঙ করা জানলা। এই জানলার গ্রিল ধরে নীতেশ দাঁড়িয়ে থাকে— যখন খুব রোদ করে, ভীষণ বৃষ্টি হয়, এমনকি যখন জানলা বন্ধ থাকে তখনও।

এই জানলার ধারেই প্রথম নীতেশকে দেখেছিলাম। কবরের মাটির মতো পরিচর্যাহীন চুল। তেলের সাথে ওদের জলের সম্পর্ক। সেদিন ক্লাসে ছয় ঋতুর নাম জানতে চাইলে কে যেন সেদিন বলেছিল— গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্ত শীত ও নীতেশ। মুখভর্তি বসন্তের দাগ নিয়ে নীতেশ তখন জানলার বাইরে জোড়া শালিকের পথ খুঁজে বের করছে। বিভিন্ন কিছু হতে চেয়েছিলাম আমরা। কেউ স্কুল মাষ্টার, কেউ কালেক্টর, কেউ উকিল, কেউ ডাক্তার। অথচ শুধু আমি জানি নীতেশ একা হতে চেয়েছিল।

একা হবার অভ্যাস থেকে আমিই প্রতিবার ওকে টেনে পৃথিবীতে নামিয়ে এনেছি। নামিয়ে আনা অনেকটা হাতার ভাঁজ খোলার মতো। জামা থেকে ভাঙা বোতামের শ্মশানযাত্রা যেমন। সেবার আমার স্কুলের জামার বোতাম ভেঙে গেল নীতেশ কালো রঙের বোতাম লাগিয়ে দিয়েছিল। হয়ত সাদা রঙের কোন বোতাম ওর কাছে ছিল না। আবার এমনও হতে পারে— ও চাইত আমি কালো রঙের বোতাম খুলি। জামাটা পরে স্কুলে গেলে বন্ধুরা হাসাহাসি করেছিল খুব। নীতেশ কখনও হাসত না। ও ওই বোতামটায় আঙুল ছুঁয়ে বলেছিল— স্তন। আর আমরা বড় হয়ে গেলাম ।

পাতারাও তো বড় হয়ে গেলে আলগা হতে শেখে গাছের কাছ থেকে। যে নারী কিছুক্ষণ আগে জন্ম দিয়েছে মৃত সন্তানের, তার কাছ থেকেও পৃথিবী শিখে নেয় পর করে দিতে। সম্পর্কের মধ্যে যে চারাগাছ ক্রমশ বৃক্ষজীবন পায়। তার মসৃণ বুক কেটে দরজা বানাই। এরপর নীতেশের মুখের ওপর একদিন ওই দরজা বন্ধ করে দিই।

নীতেশদের বাড়ির উত্তর পাশে ছিল হারান মুন্সীর কবর। কবরটা দু’টো বাড়ির মধ্যে পাঁচিল হয়ে আছে। এদিকের হাওয়ারও ওদিকে যেতে মানা। ধুলোগুলোও নিরুপায় হয়ে শুয়ে থাকে। অথচ এখন প্রায়ই মাঝরাতে, মুন্সী বাড়ির বড় ছেলেকে দেখি— সাপে কাটা মানুষের মতো দাপাদাপি করতে থাকা হারিকেনের আলোয় নীতেশের ঘরে থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।