ভোরবেলার আলো

সৈকত দে


কোনো এক নক্ষত্রপথে ফেলে আসা প্রেমিকার সাথে হাঁটতে হাঁটতে তলপেটে চাপ অনুভব করে ঘুম ভেঙে যেতে চারদিকে অন্ধকার, শরীরের উপর বউয়ের হাত আলতো করে নামিয়ে, লালচে ডিম লাইটের আলোয় তার ঘুমন্ত মুখ দেখে আশ্চর্য মায়া লাগায়, গালের উপর কাশফুলের নরম ছোঁয়ার মতন হালকা চুমু দিয়ে, বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে কাশফুল উপমার সৌজন্যে প্রথমকৈশোরে দেখা জন্মনিয়ন্ত্রণ ট্যাবলেটের স্মৃতি মনে পড়ে গেলে নিজে নিজে হেসে ফেলে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগে, কম্পিউটার টেবিলে চার্জে রাখা মোবাইলের চার্জিং বন্ধ করে হাতে নিয়ে দু'টো জিনিস একসাথে দেখে ফেলে। প্রথমত, এখন ভোর সোয়া চারটে এবং একটি মেসেজ ডিসপ্লেতে: মঈন ভাই আর নাই রে; মেসেজটা স্কুলফ্রেন্ড বাবুর। ঘুমচোখে মেসেজটার তাৎপর্য উপলব্ধির আগেই তলপেট খালি, হাতে মুখে মাথায় জল দিয়ে বেরিয়ে এমনকি এক গ্লাস কণ্ঠনালীপথে নেমে গেলো। তার বাদে অনলাইন হতেই ফেসবুকে মঈন ভাইয়ের হাসিমাখা অনেক অনেক ছবি, বন্ধু ও ছোটো ভাইয়েদের পোস্টে স্মৃতিকথা ও শোক ভরা বর্ষার মতন ঝরে পড়তে দেখে আস্তে মাথা পরিষ্কার হয়ে এলো, বাস্তবতা দেখে স্তব্ধ। নিরু দত্ত এখন নিছক শ্বাসপ্রশ্বাসসহ এক জোম্বিপুতুল এবং তার মানসিক অবস্থা বিবৃতির ক্ষমতা লেখকের নেই বলে প্রসঙ্গান্তর... একটা মানুষ, আছে আর নেই, বিস্তর ফারাক তৈরি করে দেয়। আবার একেবারে না থাকাও তো কারো পক্ষে সম্ভব না৷ সকল মানুষ-ই যৌথ স্মৃতির অংশ, কারো না কারো স্মৃতিতে মানুষ অমর হয়-ই, তার এক বিন্দু নিঃশ্বাস অন্তত পৃথিবীর বুকে থেকে যায়। যেমন, শ্রমিক রাজনীতি করতে করতে পথনাটকে আসা মিন্টুর কথা মনে পড়ে, মিন্টু সর্দার। নিরুর কাছাকাছি বয়সী৷ কিছুদুর পড়েছিলো অথচ তার ভাষ্যমতে, এখন অনেক কিছু মনে নেই, প্রতি শুক্রবার সকালে ঘন্টাখানেক সময় দিতো। বাংলা বর্ণমালা, সহজ কবিতা পড়া চলতো। একদিন, রাতের বেলা খেয়েদেয়ে বই একটা নিয়ে বিছানায় শুয়েছে নিরু, এসে উদয় হলো মিন্টু, দুমদুম শাটারে শব্দ, তখন পৈতৃক মিষ্টির দোকানের দোতলায় নিরুর বাস। নিচে নেমে আসতে অনেকগুলো টুকরো কাগজ গছিয়ে দেয়ার চেষ্টা ও বিধ্বস্ত চেহারা। কিছু সহিষ্ণু চেষ্টার পর জানা গেলো, প্রেম ভেঙে গেছে প্রেমিকা সব চিঠি দয়ে গিয়েছে, মিন্টুর ধারণা, বানান ভুলের কারণেই। এবং, সেইজন্যেই চিঠিগুলি প্রবল ব্যক্তিগত হওয়া সত্ত্বেও পড়তেই হবে নিরুকে। বহু কষ্টে বিদায় দিয়ে অত্যন্ত বিরক্ত মুখে চিঠির গোছা নিয়ে বিছানাত ফেরা, একটা বই দিয়ে চাপা ও শেষ রাতে ঘুম ভেঙে গেলে ঘুম আর না আসায় চিঠি নিয়ে বসা এবং বিরক্তির সর্বশেষ সীমায় যেতে যেতে অকস্মাৎ একটি পৃষ্ঠার মাত্র তিনটি বাক্যে থমকে যায় এবং স্তম্ভিত অবস্থায় বিছানা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ে, ভোরের আলো ফুটছে আর বাক্য তিনটি এমন: ছায়ামাত্র দুটি কথা স্পেস তুমি আছো স্পেস তুমি নেই ডাবল স্পেস নেই মানে একেবারে নেই, একটি এ ফোর সাদা কাগজে এই তিনটি মাত্র বাক্য। স্পেস সংস্থান কেমন করে শিখলো! নিরু তো শেখায়নি। কর্ণফুলীর পাড়ে যে জেলে পাড়া সেখানেই মিন্টুকে খুঁজে পাওয়া গেলো- চোখ মুছতে মুছতে সে নিরুকে দেখে চমকায় আর নিরু চেপে ধরে : 'কোথা থেকে দেখে লিখেছো বলো এই তিন লাইন!' নাকের সামনে এ ফোর সাইজের সাদা পায়রার বুক। মিন্টু আস্তে আস্তে ঘরের কাছেই মজা নদীর অংশে কবেকার এক ছিন্ন নৌকার আধভাঙা গলুইয়ে বসে, ভোরের বাতাসে তার সিনেমার মতন চুল ওড়ে, আস্তে বলে,' এসে গেলো ভাই।' মঈন ভাইয়েরা যখন 'সুবর্ণরেখা' অল্টারনেটিভ ফিল্ম ক্লাব করলো, সেখানে মিন্টু ছিলো কিচেনের দায়িত্বে। মসুরির ডালে পিষে মুখে মেখে, মুখে মার্বেল নিয়ে বসে থাকতো। আরেকটু ফর্সা হতে চাওয়া কিংবা উচ্চারণের জড়তা কাটাতে চাওয়া। স্বপ্ন সফল না হলেও এখন অন্যভাবে স্বস্তির জীবন কাটাচ্ছে, বিয়ে ও সন্তান, শীর্ণ স্বাস্থ্য নধর হয়ে উঠেছে। প্রতিটি শহরে এমন দু দশজন স্বপ্নের চিল থাকে, আকাশের অনেকটা উপরে উড়ে বেড়াতে চায়। এখন, নিরুর চেয়ারে বসাটি লক্ষ্য করা যাক। মেসেঞ্জারে সে দেখবে, মাটি মঈন ভাইয়ের বাড়ির দিকে যাচ্ছে। সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। চিৎকার করে কাঁদলে ঘরের সবাই উঠে যেতে পারে। তার তো এই সংসারে কন্ট্রিবিউশন নেই, শুধু শুধু সবার ঘুম ভাঙানোর দরকার নেই কিন্তু সারা শরীর থরথর কাঁপছে কান্না চেপে রাখতে গিয়ে। নিজেকে কোনোমতে চেয়ার থেকে তুলে চার তলা থেকে নিচে নামতে গিয়ে দেখা গেলো, বাড়িওয়ালা ফজরের নামাজ পড়তে যাওয়ার জন্যে গেট খুলছেন। নিরু বেরিয়ে এলো। খাজা গরিবুল্লাহ শাহ হাউজিং কলোনি এখন বেশ শান্ত। একটি দুটি নিভে আসা তারার মতন শান্ত মানুষ পরকাল কিংবা ইহকালের স্বাস্থ্যের দিকে ছুটে যাচ্ছেন। এলাকার প্রতাপশালী অনেক সন্তানের বাবা কুকুরটি এখন এই কুল ওয়েদারে আরামে ঘুমোচ্ছে। অবিকল মানুষের মতন সে ঘুমের ঘোরে নিজেকে খানিক চুলকে নেয়। খানিক এগোতে কাঁচা বাজার, খানিক বেলা হলে যে ছাগলেরা কাটা পড়ে নানারকম আয়ের গৃহস্থবাড়িতে নানারকম পরিমাণে ঢুকে যাবে, তারা করবার কিছু না পেয়ে কাঁঠাল পাতা চিবোচ্ছে। ব্রয়লার মুরগিসমাজ অপেক্ষাকৃত শান্ত, কোনো প্রতিবাদ নেই। মাত্র তিরিশ বছর আগেও নাকি এলাকাটা পুরো জঙ্গল ছিলো আর অনেকটা সস্তায় জমি পাওয়া যেতো। বাবাকে কি মুখ ফসকে গালি দিয়ে ফেললো নিরু! পাশের গরিবুল্লাহ মাজার কবরস্থানে শুয়ে আছেন বাঙালি ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম, অতি অবহেলায়। ইশ! তাঁর ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের বই সব ফুটপাথে চলে এলো। প্রতিটি বইতে তাঁর পেন্সিলের দাগ। বই বড়ো আদরের জিনিস। এর চেয়ে বেশি কিছু ভালোবেসেছি কি! ভোরের বাতাস গায়ে লাগাতে লাগাতে নিজেকে বলে। জিইসি মোড়ের রাস্তা পার হতে হতে আবার মঈন ভাইয়ের স্মৃতি মাথাচাড়া দেয়। প্রথম স্মৃতি কি? মনে নেই। এইটুকু মনে আছে, যতক্ষণ কথা বলতেন অনেক বই আর সিনেমার অনুষঙ্গ জেনে নেয়া যেত। নিরুর মতন আগ্রহীদের নিজ থেকেই দিতেন৷ প্রিয় লেখক দস্তয়েভস্কি শরৎচন্দ্র আর পাওলো কোয়েলহো। কিরণময়ী আর নাস্তাশিয়ার কথা বলছেন অন্তরঙ্গ আড্ডায়। শরৎচন্দ্রকে সহ্য হতো না নিরুর। কেমন গ্যাদগেদে গদ্য! ধমকাতেন মঈন ভাই। হায়! আজো একটাও কোয়েলহো পড়ে নাই নিরু। মাঝে ফেসবুকে দেখেছে যারা ভ্যানিগাড়িতে করে তাঁর বইয়ের পাইরেট এডিশন বিক্রি করে পাওলো তাঁদের প্রশংসা করেছেন, বলেছেন,এটা জীবনযাপনের সৎ উপায়। গোলপাহাড় কালীবাড়ির সামনে দিয়ে যেতে অভ্যাসবশত মন্দিরের দিকে তাকায়। ধর্মের সাথে তার সম্পর্ক পুরাণকথা আর স্থাপত্যসুন্দর, এইমাত্র! পাশেই মহাশ্মশান, এক অতি প্রিয় হয়ে ওঠা দেড় দিন বয়সী শিশু ওখানে ঘুমিয়ে আছে, অনেকক্ষণ ভেবেও আজকাল জন্ম ও মৃত্যুর দিন গুলিয়ে ফেলে। খালি মনে আছে, সকালের দিকে পোলানস্কির রিপালসানে সেই তীব্র প্রেমিকাকে দেখেছিলো, তারপরেই বাবার ফোন, শিশুটির মাথায় হাত রেখে হার্টবিট টের পাওয়া, লাইফ সাপোর্ট আর কিছু ভাবা যায় না যেন জলছাপ কিংবা স্কুলবেলার ড্রইং খাতার সাদা পাতার উপর সেই পাতলা কাগজটা। নিজের স্বার্থপরতায় ঘৃণা হয় তার। প্রবর্তক মোড়ে ফুলের দোকানগুলো বন্ধ, একেবারে আশ্চর্য নয় যে, ফুলদোকানগুলোর লাগোয়া নালা- এইভাবে সুন্দর অসুন্দর ইতিহাসের শুরু থেকেই পাশাপাশি থাকে। আকাশ এতোক্ষণ গাঢ় নীল ছিলো, যেন ছেলেবেলার রবিন লিকুইড ব্লুতে ধোয়া নীলচে সাদা রঙ, আস্তে আস্তে ফুটে উঠছে সাদা আলো। হাসপাতালের মর্গের ঠিক উল্টোদিকে লোটাস নামের যে উচ্চমধ্যবিত্ত রেস্টুরেন্ট সেইখানে এক কবিযশোপ্রার্থী মেয়েকবির কবিতা শুনতে কবিতা শুনতে হতো মুরগির পা খেতে খেতে, বিল সে দিতো বলে পুষিয়ে যেতো, যদিও মর্গের ঠিক উল্টোদিকে বসে মুরগি খেতে তার পুরোপুরি স্বস্তি লাগতো না৷ কিন্তু জীবনকে কোথাও না কোথাও স্বীকার করতেই হবে। মেডিকেল স্টাফ কোয়ার্টার পার হবার সময় আজো মাথা ঘুরিয়ে মেন গেটের সোজা সামনের দালানের নিচতলার ফ্ল্যাটের দরজার দিকে চোখ যায়। একুশ বছর আগের একতরফা প্রেমিকার বাসা। এখন অবশ্য আবেগ অবশিষ্ট নেই, খালি মাথাটা ঘুরে যায় অই হলুদ বালব লাগানো দরজার দিকে। মন খালি জানতে চায়, ভালো আছে তো সে? চকবাজারের মোড়েই ছিলো সুবিখ্যাত গুলজার সিনেমা হল, এই হলে সিনেমা দেখার বয়স হতে হতে সিনেমা হল ভেঙে শপিং কমপ্লেক্স হওয়ার আগে কয়েকটা সিনেমা তো দেখেইছে- বিশেষত, আম্মাজান! মান্না কেন যে আরো ভালোভাবে ব্যবহৃত হলেন না! মঈন ভাইয়ের মনটাও খোলা ছিলো। প্রায় সেনাবাহিনি ট্রেনিং এর মতন ডগমাটিক, অর্থহীন নিয়মে আবদ্ধ বামপন্থী দলটিও তাঁকে পুরো গ্রাস করতে পারেনি। ইউরোপিয়ান নায়িকাদের নির্লোম পদযুগল থেকেও তিনি শিল্প আস্বাদে সক্ষম ছিলেন। দু হাজার তিনের মংলা লংমার্চ এবং দু হাজার ছয়ের কুড়িগ্রাম লং মার্চ কী তার, নিরুর, উন্মাদদশাতেও মনে পড়বে না! অধিকাংশ বামপন্থী ছেলেমেয়েদের কাছে এ একটা পিকনিক কিংবা শিক্ষা সফর। দেশটা পায়ে হেঁটে দেখে নেয়ার সুযোগ, প্রতিদিন নতুন জেলা প্রতিদিন নতুন নদী। বগুড়ার একটু আগে এক পথসভা থেকে, ইচ্ছেকৃত ছিটকে গিয়ে, নিরু আর মঈন ভাই হাঁটতে হাঁটতে এক অবহেলিত ভাঙা মন্দিরে উপস্থিত হয়ে দেখে এইখানে প্রতিমাটিও জৌলুসহীন, রংচটা, ফুল শুকিয়ে গেছে। 'প্রার্থনাও একদিন ফুরিয়ে যায় রে, নিরু। ' মঈন বলেছিলেন। এই চকবাজার, আরব্য রজনীর বাগদাদ যেন! কতোই না রহস্য! প্রধানতম রহস্য ভরত স্যার। শহরের সব ফাঁকিবাজ, ইয়ারড্রপ স্টুডেন্ট তাঁর কাছে। কো-এড, ফলে স্যারের বাসার ছাদে লুকিয়ে চুমু, জড়িয়ে ধরা, বেশিরভাগ আসতে চাইতো সন্ধার ব্যাচে কেন না বিকেলের ব্যাচ চলাকালীন ছাদের নির্জন। পরে বিয়ে হতো বা হতো না, মেদুর আলোর মতন এই প্রেম চকবাজারে অপ্রতিরোধ্য। একটি রচনাতেই স্যার যাবতীয় যাত্রা শেষ- উড়োজাহাজ, জলের জাহাজ কিংবা বাস ট্রেন রিক্সা। খালি বলতেন, বাবারা, ট্রেন আকাশে চালাইও না, নৌকা রাস্তায় তুলিও না। এই স্যারের বাসাতেই প্রথম প্রেম, একতরফা, চুপচাপ মেয়েটি, বন্দনাপ্রভা দাশ, তার উপস্থিতিই এক রাশ উজ্জ্বলতা। প্যারেডের মাঠ পুরোপুরি জেগে উঠেছে। মানুষজন এখন স্বাস্থ্যসচেতন। ভোর, খানিক ছোটাছুটি, সারাদিন মন ভালো রাখে। নিরু প্রতিদিন ভোরে উঠবে ভেবেও পারে না। শতাব্দীপ্রাচীন মসজিদের কারুকাজ খানিক মুগ্ধ হয়ে দেখে। আমাদের পূর্বপুরুষ আমাদের চেয়ে সুন্দর আর জ্ঞানী ছিলেন নিশ্চয়ই।

****
খাজা গরিবুল্লাহ শাহ হাউজিং কলোনি এখন বেশ শান্ত। একটি দুটি নিভে আসা তারার মতন শান্ত মানুষ পরকাল কিংবা ইহকালের স্বাস্থ্যের দিকে ছুটে যাচ্ছেন। এলাকার প্রতাপশালী অনেক সন্তানের বাবা কুকুরটি এখন এই কুল ওয়েদারে আরামে ঘুমোচ্ছে। অবিকল মানুষের মতন সে ঘুমের ঘোরে নিজেকে খানিক চুলকে নেয়। খানিক এগোতে কাঁচা বাজার, খানিক বেলা হলে যে ছাগলেরা কাটা পড়ে নানারকম আয়ের গৃহস্থবাড়িতে নানারকম পরিমাণে ঢুকে যাবে, তারা করবার কিছু না পেয়ে কাঁঠাল পাতা চিবোচ্ছে। ব্রয়লার মুরগিসমাজ অপেক্ষাকৃত শান্ত, কোনো প্রতিবাদ নেই। মাত্র তিরিশ বছর আগেও নাকি এলাকাটা পুরো জঙ্গল ছিলো আর অনেকটা সস্তায় জমি পাওয়া যেতো। বাবাকে কি মুখ ফসকে গালি দিয়ে ফেললো নিরু! পাশের গরিবুল্লাহ মাজার কবরস্থানে শুয়ে আছেন বাঙালি ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম, অতি অবহেলায়। ইশ! তাঁর ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের বই সব ফুটপাথে চলে এলো। প্রতিটি বইতে তাঁর পেন্সিলের দাগ। বই বড়ো আদরের জিনিস। এর চেয়ে বেশি কিছু ভালোবেসেছি কি! ভোরের বাতাস গায়ে লাগাতে লাগাতে নিজেকে বলে। জিইসি মোড়ের রাস্তা পার হতে হতে আবার মঈন ভাইয়ের স্মৃতি মাথাচাড়া দেয়। প্রথম স্মৃতি কি? মনে নেই। এইটুকু মনে আছে, যতক্ষণ কথা বলতেন অনেক বই আর সিনেমার অনুষঙ্গ জেনে নেয়া যেত। নিরুর মতন আগ্রহীদের নিজ থেকেই দিতেন৷ প্রিয় লেখক দস্তয়েভস্কি শরৎচন্দ্র আর পাওলো কোয়েলহো। কিরণময়ী আর নাস্তাশিয়ার কথা বলছেন অন্তরঙ্গ আড্ডায়। শরৎচন্দ্রকে সহ্য হতো না নিরুর। কেমন গ্যাদগেদে গদ্য! ধমকাতেন মঈন ভাই। হায়! আজো একটাও কোয়েলহো পড়ে নাই নিরু। মাঝে ফেসবুকে দেখেছে যারা ভ্যানিগাড়িতে করে তাঁর বইয়ের পাইরেট এডিশন বিক্রি করে পাওলো তাঁদের প্রশংসা করেছেন, বলেছেন,এটা জীবনযাপনের সৎ উপায়। গোলপাহাড় কালীবাড়ির সামনে দিয়ে যেতে অভ্যাসবশত মন্দিরের দিকে তাকায়। ধর্মের সাথে তার সম্পর্ক পুরাণকথা আর স্থাপত্যসুন্দর, এইমাত্র! পাশেই মহাশ্মশান, এক অতি প্রিয় হয়ে ওঠা দেড় দিন বয়সী শিশু ওখানে ঘুমিয়ে আছে, অনেকক্ষণ ভেবেও আজকাল জন্ম ও মৃত্যুর দিন গুলিয়ে ফেলে। খালি মনে আছে, সকালের দিকে পোলানস্কির রিপালসানে সেই তীব্র প্রেমিকাকে দেখেছিলো, তারপরেই বাবার ফোন, শিশুটির মাথায় হাত রেখে হার্টবিট টের পাওয়া, লাইফ সাপোর্ট আর কিছু ভাবা যায় না যেন জলছাপ কিংবা স্কুলবেলার ড্রইং খাতার সাদা পাতার উপর সেই পাতলা কাগজটা। নিজের স্বার্থপরতায় ঘৃণা হয় তার। প্রবর্তক মোড়ে ফুলের দোকানগুলো বন্ধ, একেবারে আশ্চর্য নয় যে, ফুলদোকানগুলোর লাগোয়া নালা- এইভাবে সুন্দর অসুন্দর ইতিহাসের শুরু থেকেই পাশাপাশি থাকে। আকাশ এতোক্ষণ গাঢ় নীল ছিলো, যেন ছেলেবেলার রবিন লিকুইড ব্লুতে ধোয়া নীলচে সাদা রঙ, আস্তে আস্তে ফুটে উঠছে সাদা আলো। হাসপাতালের মর্গের ঠিক উল্টোদিকে লোটাস নামের যে উচ্চমধ্যবিত্ত রেস্টুরেন্ট সেইখানে এক কবিযশোপ্রার্থী মেয়েকবির কবিতা শুনতে কবিতা শুনতে হতো মুরগির পা খেতে খেতে, বিল সে দিতো বলে পুষিয়ে যেতো, যদিও মর্গের ঠিক উল্টোদিকে বসে মুরগি খেতে তার পুরোপুরি স্বস্তি লাগতো না৷ কিন্তু জীবনকে কোথাও না কোথাও স্বীকার করতেই হবে। মেডিকেল স্টাফ কোয়ার্টার পার হবার সময় আজো মাথা ঘুরিয়ে মেন গেটের সোজা সামনের দালানের নিচতলার ফ্ল্যাটের দরজার দিকে চোখ যায়। একুশ বছর আগের একতরফা প্রেমিকার বাসা। এখন অবশ্য আবেগ অবশিষ্ট নেই, খালি মাথাটা ঘুরে যায় অই হলুদ বালব লাগানো দরজার দিকে। মন খালি জানতে চায়, ভালো আছে তো সে? চকবাজারের মোড়েই ছিলো সুবিখ্যাত গুলজার সিনেমা হল, এই হলে সিনেমা দেখার বয়স হতে হতে সিনেমা হল ভেঙে শপিং কমপ্লেক্স হওয়ার আগে কয়েকটা সিনেমা তো দেখেইছে- বিশেষত, আম্মাজান! মান্না কেন যে আরো ভালোভাবে ব্যবহৃত হলেন না! মঈন ভাইয়ের মনটাও খোলা ছিলো। প্রায় সেনাবাহিনি ট্রেনিং এর মতন ডগমাটিক, অর্থহীন নিয়মে আবদ্ধ বামপন্থী দলটিও তাঁকে পুরো গ্রাস করতে পারেনি। ইউরোপিয়ান নায়িকাদের নির্লোম পদযুগল থেকেও তিনি শিল্প আস্বাদে সক্ষম ছিলেন। দু হাজার তিনের মংলা লংমার্চ এবং দু হাজার ছয়ের কুড়িগ্রাম লং মার্চ কী তার, নিরুর, উন্মাদদশাতেও মনে পড়বে না! অধিকাংশ বামপন্থী ছেলেমেয়েদের কাছে এ একটা পিকনিক কিংবা শিক্ষা সফর। দেশটা পায়ে হেঁটে দেখে নেয়ার সুযোগ, প্রতিদিন নতুন জেলা প্রতিদিন নতুন নদী। বগুড়ার একটু আগে এক পথসভা থেকে, ইচ্ছেকৃত ছিটকে গিয়ে, নিরু আর মঈন ভাই হাঁটতে হাঁটতে এক অবহেলিত ভাঙা মন্দিরে উপস্থিত হয়ে দেখে এইখানে প্রতিমাটিও জৌলুসহীন, রংচটা, ফুল শুকিয়ে গেছে। 'প্রার্থনাও একদিন ফুরিয়ে যায় রে, নিরু। ' মঈন বলেছিলেন। এই চকবাজার, আরব্য রজনীর বাগদাদ যেন! কতোই না রহস্য! প্রধানতম রহস্য ভরত স্যার। শহরের সব ফাঁকিবাজ, ইয়ারড্রপ স্টুডেন্ট তাঁর কাছে। কো-এড, ফলে স্যারের বাসার ছাদে লুকিয়ে চুমু, জড়িয়ে ধরা, বেশিরভাগ আসতে চাইতো সন্ধার ব্যাচে কেন না বিকেলের ব্যাচ চলাকালীন ছাদের নির্জন। পরে বিয়ে হতো বা হতো না, মেদুর আলোর মতন এই প্রেম চকবাজারে অপ্রতিরোধ্য। একটি রচনাতেই স্যার যাবতীয় যাত্রা শেষ- উড়োজাহাজ, জলের জাহাজ কিংবা বাস ট্রেন রিক্সা। খালি বলতেন, বাবারা, ট্রেন আকাশে চালাইও না, নৌকা রাস্তায় তুলিও না। এই স্যারের বাসাতেই প্রথম প্রেম, একতরফা, চুপচাপ মেয়েটি, বন্দনাপ্রভা দাশ, তার উপস্থিতিই এক রাশ উজ্জ্বলতা। প্যারেডের মাঠ পুরোপুরি জেগে উঠেছে। মানুষজন এখন স্বাস্থ্যসচেতন। ভোর, খানিক ছোটাছুটি, সারাদিন মন ভালো রাখে। নিরু প্রতিদিন ভোরে উঠবে ভেবেও পারে না। শতাব্দীপ্রাচীন মসজিদের কারুকাজ খানিক মুগ্ধ হয়ে দেখে। আমাদের পূর্বপুরুষ আমাদের চেয়ে সুন্দর আর জ্ঞানী ছিলেন নিশ্চয়ই।
মঈন ভাইয়ের বাসা যত ঘনিয়ে আসছে, তার শরীর ও আত্মা কান্নায় ছিন্ন হচ্ছিলো। চশমা বার বার খুলে আর পরে, থেমে থেমে বিখ্যাত সেই কলোনী যার রাস্তা ঢালু নেমে গেছে, তার সামনে যখন, উল্টোদিকে সবেমাত্র কিশোর পরোটানির্মাতা তার সবটুকু ঘুমচোখের মেধায় পরোটা ভাজছে। মাত্র ছয়টা দশ। মাটিকে দেখা গেলো তারপর, আরো দু তিন বন্ধু। ঢালু পথে নেমে যেতে যেতে শেষ মাথায় নিজেদের বাড়ি মঈন ভাইদের। তার নিচতলায় কয়েকজন বিপন্ন মানুষ। এতোক্ষণে সিগারেটের তৃষ্ণা পায়। শ্যামল দা মোবাইলে মঈন ভাইয়ের ছবি দেখায়। শুয়ে আছেন একজন মানুষ, মুখ হা চোখ খোলা, বিস্ময় না ব্যথা অথবা দুটোরই মিশ্রণ। ঘরময় এক বোবাকান্না সবার শরীরে স্পষ্ট। বেলা গড়াতে থাকে। বন্ধু ছোটোভাই কমরেডদের ভীড় বাড়ে রোদের সাথে। আজ ছুটির দিন৷ স্বাধীনতা দিবস৷ আজকেই বসার কথা ছিলো, বিকেলে, দিন চারেক আগে সময় রাখতে বলেছিলেন, আমি তো সময় রেখেছিলাম মঈন ভাই। তুই কবিতা বাদ দে, গল্প লেখ, বললেন একদিন। অবশ্য এখন মাটির কাছে জানা গেলো, শেষদিকে নিরুর কবিতাও ভালো লাগছিলো তাঁর। নিজের প্রকাশনা 'তিতির' থেকে বই করতে চেয়েছিলেন দুটো। এবারই ফিরে, নিয়মে বাঁধতে চেয়েছিলেন। আসলে এলোননেস এমন এক অনুভূতি, কিছুতেই শান্তি মেলে না। নইলে সেই ঊনচল্লিশ বছর আগেই একাধিক মেয়ের মৃত্যুর পর এই ছেলে জন্মালো, শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তিনি, মঈন ভাইয়ের বাবা, বিদেশ থেকে ইনকিউবেটর নিয়ে এসেছিলেন রাতারাতি। বেঁচে উঠেছিলো ছেলে। যন্ত্র উপহার দিলেন হাসপাতালে। আসলে প্রেমই বিধ্বস্ত আর অসুখী করেছে তাঁকে৷ প্রেমের বিয়ে কিছুদিন পর ভাঙার পর আর সেরে উঠতে পারেননি। অথচ যে কদিন সম্পর্কে ছিলেন, অদ্ভুত আনন্দে ছিলেন৷ ভালো রান্না পারতেন। একদিন গভীর রাতে অনলাইন দেখে প্রশ্ন করলো, মেসেঞ্জারে: 'এতো রাতে কি সিনেমা দেখেন?' একটা স্মাইলির সাথে উত্তর এসেছিলো,' এখন আমি সিনেমা বানাই। ' বেলা আরো গড়ায়। মঈন ভাই ঢাকা থেকে আসছেন ঠান্ডা গাড়িতে৷ একলা ঘরে মরে পড়েছিলেন। সুনির্দিষ্ট জানা যায়নি মৃত্যুদিন। সবাইকে নিয়ে খেতে পছন্দ করতেন অথচ শেষ খাবারের বাক্স খুলতে পারেননি। ফোনে না পেয়ে, দরজা ভেঙে তাঁকে পাওয়া যায়। জীবনানন্দের 'নিরুপম যাত্রা' গল্পটা খুব ভালোবাসতেন। ঠিক, অই লেখার মতন জীবনের শেষ দিনগুলো৷ খুব চাইতেন মেয়ের কাছে যেতে, পারেননি৷ এবং মেয়ে তাঁকে বাবা ডাকতো না এ এক গভীর বেদনার বিষয় ছিলো। চারদিকে গাছপালা আর ঠান্ডা থাকলেও শরীর পচতে শুরু করেছিলো। মঈন ভাইকে যখন নিয়ে আসা হলো, সেই নিচতলায় রাখা হলো। মেঝেতে শুয়ে, খানিক কুঁকড়ে, শীত লাগছে নাকি তাঁর, এতোক্ষণ ফ্রিজে থেকে! নাকে তুলো, একবার খুব জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে কিন্তু দেখেই বেরিয়ে এলো। ততক্ষণে অনেক মানুষ।

***

'চারদিন আগে আজ বিকেলটা আপনি চেয়ে নিয়েছিলেন মঈন ভাই। আমি তো চুপচাপ বসে আপনার ফোনের অপেক্ষায়। সময় কি আমার এই মুহূর্তের আমাকে ধারণ করতে পারবে? আপনি তো যৌথস্মৃতির আধার। আজ একসাথে সব আপনার সাথেই ঘুমিয়ে পড়লো। একদিন বলেছিলেন, নিরু আমি ফতুর হয়ে গেলে তুই আমাকে খাওয়াবি? আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। আরেকদিন বললেন, নিরু আমাকে কি কেউ শুধু আমার জন্য ভালোবাসে? ধর যে আমার টাকাপয়সা নাই তারপরেও! আরেকদিন বললেন, তোমার কবিতা হয় না। বাদ দাও। তবে তোমার মত গদ্য কেউ লিখতে পারে না। স্থির হও। নাস্তাশিয়াকে ভালোবাসতেন খুব। ইডিয়টের। বলতেন, এই বই না পড়া অপরাধ। রব্বানীর কাছ থেকে ধার নিয়ে পড়ছি। কিন্তু এই অপরাধ মোচনের প্রাইজ কার থেকে নেবো? এবার মাটির কাছে শুনলাম, দুখানা বই করতে চেয়েছিলেন। গল্প আর কবিতার। কবিতার জন্যে স্বীকৃতিই মনে হলো। মঈন ভাই আমার কবিতার স্বীকৃতি দিয়েছেন। এমন একজন পাঠক সাতজন্মের ভাগ্য। একজন মানুষ যে আমাদের ভালোবাসতো। আমার বিন্দু মাত্র মন খারাপের আশ্রয় ছিলেন তিনি। তাঁর বাসার ছাদ। বাবামা তো জন্ম দেয়। বাকিটুকুর বেশিরভাগ মঈন ভাইয়ের তৈরি করে দেয়া। একজন দাদা স্কুলে যাওয়ার সময় যেভাবে ভাইয়ের চুল আঁচড়ে দেয়। জুতার ফিতে বেঁধে দেয়। আইস্ক্রিম কিনে দেয়। মাথায় হাত রেখে আদর করে দেয়। আজ আমি আমারই একটা অংশকে চিরতরে হারিয়ে ফেললাম৷ বাকি জীবন বয়ে বেড়াতে হবে এই বিপন্নতা। দ্য ম্যান হু লাভড আস। বিনিময়ে সেল্ফলেস ভালোবাসা চেয়েছিলো। ফোন আসছে না কেন মঈন ভাই? আমি অপেক্ষা করছি তো।'
- ডাইরিতে লেখে নিরু৷ বিকেল ঘনিয়ে এলো। বারান্দায় অনেক পাখির ডাক। পাখির ভাষা জানলে মানুষের একলা মরা কমে যেত নিশ্চয়ই। কোনো কোনো পাখি জানাতো স্নোকুইনের কথা কিংবা কোথায় সীম গাছ আকাশ ফুঁড়ে উঠে গেছে।
'আমার সম্পর্কে তোর ধারণা কি? একদিন ভরপেট চিকেন খেয়ে ও খাওয়ানোর পর গড়াগড়ি দিতে দিতে বললেন। তার আগে গামছা নিয়ে স্নান। আমি বললাম, ঈশ্বর সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা তো ভক্ত করতে পারে না।
তারপর বললেন, প্রিয় লেখক কে তোর
বললাম, রবীন্দ্রনাথ আর রসময় গুপ্ত( ফাজলামি করেই)। জোরে জোরে হাসলেন অনেক ক্ষণ, বললেন, রসময় দিস। বললাম, অরিজিনাল পাওয়া যায় না। সেদিনই বললেন, শোন মন দিয়ে দস্তয়েভস্কি পড়। দস্তয়েভস্কি পড়লে তুই অনেক স্থির হয়ে যাবি। মঈন ভাই, আমি এখন দস্তয়েভস্কি সব যোগাড় করে পড়ছি। কিন্তু কাকে বলব বলেন তো!
আমার তো কান্না শুকায় না। আমার তো ঘুম ভেঙে ভেঙে যায়।' সিগারেট ধরিয়ে এই টুকরোটাও লেখা গেলো। লেখা নিরুকে প্রকৃত মুক্তি দেয়। 'প্রেম ট্রেমের প্রতি বিশ্বাস সেদিনই চলে গিয়েছিলো যেদিন বন্ধু বসেছিলো মায়ের সাথে শ্মশানে আর তার মাস দুয়ের পুরনো প্রাক্তন সেল্ফি তুলছিলো। জীবন আসলে এইরকম। ঠিক এইরকম। যতক্ষণ বেঁচে আছো গরম ডালপুরিতে হাত দিলে গরম আর ফ্রিজ থেকে বেরনো ঠান্ডা কোকাকোলা ঠান্ডা লাগবে। আজ মরলে কাল দুদিন। ফলে মৃত্যু জিনিসটা ইজি৷ এখন নিজের যত্ন করা শিখতে হবে। যে পাশে আছে তাকে ভালোবাসো, প্রিয় বই পড়ে ফেলা আরেকবার, সম্ভব হলে দু একটা কাজ পরের প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া। এই তো। ব্যবহৃত হতে হতে শুয়োরের মাংস হবার জন্য জীবন নয়৷ জীবনানন্দ ভাবলে তাঁর ভাবনা। অই ভুল আর না ঘটাই হেলদি। ' নিরুকে আজ ডাইরিতে পেয়েছে। বউ ভাতঘুমে। খানিক দেখে বারান্দার জানালা দিয়ে । নিজের বউ-ই তো! অন্য কারো নয়।
'যখন খুব একা লাগবে, ভাববে বলার মত অনেক কথা, তখন আমাকে ফোন করো কিংবা মেসেঞ্জারে নক করো। যে কেউই। দেখো, জীবন ছোটো আর এলোননেস এমন একটা ভেতরের কলকব্জার খুলে খুলে পড়া যে একজন মানুষকে ফুরিয়ে দেয়। মদ, গাঁজা, সিগারেটে মানুষ মরে কি না সুনিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও একাকীত্ব এমন একটা ব্যাপার যা আসলে স্লো পয়জন। আস্তে আস্তে কাজ করে। একসময় বই গান সিনেমা প্রাচূর্য মুক্তি দিতে পারে না। যে মানুষ নিজেকে পরিত্যক্ত ভাবে তার আর মুক্তি নেই। হয়ত তার ভাবনা ভুল, হয়ত সে জানে না কত অসংখ্য মানুষ শব্দহীন তাকে ভালোবাসে তবু মনে হয়, আমাদের সবার পাশাপাশি হাত ধরে, কাঁধে হাত দিয়ে স্কুলবেলার মত থাকা দরকার এইটুকু বলবার জন্য দেখো আমি আমার আত্মার সকল আত্মার সকল দরজা খুলে রেখেছি, তুমি এসে বসো। দু একটা কথা বলা যাক। অই যে দূরে পাখিটি খানিক জিরিয়ে নিচ্ছে তার জিরোবার সুন্দরের দিকে এসো তাকাই৷ ফুলের ফুটে ওঠা দেখি। চলো একসাথে কোথাও বেড়াতে যাই৷ নিজেদের ছেলেবেলার কথা বলি। লিখি। সব লেখা ছাপতে হবে এমন নয়। তোমার হাতের লেখা আমার কাছে থাক। আমার হাতের লেখা তোমার কাছে।

এসো, মা বাবা ভাই বোনের পাশে, পরের প্রজন্মের নতুন মুখের সুন্দরের দিকে খানিক তাকাই৷ শমিত হও। তুমি একা নও। পৃথিবীর কেউই বাস্তবিক একা নয়।

এসো, পাশাপাশি বসি, ধুলোয় কিংবা ঘাসে আর অনর্গল কথা বলি। মায়ের কাছ থেকে জানি তার শৈশব। মা, তোমার আর বাবার ইচ্ছের ভেতর কেমন করে ছিলাম! আমার ইচ্ছের ভেতর তোমার ইচ্ছের ভেতর এখনো আসেনি যে শিশু সে কেমন করে আছে!

এসো, বেঁচে থাকি। আরো গোল হয়ে আরো ঘন হয়ে আসি৷ এই পোড়া দেশে আর বাঁচার পদ্ধতি নেই।'

এক ধরণের সেল্ফ স্টেটমেন্ট লিখে নিরু ডাইরির উপর নিজের সর্বস্ব দিয়ে নিরব কান্নায় ভেঙে পড়ে। তার অক্ষরেরা ঝাপসা হয়ে যায়। আমার নাম মঈন- বলে শরীরের অনেক ভেতর থেকে কে যেন চিৎকার করে ওঠে। প্রথম আলাপের বিকেলটা সতেরো বছর পর কাঁদতে কাঁদতে মনে পড়ে যায়। একটা কোকিল বেপরোয়া ডেকে, পুরো গল্পে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর দিচ্ছে।