ইরেজার কই ?

পৃথা রায় চৌধুরী

“ দাদু ... সেজকাকার ছেলে হয়েছে ” ।
“ তুই ভুল জানিস । যা গিয়ে ভালো করে জেনে আয়, মেয়ে হয়েছে। ”
“ ও দাদু ... দাদু ! হ্যাঁ গো , তুমি ঠিক বলেছিলে , আমিই ভুল বলেছিলাম । ছেলে না, মেয়ে… ”।
দাদু জ্যোতিষী , এবং বেশ নামকরা । নিজের গণনার ওপর অগাধ বিশ্বাস । বিশ্বাসে দাগ পড়লো না । নাতনির জন্মের আগে থেকেই অসুস্থ অবস্থায় ছিলেন হাসপাতালে । নিজে হাসপাতালের বেডে শুয়ে জন্মের পরেই ছক কষে দিয়েছিলেন। মেয়ে নাকি দারুণ পয়া ।
হুঃ ! ছাই পয়া ... জন্মেই কি কাণ্ড করলো ? ঠিক চৌদ্দ দিনের মাথায় ঠাকুরদাকে বেমালুম খেয়ে ফেললো ! দাগ ধরালো জ্যোতিষীর গণনায় ।

একান্নবর্তী পরিবার । সাবেকি নিয়মকানুন । মেয়েকে বাড়ির আর পাঁচটা মেয়ের মতো
নয় , আরো ভালো শিক্ষা দেবার চেষ্টা চালালেন বাবা । মেয়ে ভর্তি হলো শহরের একটি মাত্র কনভেন্টে । মেয়ে ঝটাপট ইংরেজি বলবে । সে তো শিখলো মেয়ে , সাথে শিখলো কিছু বেয়াড়া গুণ ... মুখ বন্ধ করে খাবার চেবানো , মুখ চেপে কাশি ,হাঁচি , হাই, ইত্যাদি শিখলো স্কুলের চ্যাপেলে যাওয়া সিস্টারদের সাথে । মেয়ে শিখলো ... মনুষ্যত্ব । উকিল বড়োকাকার মক্কেলকে বাড়ির কাঁসার গ্লাসে জল দিলে , ছ’বছরের মেয়ের কপালে জুটলো যথেচ্ছ তিরস্কার । কোন জাত জানা নেই । বাড়ির গ্লাসে জল খাইয়ে নিজেদের জাত খোয়াতে হবে ? বাড়িতে কথা উঠলো , “ মেয়েকে সাহেব তৈরি করছে । “ বাবা বকে বলেছিলেন , “ এসব বাড়িতে করে দেখাতে হবে না । বাড়িতে শুধু ঠাকুমার নিয়ম। মেয়ে বুঝলো , সব শিক্ষা সব জায়গায় ঠিক নয় ।

মেয়েকে এতো মাথায় করা ঠিক নয় । ওই মেয়ের রূপ ! কালো , মোটা ... বিয়ে দেওয়া যাবে না । ওকে পড়াশোনা কম করিয়ে কিছু কিছু কাজ শেখাও । কে শোনে কার কথা । বিদ্যের জাহাজ মা , আর বিদ্যানুরাগী বাবা , শিক্ষায় মেয়েকে এভারেস্টে দেখতে চান । ইতিমধ্যে , মেয়ের কুচ্ছিত রূপ কিভাবে পাত্র জোটাবে ভাবনাও এসে জুটতো বইকি । তাই , “ দিন দিন কুমড়ো হচ্ছিস । দিনে পঁচিশ বার সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করবি ” । একঘর লোকের সামনে এসব ... মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়েও ঠিক ভুল বিচার করতে পারেননি মা ।

“ খুব লোভ , না ? আজ মেরেই ফেলবো ! কে বলেছে , আঁচারের বয়েম ছুঁতে ? সব আঁচার ফেলে দিতে হবে এবার । ওই গায়ে শিলের কাছে কেন ? ”
” আর করবো না মা , মনে রাখবো , এবারটা ছেড়ে দাও। "
“ এই জন্য বলেছিলাম , পাঠাস না মেয়েটাকে কেরেস্তান স্কুলে ”।
রাত্রে মাথায় ভেজা ভেজা হাত বুলিয়ে ..." কেন যে মেয়ে হলি রে মা... " ।

বন্ধ এবার গুলি ডাণ্ডা , ঘুড়ি ওড়ানো , ব্যাট নেবার জেদি কান্না । শুরু আচারের থেকে বেশি অনাচার কাকে বলে জেনে রাখা ।
এরপর , ধাপে ধাপে সমস্ত ইট কাঠ ভাঙ্গা । ছোটবেলার ছেলে সাজা , বাবার জামা গায়ে লটরপটর হাত , আয়নায় কাজল গোঁফ , পাল্টাতে পাল্টাতে নিজের সন্তান দেখে আবার বলে ওঠা ... " কেন যে মেয়ে হলি রে মা... " । দাদু , তোমার গণনা ভুল হলো না কেন ? সব গণনা ভুল হয় না কেন ? যে সব গণনার মাথায় ভেজা হাত বোলানো বাকি থেকে যায় ... ?
ভুলেরা রান্নাঘর , অফিস কাছারি , বিজনেস ওয়ার্ল্ড , শিক্ষা জগৎ ছেয়ে ফেলে ঠিকের সাথে। পাশাপাশি বেড়ে ওঠে কামদুনি , দিল্লী , বারাসাত , বাদায়ুন , বেঙ্গালুরু...!