অতিকথা

গৌতম চৌধুরী

অতিকথা ১

কে না জানে,প্রেমে পড়িলে সকলেই দিওয়ানা হয়
ব্যাঙের পুতটিরও সেই দশা
এই বয়সে সকলেই একটু ছটফটে হইয়া উঠে
সে হয়তো খানিক বেশিই ছিল
একদিন হইয়াছে কী, লাফ দিয়া সে এক্কেরে কূপের বাহিরে
ওমা,এ যে এক বিশাল প্রান্তর!
সবুজ ঘাসের উপর শিশির পড়িয়া চিকচিক করিতেছে
সোনালি রোদ আসিয়া তাহাদের বুকে পড়িয়া রুপালি হইয়া যাইতেছে
বাতাস বহিয়া যাইতেছে মন কেমন-করা
কিন্তু হাজার হউক,সে ব্যাঙের ঘরের পুত
ভাবের ঘোরে আবার দিয়াছে লম্ফ
কাছেই ছিল আরেকটি কূপ, পড়বি তো পড় তাহার ভিতর
পড়িয়াই দেখা এক ব্যাঙকন্যার সাথে
আর,যাহাকে বলে,পহেলা দর্শনেই প্রেম
ব্যাঙকন্যাও তাহাকে দেখিয়া হাসিয়া একেবারে খুন
ব্যাঙপুত্তুর বলে, তোমরা দেখি আমাদের মতোই হাস'
কন্যা বলে, ওমা,আমরা কি ব্যাঙ নই গা!
তাহার পর তাহারা অনেক হাসাহাসি করিল
প্রাণের ধর্মে যাহা যাহা কুলায়,সকলই করিল
কন্যা বলে, তুমি এইখানেই থাকিয়া যাও
পুত্তুর বলে, আমার মা যে বড় চিন্তা করিবে
বরং উহাদের বলিয়া কহিয়া তোমাকেই লইয়া যাইব জলদি
এই বলিয়া সে নিজেদের কূপে ফিরিয়া আসিল
সে কিন্তু রাজা দুষ্মন্তের মতো ছিল না
দিবানিশি তাহার মন পড়িয়া রহিল পাশের কূপের দিকে
ইয়ার দোস্তদের সাথে দেখা হইলে সে বলিল –
জানিস তো,আমাদের কূপের পাশেই এমনি আরেক কূপ আছে।
তাহারা বলিল – জানি জানি,উহা দুশমনদের কূপ।
– দুশমন কীরে,উহারা তো আমাদের মতোই হাসে,আমাদের মতোই নাচে-গায়?
– খবরদার,ওইসব হইল শয়তানি হাসি,শয়তানের নাচ-গান!
– তবে যে শুনিলাম, দুই কূপের ভিতর মাটির অনেক নিচ দিয়া একটা যোগ আছে?
– এই হারামজাদা,এইসব পেঁচোয়-পাওয়া কথা তোকে কে শিখাইল রে?
– কিন্তু বিশ্বাস কর,ওই যে আকাশের তারাটি দেখিতেছিস
ওই কূপ হইতেও তারাটি এমনই দেখা যায়
– আয়,তোকে আচ্ছাসে তারা দেখাইতেছি।
বলিয়া, সকলে মিলিয়া এমন পিটান পিটাইল
যে,ব্যাঙের পুতের কাহিনি এইখানেই শেষ
আকাশের তারাটি শুধু ফ্যালফ্যাল করিয়া তাকাইয়া রহিল

২২-০২-২০১৯


অতিকথা ২

রাসভই বল আর গর্দভই বল,গাধা আসলে গাধাই
কিন্তু গাধা হইলে কী হয়,গানটি শিখিয়াছে মন্দ না
আজকাল সে নানান জলসা হইতে ডাক পায়
পয়সা মিলুক না-মিলুক,হাততালি জুটিতেছে অল্পবিস্তর
গাধা তাহাতেই খুশি
কাঁধের উপর তম্বুরাটি ফেলিয়া মঞ্চ হইতে মঞ্চে ঘুরিয়া বেড়ায়
মনের সুখে গান গায়
আর, সকলে কেমন তারিফ করিয়াছে, বাড়ি ফিরিয়া বউকে সেই গল্প বলে
একদিন এক আসরে আসিয়া দ্যাখে –
পিছনের পটে আঁকা আছে দুইটি খড়ম
ইহারা নাকি রানিমার খড়ম!
মনে মনে একটু অবাক হইলেও,ভাবিল গাধা –
খড়ম তো আর গানের তাল ভাঙিতেছে না, আছে, থাকুক!
দরদ দিয়া গাহিতে লাগিল সে
আবার একদিন মঞ্চে ঢুকিয়া দ্যাখে –
পিছনে আঁকা একটি পেল্লায় ত্রিশূল
গানবাজনার আসরে আবার ত্রিশূল কেন!
খুবই ভয়ের ব্যাপার
তবু ভাবিল গাধা,আমার পিছনে তো আর বিদ্ধ হইতেছে না
গান গাহিতে দোষ কী?
কিছুদিন পর আর এক আসরে গিয়া দ্যাখে –
বাঃ,পিছনের পটে একটি ঘননীল আকাশ
কিন্তু ও কী,আকাশের এককোণে কে আঁকিয়া দিয়াছে একফালি চাঁদ
আর চাঁদের উপরে ঝকঝক করিতেছে একটি তারা
গাধা আর বসিবার সাহস পাইল না
তম্বুরা ঘাড়ে করিয়া ছুটিতে ছুটিতে ফিরিয়া আসিল বাড়ি
গিন্নি বলিল – হাঁফাইতেছ কেন?
গাধা বিড়বিড় করিয়া বলিল – চাঁদ, বলিল – তারা!
গিন্নি বলিল – তোমার কি শরীর খারাপ লাগিতেছে?
গাধা বলিল – বুঝিলে না, সন্ত্রাসবাদ।
বলিয়া, ঘরের কোণে শান্তিতে বসিয়া জুড়িল দেশকল্যাণ রাগে আলাপ

২২-০২-২০১৯


অতিকথা ৩

বাহির হইতে দেখিলে কি আর কাহারও মনের দুঃখ টের পাওয়া যায়?
কাঠবিড়ালিগুলির দশাও সেইরকম
এমনিতে মনে হইবে, দিব্য লাফাইতেছে ঝাঁপাইতেছে
চক্ষের পলকে কার্নিশ হইতে চলিয়া যাইতেছে চিলেকোঠার টঙে
বা, নারিকেল গাছের একেবারে চূড়ায়
কিন্তু আসলেই উহাদের মন খারাপ
হাতে কোনও কাজ নাই
নিষ্কর্মার ঢেঁকি হইয়া দিন গুজরান করিতেছে বহুকাল
এই যে চারিদিকে এত
পেল্লায় পেল্লায় সেতু বাঁধিবার জোগাড়যন্ত্র চলিতেছে
সেসব কাজে তাহাদের আর ডাক পড়িতেছে কই
নুড়ি-পাথরের কাহিনির দিন কবেই ফুরাইয়াছে
অথচ বানর হনুমানের দল
সকলেই সুবিধা মতো জায়গায় কাজ পাইয়া গেল
এমন কি রাক্ষসেরাও বসিয়া নাই
নানান দফতর খুলিয়া, শাখা-প্রশাখা খুলিয়া
তাহারা দিব্য চালাইয়া যাইতেছে
আসমুদ্রহিমাচল আজ তাহাদের হাতের মুঠায়
তাহাদের ঢাল-তলোয়ার শড়কি-বল্লম দেখিয়া কে না ভয় পায়
পান হইতে চুন খসিলেই, যখন খুশি যাহার খুশি, হাতে মাথা কাটিতেছে
আর না-খসিলেই বা কী
বানর-হনুমানের মর্জিই আইন, রাক্ষসদের মেজাজই কানুন
কাঠবিড়ালিরা এইসব কাণ্ডকারখানা দেখিয়া থ
তবে কি আবার নতুন করিয়া নুড়ি-পাথর জোগাড় শুরু করিবে তাহারা
ভাঙিয়া যাওয়া হৃদয়ের এপার হইতে ওপারে, আবার কি
এক নতুন সেতুবন্ধের কাজ চালু করিয়া দিবে ছোট ছোট হাতে?
চাহিলে, কাঠবিড়ালিরা কী না পারে!

২৩-০২-২০১৯