টুকলি

দ্বৈপায়ন মজুমদার




আমি যখন বেশ ছোট, মানে স্কুলে যাই হাফপ্যান্ট পরে, নাকের সিকনি হাত দিয়ে মুছে , সেই সময় জানতাম টুকলি মহা পাপ । পরীক্ষায় অন্যের দেখে লিখলে খুব বড় অন্যায়, মানে পুলিশ ধরতে পারে, ঠাকুর পাপ দিতে পারে, এই লেভেলের অন্যায় । এমনকি বসে আঁকো প্রতিযোগিতা হলেও নিজের আঁকা লুকিয়ে রাখতাম, যাতে না কেউ আমার পাবলো পিকাসো, রামকিঙ্কর লেভেলের ছবি ঝেড়ে দেয় । মানে সোজা কথায় আদর্শ সুবোধ বালক, টুকব না, টুকতে দেবও না । কপি ব্যাপারটা এত অপছন্দের ছিল, বাবা একবার কোয়ার্টারের নিচে আমাদের ক্রিকেট ব্যালকনি থেকে দেখতে গিয়ে কোন কারণে বলেছিল 'কপি বুক স্টাইল' । আমি কপি মানে খারাপ জানতাম, তাই ভাবলাম খুব বাজে ব্যাপার, বাবাকে মনের দুঃখ জানাতে প্রথম বুঝলাম সব কপি খারাপ না, 'কপি বুক স্টাইল' বেশ প্রশংসার ব্যাপার ।

ক্লাস সিক্সে টুকলি সব থেকে কষ্ট দিল । বাবার বদলিতে স্কুল, শহর দুটোই বদলেছে । নতুন স্কুলে নতুন ব্যাচমেট, বন্ধু তখনও হয়নি, কিন্তু পরীক্ষা এসে গেল । সেই প্রথম দেখলাম, ক্লাসের পড়াশোনায় এক ভাল ছেলে পকেট থেকে টুকরো কাগজ বের করে কী সব লিখছে । আর সবাই মোটামুটি সুযোগ পেলেই এর ওর কাছে ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করছে । এদিকে আমি এই অনৈতিকতার বিরুদ্ধে একা মাথা নিচু করে লিখে চলেছি । রাগ, বিরক্তি সব বাড়ছে, আচ্ছা ঠাকুর কী পাপ দিচ্ছে ওদের ?? ফল কী দাঁড়াল ?? আমি বেশ কিছু প্রশ্ন ঠিক মত পারলাম না । ওদিকে সবার সাদা দাঁতের পাটি দেখতে পেলাম পরীক্ষার পর । সবাই একে ওকে বলে এটা ভাই তুই না বললে পারতাম না । আর পকেট থেকে সাদা ছোট কাগজ যেটাকে নাকি 'চিট' বলে সেটা নিয়ে আসা গুড বয় আমাকে আসতে আসতে বলল, এসব একটু করতে হয়, সব কী আর মনে থাকে । আমার মনে রাগটা ক্রমে বদলে গেল, আমি ক্রমশ বুঝতে পারলাম টুকলে ধরা না পড়লে দিনের শেষে ফল ভালই হয় ।

কিন্তু ইচ্ছে থাকলেই কী আর সব হয়, সাহস তো একটা ব্যাপার । তাই ওই ঘাড় ঘুরিয়ে দু একটা জিজ্ঞেস করা, ক্লাসের কোন ভাল ছেলে বাথরুম গেলে আমিও হাত তুলে স্যার টয়লেট যাব বলে তাকে বাথরুমে দেখতে পেলে খুব নিচু স্বরে দু একটা জানতে চাওয়া, এর বেশি উন্নতি হল না । একবার খুব সাহস করে পিছনের বেঞ্চে বসা বন্ধুর কাছে একটা উত্তর নিজের প্রশ্ন পত্রের পিছনের সাদা অংশে লিখে নিলাম, বন্ধুটিকে বিনিময়ে সাহায্যও করতে হল । কিন্তু হল থেকে বেরিয়ে জানলাম তার বলা উত্তর পুরোটাই ভুল ।

ব্যাস, বিশ্বাস ভরসা সব গেল । বুঝলাম টুকলি অন্য দুনিয়া, অন্য ক্ষমতা লাগে, লাল চোখের স্যারগুলোকে জাস্ট বোকা বানিয়ে ছোট ছোট কাগজ প্যান্টের পকেট, জ্যামিতি বক্স, ফুল শার্টের হাতা, হাতের তালু এসবে লুকিয়ে পাতার পর পাতা ভরাতে ক্যালি লাগে । কী নির্বিবাদে লোকে বাথরুমে বই রাখে, আর তা থেকে সুযোগ বুঝে অন্য কেউ নিজের প্রয়োজনের পাতা ছিঁড়ে নেয়, আর বইয়ের মালিক বেচারা বাথরুমে নিজের বই টুকরো টুকরো অবস্থায় উদ্ধার করে । তারপর পরীক্ষার শেষে সে কী বাওয়াল, বেচারা সবাইকে সন্দেহ করছে, কিন্তু সব্বাই অস্বীকার করছে । শেষে সে চোখে জল ফেলে বলে এই বিধ্বস্ত বই তার বাবা দেখলে তার পিঠের চামড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না । এই চোখের জল অবশ্য সেই অপরাধীর বা অপরাধীদের মন গলায়নি বলাই বাহুল্য । একবার বাথরুম থেকে বেশ কিছু অন্য ক্লাসের বই বাজেয়াপ্ত হয়েছে খবর আসার পর টুকলি চ্যাম্পদের দুনিয়ায় সাময়িক নিরবতা নেমে এল । তারপর আবার নো পরোয়া মেজাজে ফিরতেও সময় নেইনি তারা ।

ক্লাস টেনের টেস্ট পরীক্ষা, লম্বা বেঞ্চ, পাশে অন্য সেকশনের একটা ছেলে । আগেই আলাপ ছিল, পরীক্ষার কদিন আদান প্রদানে আলাপ জমাটি বন্ধুত্ব । ইতিহাসে আমি খারাপ ছিলাম না, প্রশ্ন আসল কংগ্রেসের সুরাট অধিবেশন ১৯০৭, শর্ট নোট । এই কটা দিনে ছেলেটা খুব কাছের হয়ে গেছে খুব । পুরো টেস্ট একসাথে দিচ্ছি, কিছু আনে না পকেটে । ওই টুকটাক জিজ্ঞেস করা দিয়ে চলছে, ওকে বললে সাহায্য করে, আমাকে জানতে চাইলেও আমি চেষ্টা করি । তা যাই হোক সুরাট অধিবেশনে ফিরি, আমার খুব ভাল মনে পড়ছে না সুরাট অধিবেশন, বললাম তুই কী লিখবি, তাহলে একটু হেল্প করিস । ভাল ছেলে, নির্বিবাদে বলল লেখার সময় বলে দেবে । তারপর সময় এগিয়ে চলে । লেখা শুরু করল, আর মুখে বিড়বিড় করে বলতে থাকল । কিছুক্ষন শোনার আর লেখার পর যেটা সারমর্ম দাঁড়াল যে সুরাট অধিবেশনে অনেক ঝামেলা হল, গান্ধীজি রেগে সভা ত্যাগ করলেন । আমার হঠাৎ মনে পড়ল ওই সময় গান্ধীজি তো কংগ্রেসে ছিলেন না, বললাম একটা গণ্ডগোল হচ্ছে, সুরাট অধিবেশন ১৯০৭, মনে হয় গান্ধীজি ছিলেন না, গান্ধীজি তার কয়েক বছর পর ভারতে ফেরেন ।

বন্ধু একটুও অবাক হলো না, ঘাবরেও গেল না, খুব ঠাণ্ডা মাথায় নিরুত্তাপ গলায় বলল, ও তাই । এক কাজ কর, গান্ধী কেটে ওটা প্যাটেল করে নে, ভাবলাম সুরাট তো গুজরাটে তাই গান্ধী থাকবেন, প্যাটেলও গুজরাটের , তাই ওটা প্যাটেল করে দিলে আর সমস্যা নেই । আমার চোয়াল ঝুলে গেছে । বললাম, আর বাকিটা, মানে সভায় ঝমেলা, সভা ত্যাগ, এসব কী হবে ?? পাতায় আবার মুখ গুঁজে সেই নির্বিবাদী ভাল ছেলে বলে ওসব একই থাকবে, অধিবেশন মানেই ঝামেলা হয়, আর কেউ না কেউ রেগে সভা ত্যাগ করে ।

দুই বন্ধু সাদা খাতায় এরপর দেশের কী ইতিহাস লিখেছিল তার খবর আর কেউ রাখেনি ।

পরীক্ষার টোকাটুকি একটা স্মৃতি, অনেক সময় বেশ মিষ্টি স্মৃতিই বলা চলে । সেই সাদা কালো ফ্রেমের স্কুল বেঞ্চের দিন কাটিয়ে চলে এল কিবোর্ড, মনিটরের দুনিয়া । একটা আজব ম্যাজিক আবিষ্কার করে ফেলল মানুষ, কন্ট্রোল সি, কন্ট্রোল ভি । বেমালুম সব ভুলে চলতে থাকল কপি পেস্ট । আর ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপে চুপচাপ নাম মুছে ঝেড়ে দেওয়া তো অনেকের প্রায় জন্মগত অধিকার, এটাকে ঠিক টুকলি নামক নির্বিষ তকমা দেওয়া যায় কিনা জানা নেই । কাগজ পেনের নিপাট চুরির জায়গা নিল কপি পেস্টের খেলা । এমনকি 'সংগৃহিত' অথবা 'কালেক্টেড' এর ভ্রদ্রতার আস্তরণও থাকে না অনেক সময়। অবশ্য টুকলির দুনিয়াতে অনেক বড় বড় খেলোয়াড় আছে । অন্য দেশের সাহিত্য, গান বেমালুম ঝেঁপে দিয়ে অম্লান বদনের হাসি ঝুলিয়ে জনপ্রিয় ট্যাগ নিয়ে এদের দাপাদাপি । তবু থামে না সৃষ্টি, থামে না লেখা এবং থামে না চুপ চাপ ঝাঁপা । দিনের শেষে লেখা খুঁজে পায় পাঠক ।

কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে, ক্রমশ ধূসর হচ্ছে লেখক পাঠক বাঁধন । এখন টুকলি শুধু আদান প্রদান না, টুকলি এখন লাইক, শেয়ার, সেলিব্রেশন, উদযাপন ।