এক গুচ্ছ কবিতা

তন্ময় ভট্টাচার্য


নীহারিকা

ওপারে বসেই আছ, কিছুই বুঝতে পারছি না
কাঁদছ, নাকি প্রবল বিরক্তি ছড়িয়ে পড়েছে
আমার মধ্যে যদি চারাগাছ বেড়ে ওঠে খুব
তোমার উচিৎ নয় কি সহজ যত্নটুকু করা

চাইনি কিছুই, শুধু একবার মনে মনে ঘোরা
সেইসব নিকেতনে, আলোহাসি মাখা উন্মাদ
যেখানে প্রথম কবিতার খাতা ফেলে এসেছিল
দূর্বা ছেয়েছে দেখো অক্ষরমালা ভালোবেসে

সেই উদ্দেশে, বলো, তুমিও কি সেই উদ্দেশে
পদ্মপাতায় ঢেকে রেখেছ যাতে না আলো পড়ে
আমার বসন্ত জানে কীরকম আলো কুঁড়েঘরে
জমা হলে মনে হবে দেবী নেমে এসেছেন হাতে

শিহরন জেগে ওঠে কল্পিত সেই সাক্ষাতে


গমন

বালক যেমন তার
জ্যামিতি মুছতে গিয়ে
ছিঁড়ে ফেলে হোমওয়ার্ক খাতা

মা এসে ধমক দেয়
বালক বোঝে না, কেন
একটু জোর দিলেই
অরণ্য নেমে আসে তার

বিদায় আঁকছ। আজও
পেনসিল ভাঙা হাহাকার


পথিক

তোমার সৌন্দর্য নিয়ে বন্ধুরা কথা বলে আজও
ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ইস্তেহারের মতো
কয়েকটি ব্রজবুলি গান

‘মহাভারতের কথা অমৃতসমান’ –
পুরোনো দালান ঘিরে
শোনা যায় ঠাকুমার স্বর

আমি যে নিরক্ষর
আমি যে তোমায় ছাড়া কিছুই পড়তে শিখিনি

অবশিষ্ট সব কাজ জুড়ে জুড়ে
আজও তাই
দূর থেকে দেখলেই তোমায় দূরের বলে চিনি


প্রস্তুতি

ভাঙবো বলেই হাত তুলেছি
নম্র এবং আতঙ্কিত

এক বয়েসে সবাই তোমায়
বিকল্প অস্তিত্ব দিত

পানের ওপর টিপ দেখে
কেউ অন্যমনা হতেও তো চায় -

জল এড়ানোর জন্য জলের
দাগ লেগেছে সরাইখানায়


বাধ্যতামূলক

প্রত্যাখ্যান উঠে এসেছে তোমার বাড়ি থেকে

আমি তাতে জল দিই
প্রয়োজনমতো সার
তাড়াতাড়ি বেড়ে ওঠে যেন

কিছু আপত্তি জড়ো করেছি
এখন আর
মায়াঅঞ্জন চোখে অধিকার দিও না আমাকে

ইন্দ্রিয় জানে, কত বাতাসতাড়িত হলে
তোমার দীর্ঘশ্বাসে
প্রেমের গন্ধ লেগে থাকে...


নতুন করে পাবো বলেই

(১)
অন্য নামের চিঠি লিখে
যখনই ফেলে এসেছি সোনারং ডাকবাক্সটিতে

জানতাম, একদিন তন্নতন্ন করে
হাতের লেখাটি মেলাবেই

(২)
এখনও সময় আছে
খুঁজেপেতে দেখো কোনো আদ্যাক্ষর মেলে কিনা

দীর্ঘ ঈ'কারে মেঘ জমে কিনা শীতলাক্ষা নদীটির মতো

উড়ো চিঠি ভেবে যদি
সত্যিই ছুঁড়ে দাও যুদ্ধাপরাধীর শিবিরে,

সন্দেহে একবার কুড়িয়েও এনো অন্তত!


ঈর্ষা

সে তোমায় ছেড়ে যেতে চায় না বলেই
অসুখের অজুহাত আঁকড়ে ধরেছে -
বিছানায় মিশে যাচ্ছে কল্পিত জ্বর ও আরাম

বিবাহের ফলাফল, তুমিও বুঝেছ
আমায় শোনাতে চাও কেন কেন কেন
অতিকষ্টে গতকাল তবে যে ঘুরেও দাঁড়ালাম?


চাতক

তোমার রূপের কাছে ঋণী হয়ে রয়েছি সবাই

অথচ কাউকে শোধ
করতে দেবে না তুমি

একা নিয়ে বসে থাকো
পরিধি ক্রমশ বেড়ে যায়

আমরা গল্প বলি
লোকে ভাবে, কান্না শোনাই!


ফলাফল

তোমাকে ভুলতে গিয়ে, খেয়াল করেছি -
আমাকেই ভুলেছে কবিতা!


খেলুড়ে

এবার দেখাও তবে খোলামাঠ, ব্যাটিং-এর পিচ
ভদ্রলোকের খেলা -
ইতিহাস সমূহ জেনেছে

স্টেডিয়াম, হাততালি, আম্পায়ারের লোভী চোখ
কিছুর পরোয়া নেই -
টস কর, জিতে নাও কে তোমার প্রথম মালিক

কিউরেটরের নাম প্রকাশ্যে কেই বা এনেছে!


রাত

...সেই রিংটোন
ত্বরিৎগতিতে যদি কেটে দেওয়া হল,

কী কাজে ব্যস্ত আছ
জিজ্ঞেস না-করা সমান!


উপসংহার

মিথ্যা বলতে পারো
আমি তাও স্বীকার করেছি

আগুনের কাছে এসে দাঁড়িয়েছি কাফের অতিথি

এইটুকু তো পথ
মোহভঙ্গের শেষে ভুলে যায় মৃত জঙ্গলও

আমার শেষ কবিতা, তোমাকে নিয়েই লেখা হল...