একজন কবি, একটি ট্রাম অথবা অদ্ভুত আঁধার

ইমরান নিলয়



লোকটা বেঁচে থাকতে ভীষণ ভাবুক ছিলেন বোঝা যায়। তা না হলে কেউ কি দিনে-দুপুরে ট্রামের নিচে পড়ে। ট্রামতো আর ছোটখাটো কোনো বস্তু নয় যে খেয়াল হবে না, চোখে পড়বে না। তাছাড়া অবিরাম ঘণ্টা বাজানো ছাড়াও বারংবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করছিল ট্রাম ড্রাইভার। তবু লোকটা ট্রামের নিচেই পড়লো। ট্রামের ক্যাচারে আটকে তার শরীর মুচড়ে গেলো। গুরুতর আহত লোকটার চিৎকার শুনে ছুটে আসে নিকটস্থ চায়ের দোকানের মালিক চূণীলাল। আরো কয়েকজন মিলে ধরাধরি করে ক্যাচারের কঠিন ছোবল থেকে অতি কষ্টে টেনে-হিঁচড়ে বের করলো রক্তস্নাত মানুষটির অচেতন দেহ। কেটে, ছিঁড়ে থেঁতলে গেছে এখানে সেখানে। চুরমার হয়েছে বুকের পাঁজর, কন্ঠা আর উরুর হাড়। তাকে নিয়ে যাওয়া হলো শম্ভূনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে। কিন্তু লাভ হয়নি কোনো।

৬৫ বছর আগের অক্টোবর মাসের এক রাতে মরে গেলো লোকটি।

কতটা কেমন হলে একটা মানুষ ট্রামের নিচে পড়ে মারা যেতে পারে? তার উপর জানা যাচ্ছে যে, গত একশ বছরে ট্রাম দুর্ঘটনায় কলকাতায় মৃত্যুর আর কোন তথ্য নেই- একজন লোকই মৃত্যুবরণ করেছেন ট্রামের আঘাতে। তিনি আর কেউ নন, কবি জীবনানন্দ দাশ।

লোকটার জীবনটাই যেন কেমন। যেন কখনো কোথাও ‘ফিট’ হতে পারেনি। না শিক্ষকতায়, না ইনস্যুরেন্স কোম্পানীতে, না পত্রিকায়।

জীবনানন্দ দাশকে বুঝতে হলে এমন একজন কবির চরিত্রকে কল্পনা করতে হবে অর্থকষ্ট যাকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অনুসরণ করে গেছে ধীর পায়ে। কল্পনা করতে হবে এমন একজনকে যিনি কবিতাকে ভালোবাসেন, লিখতে ভালোবাসেন, কিন্তু বারবার পরাজিত হতে থাকেন। জীবনের অলিতে গলিতে চলার সময় লেখা নিয়ে ভাবতে ভাবতে যার পা কেটে যায় হোঁচট খেয়ে। কিন্তু তিনি থামেন না। ব্যথা পাওয়া জায়গায় হাত বুলিয়ে আবার উঠে দাঁড়ান। চলতে শুরু করেন। তিনি জানেন তাকে তাড়া করে ফিরছে শকুনেরা, থামলে চলবে না। এমন অনেক রাত গেছে হয়ত তার মাথায় গিজগিজ করছে লেখা, কিন্তু তাকে রাত জেগে হারিকেনের বাতি জ্বেলে এর-ওর কাছে টাকা ধার চেয়ে লিখে যেতে হয়েছে চিঠি। একজন লেখকের লিখতে না পারার যে যন্ত্রণা তা কবির মগজকে নীরবে খেয়ে চলেছিলো, সাথে দুশ্চিন্তা-ক্লান্তিও কি পেয়ে বসেনি তাকে?

তবু শত সমস্যা স্বত্বেও তিনি লিখে গেছেন। কখনো একটু সুযোগ পেলেই তার কলম হয়ে উঠতো তুলি। আর তিনি কাগজের ক্যানভাসে এঁকে যেতেন সেইসব কাব্যচিত্র যার কল্পনা আজও আমাদের মোহিত করে, মোলায়েম অনুভূতি যোগায়। অথচ যে মানুষটির হাত ধরে আমরা বনলতা সেনদের চোখে ডুব দিতে শিখেছি, কি পরিমাণ সংগ্রাম সহ্য করতে হয়েছে তাকে তা অনুমানের চেষ্টাও এক প্রকারের স্পর্ধা।

তুচ্ছ কারণে একটার পর একটা চাকরি হারিয়েছেন। কলকাতার ১৮৩ নম্বর ল্যান্সডাউন স্ট্রিটের একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। স্ত্রী লাবণ্যগুপ্তর অসুস্থতাসহ পুরো পরিবারের ভার তাকে অস্থির এবং ক্রমশ অসহায় করে তুলেছিলো। নিদারুণ অর্থকষ্টে ভাড়াবাড়ির একটা ঘর সাবলেট দিয়েছিলেন একজন নর্তকীর কাছে, হয়ত আশা ছিলো- বাড়তি ক’টা টাকা সংসারে স্বস্তি আনবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। উল্টো ভাড়াটিয়ার উৎপাতে তাঁর তখন ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি অবস্থা।

তখনকার সময়ে ইংরেজীতে এমএ পাশ করেও কোথাও থিতু হতে পারেননি এই তরুণ কবি। কলকাতা, বাগেরহাট, দিল্লি, বরিশাল, আবার কলকাতা- ঘুরেছেন; জীবনের শেষদিন পর্যন্ত হেঁটে গেছেন। টিউশনি থেকে বীমা কোম্পানির দালালি পর্যন্ত করেছেন- কোথাও দুদণ্ড শান্তি মেলেনি। টাকা ধার করেছেন যেখান থেকে পেরেছেন- ভাই-বোন, ভাইয়ের বউ, বীমা কোম্পানি, স্কটিশ ইউনিয়ন। শোধও করেছেন ভেঙে ভেঙে, ভেঙ্গে পড়তে পড়তে।

সেই সময় চরম অর্থকষ্টে ছিলেন কবি। জীবনানন্দ জানেন না আর সাত মাস পর তিনি মারা যাবেন। তাই স্বরাজ পত্রিকার সম্পাদক হুমায়ূন কবিরকে চিঠি লিখলেন। অধ্যাপক হুমায়ূন কবির তখন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী আবুল কালাম আজাদের সচিব ও বিশিষ্ট সাহিত্য অনুরাগী। তিনি চাইলে কিছু করতে পারবেন। আর তাছাড়া হুমায়ূন কবিরের পত্রিকা স্বরাজে তো এর আগেও সাত মাস কাজ করেছিলেন কবি। তাই প্রবল আশা নিয়ে তিনটি চিঠি লিখে ফেললেন তিনি। না, তিনটি চিঠির কোনটিরই জবাব আসেনি। ছয় মাস পর জবাব নিয়ে এলো স্বয়ং বালিগঞ্জের ট্রাম।

জীবনানন্দ প্রথম চিঠিটি লিখেছিলেন ছোট করে। চিঠিতে খুব বেশি অতিরিক্ত কথা নেই। হয়ত কবি আশা করেছিলেন এতেই কাজ হয়ে যাবে।

১৭.৩.৫৪
আমার প্রিয় মিস্টার কবির,
আপনি এখন একটা খুব প্রভাবশালী জায়গায় আছেন। শিক্ষা, সাংস্কৃতিক সম্পর্ক, সাহিত্য, প্রকাশনা এবং অন্যান্য অনেক বিষয় আপনার সাক্ষাৎ তত্ত্বাবধানে আছে, যাদের মাধ্যমে আপনি আমাকে কোনও একটা উপযুক্ত চাকরিতে বসিয়ে দিতে পারেন। দয়া করে কিছু একটা করুন এক্ষুনি। আশা করে রইলাম তাড়াতাড়ি করে আপনি আমাকে কিছু জানাবেন।
শুভেচ্ছা এবং শ্রদ্ধা নিবেদন-সহ
আপনার জীবনানন্দ দাশ

কিন্তু চিঠির উত্তর আসে না। এদিকে চারপাশের ঝামেলা বাড়ছেই। কবি বুঝলেন এত কম কথায় হবে না। আমাদের দরিদ্র কবি মাসখানেক পর সবটুকু কাকুতি-মিনতি জানিয়ে লিখলেন দ্বিতীয় চিঠিটি- রীতিমতো মাথা নিচু করে বললেন নিজের দুরাবস্থা, আর যে কোন প্রকারের একটি মোটামুটি চাকরির কথা।

১৬.৪.৫৪
আমার প্রিয় অধ্যাপক কবির,
বিশিষ্ট বাঙালিদের ভিতর আমি পড়ি না; আমার বিশ্বাস, জীবিত মহত্তর বাঙালিদের প্রশ্রয় পাওয়ার মতনও কেউ নই আমি। কিন’ আমি সেই মানুষ, যে প্রচুর প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রতিটি দ্রব্যকে সোনা বানিয়ে তুলতে চায় অথবা মহৎ কোনও কিছু – যা শেষ বিচারে একটা কোনও জিনিসের-মতন-জিনিস; – কিন্তু, ভাগ্য এমনই যে, আজ তার পেটের-ভাত জুটছে না। কিন্তু, আশা করি, একটা দিন আসবে, যখন খাঁটি মূল্যের যথার্থ ও উপযুক্ত বিচার হবে; আমার ভয় হয়, সেই ভালো দিন দেখতে আমি বেঁচে থাকব না। আপনার কথা-মতো আমি জ্যোতিবাবুর অথবা বি.সি. রায়’এর সঙ্গে এখনও দেখা করার চেষ্টা করি নি; আমার মনে হয়, আমার মতন মানুষের পক্ষে তাঁরা দূরের মানুষ। আমি যেন অনুভব করি, আপনিই আমাদের মতন লোকের জন্য এক-মাত্র মানুষ; আপনার উপর আমার গভীর আস্থা আছে। আমি সর্বদা বিশ্বাস করি যে, আপনার নিজের পরিপূর্ণ শাসনের ভিতরে আছে, এমন কোনও একটা, আমার পক্ষে মানানসই, জায়গায় আপনি আমাকে বসিয়ে দিতে পারেন; আমাকে একটা উপযুক্ত কাজ দিয়ে দেবার মতন সুযোগ-সুবিধা আপনার খুবই আছে। আমার আর্থিক অবস্থাটা এখন এতটাই শোচনীয় যে, যেকোনো একজন সকর্মক ‘অপর’ মানুষ যে-কাজ করতে পারে, কেন্দ্রীয় সরকার’এর অধীনে সে-কাজ আমারও করতে পারা উচিত। আমি মনে করি, এ-রকম একটা কাজ এক জন মানুষকে সেই সম্মানটা দিয়ে দিতে পারে, যা প্রতিটি মানুষ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলে অর্জন করে নেয়; তার বেশি আমি আর কিছু চাই না। আমার দেশ আমার অস্তিত্বের স-র-মাত্রাটার সাপেক্ষে সেই যথাযোগ্য সুযোগটা আমাকে দিক, যাতে আমি আমার ন্যূনতম জীবনযাপন নিয়ে থেকে যেতে পারি। প্রাইভেট কলেজের অধ্যাপকের কাজ ক্ষুদ্র কাজ : অধিকন্তু অন্যান্য নানা কারণেও ওই কাজটা আমি আর করতে চাই না। আমার খুবই পছন্দ তেমন কোনও একটা মানানসই কাজ, যাতে অনেকটা গবেষণা করতে হয়, লিখতে হয় এবং ভাবনা-চিন্তা করতে হয়।
ইতি
আপনার জীবনানন্দ দাশ

কয়দিন পর লেখেন তৃতীয় চিঠিটিও।

২৩.৪.৫৪
প্রিয় মিস্টার কবির,
আশা করি, ভালো আছেন। আপনি এখন খুব একটা উঁচু জায়গায় আছেন, এবং খুব সহজেই আমার জন্য কিছু-একটা করতে পারেন। আপনার নিজের ডিপার্টমেন্ট আছে। খুবই যুক্তিসঙ্গত ভাবে আপনার ডিপার্টমেন্টে কোনো এক জায়গায় আপনি আমার জন্য একটা চাকরি খুঁজে পেতে পারেন, যেমন অল-ইন্ডিয়া রেডিও আছে। আমি আপনাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করছি, আমাকে সাহায্য করতে এক্ষুনি আপনি যথাসাধ্য করুন, আমি খুবই অসুবিধের ভিতর আছি।

শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ-সহ
আপনার জীবনানন্দ দাশ

এই চিঠিতে শব্দ কম হলেও, শব্দগুলোর মাঝে ক্রমশ ডুবে যেতে থাকা একজন মানুষের গাঢ় আকুতি টের পাওয়া যায়। কিন্তু অধ্যাপকের কানে দরিদ্র কবির দুর্বল কণ্ঠ হয়ত পৌঁছায় না। কোনো সাহায্য আসে না। আসে না কোনো সাহসের প্রতিশ্রুতিও। কবি হলেওতো তিনি মানুষ। ভাঙতে ভাঙতে কতোটা ভাঙা যায়। তাই শরীরটাই একদিন অভিমান করে ভেঙ্গে পড়লো ট্রামের নিচে। অথচ ট্রামটাকে ঠিক খুনী বলা যায় না। দয়া করে ট্রামটিই কি মুক্তি দিয়ে গেলো না আমাদের দরিদ্র কবিকে? কে জানে। হুমায়ূন কবির সাহেব যে শেষপর্যন্ত কিছুই করেননি তা না। জীবনানন্দকে মরণোত্তর সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারটা পাইয়ে দিয়েছিলেন ঠিকই।

ট্রাম দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর মতে দুর্ঘটনার সময় দুই হাতে দুই থোকা ডাব নিয়ে ট্রাম লাইন পার হচ্ছিলেন কবি। ডাব নিয়ে কেউ আত্নহত্যা করতে যায় না। তাঁর মৃত্যুটা কি আত্নহত্যা নাকি দুর্ঘটনা- তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হলেও এটা অস্বীকারের উপায় নেই যে, এটা এক ধরণের ঠান্ডা মাথার খুন। সমাজ কর্তৃক একজন লেখককে খুন, দারিদ্র দিয়ে একজন কবিকে খুন- যেন সিস্টেম পরিচালিত দারুণ এক ট্রাজেডির চমৎকার নির্মান।

কিন্তু যে কবির জীবনও কবিতা, তাঁরতো মরে যাবার প্রশ্নই ওঠে না।