চব্বিশটা শনিবার

আনোয়ারা আল্পনা



বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসার আগে, আমি কেবল বস্তাখানেক গল্পের বই পড়েছি। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে এক লেখকের সঙ্গে প্রেম হলো। গল্প লিখত সে, কবিতাও লিখত, আবার এক মাঝারি দৈনিক পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিও ছিল। মানে জগাখিচুড়ি ব্যাপার। এইরকম একটা মাল্টিক্সিল্ড প্রেমিক যদি আমার থাকে, তাহলে শিল্পকলার অন্যান্য শাখায় আমার জ্ঞানগম্যি যা তা হবে, এ তো জানা কথাই। এই জগাখিচুড়ি পাশ করে বেরিয়ে জয়েন করল ব্যাংকে। তার দুই বছর বাদে আমি পাশ করে বেরোলাম, আর তার লেজ ধরে আমিও জয়েন দিলাম ব্যাংকেই। আমরা দুই ক্যাশিয়ার পাশাপাশি ডেস্কে বসে সারাদিন ময়লা আর নতুন টাকা গুনি। দিন শেষে কোনোদিন হিসাব মেলে কোনোদিন মেলে না। পাঁচশ, হাজার হলে নিজের পকেট থেকে দিয়ে মিলিয়ে দিয়ে বেরিয়ে আসি। গড়মিল আরো বেশি হলে, ফের গুনতে বসি। এভাবে গেছে বছর খানেক। টাকা গুনতে গুনতে তার গল্প, কবিতা মাথায় উঠেছে, বিয়ে শাদি যে করতে হবে, তাও মনে নাই। তখন একদিন আমি তাকে বললাম, ‘তোমাকে আর ভাল্লাগতেছে না, ব্রেকাপের সময় হইছে, আর এই ব্যাংকের চাকরিও ছাইড়া দেব আমি।’ সে বলল, ‘আচ্ছা’।
ভাবছেন, এতদিনের প্রেম এই দুইটা কমা আর এক দাড়িওয়ালা একটা বাক্য আর এক শব্দের একটা উত্তরে ভাঙ্গে নাকি? আমি বলছি, হ্যাঁ ভাঙ্গে, পুরাপুরি ভাঙ্গে।
বিশ্বাস করেন, তাকে আর চাকরিটাকে ছেড়ে দিয়ে আমার কি যে শান্তি হলো! রাস্তায় বেরোলে সবাইরে চুমু খাইতে মন চাইতো! কুৎসিত ঢাকাকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করতো। তিনটা মাস আমি সেই সুখ চাখলাম। তারপর অনেক ভেবে চিন্তে ঠিক করলাম পত্রিকা অফিসে কাজ করবো আর গল্প লিখবো, জিন্দেগিতে বিয়ের নাম মুখে আনবো না। এই যে পাঁচ টাকার যে পত্রিকা অফিসে আমি গত পাঁচমাস ধরে মহা সুখে কাজ করছি, সে অফিসের ফিচার এডিটর লূনা আব্বাসি আমার রুমমেট ছিলেন। সিনিয়র আপা তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ দুই বছর খুব কপাল করে আমার মতো সোনার টুকরা জুনিয়রকে রুমমেট হিসেবে পেয়েছিলেন। হলে আমি তাকে যে সেবা দিয়েছি, সেটা এহজীবনে তার পক্ষে ভোলা সম্ভব নয়। ফলে আমার চাকরি কেউ আটকাতে পারে নাই। আমি মনের মাধুরি মিশিয়ে আজগুবি সব ফিচার লিখি। পাঁচ টাকার পত্রিকা হলেও বাজারে আমাদের ফিচারের নামডাক আছে।
কিন্তু আমার সুখের গুড়ে বালু পড়লো, যখন এক চিত্রকরের ইন্টারভিউ করার হুকুম নাজিল হলো।
এমন হয় আপনাদের খুব চেনার কথা ছিল, অথচ চেনেন না এমন কারো সাথে হঠাৎ পরিচয় হলো? তখন হয়ত সেই বিখ্যাত বা প্রায় বিখ্যাত ব্যাক্তি নতুন কারো সাথে পরিচিত হবেন সেই মুডেই নাই। এখন তো টকশোর কাল। একটু আধটু বিখ্যাত হলেই টকশোওয়ালারা ধরে নিয়ে যায়, টিভিতে সেই টকশো যদি আপনি মিসও করেন, তার লিংক ইউটিউবে পাওয়া যায়, সেই লিংক আবার ফেসবুকে ঘুরতে থাকে। আগে দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকদের চেহারায় চিনতো না মানুষ। এখন তো সে উপায় নাই। লেখক, কবি সবাই এখন চেহারায় চেনা। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার, যদি একেবারে নিরামিষ না হন, তারাও স্টার। চোর, সাধু সকলেই এখন চেনামুখ। পুলিশের কষ্ট কমে গেছে, যাকে ধরতে চান, তাকেই ধরতে পারেন, আগে তো কত ভুল মানুষকে ধরে নিয়ে যেতেন। ক্রসফায়ারওয়ালাদের গুলিও এখন আর বেশি খরচা হয় না। দুই তিনজন ভুল করে মেরে আসলটার কাছে পৌঁছানো লাগে না। সিধা টার্গেট, এক গুল্লিতে কেল্লা ফতে।
শিল্পকলার এই শাখা নিয়ে আমার জানা শোনা মোটেই নাই। এই চিত্রকর নাকি বিখ্যাত। এ বছর তার সত্তরতম জন্মদিন। সব কাগজে তাকে নিয়ে এক্সক্লুসিভ আয়োজন থাকবে। আমার কাজ হলো, কেউ যা জানে না তা বের করা। আমি কাউকে বুঝতে দিলাম না যে, আমি তার নামই শুনি নাই আগে। গুগল সার্চ দিয়ে বিসমিল্লা করলাম। ফিচার এডিটরকে ডিঙ্গিয়ে সরাসরি এডিটরের সঙ্গে বৈঠক করলাম দুইদিন। নিজের গাঁটের টাকা দিয়ে চিত্রকরকে নিয়ে লেখা বিরাট এক বই কিনে সারারাত জেগে পড়ে ফেললাম। পরেরদিন এডিটর আতা ভাই বললেন, ‘আমি কথা বলে রেখেছি, তুমি একবার ফোন করে চলে যেও, তানভীরকে সাথে নিও।’ তানভীর আমাদের অফিসের তিন ফটোগ্রাফারের একজন, মানুষের ছবি ভালো তোলে। আমি পরপর তিন কাপ মিষ্টি চা খেয়ে লূনা আপাকে কদমবুচি করে চিত্রকরকে ফোন করলাম। তিনি দুইদিন পরে সকাল আটটায় সময় দিলেন। আমি থাকি মোহাম্মদপুর, তিনি উত্তরা, সকাল আটটা! মানে আমাকে সুবেহ সাদিকে উঠতে হবে। মনে পড়ে গেল, গত পাঁচমাস কি সুখে আছি আমি, সারারাত জেগে ভোরবেলা ঘুমিয়েও ছয় ঘন্টার ঘুম পুরা করে অফিসে যেতে পেরেছি। যাইহোক নিজেকে লক্ষিসোনা বলে আদর করে স্বান্তনা দিলাম, রোজ রোজ তো আর এমন এসাইনমেন্ট থাকবে না!
নির্ধারিত দিনে ভোর পাঁচটায় উঠলাম। উঠতে পারার জন্য নিজেকে আলিঙ্গনের সহিত ধন্যবাদ দিলাম। চা বানিয়ে খেয়ে রেডি হয়ে গেলাম। কয়েকদিন আগে সবুজ রঙের এক জোড়া কন্টাক্ট লেন্স কিনেছি, সেটা পরলাম, সঙ্গে সবুজ ফতুয়া আর কালো জিন্স। অবাক হয়ে ভাবলাম, এতটা সিরিয়াসলি নিয়েছি এই সাক্ষাৎ!
তিনি আমাকে আগেই বলেছিলেন, ‘বেল বাজাবে না, দরজায় পৌঁছে ফোন করবে।’
নিজেই দরজা খুললেন। আমি তার ফটো দেখেছি, অনলাইনে যত আছে, সব। তবু তিনি লম্বায় আমার চেয়ে কম, বুঝিনি। তিনিও একটা সবুজ ফতুয়া পরেছেন, সঙ্গে চেক লুঙ্গি। নিয়ে গেলেন আঁকার ঘরে। একটা দেয়াল জোড়া বইয়ের আলমারি, একপাশে একটা সিঙ্গেল খাট। খাটের পাশে একটা ছোট্ট টেবিলে ফ্লাস্ক, মগ, ওষুধপত্র। এক কোনায় ইজেল আর রং- ব্রাশ। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো বসার ঘরে বসেই কথা বলবেন। ঘরে একটামাত্র চেয়ার, চেয়ার না ঠিক, মোড়া। আগের দিনে স্টুডিওতে, চোখে মোটা কাজল আর ইয়া বড় নজর টিপ দিয়ে শিশুদের ছবি তোলা হত যেমন চেয়ারে বসিয়ে তেমন চেয়ার। সেটাতে তিনি বসে আমাকে বিছানা দেখিয়ে দিয়ে বললেন, ‘বসো।’
খাটটা উঁচু, মোড়াটা অনেক নিচু। মুখোমুখি বসার পরে মনে হলো আমার পায়ের কাছে বসেছেন তিনি। অস্বস্তি হওয়া উচিত কিনা ভাবছি, ফ্লাক্স থেকে ঢেলে চা দিলেন, নিজে নিলেন না। রেকর্ডার কোথায় রাখবো ভাবছি আর প্যাড কলম বের করছি, তিনি বললেন, রেকর্ডার আমার বুক পকেটে দিয়ে দাও। বলে হাত বাড়ালেন না, আমি রেকর্ডার অন করে তার পকেটে দিয়ে দিলাম। সামান্য ছোঁয়া লাগলো তার বুকের বাঁ পাশে। কথা বলতে শুরু করলেন তিনি। শুরুতে আমার একটা মিনি ইন্টারভিউ নিলেন। বাজিয়ে দেখলেন, তার সম্পর্কে কতটা জানি। মনে মনে বললাম, হু হু বাবা পাক্কা চার বছর মাল্টিস্কিলড এক জগা খিচুরির প্রেমিকা ছিলাম, তুমি জানতেও পারলা না, এক সপ্তাহ আগে আমি তোমার নামও জানি নাই।
নয়টার দিকে তানভীরের টেক্সট, ‘বিরাট ঝামেলায় পড়েছি, আসতে পারছি না, প্লিজ আরেকটা ডেট নেন।’
ঘন্টা তিনেক কথা বলার পর আমার মনে হলো, এমন কিছুই তিনি বললেন না যা আমি জানি না। মানে চার পাঁচ দিন পড়েই এসব জেনেছি আমি। যারা তাকে দীর্ঘদিন জানেন, তাদের থেকে কোনোভাবেই ভালো ইন্টারভিউ হবে না এতে। বললাম, ‘আরেকবার কি বসতে পারি আমরা?’ তিনি দুই দিন পরের আরেকটা ডেট দিলেন। এবং এবারও সকাল আটটা।
অফিসে পৌঁছে শুনলাম তানভীরের বাসায় চুরি হয়েছে, তার ক্যামেরা, ল্যাপটপ সব নিয়ে গেছে। সে গেছে জিডি করতে। লূনা আপাকে বললাম, ‘আরেকদিন যেতে বলেছেন চিত্রকর।’
দ্বিতীয় দিন ফটোগ্রাফার আজম ভাইকে নিয়ে গেলাম একবারে। ফটো তুলে আজম ভাই চলে গেল, আমরা কথা বলতে শুরু করলাম। তিনি বললেন, ‘তোমাকে একটা মজার কথা বলি, সবুজ চোখের একটা মেয়েকে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম আমি। আমাকে তো দেখছই, একটুও ভালো না দেখতে, খাটো, কালো।’ আমি হাসলাম, ‘আপনি মোটেই খারাপ দেখতে নন।’ তিনি বললেন, ‘লাহোরে এক বাসায় গিয়ে একবার একটা সবুজ চোখের মেয়েকে দেখলাম, দেখতে খারাপ বলে সে আমাকে পাত্তাই দিল না!’
তারপর তার প্যারিসবাস আর ইটালিবাসের গল্প শোনালেন। অনেক বছর পর ঢাকায় আবার সেই সবুজ চোখের মেয়েকে পেলেন, ততদিনে তিনি বিধবা। এবার সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন। হয়ে গেল বিয়ে। বললেন, ‘আমি তাকে খুব ভালবাসতাম। বিয়ের দশ বছরের মাথায় মরে গেল সে, আমাকে কোনোদিন ভালোবাসেনি!’ খুব করুণ মুখে বললেন, ‘কতদিন একটা প্রোট্রেট আঁকব বলে ডেকেছি, আসেনি।’
‘প্যারিস, ইটালিতে প্রেম হয়নি?’ জানতে চাই আমি। তিনি বলেন, ‘আলবৎ হয়েছে।’
হেসে পজ দিয়ে জানতে চাই, মদ্যপান করেন? - ‘আলবৎ করি!’ তারপর সিরিয়াস হয়ে বলেন, ‘তবে মদ্যপ অবস্থায় কখনও আঁকি নি!’
এবং হঠাৎ তিনি জানতে চান, তোমার সাপ্তাহিক ছুটি কবে?
আমি থতমত হয়ে বলি- ‘শনিবার! কেন?’
তিনি বলেন, ‘চা খাও, খেয়ে বিদায় হও!’
নিজেই ফ্লাস্ক থেকে ঢেলে চা খেলাম, চলে আসার সময় তার গাল ছুঁয়ে আদর করলাম। তিনদিন ধরে আঠারো শো শব্দের ইন্টারভিউ লিখলাম। তাঁর জন্মদিনে সেটা প্রায় বিনা কর্তনে ছাপা হলো। তাকে কপি পৌঁছে দিতে আমিই গেলাম, আর ফিরে আসার সময় আবারও গাল ছুঁয়ে আদর করলাম।
এই পরিচয় এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত, কিন্তু হল না।
পরের শনিবার সকাল সাতটার দিকে আমার ফোনে একটা বার্তা এলো, ‘আমার সঙ্গে যাবে এক জায়গায়?’ আটটার সময় আমি তাকে ফোন করলাম- ‘কোথায় আসব?’
দেখা হওয়ার পর চিত্রকর আমাকে যা বললেন, সেটা শুনে প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম- ‘আমি আরো অনেকদিন বাঁচতে চাই! প্লিজ হেল্প!’
তিনি আমাকে আরো যা যা বললেন সেটা তাঁর বয়ানে বলার শক্তি নাই আমার। ঠিক করলাম, ঢাকা শহরের সব গাছ ছুঁয়ে দেখতে আমি তাঁর সঙ্গে থাকব। প্রায় বিশ্বাস করে ফেললাম, গাছেরা তাকে দীর্ঘ জীবন দেবে।
প্রথম শনিবার আমরা গেলাম রমনা পার্কে, সকাল ছয়টায়। আমার হাতে একটা সিডি মার্কার। তাকে তাঁর ড্রাইভার নামিয়ে দিয়ে গেছে, আমি খানিক রিকশায়, খানিক হেঁটে পৌঁছে গেলাম। তিনি গাছ ছুঁয়ে দেন আর আমি মার্কার দিয়ে নম্বর দিই গাছের গায়ে। ‘এসো তুমিও ছুঁয়ে দাও’ আমি দুইদিকে মাথা নাড়ি, ‘আমি বিপ্লব নই, দীর্ঘজীবী হতে চাই না।’ এবার তিনি আমার মতো করে বললেন, ‘কেন? ব্রেকাপ হইছে বইলা?’ হো হো করে হাসলাম আমি। ঘন্টা খানেক হেঁটে লেকের পাড়ে একটা বেঞ্চিতে বসলাম আমরা। ফ্লাস্কের চা খেলাম। কাছেই ফুল কুড়িয়ে এনে মালা গাঁথতে বসেছে পথ শিশুর দল। জানুয়ারির শীত, খবরের কাগজ দিয়ে আগুন জ্বালিয়েছে তারা। ধোঁয়ায় তাঁর কষ্ট হচ্ছিল বলে অন্যদিকের বেঞ্চিতে বসার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছি, তিনি হাঁটতে শুরু করেছেন, আমি আগুনের দিকে এগিয়ে গেলাম একটা ফুলের মালা কিনবো বলে। সেই সময় আগুনে হঠাৎ চোখে পড়ল একটা কাগজের দিকে, কোনো দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতা, কবিতায় আগুন লেগে গেছে। আমি কাছে গিয়ে আগুন থেকে কবিতা তুলে নিলাম। তোলার সময় আগুন আর মাটিতে জোড়ে থাপ্পড় মেরেছি বলে একটু ছ্যাকা লেগেছে। পলাশের কবিতা ছাপা হয়েছে- ‘এত সহজে!’ চিত্রকর খানিক এগিয়ে গিয়েছিলেন, দ্রুত ফিরে এসে আমার হাত ধরলেন- ‘কী করছ?’ হাতের পাতা মেলে দেখলেন লাল হয়ে গেছে। আমি ব্যাকুল হয়ে বললাম, ‘পলাশের কবিতা ছাপা হইছে!’ এবার তিনি হেসে ফেললেন, ‘এই তোমার ব্রেকাপ?’ একটু হেঁটে দুরের একটা বেঞ্চিতে গিয়ে বসলাম আবার, তিনি বললেন, ‘পলাশকে একটা ফোন করবে নাকি?’ আমি বললাম, ‘না, ব্রেকাপ ইজ ব্রেকাপ।’
পরের শনিবার আমরা গেলাম বোটানিক্যাল গার্ডেনে। প্রায় দুই ঘন্টা গাছ ছোঁয়া হলে বসলাম আমরা। তিনি বললেন, ‘নরসিংদিতে আমার একটু জমি আছে। সেখানে ছোট একটা ঘর আছে, সেখানে গিয়ে ছবি আঁকি মাঝে মাঝে। যাবে একদিন?’
আমি চোখ টিপে হেসে বললাম, ‘কেন? আমার ন্যুড আঁকবেন?’
তিনি আহ্লাদ করে বললেন, ‘খুব পাজি মেয়ে তো তুমি!’ তারপরই বললেন, ‘পরের শনিবার তোমার সবুজ লেন্স পরে এসো, ছবি আঁকবো। ন্যুড না, শাড়ি পরবে?’
আমি বললাম, ‘না পরব না, শাড়ি অপছন্দ আমার।’
এবার তিনি বললেন, ‘কেন? ব্রেকাপ ইয়াদ আসে?’
আমি হাসতে হাসতে বললাম, ‘আপনি তো খুব দুষ্টু আছেন!’
পরের শনিবার আমরা নরসিংদি গেলাম। পাক্কা তিন ঘন্টা সিটিং দিলাম। ক্যানভাসে একটু একটু করে আমাকে ফুটে উঠতে দেখে খুব অবাক হলাম, তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলাম। তিনি লজ্জা পেয়ে বললেন, ‘আহা কী করো!’
টানা ছয়মাসের চব্বিশটা শনিবার আমি তাঁর সঙ্গে কাটালাম, গাছে এবং আঁকায়।
পঁচিশতম শনিবার ভোরবেলা তাঁর ফোনে নয়, ঘুম ভাঙ্গল লূনা আপার ফোনে। গতকাল রাতে চিত্রকর মারা গেছেন। এগারোটার সময় লাশ শহীদ মিনার নেওয়া হবে। আমাকে বলা হলো, শহীদ মিনার হয়ে অফিসে যেতে। আমি প্রথমেই অবিশ্বাস করলাম, ফোন করলাম তাঁর ফোনে, যেন আমি তাকেই জিজ্ঞাসা করতে চাই, আপনি নাকি মরে গেছেন? ফোন বেজে গেল, কেউ ধরল না। আমার কান্না পেল না, কেবল মনে হল, চব্বিশটা শনিবার আমি খুব ভালো কাটিয়েছি। তিনি আমার শনিবার গুলা সাথে করে নিয়ে গেছেন।
আমি আস্তে ধীরে রেডি হলাম, তাঁর সঙ্গে দেখা হবার প্রথম দিনের সবুজ ফতুয়া আর সবুজ লেন্স পরলাম। দশটার দিকে শহীদ মিনার গেলাম। লোকে লোকারণ্য। এক কোনায় চুপ করে বসলাম। তানভীর এলো ছবি তুলতে। এগারোটার দিকে তিনি এলেন, ফুলে ফুলে ছেয়ে গেলেন। আমি কাছে গেলাম, হাত বাড়িয়ে তাঁর গাল ছুঁয়ে দিলাম একটু। তাঁর দুই মেয়েকে দেখলাম, কেঁদে কেঁদে ক্লান্ত হয়ে গেছেন।
তানভীরের সঙ্গে অফিসে চলে এলাম। লূনা আপা বললেন, ‘চিত্রকরকে নিয়ে কিছু লিখে দাও, পেছনের পাতায় বক্স হয়ে যাবে।’ আমি বললাম, ‘আমার ডে অফ বদলে দেন, শনিবার আর লাগবে না আমার!’ লূনা আপা কি বুঝল কে জানে, বলল, ‘খুব খারাপ লাগতেছে?’ আমার কথা বলতে ইচ্ছা করছিল না, তবু বললাম, ‘না খারাপ লাগতেছে না, নীচে যাই, চা খাইয়া আইসা লিখতে বসব।
মাস খানেক পরে এগারোটার দিকে অফিসের জন্য রেডি হচ্ছি, তখন ফোন এলো। ফোন হাতে নিয়ে তাকিয়ে রইলাম, তাঁর নম্বর! বেজে বেজে কেটে গেল। আবার ফোন বাজতে লাগল, এবার ধরলাম। ও পাশ থেকে নারীকন্ঠ বললেন, আমি চিত্রলেখা, ‘আপনি এখনি একটু আমাদের বাসায় আসতে পারবেন?’ চিত্রলেখা চিত্রকরের মেয়ে!
লূনা আপাকে জানালাম, অফিসে আসতে দেরি হবে।
এবার আমি তাঁর বাসায় গিয়ে বেল বাজালাম। বসার ঘরে অনেক লোকজন। আমাকে বসতে বললেন কেউ একজন। আমি কোলের ওপর ব্যাগ রেখে বসলাম। চিত্রকরের মেয়ে চিত্রলেখা বললেন, ‘আপনি আমার বাবার উইল বিষয়ে কিছু জানেন?’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কী বলছেন বুঝতে পারছি না, কীসের উইল?’ চিত্রলেখা দাঁতে দাঁত ঘষে বললেন, ‘অভিনয় করবেন না!’ তারপর এক ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনি কথা বলুন প্লিজ।’ ভদ্রলোক আমাকে বললেন, ‘নরসিংদীতে ওনার একটা জমি আছে, সেটা তিনি আপনাকে দিয়ে গেছেন!’ আমার মনে পড়ল, তিনি একদিন আমাকে বলেছিলেন, ‘তোমার পাসপোর্ট সাইজের এক কপি ছবি আর ভোটার আইডির কপি দেবে আমাকে, কেন জানতে চাইবে না।’ আমি দিয়েছিলাম। এবার চিত্রলেখা বললেন, ‘আপনার সঙ্গে বাবার কী সম্পর্ক?’
আমি বললাম, ‘চব্বিশটা শনিবার আমি তাঁর সঙ্গে গাছ ছুঁতে গেছি, তিনি বিশ্বাস করতেন গাছেরা তাকে দীর্ঘ জীবন দেবে। এছাড়া তিনি আমার একটা প্রোট্রেট এঁকেছিলেন। আর আমরা প্রচুর কথাও বলেছি। এর বাইরে কোনো কিছু ছিল না।’ চিত্রলেখা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘প্রতি শনিবার বাসায় ফিরে বাবার প্রেসার ফল করত, তিন চারদিন বিছানায় পড়ে থাকতেন, জানেন আপনি?’
আমি উকিল ভদ্রলোকের দিকে ঘুরে বললাম, ওই জমি আমি চাই না, কোথায় সাইন করতে হবে, দিন, করে দিচ্ছি। চিত্রলেখার দিকে ঘুরে বললাম, ‘আমি কি তাঁর আঁকার ঘরটা একবার দেখতে পারি?’ চিত্রলেখা উঠলেন, আমরা আঁকার ঘরে গেলাম। খাটের মাথার কাছে দেয়ালে হেলান দিয়ে আমার প্রোট্রেটটা রাখা। আমি চিত্রলেখার হাত ধরে বললাম, ‘এটা আ্মাকে দেবেন?’
চিত্রলেখা হ্যাঁ বললেন।
আমার ব্যাগে রাখা র‍্যাপিং পেপাপ আর সুতা দিয়ে ওটা খুব যত্ন করে মোড়ালাম। আসার সময় কিনেছি, র‍্যাপিং পেপার আর পাকানো সুতা। চিত্রলেখার ফোন পেয়ে আমার প্রথমেই মনে হয়েছিল, ছবিটা দিতেই আমাকে ডেকেছেন।
উকিলের কাগজ পত্রে সাইন করলাম।
ছবি নিয়ে বাসায় ফিরলাম, অফিসে গেলাম না।