ছায়াপথে, কয়েক টুকরো লেখা

পার্থজিৎ চন্দ



ছায়াপথে, কয়েক টুকরো লেখা


আমি এসে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম, গত-পিকনিকে বন্ধুদের ফেলে যাওয়া হাসি। তালপাতা-ছাওয়া একটা ঘর। সেখানে রাত্রিবাস করেছিল ওরা। দেখেছিলাম একটা কালো উনুন। মাটির। পোড়া কাঠ। শালের দীর্ঘ ছায়া শরীর পেতে শুয়ে আছে মাটির ওপর। বল্মীকের স্তুপ থেকে বেরিয়ে আসছে ডেঁয়ো-পিপড়ের সার। ঠিক এভাবেই সার বেঁধে চলে গেছে বন্ধুরা। আমার জন্য তারা ফেলে রেখে গেছে বিষাদ। এই বিষাদের মধ্যেই সুসংবাদ আসে। এ বছর দুর্গাছাতু হবে খুব। সেই শালবনের ভেতর থরে থরে ফুটে থাকবে দুর্গাছাতু। আমরা কল্পবাস্তবের ছেলেমেয়ে প্রায়। সেই কোন গতজন্মে আমাদের শেষ দেখা হয়েছিল। তারপর এক দীর্ঘ টানেল বেয়ে উরগ গতি। কেউ কাউকেই দেখতে পেতাম না।
যে বছর আলপথ ধরে শুঁড়িপথ ধরে খরিশ ঘুরতে থাকে নিজের মনে, সে বছর দুর্গাছাতু উপচে পড়ে। এ বছর আমাদের আবার নিশ্চয় দেখা হবে, হবেই। আমরা একসঙ্গে দুর্গাছাতু তুলতে যাব বনে। অন্ধকার টানেলে আবার তলিয়ে যাবার আগে ওটুকুই আমাদের একমাত্র কাজ। ঝলমল করবে আকাশ। ঝলমল করবে দুর্গাটুনটুনির শিস। লালমাটির গর্তে টলটল করবে জল। নিচু হয়ে দুর্গাছাতু কুড়োবার সময় চোখে পড়বে, জলের ভেতর অসুরের বর্শা-বেঁধা শরীর। তার বুকের রক্ত চেটে ফিরে যাচ্ছে হলুদ খরিশ।
দুর্গাছাতুর ওপর জেগে থাকা রক্তের ছিটছিটে দাগ


তোমাকে দেখেছি আমি মুণ্ডহীন সাপ।
এক সোনার নেউল এ-জন্মে তোমার মুণ্ড ছিঁড়ে রেখে গেছে বল্মীকের স্তুপের ভেতর। মাঝে মাঝে সে এসে দেখে যায় তোমাকে। তোমার রক্তধুলোমাখা মুণ্ডখানা তার খুব প্রিয়।
কিছুটা দূরে তোমার নিথর শরীর। গলার কাছে সরু কালো চুলের মতো দাগ। তোমার জাতক-শরীর জানিয়ে দিয়েছে, গতজন্মে ... তারও আগের আগের জন্মে তোমার গলা চিরে দিয়েছিল নেউলের ধারালো ক্ষুর। খাদ্য-খাদক সম্পর্কহীন হত্যার থেকে প্রিয় আর কিছুই নেই। কিন্তু তুমি গলায় সেই চিহ্ন বয়ে বেড়াতে আজও ভালোবাসো?
বনের ভেতর থেকে ভেসে আসছে কার নুপুরের আওয়াজ?
কেউ জানে না, আমি জানি বল্মীকের স্তুপে একদিন ঝরে পড়েছে তোমার শোণিত। সেদিন থেকে সব কাহিনীর ভেতর রক্তাভ তাম্রপুষ্প ফুটে আছে। তোমার শরীর জুড়ে ফুটে উঠছে হাজার হাজার উদগ্রীব শ্রবণেন্দ্রিয়। সারা শরীর পেতে তুমি শুনতে চাইছ সেই ধ্বনি, সেই বিষ-নুপুর বিষ-নুপুর...
দূরে, বল্মীকের স্তুপে কোথাও কেঁপে উঠছে তোমার ছিঁড়ে নেওয়া মাথা

তীব্র ঝকঝকে ছুরি হাতে বনের কাছে অপেক্ষা করেছিল এক রাক্ষস। ছুরির হাতলে স্যাফায়ার। এই রাক্ষসের হাতে ধরা পড়াই নিয়তী, জানতাম। জানতাম সে আমাকে টেনে নিয়ে যাবে বনের গভীরে। সেখানে বিশাল কালো বাড়ি। সব আলো নেভানো। একটা সিঁড়ি ক্রমশ নেমে গেছে টংঘরের দিকে। হ্যাঁ, নেমেই গেছে। সেই সিঁড়ি বেয়ে আমাকে উঠে যেতে হবে। রাক্ষস আমার জন্য সাজিয়ে রাখবে ময়ূর ঝর্না আর এক অভয়ারণ্যের ছবি। তিনটি পায়ার ওপর ভর করে আশ্চর্য দাঁড়িয়ে থাকবে এক ষড়ভূজাকৃতি টেবিল। রাক্ষস আর আমি মুখোমুখি। কেউ কারোর চোখের থেকে চোখ সরাতে পারব না। আমাদের দু’জনের চোখের মাঝখান দিয়ে হুহু করে ছুটতে শুরু করবে হাওয়া। ঝড়। একদিন এক খুলির ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের শব্দ শুনেছিলাম। শুনেছিলাম, সেখান থেকেই ফুটে উঠছে গান। বেডশিট ওলটপালট হয়ে যাবে ঝড়ে। ফোটোফ্রেম আছড়ে পড়বে মেঝেয়। ফ্রেম থেকে লাফ মেরে ছাদের কার্নিসে ঘুরতে শুরু করবে ময়ূর। রাক্ষস টেবিলের ওপার থেকে উঠে এসে তীক্ষ্ণ ছুরি দিয়ে কেটে ফেলবে আমার মাথা। খুঁটে খুঁটে বের করবে স্নায়ু, দীর্ঘ দীর্ঘ সব স্নায়ু। ঘষে ঘষে তুলে ফেলবে স্মৃতির মেদ। শুটিং-স্টারের মত সেই টংঘর থেকে মেদ ছড়িয়ে পড়বে অন্ধকারে।
সেই রাক্ষস আমাকে অ্যডিউ জানাবে ভোরবেলা। সেই কালো ঘর, সেই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসার সময় আমার কোনও স্মৃতি নেই অতীত নেই। ফলত মনে পড়বার কথা নয় সেই রাক্ষস সেই ছুরি সেই ফোটোফ্রেম আর সেই ময়ূর। অথচ আমার স্মৃতির বাইরে, স্মৃতির মেদ-উপড়ে-নেওয়া ছুরি ও তার স্যাফায়ার হাতলের কোনও অস্তিত্বও নেই।
একটু একটু কর মনে পড়ে রাক্ষস বন ছুরি টংঘর আর ময়ূর...


একটা পাথরের নৌকো এসে দাঁড়িয়েছে শালের জঙ্গলে। শালজঙ্গলের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ছোট ছোট ঢেউ। জোড়ায় জোড়ায় ঘুঘু এসে বসছে নৌকার ছইয়ে। সেই কোন সন্ধ্যায় ছইয়ের ভেতর কুপি জ্বালিয়ে নৌকা ছেড়েছিল মাঝি। মাটির পেট থেকে উঠে আসা হাওয়ার দাপটে নিভেছে বাতি। নৌকার পাটায় বসে তারাদের দিকে চেয়ে গান গেয়েছে মাঝি। অতি দীর্ঘ দুঃখের গান। হাওয়ায় হাওয়ায় গলুইয়ের জল কেঁপেছে। ছটফট করেছে আটকে-পড়া তেচোখো মাছ। পাথরের নদীতে ভাটার টানে বারবার ধাক্কা খেয়েছে নৌকো। থরথর করে কেঁপে উঠেছে। যেন নড়ে উঠেছে মাতৃগর্ভের অন্ধকার। ভোররাতে নৌকা এসে থেমেছে শালের জঙ্গলে।
বহুদিন আগে মাতৃহারা এক কন্যাকে বনযত্নে রেখে গিয়েছিল সে। আজ তাকে নিতে এসেছে। আধো ঘুমন্ত মেয়েকে কোলে নিয়ে ফিরে যাচ্ছে।
ভোরবেলা শালজঙ্গলে টলটল করে উঠছে জলভরা পাথরের চোখ


তুখোড় জুয়াড়ি শুধু জুয়াই খেলে না; বানিজ্য পদ্ধতিও বুঝে নিতে চায়।
পাহাড়ি শহর থেকে দেখা, আরও দূরে পাহাড়ের ওপর এক জুয়া-ঘর। এঁকেবেঁকে রাস্তা উঠে গেছে। প্রত্যেক জুয়াড়িকে নিজেই নিজের পথ তৈরী করে নিতে হয় সেই ক্যাসিনোয় পৌঁছাতে গেলে। কারণ এক মুহূর্তের পথ আরেক মুহূর্তে সত্য(!)নয়। সেখানে রুলেটের ওপর জ্বলে থাকে নীল আলো। খুলি আঁকা ক্যাসিনোর দরজা মানুষের ছায়া পড়া মাত্র খুলে যায়।
প্রতিবার প্রবেশ করবার পর ক্যাসিনো মালিকের চোখে চোখ পড়লে মনে হবে – পঞ্চাশ পঞ্চাশ। একটি বাস্তবতার দুটি সম্ভাবনা … কয়েনের একদিকে তুমি আর এক দিকে ক্যাসিনোর মালিক। নিখুঁত নিশানায় ডার্ট বিঁধে গেলে তুমিই রাজা। আর না-হলে মালিকের কান থেকে চোখ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া হাসি।
একদিন ক্যাসিনো মালিক তার বানিজ্য পদ্ধতি কিছুটা বুঝিয়ে ছিলেন। যত বেশী ডার্ট তত বেশী লক্ষ্যভেদের ভুল।
শেষতম জুয়া খেলবার পর পাহাড়ের খাঁজ ভেঙে ভেঙে নামতে দিয়ে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়েছি। কারণ তিনি আমার হাতে সম্ভাবনার একটি ডার্ট তুলি দিয়েছেন।
নিশ্চয় ক্যাসিনো মালিকও ঈশ্বরকেই ধন্যবাদ দিতে দিতে বাড়ি ফিরেছেন; ভেবেছেন তিনি মঙ্গলময়। কারণ তিনি প্রভূত সম্ভাবনার ডার্ট বহুদিকে ছড়িয়ে দিয়েছেন


একটা কালো দূরবীন। জনমানবহীন এক বিশাল ইমারতের ঝুল-বারান্দায় পড়ে থাকা পরিত্যক্ত অ্যকোয়ারিয়ামের ভেতর ডুবে রয়েছে। অ্যকোয়ারিয়ামের ভেতর নুড়ি-পাথরের সাজানো পাহাড়। পোর্সেলিনের ল্যাংটো ছেলে মেয়ে। জলে ডোবা লতাপাতায় মোড়া তাদের শরীর। বুজগুড়ি দিয়ে পাকিয়ে উঠছে জল। কবে, কারা এই বাড়ি ছেড়ে উঠে গেছে কেউ জানে না। সূর্য ওঠে সূর্য অস্ত যায়। বারান্দায় ঢলে পড়ে ছায়া। এর বাইরে আর কিছুই ঘটে না তেমন।
নাহ, আরেকটি ঘটনাও ঘটে।
মাছের লোভে একদিন একটি সাপ অ্যকোয়ারিয়ামে ঢুকে পড়েছিল। আজ কিছুতেই বের হতে পারছে না সে। তার লেজ বেরিয়ে আছে বাইরে। গলার কাছে আটকে রয়েছে আধ-খাওয়া মাছ। কালো দূরবীনটিকে তীব্র ভাবে পাকিয়ে ধরেছে সে।
অ্যকোরিয়ামের শেষ মাছটি ঘুরে ঘুরে এসে পড়ে দূরবীনটির আইপিসের সামনে। রাতের অন্ধকার মাছটি দেখে কোটি কোটি কোটি মাইল দূরে কালপুরুষের দেহ। অথবা কালনারীর। কোটি কোটি কোটি বছরের বিষন্নতায় একদিকে হেলে পড়েছে তার মাথা